ভোটকেন্দ্রে বিএনপি, পোস্টাল ব্যালটে জামায়াতের জয়

ভোটকেন্দ্রে বিএনপি, পোস্টাল ব্যালটে জামায়াতের জয়
পোস্টাল ব্যালট । ছবি: বাসস

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কেন্দ্রভিত্তিক ফলাফলে বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ আসনে বিজয়ী হলেও পোস্টাল ব্যালটের ফলাফলে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। নির্বাচনের মূল ভোটগ্রহণের বাইরে ডাকযোগে দেওয়া ভোটের ফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২৯৯টি সংসদীয় আসনের মধ্যে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থীরা ২৫৫টি আসনের পোস্টাল ব্যালটের ফলাফলে বিজয়ী হয়েছেন।

অর্থাৎ, ভোটকেন্দ্রে যে ফলাফল দেখা গেছে, ডাকযোগে দেওয়া ভোটে তার উল্টো চিত্র লক্ষ্য করা গেছে। তবে এই বিপরীত চিত্র বাস্তব নির্বাচনী ফলকে খুব বেশি প্রভাবিত করতে পারেনি। কারণ, পোস্টাল ভোটের ফলাফল কেন্দ্রভিত্তিক প্রাপ্ত ভোটের সঙ্গে যুক্ত হয়ে মাত্র দুটি সংসদীয় আসনের—সিরাজগঞ্জ-৪ ও মাদারীপুর-১—চূড়ান্ত ফলাফল নির্ধারণে ভূমিকা রেখেছে।

নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তাদের থেকে প্রাপ্ত পোস্টাল ব্যালটের ফলাফল বিবরণী বিশ্লেষণ করে এ তথ্য পাওয়া গেছে। নির্বাচন কমিশনের কাছে পাঠানো এই তথ্য বিবরণী অনুযায়ী, ১১ দলীয় জোটের প্রার্থীরা ২৫৫টি আসনে পোস্টাল ব্যালটে এগিয়ে ছিলেন। অন্যদিকে বিএনপি প্রার্থীরা ৪০টি আসনে এবং ৩টি আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা পোস্টাল ব্যালটে বিজয়ী হয়েছেন। সামগ্রিকভাবে ডাকযোগে দেওয়া ভোটে ১১ দলীয় জোট প্রার্থীদের একটি সুস্পষ্ট প্রাধান্য লক্ষ্য করা গেছে।

সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপের মাধ্যমে প্রায় ১৫ লাখ প্রবাসী, সরকারি চাকরিজীবী এবং কয়েদি ডাকযোগে ভোট দিতে নিবন্ধন করেন। নির্বাচন কমিশনের তথ্য বিবরণী অনুযায়ী, নিবন্ধিত ভোটারদের মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশ—অর্থাৎ, ১০ লাখ ৬৩ হাজার ৮৭৪ ভোটার পোস্টাল ভোট দেয়।

তবে প্রদত্ত ভোটের মধ্যে যাচাই-বাছাই শেষে ৫৭ হাজারের বেশি ভোট বাতিল হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ভুলভাবে পূরণ করা ব্যালট অথবা সময়মতো পৌঁছাতে না পারার মতো বিভিন্ন কারণে এসব ভোট বাতিল হয়েছে। ফলে বৈধ পোস্টাল ভোটের সংখ্যা কিছুটা কমে যায়।

জয় নির্ধারণ দুই আসনে

পোস্টাল ভোটের ফলাফল সিরাজগঞ্জ-৪ ও মাদারীপুর-১ আসনের ফলাফল নির্ধারণে সরাসরি ভূমিকা রেখেছে বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এই দুই আসনে ভোটকেন্দ্রের প্রাথমিক ফলাফলে এগিয়ে থাকা প্রার্থীদের অবস্থান পোস্টাল ভোট যোগ হওয়ার পর পরিবর্তিত হয়েছে। শেষ পর্যন্ত এই দুই আসনেই জামায়াতে ইসলামী এবং ১১ দলীয় জোট মনোনীত প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন।

