Advertisement Banner

কেন ‘আরেকটি বিপ্লব অনিবার্য’ বলছেন জামায়াত আমির?

কেন ‘আরেকটি বিপ্লব অনিবার্য’ বলছেন জামায়াত আমির?
জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। ছবি: বাসস

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধী দলীয় নেতা শফিকুর রহমান সম্প্রতি বিভিন্ন বক্তব্যে ‘আরেকটি’ বিপ্লবের জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন। তবে দলটির দায়িত্বশীল নেতারা এ ধরনের বক্তব্যকে ‘মেঠো রাজনৈতিক বক্তব্য’ বলছেন।

সম্প্রতি বিভিন্ন দলীয় সমাবেশ ও জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের সমাবেশে দেওয়া বক্তব্যে বারবারই আরেকটি বিপ্লব ‘অনিবার্য’ বলে উল্লেখ করেছেন। শুধু তাই নয়, এ জন্য সবাইকে প্রস্তুত হওয়ারও আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

এর কারণ খুঁজতে চরচা কথা বলে জামায়াতে ইসলামীর একাধিক দায়িত্বশীল নেতার সঙ্গে। কেউ একে ‘মেঠো রাজনৈতিক বক্তব্য’ বলছেন, তো কেউ বলছেন ‘শব্দের খেলা’। পাশাপাশি কেউ কেউ এমন বক্তব্যের সঙ্গে ‘জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না হওয়া’র বিষয়টিকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করছেন।

জামায়াত আমির কী বলেছেন?

জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান ‘আরেকটি বিপ্লব অনিবার্য’ বলে প্রথম বক্তব্য দেন গত ২০ জুন। ওই দিন খুলনার সার্কিট হাউজ ময়দানে ১১ দলীয় ঐক্যের বিভাগীয় সমাবেশে ‘আরেকটি অনিবার্য বিপ্লবের’ লক্ষ্যে প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানান। এর পর ২৩ জুন ঢাকায় ১১ দলীয় জোটের সমাবেশেও তিনি একই ধরনের বক্তব্য দেন। সেখানেও ‘আরেকটি বিপ্লব অনিবার্য হয়ে উঠেছে’ বলে উল্লেখ করেন বিরোধী দলীয় নেতা।

ওই সমাবেশে দলীয় নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে জামায়াত আমির বলেন, “সেই বিপ্লবের জন্য আপনারা কি প্রস্তুত? প্রস্তুত থাকুন সেই বিপ্লবের জন্য। অন্যায়ের সাথে কোনো আপস নয়। পুরাতনও পরিত্যাজ্য, নতুনও ঘৃণিত। কোনো ফ্যাসিবাদ মানব না, ইনশাআল্লাহ। জীবন যাবে, জীবন একটাই। সেই জীবন যাবে আল্লাহর জন্যে। সেই জীবন যাবে মানুষের জন্য।”

এর পর গত শুক্রবার ঢাকায় দলের কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরার অধিবেশনে শফিকুর রহমান বলেন, “আমাদের লড়াই হবে সকল অন্যায় ও অপশক্তির বিরুদ্ধে। নতুন, পুরাতন ফ্যাসিবাদ বুঝি না। যেখানেই ফ্যাসিবাদ, সেখানেই প্রতিরোধ, সেখানেই প্রতিবাদ করা হবে। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই অব্যাহত থাকবে।”

জামায়াত আমিরের বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তার দাবি–দেশে এখনো শোষণ, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির অবসান হয়নি এবং এগুলোর বিরুদ্ধে নতুন গণআন্দোলনের প্রয়োজন হতে পারে। তিনি বলেন, ‘জুলাই বিপ্লব’-এর লক্ষ্য ও জনগণের রায় (যাকে তিনি ‘গণভোটের রায়’ ও ‘জুলাই সনদ’ হিসেবে উল্লেখ করেন) পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। তার ভাষ্যে, সংসদের মাধ্যমে এসব বিষয়ে সমাধান না এলে তারা জনগণের কাছে গিয়ে গণজাগরণ গড়ে তুলবেন। তিনি আরও দাবি করেন, এই সম্ভাব্য ‘বিপ্লব’ কোনো দল, পরিবার বা গোষ্ঠীকে ক্ষমতায় আনার জন্য নয়; বরং একটি স্বাধীন, সার্বভৌম, দুর্নীতিমুক্ত ও মর্যাদাপূর্ণ রাষ্ট্র গড়ার উদ্দেশ্যে। একইসঙ্গে তার এ ধরনের বক্তব্য বেশ কিছু প্রশ্ন সামনে এনেছে।

