সুদীপ্ত সালাম

কাজটি করা হয়েছিল কেবলই মৃত শিশুদের স্মৃতি ধরে রাখতে। বন্দুক হামলায় মরে যাওয়া শিশুদের ঘর ও নানা স্মৃতি ক্যামেরার লেন্সে ধরে রাখতে রাখতে কখন যে সেইসব দুঃসহ ঘটনার সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে যাওয়া, তা ঠাওর করাই কঠিন।
লু বোপ একজন নিউইয়র্কভিত্তিক বাণিজ্যিক আলোকচিত্রী। তিনি বিভিন্ন ব্র্যান্ডের জন্য মানুষ ও পোষা প্রাণীর ছবি তুলে থাকেন। ২০১৮ সালে তার কাছে এমন এক কাজ আসে, যা তিনি আগে কখনো করেননি। কাজটিতে হয়তো তিনি হাতও দিতেন না যদি তার সাংবাদিক বন্ধু স্টিভ হার্টম্যান তাকে কাজটি করতে না বলতেন। স্টিভ কাজ করেন সিএসবি নিউজ-এর হয়ে। ২০১৮ সালে তিনি লুকে একটি আইডিয়ার কথা জানান, যুক্তরাষ্ট্রে তো প্রায়ই স্কুলগুলোতে গুলির ঘটনা ঘটে, যে শিশুরা এই স্কুল-শ্যুটিংয়ে নিহত হয়েছে তাদের বেডরুমগুলোর ছবি তুললে কেমন হয়? লু তখন স্টিভকে বলতে পারেননি—আসলে কেমন এই আইডিয়া। তবে বিস্ময়কর মনে হয়েছিল তার, এ কেমন ফটোগ্রাফি-প্রজেক্ট—যেখানে কেন্দ্রীয় চরিত্রই নেই! তারপরও চ্যালেঞ্জ হিসেবে তিনি এই বিশেষ প্রজেক্টে যুক্ত হন।
আলোকচিত্রী লু বোপ–এর অভিজ্ঞতা শোনা যাক তার কথাতেই। তার অভিজ্ঞতায়, ‘‘এমন এক প্রকল্পে কাজ করেছি, প্রকল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র যারা—তারাই নেই। কেন নেই? এই প্রশ্নের উত্তরটি নির্মম। যারা বেঁচে নেই তাদের ছবি তো তোলা যায় না! তবে তাদের খুঁজে পেয়েছিলাম তাদের ঘরের প্রতিটি কোণায়, চুল বাঁধার ফিতায়, টুথপেস্টের টিউবে এবং স্কুলের অনুষ্ঠানের ছেঁড়া টিকিটে। এই প্রকল্পে আমরা ছয় বছরেরও বেশি সময় কাজ করেছি। সন্তানহারা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করেছি। সাংবাদিক স্টিভ যখন নতুন কোনো পরিবারের খবর দিত তখন আমি ভারাক্রান্ত হয়ে পড়তাম। কেননা খবরটি আমাকে জানাত, আরো একটি পরিবার তাদের সন্তান হারিয়েছে।’’
লু–এর বন্ধু স্টিভের মতে, স্কুলে বন্দুক-হামলা মহামারি আকার ধারণ করেছে। এই ঘটনা তাকে ভীষণভাবে পীড়া দিতে থাকে। তারপর এ বিষয়ক একই ধরনের সংবাদের পুনরাবৃত্তি তার কাছে একঘেয়ে লাগছিল। তিনি বলেছেন, ‘‘দেশটি যেন অসাড় হয়ে ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারগুলোর প্রতি সহানুভূতি হারিয়ে ফেলছে। আমি কিছু একটা করতে চেয়েছিলাম। তখনই আমি দেশের অন্যতম সেরা আলোকচিত্রী লু বোপের সঙ্গে যোগাযোগ করি।’’

