Advertisement Banner

‘কোনো কোনো উপদেষ্টা নিজেরটা বাদে অন্য মন্ত্রণালয়ে বেশি উৎসাহী ছিলেন’

‘কোনো কোনো উপদেষ্টা নিজেরটা বাদে অন্য মন্ত্রণালয়ে বেশি উৎসাহী ছিলেন’

অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট দায়িত্ব নেয়। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন এই অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কাল নিয়ে সে সময় ও পরে রাজনৈতিক সরকার আসার পরও নানা বিতর্ক হচ্ছে। চরচার সঙ্গে এসব নিয়ে কথা বলেছেন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন চরচা সম্পাদক সোহরাব হাসান

চরচা: আপনি অন্তবর্তী সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সরকারের কার্যক্রম নিয়ে এখন বেশ বিতর্ক চলছে। সম্প্রতি সাবেক পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন অভিযোগ করেছেন যে, সরকারের ভিতরেও সরকার ছিল। আপনার অভিজ্ঞতা কী?

আলী ইমাম মজুমদার: ধন্যবাদ আপনাকে। তৌহিদ একজন সজ্জন ব্যক্তি; একজন জ্ঞানী ব্যক্তিও। উনি যখন পররাষ্ট্র সচিব ছিলেন, তখন আমি মন্ত্রিপরিষদ সচিব। আমরা দুই দফায় কাজ করলাম। তৌহিদের ক্ষুব্ধ হওয়ার মতো কিছু কারণ আছে। এর মধ্যে একটা জিনিস যেটা বলেছেন, সরকারের ভিতরে সরকার; এখানে ইনার গ্রুপ কাজ করত। এটা মনে হয় সব দেশের সব সরকারের মধ্যে থাকে। অন্ততপক্ষে আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারত বা ব্রিটেনেও থাকে। তো আমাদের এখানে যেভাবে একদম স্ট্রাকচারড ফর্মে বসে পড়ছিল–যদিও এটা নিয়ে কোনো গ্যাজেট নোটিফিকেশন হয় নাই–এটা অন্যত্র হয় না। এটা ইনফরমাল ডিসকাশনের জন্য রাখা হয়।

এখানে (কিচেন কেবিনেটে) ওনারা ইনফরমাল আলোচনা করতেন। তবে কারা (সেই আলোচনা) করবেন, সেটা নির্ধারিত থাকত। এটা মঙ্গলবার, যেটা জনাব তৌহিদ বলেছেন মঙ্গলবার করে হতো। কিন্তু সমস্যাটা সৃষ্টি হয়, (যখন) তারা আবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, যেটার দায়িত্বে মূলত প্রধান উপদেষ্টা নিজেই ছিলেন, সেটা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়–এ তিনটা কেন্দ্র করে তিনটা কমিটি করা হলো। এই কমিটিগুলোকে ওই (তিনটি) মন্ত্রণালয়ের নিয়োগ-বদলি ইত্যাদি সংক্রান্ত বিষয়ে দায়িত্ব দেওয়া হলো। এইটা কিন্তু নোটিফিকেশনের মাধ্যমে করা হয়েছিল।

আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, এটা রুলস অব বিজনেস থেকে ডিপার্চার। আমার ব্যক্তিগত ধারণা ও অভিজ্ঞতা এবং আমার লেখাপড়া থেকে বলছি, আমরা শপথ নিয়েছিলাম সংবিধান অনুসারে কাজ করার। সংবিধান অনুসারে যখন আমরা কাজ করব, সংবিধানে বলা আছে যে, প্রজাতন্ত্রের কাজ কীভাবে হবে, সরকারি কাজ কীভাবে হবে–এটা রাষ্ট্রপতি বিধি দ্বারা নির্ধারণ করবেন। সেই বিধিটাই রুলস অব বিজনেস। এটা থেকে ডিপার্চার করাটা ঠিক হয় নাই। আর জনাব তৌহিদের যেটা বললাম যে, এখানে মর্মবেদনার কারণ আছে যথেষ্ট যে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে কাকে কোথায় বদলি করা হবে, কী করা হবে-না হবে–এ ক্ষেত্রে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়তো প্রধান উপদেষ্টা দেবেন; কিন্তু এম্বাসেডর লেভেল বাদে এমন কাউকে কাউকে নেওয়া হলো, যাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় চালানো বা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাজ করার কোনো ধরনের অভিজ্ঞতাই ছিল না। (এসব ক্ষেত্রে এবং) কমিটি করার সময় পররাষ্ট্র উপদেষ্টার কোনো পরামর্শ নেওয়া হয়নি। পরবর্তী সময়ে তাদের অনেককে নিয়ে মিটিং করা হতো।

