Advertisement Banner

প্রমোদতরীতেই কেন ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব বেশি দেখা দেয়?

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
প্রমোদতরীতেই কেন ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব বেশি দেখা দেয়?
হান্টাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের জন্য এই জাহাজের যাত্রীদের আইসোলেশনে রাখা হয়েছে। ছবি: রয়টার্স

সমুদ্রে ক্রুজ ট্রিপ বা প্রমোদভ্রমণকে সাধারণত দুশ্চিন্তামুক্ত অবকাশ হিসেবে প্রচার করা হলেও, বিশেষজ্ঞ বা মহামারিবিদদের মতে— রোগজীবাণু ছড়ানোর ক্ষেত্রে এই প্রমোদভ্রমণ বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। প্রমোতরীকে সমুদ্রের বুকে  ‘অস্থায়ী শহর’ বলা হয়। কারণ, এখানে বিশ্বের নানা প্রান্তের হাজার হাজার মানুষ একটি নির্দিষ্ট সীমানার ভেতর ‘অর্ধ-আবদ্ধ’ পরিবেশে একই বাতাস, খাবার ও পানি ভাগাভাগি করেন। তবে এর ফলে সেখানে যদি কোনো সংক্রমণ দেখা দেয় সেটা সবার মধ্যে খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে যায়। 

সাম্প্রতিক একটি ঘটনা এর উপযুক্ত উদাহরণ। বিবিসি’র এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পশ্চিম আফ্রিকা উপকূলে একটি বিলাসবহুল প্রমোদতরীতে সন্দেহজনক হান্টাভাইরাস প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। ফলে ১৭ জন আমেরিকানসহ ১৫০ জনেরও বেশি যাত্রীকে তাদের কেবিনে কোয়ারেন্টিনে রাখা হয়েছে। এই ভাইরাসের সংক্রমণে এখন পর্যন্ত সাতজন অসুস্থ হয়েছেন এবং তিনজন মারা গেছেন। এ নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তদন্ত শুরু করেছে। এই ভাইরাস সাধারণত সংক্রমিত ইঁদুরের বর্জ্যের মাধ্যমে ছড়ায়। মানুষের মানুষের মধ্যে এটি সংক্রমিত হয় কিনা, আর হলেও তা কতটা মারাত্মক।

সমুদ্রে এ ধরনের প্রাদুর্ভাব নতুন কিছু নয়। কোভিড মহামারির সময় প্রমোদতরী ডায়মন্ড প্রিন্সেসে কোভিডের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছিল। সেখানে ৬১৯ জন যাত্রী এবং ক্রু পজিটিভ শনাক্ত হয়েছিলেন। পরবর্তী গবেষণায় দেখা গেছে যে, জাহাজের পরিবেশ সংক্রমণকে ত্বরান্বিত করেছিল, যদিও আইসোলেশন ও কোয়ারেন্টাইনের মতো পদক্ষেপগুলো এর আরও বিস্তার রোধে সহায়তা করেছিল। গবেষকেরা সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, আরও আগে পদক্ষেপ নেওয়া হলে আক্রান্তের সংখ্যা আরও কমানো যেত। 

জাহাজে সবচেয়ে বেশি নোরোভাইরাসের সংক্রমণ হয়ে থাকে। একে সাধারণত ‘ভমিটিং বাগ’ বা বমির জীবাণুও বলে। পূর্ববর্তী গবেষণার পর্যালোচনায় জাহাজে এই নোরোভাইরাসের ১২৭টিরও বেশি প্রাদুর্ভাবের তথ্য পাওয়া গেছে, যা প্রায়শই দূষিত খাবার, বিভিন্ন পৃষ্ঠতল এবং ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিগত সংস্পর্শের সঙ্গে সম্পর্কিত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক তথ্য ইঙ্গিত দেয় যে, এ ধরনের বদ্ধ ও উচ্চ-সংস্পর্শের পরিবেশে নোরোভাইরাস অত্যন্ত দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে।

প্রমোদতরীকে সমুদ্রের বুকে একটি ‘অস্থায়ী শহর’ বলা হয়। ছবি: রয়টার্স
প্রমোদতরীকে সমুদ্রের বুকে একটি ‘অস্থায়ী শহর’ বলা হয়। ছবি: রয়টার্স

প্রমোদতরীতে প্রাদুর্ভাবের কারণ

মেলবোর্নভিত্তিক স্বাধীন গণমাধ্যম ‘দ্য কনভারসেশনে’র এক প্রতিবেদনে প্রমোদতরীতে ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। 

সেখানে বলা হয়েছে, প্রমোদতরীর জনাকীর্ণ ও বদ্ধ স্থান—কেবিন, লিফট, বার বা থিয়েটার ইত্যাদির মাধ্যমে সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।

জাহাজের ফুড সার্ভিস সংক্রমণ ঝুঁকির একটি বড় কারণ। বুফে ডাইনিং, একই তৈজসপত্রের ব্যবহার এবং বারবার স্পর্শ করা হয় এমন জায়গাগুলোর মাধ্যমে পেটের পীড়া বা গ্যাস্ট্রিকের জীবাণু সহজে ছড়াতে পারে। একজন সংক্রমিত ব্যক্তি অসুস্থ বোধ করার আগেই অজান্তে খাবার বা বিভিন্ন পৃষ্ঠতল দূষিত করে ফেলতে পারেন।

জাহাজের ডিজাইনও এই সমস্যার জন্য দায়ী। যাত্রীরা ডাইনিং রুম, বার, লিফট, করিডোর, থিয়েটার এবং স্পা এলাকায় একত্রিত হন। ক্রু সদস্যরাও একই পরিবেশে বসবাস ও কাজকর্ম করেন এবং প্রায়ই তাদের থাকার জায়গা ভাগাভাগি করতে হয়। ফলে যাত্রী থেকে যাত্রীতে বা যাত্রী ও ক্রুদের মধ্যে দ্রুত রোগ সংক্রমিত হতে পারে।