এর মধ্যে সিরাজগঞ্জ-৪ আসনে কেন্দ্রভিত্তিক ফলাফলে জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী রফিকুল ইসলাম খান পেয়েছিলেন ১ লাখ ৫৯ হাজার ৬৯৩ ভোট। একই আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী এম আকবর আলী পেয়েছিলেন ১ লাখ ৬০ হাজার ৪৫৮ ভোট। অর্থাৎ, কেন্দ্রের ভোট গণনা শেষে বিএনপি প্রার্থী এগিয়ে ছিলেন। তবে পোস্টাল ব্যালটের ভোট যুক্ত হওয়ার পর এই ব্যবধান বদলে যায় এবং শেষ পর্যন্ত বিজয়ী হন জামায়াতের প্রার্থী।

পোস্টাল ব্যালটের ফলাফল অনুযায়ী ওই আসনে রফিকুল ইসলাম খান পেয়েছেন ২ হাজার ১৭৯ ভোট। অন্যদিকে এম আকবর আলী পেয়েছেন ৮২০ ভোট। ফলে পোস্টাল ভোট যোগ হওয়ার পর চূড়ান্ত ফলাফলে জামায়াতের প্রার্থী ৫৯৪ ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী ঘোষিত হন। এই আসনকে পোস্টাল ভোটের প্রভাবের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

প্রায় একইভাবে মাদারীপুর-১ আসনেও পোস্টাল ব্যালট ফলাফলে পরিবর্তন এসেছে। বিএনপির প্রার্থীর চেয়ে ৩৮৫ ভোট বেশি পেয়ে নির্বাচিত হন ১১ দলীয় জোটের শরিক দল বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থী সাইদ উদ্দিন আহমাদ হানজালা। পোস্টাল ব্যালটে হানজালা পেয়েছেন ১ হাজার ৩৯৮ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির প্রার্থী নাদির আক্তার পেয়েছেন ২৩৩ ভোট।

পোস্টাল ব্যালটের ফলাফল যুক্ত হওয়ার আগে কেন্দ্রভিত্তিক ফলাফলে নাদিরা আক্তারের ভোট ছিল ৬৫ হাজার ২৯১ ভোট। বিপরীতে হানাজালার ভোট ছিল ৬৪ হাজার ৫১১টি। অর্থাৎ, ভোটকেন্দ্রের ফলাফলে নাদিরা আক্তার ৭৮৬ ভোটে এগিয়ে ছিলেন। কিন্তু পোস্টাল ভোট যুক্ত হওয়ার পর সেই ব্যবধান উল্টে যায় এবং চূড়ান্ত ফলাফলে হানজালা এগিয়ে যান।

নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, গত ১২ ফেব্রুয়ারি ভোটের দিন বিকাল সাড়ে ৪টায় পোস্টাল ব্যালট গণনা শুরু হয়। পোস্টাল ভোটের জন্য প্রতিটি সংসদীয় আসনে একজন করে মোট ৩০০ জন প্রিসাইডিং অফিসার নিয়োগ দেয় ইসি। তাদের তত্ত্বাবধানে ডাকযোগে প্রাপ্ত ব্যালটগুলো যাচাই ও গণনা করা হয়।

ভোট গণনার সময় রাজনৈতিক দল মনোনীত একজন করে পোলিং এজেন্ট উপস্থিত ছিলেন। গণনা শেষে কেন্দ্রভিত্তিক ফলাফলের সঙ্গে পোস্টাল ব্যালটের ফলাফল যুক্ত করে চূড়ান্ত ফলাফল বার্তাপ্রেরণ শিটের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনে পাঠান সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তারা। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ডাকযোগে দেওয়া ভোটগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনের সামগ্রিক ফলাফলের অংশ হয়ে যায়।

দক্ষিণাঞ্চলেও এগিয়ে জামাত

চূড়ান্ত ভোটের ফলাফলে সবগুলো আসনে পরাজিত হলেও পোস্টাল ভোটে দক্ষিণাঞ্চলের বেশ কয়েকটি জেলায় বিপুল ব্যবধানে এগিয়ে ছিল জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট। কুমিল্লা, চাঁদপুর, ফেনী, নোয়াখালী এবং চট্টগ্রাম জেলার বিভিন্ন আসনের পোস্টাল ব্যালটের ফলাফল বিশ্লেষণ করে এ তথ্য পাওয়া গেছে।