আবার ঠিক তেমনভাবেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়টা করা হলো। যদিও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কার্যপরিধি অনেক বড়। শুধু পুলিশ বদলি নিয়ে এটা করা হলো। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় নিয়ে একটা করা হয়েছিল। সেখানেও কিন্তু একই বিষয়। যদিও ড. সালেহউদ্দিনরা (কমিটি) প্রধান ছিলেন, বাকি সদস্যদের জনপ্রশাসনে কোনো প্র্যাকটিস নেই, না কেউ কোনো সময় ছিলেন। এগুলো আসলে রুলস অব বিজনেস থেকে যেমন ডিপার্চার অ্যাজ ওয়েল অ্যাজ এগুলো তেমনভাবে ডেলিভার করতেও পারে না। বিশৃঙ্খলা তৈরি করেছে।

চরচা: হ্যাঁ, বিশৃঙ্খলা তৈরি করেছে। জনপ্রশাসনেরটা তো শেষ পর্যন্ত তিনি বাতিল করতে বাধ্য হলেন। আপনি তো জনপ্রশাসনের দায়িত্বে ছিলেন…

আলী ইমাম মজুমদার: আমি জনপ্রশাসনের দায়িত্বে ছিলাম না। কমনলি এটা ভুল ধারণা করা হয়। প্রধান উপদেষ্টা সর্বপ্রথম যখন আমাকে আগস্টের ১২ তারিখে ডেকে পাঠালেন, তিনি আমাকে ওই দিন থেকে কাজ শুরু করতে বললেন যে, ‘উপদেষ্টা পরিষদের পুনর্গঠন কয়েকদিন পরে হবে, তখন উপদেষ্টা করে নেওয়া হবে। এখন আজকে থেকে শুরু করে দাও।’ কারণ, প্রকৃতপক্ষে এবারের সরকার পরিবর্তনটা একটা বিশেষ পরিপ্রেক্ষিত হয়েছে। এটা আপনারা জানেন। আমরা এখন যখন সমালোচনা করি, তখন কিন্তু এটা বিবেচনায় নিই না।

এবারে কিন্তু রাষ্ট্রের ক্ষমতাকাঠামোর টোটাল স্ট্রাকচারটা ভেঙে পড়েছিল। পুলিশ তার কাজ ছেড়ে চলে আসছিল। অনেক পুলিশ স্টেশন পুড়িয়ে দেওয়া হয়। অনেকে হতাহত হয়। ঠিক তেমনভাবে অনেক সেক্রেটারি পালিয়ে বেড়াচ্ছিল। কেউ বিদেশে চলে গিয়েছিল। কেউ দেশের ভেতরে পালিয়ে বেড়াচ্ছিল। এটাকে স্ক্র্যাচ থেকে গড়ে তোলা একটা কঠিন কাজ ছিল। শৃঙ্খলা ফেরানোর এই দায়িত্বটা সূচনাতে আমাকে পালন করতে হয় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে। এ ছাড়া আমি প্রধান উপদেষ্টা থেকে প্রধান উপদেষ্টার অধীনে যে মন্ত্রণালয়গুলো আছে, পাশাপাশি বাকি যে মন্ত্রণালয়গুলো, যে ফাইলপত্রগুলো আসত, সেগুলো নিষ্পত্তিতে আমি প্রধান উপদেষ্টাকে সহায়তা করতাম। আমার টোটাল ওই অফিসে অবস্থান ছিল ৮৯ দিন। এর মধ্যে উনি (প্রধান উপদেষ্টা) আমার সাথে শুরুতেই কথা বলেছিলেন যে, আমাকে একটা মন্ত্রণালয় দেবেন। আমি বারবার যখন দেখতে লাগলাম যে, এই জনপ্রশাসন গাঠনিক বিষয়টা মনে হচ্ছে সবাই জানেন এবং সবাই বোঝেন। যদিও দৃশ্যটা এত সহজ না। আমাদের সার্ভিস ডেলিভারি পয়েন্ট কিন্তু জেলা এবং উপজেলা। জেলা এবং উপজেলা কীভাবে চলছে–এটা সম্পর্কে ধারণা কিন্তু আমাদের অনেকেরই নাই। কিন্তু তারাও সমস্ত উপদেশ দিতে থাকলেন। এভাবে সব ডিসিদেরকে উইথড্র করতে হবে। সেটা করা হলো না। ধরে নিলাম যে উইথড্র করার মতো একটা সরকার চলে গেছে এবং সেই সরকারের সাথে তাদের ভূমিকাটা বিতর্কিত ছিল। উইথড্র করতে হবে। আবার সব সচিবকে বাদ দিয়ে আবার সব নতুনভাবে সচিব নিতে হবে।