যুক্তরাষ্ট্রে স্কুলে বন্দুক-হামলার ঘটনাগুলো সাংবাদিক স্টিভ হার্টম্যানকে নাড়া দেওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে। মার্কিন গণমাধ্যম সিএনএন-এর একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রে স্কুলে বন্দুক-হামলায় নিহত হয় ১৮ জন। ২০০৯ সালে নিহতের সংখ্যা ছিল ২২। এর পর মৃত্যুসংখ্যা কমেছিল—২০১০, ২০১১ ও ২০১২ সনে ছিল যথাক্রমে ১৩, ১৫ ও ১৩। ২০১৩ সন থেকে নিহত ব্যক্তির সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়তে শুরু করে। ২০২৫ সালে স্কুলে বন্দুক-হামলায় নিহত হয়েছে ৭৮ জন।
আলোকচিত্রী লু বোপ ও সাংবাদিক স্টিভ হার্টম্যান পুরোদমে এই প্রজেক্ট বাস্তবায়নে নেমে পড়েন। ছয় বছরে আটটি পরিবারের কাছে তারা যান। পাঁচটি স্কুলে বন্দুক-হামলায় নিহত আট শিশুর শোবার ঘরের ছবি তুলেছেন লু। সেই ছবিগুলো শুধু নিহত শিশুদের অপ্রত্যাশিত ও বিষাদময় চলে যাওয়ার কথাই স্মরণ করিয়ে দেয় না, সন্তানহীন অভিভাবকরা শূন্য শোবার ঘর নিয়ে কীভাবে বেঁচে আছেন তাও বয়ান করে।
ছবিগুলো তুলতে গিয়ে লু বোপের অভিজ্ঞতা একদম ভিন্ন। তিনি লিখেছেন, নিহত শিশুর ঘরটি এখন পুরো পরিবারের কাছে পবিত্র স্থানের মতো। স্বজনদের অবচেতন মনে থাকে, এইমাত্র এই ঘরেই আমাদের প্রিয় শিশুটি ছিল, এখন নেই—তবে হুট করেই ফিরে আসবে। সকালে স্কুলে যাওয়ার সময় ঘরটি সে যেভাবে রেখে গিয়েছিল, সেভাবেই আছে। সে ফিরে আসবে তার এই অগোছালো ঘরেই। কিন্তু যে চলে যায় সে তো ফেরে না। এই ঘরের সঙ্গে প্রিয় সন্তানের স্মৃতি জড়িয়ে বেঁচে থাকেন বাবা-মায়েরা।
শিশুদের কাছে তাদের শোবার ঘরই একান্ত নিজস্ব। ভীষণ প্রিয় ও বিশেষ একটি জায়গা। সেই জায়গাটির কোনো কিছু লুপ ছুঁয়েও দেখেননি। তার ক্যামেরা শুধু খুঁজে ফিরেছে ঘরের মালিকের স্মৃতি—ডাস্টবিনে, খাটের নিচে, ডেস্কের পেছনে…। তবে শিশুদের ব্যক্তিত্ব সবচেয়ে বেশি ধরা দিয়েছে ছোট ছোট জিনিসের মধ্যে। যেমন—দরজার হাতলে ঝুলে থাকা চুলের ব্যান্ড, খোলা টুথপেস্টের টিউব, স্কুলের অনুষ্ঠানের ছেঁড়া টিকিট, দেয়াল ও ময়লা কাপড় রাখার ঝুড়িতে।
লু প্রথম গিয়েছিলেন টেনেসি অঙ্গরাজ্যের ন্যাশভিলের একটি বাড়িতে। এই বাড়িতে বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকত ৯ বছরের হ্যালি। সে স্কুলে বন্দুক-হামলায় নিহত হওয়ার পর তার ঘরটি যেভাবে ছিল সেভাবেই রেখে দেওয়া হয়েছে। ঘরের চার দেয়াল, মেঝে, সিলিং, জানালার পাশের ডিভান, বিছানার চাদর ও দরজার রং সাদা। যেন শুভ্র মেঘের রাজ্যে এক পরীর ঘর। ঘরের এখানে-সেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে সেই পরীর ছোট ছোট বর্ণিল জিনিসপত্র। বড় টেডি বিয়ারটিসহ সবকিছু নিথর হয়ে পড়ে আছে, কেননা যার ছোঁয়ায় এই জড়বস্তুগুলো প্রাণ ফিরে পেত—হ্যালি নামের সেই পরীটিই যে নেই!