পুরোনো বা নিম্নমানের ভেন্টিলেশন বা বায়ুচলাচল ব্যবস্থার কারণে বায়ুবাহিত রোগজীবাণু ছড়িয়ে পড়তে পারে। প্রমোদতরীতে বাতাসের গুণমান নিয়ে করা বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, যদি বায়ুচলাচল ব্যবস্থা উন্নত মানের না হয়, তবে কেবিন, রেস্তোরাঁ এবং বিনোদন কেন্দ্রের মতো জনাকীর্ণ ও বদ্ধ স্থানগুলোতে রোগব্যাধি আরও সহজে ছড়িয়ে পড়তে পারে। যাত্রীদের নিরাপদ রাখতে পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ বাতাস চলাচল, বিশেষ ফিল্টার এবং বাতাস পরিশোধনকারী প্রযুক্তির মতো বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

যাত্রী এবং জাহাজের ক্রুরা বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসেন। তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার মাত্রা ভিন্ন হয় কিংবা অনেকের টিকাকরণও নিয়মিত নয়। ফলে একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর মধ্যে নানা ধরনের রোগজীবাণু প্রবেশের সুযোগ তৈরি হয়।

জাহাজের ফুড সার্ভিস সংক্রমণ ঝুঁকির একটি বড় কারণ। ছবি: ইন্সটাগ্রাম
জাহাজের ফুড সার্ভিস সংক্রমণ ঝুঁকির একটি বড় কারণ। ছবি: ইন্সটাগ্রাম

প্রমোদতরীতে লিজিয়নিয়ার্স রোগের সংক্রমণও দেখা দেয়। এটি ফুসফুসের ব্যাকটেরিয়াজনিত একটি গুরুতর রোগ। এটি সাধারণত একজন থেকে অন্যজনে সরাসরি ছড়ায় না। বরং, দূষিত পানি সরবরাহ ব্যবস্থা, গরম পানির টব বা ঝরনা থেকে নির্গত অতি ক্ষুদ্র জলীয় কণা নিঃশ্বাসের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে।

প্রমোদতরীর যাত্রীদের মধ্যে এই রোগ সংক্রমিত হওয়ার একটা গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হলো হোয়ার্লপুল স্পা (ঘূর্ণায়মান পানির স্পা)। এ ছাড়া, মার্কিন রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের (সিডিসি) সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলোতে জাহাজের পানি সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে লিজিয়নিয়ার্স ডিজিজের আরও কিছু প্রাদুর্ভাবের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

আইসোলেশনে যাওয়ার ভয় অথবা অসুস্থতাকে গুরুত্ব না দেওয়ার কারণে যাত্রীরা অনেক সময় উপসর্গ দেখা দেওয়ার কয়েক দিন পর জাহাজের চিকিৎসাকেন্দ্রে রিপোর্ট করেন, যা প্রাদুর্ভাবকে আরও বাড়িয়ে দেয়। তবে জাহাজে চিকিৎসার সুবিধা থাকলেও তা স্থলভাগের হাসপাতালের তুলনায় সীমিত। এগুলো মূলত প্রাথমিক চিকিৎসা এবং স্বল্পমেয়াদী সেবার জন্য তৈরি, বড় আকারে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া প্রাদুর্ভাব মোকাবিলার জন্য ওই সব চিকিৎসা কেন্দ্র বা হাসপাতাল যথেষ্ট নয়।

এমন হোয়ার্লপুল স্পা থেকে ছড়াতে পারে  লিজিয়নিয়ার্স ডিজিজ। ছবি: রয়্যাল ক্যারিবিয়ান ক্রুজ শিপের ওয়েবসাইট থেকে
এমন হোয়ার্লপুল স্পা থেকে ছড়াতে পারে লিজিয়নিয়ার্স ডিজিজ। ছবি: রয়্যাল ক্যারিবিয়ান ক্রুজ শিপের ওয়েবসাইট থেকে

ক্রু সদস্যরা নিজেদের অজান্তেই ভাইরাস সংক্রমণের কারণ হিসেবে কাজ করেন। কারণ তারা জাহাজে অনেক মানুষের সংস্পর্শে আসেন। তারা একদল যাত্রীর কাছ থেকে পরবর্তী দলের যাত্রীদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে দেন।

প্রমোদতরী প্রবীণদের কাছে বিশেষ জনপ্রিয়। এমন অনেক প্রবীণ যাত্রীরই দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্য সমস্যা থাকে, যা যে কোনো সংক্রমণকে আরও গুরুতর করে তোলে।

এ কারণেই প্রমোদতরীর স্বাস্থ্য সুরক্ষা মূলত দ্রুত তথ্য প্রদান, দ্রুত আইসোলেশন এবং কঠোর পরিচ্ছন্নতার ওপর নির্ভর করে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্রুজ লাইনগুলো তাদের পরিচ্ছন্নতা এবং প্রাদুর্ভাব মোকাবিলা ব্যবস্থার অনেক উন্নত করেছে এবং অনেক সমুদ্রযাত্রা কোনো দুর্ঘটনা ছাড়াই সম্পন্ন হয়। কিন্তু প্রমোদভ্রমণের মৌলিক কাঠামোটি এখনো সেই একই চ্যালেঞ্জ তৈরি করে যেখানে অসংখ্য মানুষ একই পরিবেশে একই খাবার, একই পানি এবং একই বিনোদনের স্থানগুলো ভাগাভাগি করে ব্যবহার করে। এই কারণেই প্রাদুর্ভাবগুলো বারবার ফিরে আসে।

সম্পর্কিত