এটার ক্ষেত্রে আমার কিন্তু বড় রকম আপত্তি ছিল। এটা কিন্তু সবাইকে বাদ দেয়ার মতো কাজ তারা করে নাই। শেষ পর্যন্ত সবাইকে বাদ দেওয়া হয়নি। এখনো কিন্তু অনেকে কর্মরত আছে। এবারে দুই তিনজনকে বদলি করা হয়েছিল। এটা সম্পর্কে তীব্র আপত্তি ওঠে। মন্ত্রিপরিষদ থেকে আপত্তি ওঠে। আপত্তি ওঠার পরও বদলির আদেশটা হয়ে যায়।

চরচা: আপনি প্রশাসন থেকে তো খাদ্য মন্ত্রণালয় গেলেন। ওখানে কোনো হস্তক্ষেপ?

আলী ইমাম মজুমদার: না, আমি কৃতজ্ঞ মাননীয় প্রধান উপদেষ্টার কাছে। এবং অন্য যারা ছিলেন, তারা খাদ্য মন্ত্রণালয় ভূমি মন্ত্রণালয়ের কাজ-সংক্রান্ত বিষয়ে কখনো কোনো হস্তক্ষেপ করেননি।

চরচা: খাদ্য মন্ত্রণালয় যখন গেলেন, তখন তো একটা নাজুক অবস্থায় ছিল।

আলী ইমাম মজুমদার: নাজুক অবস্থা; শুধু তা না। এর আগে একটা দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে একটা ভয়াবহ বন্যায় ব্যাপক ফসলহানি হয় এবং কৃষি মন্ত্রণালয় ফোরকাস্ট করেছিল ১০ লাখ টন চালের ঘাটতি হবে। তো সেক্ষেত্রে এটা আমি যাওয়ার পর দেখলাম যে, স্টক যেটা আছে, ক্রমান্বয়ে শেষ হয়ে যাচ্ছে। তারপর বন্যাজনিত কারণে ভিজিএফ অনেক দিতে হয়েছে। তখন প্রথম কাজ হয়ে দাঁড়ালো–সংগ্রহ করা। তখন আভ্যন্তরীণ সংগ্রহের সুযোগ ছিল না। দেশের উত্তরাঞ্চলের বড় ফসলটা ভালো হয়েছিল। কিছু ইমপোর্ট করা হলো ইন্ডিয়াসহ বিভিন্ন দেশ থেকে। ইন্ডিয়া থেকে আনাটাই সুবিধার ছিল। দামেও কম পড়ত। যেহেতু প্রতিবেশী, সময়ও কম লাগত। এ ছাড়া আমরা তখন মিয়ানমার, ভিয়েতনাম এবং পাকিস্তান থেকে কিছু পরিমাণ চাল এনেছিলাম।

প্লাস গম; আমাদের টোটাল চাহিদা ৭০ লাখ টন। আমাদের দেশের গমের মোট উৎপাদন ১০ লাখ টন। সুতরাং আমাদের পুরো গমটাই কিন্তু ইমপোর্ট করা হয়। এই কাজগুলোতে একটা ভয়াবহ চ্যালেঞ্জের মধ্যে গিয়ে পড়ি। এটা আমি আল্লাহর রহমত মনে করি এবং প্রধান উপদেষ্টা, অর্থ উপদেষ্টাসহ অন্য সকল উপদেষ্টা আমাকে সাপোর্ট দিয়েছেন এবং কেউ কোনো রকম হস্তক্ষেপ করেননি।