২০১৯ সালের ৪ নভেম্বর ক্যালিফোর্নিয়ার সোগাস হাই স্কুলে বন্দুক হামলায় যে দুজন শিশু নিহত হয়—তাদের একজন ডোমিনিক ব্ল্যাকওয়েল। তার বয়স হয়েছিল মাত্র ১৪ বছর। বিখ্যাত ‘স্পঞ্জবব’ চরিত্রটি তার ভীষণ প্রিয় ছিল। তার পুরো ঘর এই চরিত্রের ছবি ও পুতুলে ঠাসা। কেন? স্পঞ্জবব চরিত্রের মতো ডোমিনিকও কী পৃথিবী ও মানুষ নিয়ে আশাবাদী ছিল? নেতিবাচক সব কিছু থেকে দূরে থাকা মানুষ ছিল? কেন এই কার্টুন চরিত্রটিকে সে এতটা পছন্দ করত তার উত্তর আর পাওয়া যাবে না। তার দরজার পেছনে ঝুলতে থাকা রাগবি ফুটবল খেলায় অংশ নিয়ে পাওয়া মেডেলগুলো জানান দেয়, কতটা প্রতিশ্রুতিশীল ছিল সে।

বাকি ছয়টি ঘরও আনন্দ-বেদনার গল্প বলে। সময় যেন থমকে আছে ঘরগুলোতে। অনেক কিছু দিয়ে ভর্তি হয়েও ঘরগুলো খাঁখা করছে। সব থেকেও—কিছুই নেই। সবশেষে এক গভীর শূন্যতাই জাগায় আলোকচিত্রী লু বোপ আর সাংবাদিক স্টিভ হার্টম্যানের এই ফটো-প্রজেক্ট। তবে এই উদ্যোগকে নির্মমতার বিরুদ্ধে এক ধরনের শৈল্পিক অবস্থানও বলা যায়। গুলি রক্ত-মাংসের মানুষটি মেরে ফেলতে পারে, কিন্তু তার স্মৃতি তো অমর! পুরো পৃথিবীর সব গোলাবারুদ ব্যবহার করেও স্মৃতিকে ধ্বংস করা যায় না।
এই ফটোগ্রাফিক প্রকল্পের গুরুত্ব আরো বাড়িয়ে দিয়েছে একাডেমি অব মোশন পিকচার আর্টস অ্যান্ড সায়েন্সেস। প্রকল্পটি কীভাবে তৈরি হলো তা নিয়ে মার্কিন চলচ্চিত্র পরিচালক জোশুয়া সেফটেল ২০২৫ সালে একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য তথ্যচিত্র তৈরি করেন। ৯৮তম একাডেমি অ্যাওয়ার্ডেসর আসরে এই তথ্যচিত্রটি ‘বেস্ট ডকুমেন্টারি শর্ট’ বিভাগে অস্কার অর্জন করেছে। জোশুয়া পুরস্কার গ্রহণ করতে মঞ্চে উঠেছিলেন সাংবাদিক স্টিভ হার্টম্যান, প্রযোজক কোনাল জোন্স ও গ্লোরিয়া কাসারেসকে সঙ্গে নিয়ে। গ্লোরিয়ার মেয়ে ছিল জ্যাকি। ২০২২ সালে টেক্সাসের রব এলিমেন্টারি স্কুলে বন্দুক-হামলায় ১৯ জন শিক্ষার্থী নিহত হয়েছিল, সেই দুর্ভাগাদের একজন ছিল ৯ বছরের জ্যাকি।
তথ্যসূত্র: সিবিএস নিউজ, সিএনএন, দ্য গার্ডিয়ান

কাজটি করা হয়েছিল কেবলই মৃত শিশুদের স্মৃতি ধরে রাখতে। বন্দুক হামলায় মরে যাওয়া শিশুদের ঘর ও নানা স্মৃতি ক্যামেরার লেন্সে ধরে রাখতে রাখতে কখন যে সেইসব দুঃসহ ঘটনার সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে যাওয়া, তা ঠাওর করাই কঠিন।