জামায়াত আমির ‘নতুন, পুরাতন ফ্যাসিবাদ’-এর কথা বলেছেন। পুরাতন ফ্যাসিবাদ হিসেবে পতিত আওয়ামী লীগ আমলের সময়কে বুঝিয়েছেন বলে ধরে নেওয়া যায়। কিন্তু ‘নতুন ফ্যাসিবাদ’? প্রশ্ন উঠেছে–এটা কি বিদ্যমান বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের দিকে ইঙ্গিত? তাহলে হঠাৎ কী এমন হলো যে, বিরোধী দলীয় নেতা বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে ‘আরেকটি বিপ্লব অনিবার্য’ বলে মন্তব্য করছেন? অথচ বিএনপি তো জামায়াতে ইসলামীর পুরনো মিত্র বলেই রাজনৈতিক মহলে পরিচিত।

এ বিষয়ে একাধিক জামায়াত নেতার কাছে চরচা জানতে চায়–কেন এমন মন্তব্য করছেন দলের আমির। জামায়াত নেতারা জানান, দলের আমির শফিকুর রহমান যে ‘আরেকটি অনিবার্য বিপ্লবের’ কথা বলেছেন, সেটি মূলত তার দলের দৃষ্টিতে কিছু রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় সমস্যার কারণে।

‘রাজনৈতিক মেঠো বক্তব্য’

‘আরেকটি বিপ্লবের’ প্রস্তুতি জামায়াত নিচ্ছে কি না–এমন প্রশ্নে দলটির নেতারা বলছেন, দলের আমিরের এমন বক্তব্য অনেকটা মেঠো বক্তব্য।

এ বিষয়ে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য ও সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান চরচাকে বলেন, “এটা এ জন্য বলছেন যে, দেশের মানুষের তো এখনো দুঃখ দুর্দশা শেষ হলো না। লক্ষ্মীপুরে একসঙ্গে ৪ জনকে মেরে ফেলতেছে, দেশের আইন-শৃঙ্খলার অবস্থা, ব্যাংকের অবস্থা, শেয়ারবাজারের অবস্থা; জুলাই গণঅভ্যুত্থানে মানুষের যে মূল আকাঙ্ক্ষা ছিল, গণভোটের মাধ্যমে ৭০ শতাংশ মানুষ ভোট দিয়েছে, সেটাও বাস্তবায়ন হলো না, বিচারব্যবস্থা পৃথক হলো না। এখনও তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের প্রক্রিয়া হলো না। এমন নানা কিছুই তো হলো না।”

সাইফুল আলম বলেন, “গুম কমিশনের যে একটি সুন্দর আইন করা হলো, সেটা তো বাতিল করা হলো। এটাই উনি (জামায়াত আমির) ওনার বক্তব্যে বলেছেন।”

তাহলে কি আরেকটি বিপ্লবের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে? জানতে চাইলে জামায়াতের এই সংসদ সদস্য বলেন, “বিপ্লব যখন জনগণ মনে করবে, তখন হবে।” তিনি বলেন, “আমরা তো সংসদের ভেতরে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করার জন্য বললাম, আমরা তো এটিই বলবো। এটা নরমাল।”

জামায়াত আমিরের এ ধরনের বক্তব্যের প্রসঙ্গে দলটির এই নেতা বলেন, “যখন একজন লোক মঞ্চে দাঁড়িয়ে বক্তব্য রাখে, তখন তো শব্দে শব্দে…।” তাহলে কি এটা ‘রাজনৈতিক বক্তব্য’–জানতে চাইলে তিনি বলেন, “সেটাই তো স্বাভাবিক। শব্দে শব্দে বিচার করা তো ঠিক না।”