চরচা: এবার আসি–একটা রাজনৈতিক সরকার পরিচালনার একটা ধরন বা পদ্ধতি আছে। আপনি প্রশাসনের ভেতর থেকে জেনেছেন, সেটি হচ্ছে যে সাধারণত সরকার প্রধান সব সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন এবং তার জানাশোনা তার অভিজ্ঞতা এবং তিনি যাদের পরামর্শ নেওয়ার প্রয়োজন মনে করেন, তাদের পরামর্শ নেন। অন্তবর্তী সরকার এবং যিনি প্রধান হয়েছেন তিনিও একটা পরিস্থিতির কারণে এই দায়িত্ব নিয়েছেন। কিন্তু এই সরকারটা পরিচালনা করতে সরকারের তো যে বিশাল কর্মভার, সেটা কীভাবে অন্তর্বর্তী সরকার পরিচালনা করেছে?

আলী ইমাম মজুমদার: অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন এবং পরিচালনা খুবই চ্যালেঞ্জিং ব্যাপার। কারণ, রাজনৈতিক সরকার রাজনৈতিক দলের যিনি প্রধান থাকেন, নেতা থাকেন, তিনি জেনারেলি সরকারপ্রধান হন এবং তিনি ও তার চয়েস মোটামুটি এক ঘরানার লোক। কিন্তু অন্তবর্তীকালীন সরকার বিভিন্ন ডিসিপ্লিন থেকে লোক নিয়ে একটা টিম তৈরি করা হয়। এই টিম বিল্ডিংটা খুব কঠিন ব্যাপার। বিশেষ করে এবার যেটা দেখে গেছে, এটাকে রাজনৈতিক সরকারের মতো টিম বিল্ডিং বলে দাবি করা যাবে না। তা সত্ত্বেও উপদেষ্টরা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে কাজ করেছেন। আবার কেউ কেউ ছিলেন অন্য মন্ত্রণালয়ের ব্যাপারে বেশি উৎসাহী ছিলেন। এই প্রবণতাটা আমাদের মধ্যে কাউকে কাউকে একটু বেদনার্ত করত। ব্যথিত করেছে।

চরচা: আপনি তো বলছেন যে, বিভিন্ন ডিসিপ্লিন থেকে আসার কারণে একটা সমস্যা হয়েছে। কিন্তু এর মধ্যে আবার অনেকে তো একেবারেই অনভিজ্ঞ ছিলেন। যেমন ছাত্র নেতৃত্ব থেকে আসা তিনজন; তারপর আরো কারো কারো ব্যাপার, যেমন–স্বাস্থ্য উপদেষ্টা এবং আরো আরো দু-একজনের কথা শোনা যাচ্ছে যে, তারা কখনোই প্রশাসনে কাজ করেননি। তাহলে তাদেরকে এই গুরুদায়িত্ব দেওয়া হলো কী করে?

আলী ইমাম মজুমদার: এখন আমি একটা কথা বলব–এখানে যারা সরকারে আসেন, এখনো যারা রাজনৈতিক সরকার, যারা মন্ত্রী হিসেবে আসছেন, তারা কখনো কিন্তু আসলে সেভাবে সরকার পরিচালনা করে আসেননি, প্রস্তুতিও নেননি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারেও কাউকে সরকার পরিচালনা করে আসতে হবে, তা না। কিন্তু আমি যেটা মনে করি, নিজ নিজ ক্ষেত্রে তার প্রায় সকলেই সফল ব্যক্তিত্ব। ছাত্র যাদের কথা বলছেন, তাদের ব্যাপারে আমি একটা জিনিস বলব, তারা বিশাল ছাত্র আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। ছাত্র আন্দোলনটা সফল হয়েছে। সুতরাং তারা সরকারে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে এসেছেন। মন্ত্রণালয় কার কোনটা হওয়া উচিত ছিল, সে প্রশ্ন সম্পর্কে আমি বিতর্কে যাব না। সরকারের অংশগ্রহণ সংক্রান্ত ব্যাপারে তাদের যে তাদের ইচ্ছা বা প্রধান উপদেষ্টা...

চরচা: এটা কি তাদের আগ্রহ ছিল, নাকি প্রধান উপদেষ্টা...?