লু বোপ একজন নিউইয়র্কভিত্তিক বাণিজ্যিক আলোকচিত্রী। তিনি বিভিন্ন ব্র্যান্ডের জন্য মানুষ ও পোষা প্রাণীর ছবি তুলে থাকেন। ২০১৮ সালে তার কাছে এমন এক কাজ আসে, যা তিনি আগে কখনো করেননি। কাজটিতে হয়তো তিনি হাতও দিতেন না যদি তার সাংবাদিক বন্ধু স্টিভ হার্টম্যান তাকে কাজটি করতে না বলতেন। স্টিভ কাজ করেন সিএসবি নিউজ-এর হয়ে। ২০১৮ সালে তিনি লুকে একটি আইডিয়ার কথা জানান, যুক্তরাষ্ট্রে তো প্রায়ই স্কুলগুলোতে গুলির ঘটনা ঘটে, যে শিশুরা এই স্কুল-শ্যুটিংয়ে নিহত হয়েছে তাদের বেডরুমগুলোর ছবি তুললে কেমন হয়? লু তখন স্টিভকে বলতে পারেননি—আসলে কেমন এই আইডিয়া। তবে বিস্ময়কর মনে হয়েছিল তার, এ কেমন ফটোগ্রাফি-প্রজেক্ট—যেখানে কেন্দ্রীয় চরিত্রই নেই! তারপরও চ্যালেঞ্জ হিসেবে তিনি এই বিশেষ প্রজেক্টে যুক্ত হন।
আলোকচিত্রী লু বোপ–এর অভিজ্ঞতা শোনা যাক তার কথাতেই। তার অভিজ্ঞতায়, ‘‘এমন এক প্রকল্পে কাজ করেছি, প্রকল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র যারা—তারাই নেই। কেন নেই? এই প্রশ্নের উত্তরটি নির্মম। যারা বেঁচে নেই তাদের ছবি তো তোলা যায় না! তবে তাদের খুঁজে পেয়েছিলাম তাদের ঘরের প্রতিটি কোণায়, চুল বাঁধার ফিতায়, টুথপেস্টের টিউবে এবং স্কুলের অনুষ্ঠানের ছেঁড়া টিকিটে। এই প্রকল্পে আমরা ছয় বছরেরও বেশি সময় কাজ করেছি। সন্তানহারা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করেছি। সাংবাদিক স্টিভ যখন নতুন কোনো পরিবারের খবর দিত তখন আমি ভারাক্রান্ত হয়ে পড়তাম। কেননা খবরটি আমাকে জানাত, আরো একটি পরিবার তাদের সন্তান হারিয়েছে।’’
লু–এর বন্ধু স্টিভের মতে, স্কুলে বন্দুক-হামলা মহামারি আকার ধারণ করেছে। এই ঘটনা তাকে ভীষণভাবে পীড়া দিতে থাকে। তারপর এ বিষয়ক একই ধরনের সংবাদের পুনরাবৃত্তি তার কাছে একঘেয়ে লাগছিল। তিনি বলেছেন, ‘‘দেশটি যেন অসাড় হয়ে ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারগুলোর প্রতি সহানুভূতি হারিয়ে ফেলছে। আমি কিছু একটা করতে চেয়েছিলাম। তখনই আমি দেশের অন্যতম সেরা আলোকচিত্রী লু বোপের সঙ্গে যোগাযোগ করি।’’

যুক্তরাষ্ট্রে স্কুলে বন্দুক-হামলার ঘটনাগুলো সাংবাদিক স্টিভ হার্টম্যানকে নাড়া দেওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে। মার্কিন গণমাধ্যম সিএনএন-এর একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রে স্কুলে বন্দুক-হামলায় নিহত হয় ১৮ জন। ২০০৯ সালে নিহতের সংখ্যা ছিল ২২। এর পর মৃত্যুসংখ্যা কমেছিল—২০১০, ২০১১ ও ২০১২ সনে ছিল যথাক্রমে ১৩, ১৫ ও ১৩। ২০১৩ সন থেকে নিহত ব্যক্তির সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়তে শুরু করে। ২০২৫ সালে স্কুলে বন্দুক-হামলায় নিহত হয়েছে ৭৮ জন।