কুমিল্লা জেলার ১১টি সংসদীয় আসনের পোস্টাল ব্যালটের ফলাফলের প্রতিটিতেই জয়ী হয়েছেন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থীরা। এর মধ্যে কুমিল্লা-৪ আসনে জোট শরিক জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) প্রার্থী হাসনাত আব্দুল্লাহর সঙ্গে বিএনপি সমর্থিত গণঅধিকার পরিষদ মনোনীত প্রার্থীর ভোটের ব্যবধান ছিল ৫ হাজার ৮১৫। এই আসনে চূড়ান্ত ফলাফলেও বিজয়ী হয়েছেন হাসনাত আব্দুল্লাহ। পোস্টাল ব্যালটে তিনি পেয়েছেন ৬ হাজার ৫৬ ভোট। কুমিল্লা জেলার ১১টি আসনে পোস্টাল বিডি অ্যাপে গড়ে ৯ হাজার ৩১৬ জন ভোটার ডাকযোগে ভোট দিতে নিবন্ধন করেছিলেন।

একইভাবে চাঁদপুর, নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুর জেলার সবকটি আসনেই ১১ দলীয় জোটের প্রার্থীরা পোস্টাল ব্যালটে বিজয়ী হয়েছেন। চাঁদপুর জেলার পাঁচটি আসনের মধ্যে চাঁদপুর-৩ আসনে পোস্টাল ব্যালটে ভোটের হার ছিল সর্বোচ্চ ৭১ দশমিক ৫৯ শতাংশ। ওই আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী শাহজাহান মিয়ার সঙ্গে বিএনপির প্রার্থী শেখ ফরিদ আহম্মেদের ভোটের ব্যবধান ছিল ২ হাজার ২৬০।

পোস্টাল বিডি অ্যাপে ফেনী-৩ আসনে নিবন্ধন করেছিলেন সর্বোচ্চ ১৬ হাজার ৩৮ জন ভোটার। ওই আসনে পোস্টাল ব্যালটে বিএনপি প্রার্থী আব্দুল আউয়াল মিন্টু পেয়েছেন ৩ হাজার ১৯৬ ভোট। বিপরীতে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মোহাম্মদ ফখরুদ্দিন পেয়েছেন ৭ হাজার ৩৩৯ ভোট। ফলে এই জেলায় তিনটি আসনেই ১১ দলীয় জোটের প্রার্থীরা বিএনপির চেয়ে গড়ে প্রায় ২ হাজার ৮৯৬টি করে ভোট বেশি পেয়েছেন।

চট্টগ্রাম জেলার ১৬টি আসনের মধ্যে মাত্র একটি আসনের পোস্টাল ব্যালটে জয় পেয়েছেন বিএনপি মনোনীত প্রার্থী। চট্টগ্রাম-১২ আসনে বিএনপি প্রার্থী মো. এনামুক হক পোস্টাল ব্যালটে পেয়েছেন ৯৬৪ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ফরিদুল আলম পেয়েছেন ৭৬৪ ভোট। এই আসনে পোস্টাল ভোটের ব্যবধান ছিল ২০০।

তিন আসনে জয়ী স্বতন্ত্র প্রার্থী

পোস্টাল ব্যালটের ফলাফলে তিনজন স্বতন্ত্র প্রার্থীও বিজয়ী হয়েছেন। যদিও বিএনপি এবং ১১ দলীয় জোটের প্রার্থীদের সঙ্গে তাদের ভোটের ব্যবধান খুব বেশি নয়।

পটুয়াখালী-৩ আসনে পোস্টাল ব্যালটে ৭৮৫ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. হাসান মামুন। এই আসনে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী নুরুল হক নুর পেয়েছেন ৫৫৭ ভোট এবং জামায়াতের প্রার্থী মুহাম্মদ শাহ আলম পেয়েছেন ৪৮২ ভোট।

এ ছাড়া ময়মনসিংহ-১ আসনে পোস্টাল ব্যালটে বিজয়ী হয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী সালমান ওমন। ঘোড়া প্রতীকে তিনি পেয়েছেন ১ হাজার ২৪ ভোট। অন্যদিকে ঢাকা-৯ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী তাসনিম জারা পেয়েছেন ১ হাজার ১৬৫ ভোট। এই আসনে তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির প্রার্থী হাবিবুর রশিদ পেয়েছেন ১ হাজার ১০১ ভোট।

এই ফলাফলগুলো থেকে দেখা যায়, ডাকযোগে দেওয়া ভোটের ক্ষেত্রে কিছু আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থীরাও উল্লেখযোগ্য সমর্থন পেয়েছেন। যদিও সামগ্রিকভাবে পোস্টাল ব্যালটে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থীদের মধ্যে।

সম্পর্কিত