আলী ইমাম মজুমদার: বোথ সাইডেই ছিল। প্রধান উপদেষ্টা তাদেরকে নিতে চেয়েছিলেন। তারাও আগ্রহী ছিল। দুইটাই আর কি। এটাকে আমি অযৌক্তিক মনে করি না; সঙ্গতই মনে করি। তারা নিজ নিজ ক্ষেত্রে সফল। আমি যেমন একদিক দিয়ে যখন দাবি করি যে, আমি প্র্যাকটিশনার ছিলাম, ফিল্ড মাঠ প্রশাসন থেকে আরম্ভ করে সচিবালয় পর্যন্ত; ঠিক তেমনভাবে তারা নিজ নিজ ক্ষেত্রে সফল ছিলেন। এখানে যারা আসছেন সরকারে, তারা কিন্তু নিজের ক্ষেত্রে প্রত্যেকে সফল ছিলেন। পারফর্ম করতে যেয়ে কেউ কেউ কিন্তু এখানে ঠিকমতো পারফর্ম করতে পারেননি। এটা নিয়ে আমি মন্তব্য করব না। এ সম্পর্কে তাদের জবাবটা তারা দেবেন যে, কেন তারা পারফর্ম করতে পারেন নাই।

চরচা: কুমিল্লার জেলা প্রশাসক অভিযোগ করেছেন, এনসিপি নেতা এবং সাবেক এক উপদেষ্টার বিরুদ্ধে যে, তারা দুটি উপজেলার জন্যে ১৫ কোটি ও ১০ কোটি মিলিয়ে মোট ২৫ কোটি টাকার বরাদ্দ নিয়েছেন। এভাবে কি নিতে পারেন?

আলী ইমাম মজুমদার: না। যিনি লোকাল গভর্নমেন্ট ডিভিশনের দায়িত্বে যে উপদেষ্টা ছিলেন, তিনি তার উপজেলার জন্য এটা নিয়েছেন বলা হয়েছে। আমি মনে করি এটা অনৈতিক।

চরচা: আপনি অনভিজ্ঞ উপদেষ্টা যে বা যারা ছিলেন, ছাত্র আন্দোলনে জয়ী হয়েছেন; কিন্তু প্রশাসনিক কাজে তো তাদের অভিজ্ঞতা ছিল না, তারা কি আপনাদের মতো যারা প্রবীণ উপদেষ্টা তাদের সহায়তা বা তাদের পরামর্শ নিয়েছেন কখনো?

আলী ইমাম মজুমদার: না, এখানে তাদের কার্যক্ষেত্রে কোনো সহায়তার জন্য আমাকে কখনো বলা হয়নি। অন্যদের থেকে (সহায়তা বা পরামর্শ) নিয়েছেন কিনা, সেটা সম্পর্কে বাকিরা বলতে পারবেন। তবে মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা যেহেতু সবটাই দেখভাল করতেন, ওনার নির্দেশনা নিশ্চিত নিয়েছেন। তবে এই জাতীয় টাকা নেওয়ার ব্যাপারে ওনাকে জিজ্ঞেস করে এটা করা হয়েছে বলে আমি মনে করি না।

চরচা: আপনি এর আগে আরেকটি অরাজনৈতিক সরকার; ওইটাও অস্বাভাবিক ও অরাজনৈতিক সরকারের প্রশাসনে শীর্ষ পদে ছিলেন। ২০০৭ সালের সেই তত্ত্বাবধয়ক সরকারের সময় মন্ত্রিপরিষদ সচিব ছিলেন। তখনকার সরকার পরিচালনা খুব কাছ থেকে দেখেছেন। আর এখানে তো আপনি শরিক ছিলেন। এই দুটির মধ্যে একটু পার্থক্য আছে কি?