আলোকচিত্রী লু বোপ ও সাংবাদিক স্টিভ হার্টম্যান পুরোদমে এই প্রজেক্ট বাস্তবায়নে নেমে পড়েন। ছয় বছরে আটটি পরিবারের কাছে তারা যান। পাঁচটি স্কুলে বন্দুক-হামলায় নিহত আট শিশুর শোবার ঘরের ছবি তুলেছেন লু। সেই ছবিগুলো শুধু নিহত শিশুদের অপ্রত্যাশিত ও বিষাদময় চলে যাওয়ার কথাই স্মরণ করিয়ে দেয় না, সন্তানহীন অভিভাবকরা শূন্য শোবার ঘর নিয়ে কীভাবে বেঁচে আছেন তাও বয়ান করে।
ছবিগুলো তুলতে গিয়ে লু বোপের অভিজ্ঞতা একদম ভিন্ন। তিনি লিখেছেন, নিহত শিশুর ঘরটি এখন পুরো পরিবারের কাছে পবিত্র স্থানের মতো। স্বজনদের অবচেতন মনে থাকে, এইমাত্র এই ঘরেই আমাদের প্রিয় শিশুটি ছিল, এখন নেই—তবে হুট করেই ফিরে আসবে। সকালে স্কুলে যাওয়ার সময় ঘরটি সে যেভাবে রেখে গিয়েছিল, সেভাবেই আছে। সে ফিরে আসবে তার এই অগোছালো ঘরেই। কিন্তু যে চলে যায় সে তো ফেরে না। এই ঘরের সঙ্গে প্রিয় সন্তানের স্মৃতি জড়িয়ে বেঁচে থাকেন বাবা-মায়েরা।
শিশুদের কাছে তাদের শোবার ঘরই একান্ত নিজস্ব। ভীষণ প্রিয় ও বিশেষ একটি জায়গা। সেই জায়গাটির কোনো কিছু লুপ ছুঁয়েও দেখেননি। তার ক্যামেরা শুধু খুঁজে ফিরেছে ঘরের মালিকের স্মৃতি—ডাস্টবিনে, খাটের নিচে, ডেস্কের পেছনে…। তবে শিশুদের ব্যক্তিত্ব সবচেয়ে বেশি ধরা দিয়েছে ছোট ছোট জিনিসের মধ্যে। যেমন—দরজার হাতলে ঝুলে থাকা চুলের ব্যান্ড, খোলা টুথপেস্টের টিউব, স্কুলের অনুষ্ঠানের ছেঁড়া টিকিট, দেয়াল ও ময়লা কাপড় রাখার ঝুড়িতে।
লু প্রথম গিয়েছিলেন টেনেসি অঙ্গরাজ্যের ন্যাশভিলের একটি বাড়িতে। এই বাড়িতে বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকত ৯ বছরের হ্যালি। সে স্কুলে বন্দুক-হামলায় নিহত হওয়ার পর তার ঘরটি যেভাবে ছিল সেভাবেই রেখে দেওয়া হয়েছে। ঘরের চার দেয়াল, মেঝে, সিলিং, জানালার পাশের ডিভান, বিছানার চাদর ও দরজার রং সাদা। যেন শুভ্র মেঘের রাজ্যে এক পরীর ঘর। ঘরের এখানে-সেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে সেই পরীর ছোট ছোট বর্ণিল জিনিসপত্র। বড় টেডি বিয়ারটিসহ সবকিছু নিথর হয়ে পড়ে আছে, কেননা যার ছোঁয়ায় এই জড়বস্তুগুলো প্রাণ ফিরে পেত—হ্যালি নামের সেই পরীটিই যে নেই!