সরকারের জন্য একটি শক্ত বার্তা

দলের আমির শফিকুর রহমান সরকারকে একটি শক্ত বার্তা দিতে চেয়েছেন বলে মনে করেন দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আব্দুল হালিম। এ বিষয়ে তিনি চরচাকে বলেন, “উনি এ জন্য বলেছেন যে, ছাত্র, যুবক, মানুষ, যে সংস্কারের জন্য জীবন দিয়েছে, সেই সংস্কারের জন্য যে গণভোট, তার (রায়) তো বাস্তবায়ন হয়নি। তাহলে মানুষ আবার সংঘবদ্ধ হয়ে দাবি আদায় করবে। এটাই উনি একটু শক্তভাবে তুলে ধরেছেন আরকি।”

সে হিসেবে দলীয় প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে কি না–জানতে চাইলে আব্দুল হালিম বলেন, “হ্যাঁ, প্রস্তুতি তো হচ্ছেই। আমরা জুলাই সনদ বাস্তবায়নে বিভাগে বিভাগে সমাবেশ করছি তো। আমাদের আন্দোলনই একসময় বিপ্লবে রূপান্তর হবে। স্বাভাবিকতার মাধ্যমেই তো একটি আন্দোলন চূড়ান্ত পর্যায়ে যায়।”

‘নতুন ফ্যাসিবাদ’ কে?

জামায়াত আমির দলটির মজলিসে শূরার বৈঠকে বলছেন, ‘নতুন, পুরাতন ফ্যাসিবাদ বুঝি না। যেখানেই ফ্যাসিবাদ, সেখানেই প্রতিরোধ’–এখানে কি সরকারি দলকে নতুন ফ্যাসিবাদ বোঝানো হচ্ছে?

বিভিন্ন মহলে ওঠা এমন প্রশ্নের বিষয়ে আব্দুল হালিম চরচাকে বলেন, “আমরা তো বলতে চাই না। কেউ যদি ফ্যাসিবাদের কাজ করে, সে তো নতুন ফ্যাসিবাদ হবেই। এখন এখানে বিএনপি হবে, না আমরা হব–সেটা তো পরের কথা।” তিনি বলেন, “কোনো ফ্যাসিবাদকে জনগণ মানবে না। এখন বিএনপি যদি ফ্যাসিবাদী কাজ করে, তাহলে জনগণ তো বুঝবে এটা বিএনপি।”

আব্দুল হালিম বলেন, “ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে তো সবাই। অর্ধেক গণতন্ত্র ও অর্ধেক ফ্যাসিবাদ করে কি গণতান্ত্রিক হওয়া যাবে? তারা (বিএনপি) প্রধানমন্ত্রী হওয়ার রায় মানল, কিন্তু গণভোটের রায় মানল না। এটা কী?”

হালিম বলেন, “জুলাই আন্দোলনে মানুষের আকাঙ্ক্ষা পূরণ হয়নি। এটাই একসময় আরেকটি বিপ্লবে রূপ নেবে।”

এখন কি তেমন কোনো প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে–জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘‘এখন তো প্রস্তুতি আছে; আমরা মানুষকে সংগঠিত করছি। জনগণ রায় দিয়েছে, তারা তো দ্বিধা-দ্বন্দ্বে আছে। আমরা মানুষকে আশ্বস্ত করছি যে, আপনাদের রায়ের বাস্তবায়ন ঘটবে।”

জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে জামায়াতের এই নেতা বলেন, “সরকার তো এ বিষয়ে এখনো ব্যাখ্যা দেয়নি। তাহলে গণভোট হয়েছে কেন? প্রধানমন্ত্রী তো নিজেই গণভোটের পক্ষে কথা বলেছেন। না মানলে তখনই বলে দিত–আমরা গণভোটের পক্ষে নেই।”

সম্পর্কিত