আলী ইমাম মজুমদার: পার্থক্য হচ্ছে প্রেক্ষাপটটি ভিন্ন। এর আগে বাংলাদেশের সরকারে যত পরিবর্তন হয়েছে, আমি তো সরকারের ভিতরেই ছিলাম। শুরুর দিকে নিচের পদে ছিলাম। পরে ক্রমান্বয়ে উপরের দিকে উঠেছি। এভাবে কখনো প্রশাসন ব্যবস্থা ভেঙে পড়েনি। এটা কিন্তু এবারই প্রথম। ইমিডিয়েট আগে যেটার সাথে আমার সংশ্লিষ্টতার কথা বলছেন, যখন আমি মন্ত্রিপরিষদ সচিব ছিলাম, আমি মন্ত্রিপরিষদ সচিব নিযুক্ত হই ৬ ডিসেম্বর। আর ৩০ অক্টোবর আমি ছিলাম মূখ্যসচিব। আমি দুই দায়িত্বই কিন্তু পালন করি। তখন প্রধান উপদেষ্টা ছিলেন রাষ্ট্রপতি স্বয়ং। তখন কিন্তু (১/১১) রাষ্ট্রীয় প্রশাসন অ্যাজ ইট ইজ কাজ করেছে। সুতরাং যিনি দায়িত্ব নিয়েছেন বা যারা দায়িত্ব নিয়েছেন, তারা কিন্তু সেখানেই কিছু কসমেটিক চেঞ্জ করে রাষ্ট্র পরিচালনা করছে। এবারে কিন্তু এই ব্যাপারটা এ রকম ছিল না। এবার কিন্তু টোটাল ভেঙে পড়েছিল।

চরচা: সমন্বয়ের কথাটা যদি বলি–তখন যেটি ফখরুদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে সরকার ছিল, আর পরবর্তীকালে আপনারা যে সরকারে ছিলেন–দুইটার মধ্যে কাজের ক্ষেত্রে কী রকম পার্থক্য ছিল?

আলী ইমাম মজুমদার: আমি যেহেতু ক্যাবিনেট সেক্রেটারি ছিলাম, সরকারের সাথে সংশ্লিষ্ট ছিলাম, বলতে হবে যে ওইটা যথেষ্ট অর্গানাইজড ছিল। হয়তোবা সংখ্যা কম ছিল; ১০ জন নিয়ে, পরে পাঁচজন স্পেশাল অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে যুক্ত করা হয়। এটাও এক বছর পর। কিন্তু এবার তো সংখ্যাটার কোনো লিমিট ছিল না। তারপর শপথ নেননি–এ ধরনের উপদেষ্টা তো ছিলেন; যেমন–জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা, যিনি এখন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। উনি কিন্তু শপথ নেন নাই। সংবিধানের অধীন উনি কোনো শপথ নেননি। তিনি কিন্তু মন্ত্রিপরিষদ মিটিং, উপদেষ্টা পরিষদ মিটিংও কিন্তু শেষের দিকে উপস্থিত থাকতেন। তবে তিনি আবার সব আলোচনায় অংশগ্রহণ করতেন–এমনও না।

চরচা: এবার আসি সাবেক পররাষ্ট্র উপদেষ্টার কথায়। তিনি বলেছেন, সরকারের ভিতরে সরকার ছিল। কিচেন ক্যাবিনেট। এখন এই কিচেন ক্যাবিনেটের কাজটা কী ছিল? এটা সরকারের রাজনৈতিক বিষয়ে সিদ্ধান্ত, নাকি সরকার দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে সক্রিয় ছিল?

আলী ইমাম মজুমদার: এটার সূচনার দিকে একটা মিটিংয়ে আমি ছিলাম। এরপর আর আমাকে কখনো ডাকা হয়নি।

চরচা: তার মানে আপনাকে একটা মিটিংয়ে ডেকেছে এবং সাবেক পররাষ্ট্র উপদেষ্টাকেও একটা মিটিংয়ে ডেকছে...

আলী ইমাম মজুমদার: সূচনাতে আমি ছিলাম। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে, ধরুন সরকার পরিচালনা ব্যবস্থা সম্পর্কে আমার কিছু ভিন্নমত ছিল। একটা আমি খোলাখুলিভাবে বলি; যেমন–সবাইকে হ্যান্ডকাপ লাগিয়ে নেওয়া, আমি এটা বলেছি যে, আমার দীর্ঘদিনে ম্যাজিস্ট্রেসির অভিজ্ঞতা যেটা বলে, পুলিশ রেগুলেশনে কোনো গ্রেপ্তার আসামিকে হ্যান্ডকাপ লাগিয়ে নেওয়ার নিয়ম বা আবশ্যকতা নাই। হ্যান্ডকাপ লাগানো হবে ডেঞ্জারাস আসামি, যারা পালিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে। এ ধরনের বক্তব্যটা আমি দিয়েছিলাম–দেশের সংস্কৃতি অঙ্গনের অত্যন্ত কৃতিত্বসম্পন্ন একজন ব্যক্তি, যিনি মন্ত্রী ছিলেন, আবার এমপিও ছিলেন, তিনি একাধিক মামলায় অ্যারেস্ট হয়েছিলেন, অ্যারেস্ট হতে পারেন, হ্যান্ডক্যাপ লাগানো হবে কেন। উনি তো বয়সে আমাদের চেয়েও বড়। হ্যান্ডকাপ লাগানোর কোনো আবশ্যকতা নেই–এই জাতীয় কিছু কথা বলেছিলাম।