২০১৯ সালের ৪ নভেম্বর ক্যালিফোর্নিয়ার সোগাস হাই স্কুলে বন্দুক হামলায় যে দুজন শিশু নিহত হয়—তাদের একজন ডোমিনিক ব্ল্যাকওয়েল। তার বয়স হয়েছিল মাত্র ১৪ বছর। বিখ্যাত ‘স্পঞ্জবব’ চরিত্রটি তার ভীষণ প্রিয় ছিল। তার পুরো ঘর এই চরিত্রের ছবি ও পুতুলে ঠাসা। কেন? স্পঞ্জবব চরিত্রের মতো ডোমিনিকও কী পৃথিবী ও মানুষ নিয়ে আশাবাদী ছিল? নেতিবাচক সব কিছু থেকে দূরে থাকা মানুষ ছিল? কেন এই কার্টুন চরিত্রটিকে সে এতটা পছন্দ করত তার উত্তর আর পাওয়া যাবে না। তার দরজার পেছনে ঝুলতে থাকা রাগবি ফুটবল খেলায় অংশ নিয়ে পাওয়া মেডেলগুলো জানান দেয়, কতটা প্রতিশ্রুতিশীল ছিল সে।

বাকি ছয়টি ঘরও আনন্দ-বেদনার গল্প বলে। সময় যেন থমকে আছে ঘরগুলোতে। অনেক কিছু দিয়ে ভর্তি হয়েও ঘরগুলো খাঁখা করছে। সব থেকেও—কিছুই নেই। সবশেষে এক গভীর শূন্যতাই জাগায় আলোকচিত্রী লু বোপ আর সাংবাদিক স্টিভ হার্টম্যানের এই ফটো-প্রজেক্ট। তবে এই উদ্যোগকে নির্মমতার বিরুদ্ধে এক ধরনের শৈল্পিক অবস্থানও বলা যায়। গুলি রক্ত-মাংসের মানুষটি মেরে ফেলতে পারে, কিন্তু তার স্মৃতি তো অমর! পুরো পৃথিবীর সব গোলাবারুদ ব্যবহার করেও স্মৃতিকে ধ্বংস করা যায় না।
এই ফটোগ্রাফিক প্রকল্পের গুরুত্ব আরো বাড়িয়ে দিয়েছে একাডেমি অব মোশন পিকচার আর্টস অ্যান্ড সায়েন্সেস। প্রকল্পটি কীভাবে তৈরি হলো তা নিয়ে মার্কিন চলচ্চিত্র পরিচালক জোশুয়া সেফটেল ২০২৫ সালে একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য তথ্যচিত্র তৈরি করেন। ৯৮তম একাডেমি অ্যাওয়ার্ডেসর আসরে এই তথ্যচিত্রটি ‘বেস্ট ডকুমেন্টারি শর্ট’ বিভাগে অস্কার অর্জন করেছে। জোশুয়া পুরস্কার গ্রহণ করতে মঞ্চে উঠেছিলেন সাংবাদিক স্টিভ হার্টম্যান, প্রযোজক কোনাল জোন্স ও গ্লোরিয়া কাসারেসকে সঙ্গে নিয়ে। গ্লোরিয়ার মেয়ে ছিল জ্যাকি। ২০২২ সালে টেক্সাসের রব এলিমেন্টারি স্কুলে বন্দুক-হামলায় ১৯ জন শিক্ষার্থী নিহত হয়েছিল, সেই দুর্ভাগাদের একজন ছিল ৯ বছরের জ্যাকি।
তথ্যসূত্র: সিবিএস নিউজ, সিএনএন, দ্য গার্ডিয়ান