চরচা: আপনি সম্ভবত আসাদুজ্জামান নূরের কথা বলছেন...

আলী ইমাম মজুমদার: আরো অনেক মন্ত্রী, যারা একাধিক সরকারের মন্ত্রী ছিলেন, রাজনৈতিক নেতা হিসেবে...। আমাদের দেশে শুধু এই সরকার (এমনটা) করেছে, তা নয়। অনেক আগে থেকে আমরা কালচারটা খুব পুওর করে ফেলেছি। রাজনৈতিক নেতৃত্বকে আগে, এমনকি পাকিস্তানের সময়কালেও কিন্তু হ্যান্ডকাপ পরিয়ে নেওয়া হতো না। তাদেরকে পুলিশ এসে বলত–আপনাকে থানায় যেতে হবে। এটা কিন্তু ছিল আগেও। পুলিশ বাড়িতে আসলে রাতে গ্রেপ্তার করত না। সূর্যদয়ের পরপর বাড়ি থেকে নিয়ে যেত। কিন্তু এই কালচারটা আমরা এটাকে নষ্ট করে ফেলেছি। আমি প্রতিবাদ করেছিলাম; কিন্তু কোনো কাজ হয়নি।

চরচা: রাজনৈতিক বিষয়ে এই উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যদের মধ্যে মতভেদ ছিল কি?

আলী ইমাম মজুমদার: মতভেদ তো যেকোনো কিছু নিয়েই থাকতে পারে। আপনার সাথে আমার মতভেদ থাকতে পারে। এমনটা থাকলেও আমি মনে করব যে, বর্তমান একটা ফ্রেজাইল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন নিয়ে, এই অবস্থার মধ্যেও একটা সফল নির্বাচন হয়েছে।

চরচা: এই যে নির্বাচন, এটি কবে হবে–প্রধান উপদেষ্টার দেওয়া বিভিন্ন সময়ের বক্তৃতা বিবৃতিতেও কিন্তু নানা মত ছিল। কখনো ১৮ মাসের মধ্যে বা দু বছরের মধ্যে, আবার আমরা সংবাদমাধ্যমে জেনেছি, কোনো কোনো উপদেষ্টা বলেছেন ২০২৯ সালের আগে নির্বাচন নয়। আপনি ভেতরের একজন মানুষ হিসেবে যদি বলেন...

আলী ইমাম মজুমদার: আমরা বেশ কিছু মানুষ ছিলাম। আমরা যত দ্রুত সম্ভব নির্বাচন দেওয়া যায়, তার পক্ষে ছিলাম। সবাই ছিলেন না। না থাকলেও তো প্রধান উপদেষ্টা কমিটেড ছিলেন। এ ব্যাপারে আমি ওনার প্রশংসা করব। উনি কিন্তু কমিটেড ছিলেন। যদিও প্রথমে একটা ভেরিয়েবল টাইম নিয়ে তিনি কথা বলছিলেন। কিন্তু একপর্যায়ে গিয়ে ফেব্রুয়ারিতে ইলেকশন দেবেন বলে যে কথাটা বললেন, সে ব্যাপারে কিন্তু তিনি আমাদের ডেকে ঘোষণাই দিলেন। আমরা তাকে সাধুবাদ দিলাম।

চরচা: এই সরকারের অন্তত একটি যদি ভালো কাজ হয়, সেটা হলো নির্বাচনটি করতে পেরেছে এবং সেটা আপনাদের অন্যতম লক্ষ্য ছিল। কিন্তু এই নির্বাচন নিয়েও তো আবার বিতর্ক আছে। যেমন এখন যারা বিরোধী দল, তারা বলছে যে, নির্বাচনের আগেই উপদেষ্টা পরিষদ বা প্রধান উপদেষ্টা বিএনপির সাথে একটা সমঝোতা করে আসছেন লন্ডনে। এই লন্ডন বৈঠক সম্পর্কে কিছু জানতেন আপনারা?

আলী ইমাম মজুমদার: ওখানে আজকে যিনি প্রধানমন্ত্রী (তারেক রহমান), তার সাথে একটা বৈঠক হতে পারে–এ ধরনের কথা শুনেছিলাম। তবে এখানে এসে তিনি (ড. ইউনূস) ব্রিফ করেছেন যে, তার সাথে বৈঠক হয়েছে। কিন্তু তার সাথে একটা সমঝোতা বা এতে (বৈঠকের কারণে) নির্বাচনের ফলাফলে কোনো প্রভাব পড়েছে বলে আমি মনে করি না। আমাদের একটা দুর্ভাগ্য হচ্ছে, এটাও পুওর রাজনৈতিক কালচার বলা যায় যে, নির্বাচনে পরাজিত দল কখনো নির্বাচনকে সুষ্ঠু হয়েছে বলে স্বীকার করে না। অতীতেও করেনি, এবারও করছে না।

চরচা: আপনারা যে নির্বাচন করলেন, সে নির্বাচনে বিএনপি সরকার এল। বিএনপির সরকারের প্রতি আপনার পরামর্শ এবং সতর্কবাণী কী থাকবে?

আলী ইমাম মজুমদার: পরামর্শ হিসেবে তো যেটা থাকবে–২০০১–০৬ পর্যন্ত সরকার পরিচালনা করেছিল তারা। এই সরকার পরিচালনা করতে গিয়ে দেশে আরেক ধরনের একটা অস্থীতিশীল পরিস্থিতি হয়। এ কারণে ওয়ান-ইলাভেন এর মতো একটা জিনিস আসে। এ জাতীয় কোনো কিছু যাতে না হয়, তারা সেদিকে নজর রাখা উচিত। আরেকটা বিষয়–মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যেটা বলছেন, উনি যদি সেই স্পিরিট যদি এনফোর্স করতে পারেন, তাহলে ভালো হয়।

আমরা অত্যন্ত বেদনার সাথে লক্ষ্য করেছি, আগে আমাদের যে সরকার ক্ষমতায় ছিল ১৫ বছর, তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, আমরাও ক্ষুব্ধ ছিলাম যে, লেখালেখি করেছি, বলেছিও যে, দেশের টোটাল ইলেকটোরাল সিস্টেমটা তারা নষ্ট করে দিয়েছিল। এটাকে রিভাইভ করতে হবে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ব্যাপারে সবাই একমত হয়েছে। হয়তো এটা হয়েও যাবে। কিন্তু আরো বড় ব্যাপার হচ্ছে প্রশাসনের দলীয়করণ। এই যে প্রশাসনে দলীয় লোকদেরকে শুধু দলীয় আনুগত্য দেখে নিয়োগ দেওয়া–এই প্রবণতা বন্ধ করে আমরা যদি পেশাদারত্বের দিকে নজর না দিই, তাহলে ব্যাপারটা থেকে বেরিয়ে আসা যাবে না।

তিন মাসে কিছুটা দেখছেন না যে, দলীয়করণের ভূত কিছুটা নজরে পড়ছে। এটা সত্য যে, এখনই কমেন্ট করার সময় আসে নাই। তাদেরকে আরেকটু সময় দিতে হবে। তারপর কমেন্ট করা যাবে।

চরচা: আচ্ছা আমরা আশা করি যে আপনার যে প্রত্যাশা এবং সতর্কবাণী নির্বাচিত সরকার মনে রাখবে এবং এমন কোনো বিপর্যয় ঘটবে না, যাতে আবার আমরা কোনো অনির্বাচিত সরকার পাই, অপ্রত্যাশিত সরকার পাই। ধন্যবাদ আপনাকে।

আলী ইমাম মজুমদার: আমিও একই জিনিস চাই। তারা নির্ধারিত মেয়াদ ক্ষমতায় থাকুক এবং যথাযথভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর হোক। আমিও চাই যে, তারা একটা সুশাসনের মডেল সেট করে যাক। ধন্যবাদ।

সম্পর্কিত