ইরান ইস্যুতে নেতানিয়াহু জুয়া খেলছেন?

ইরান ইস্যুতে নেতানিয়াহু জুয়া খেলছেন?
২০০৩ সালে ইরাকে মার্কিন হামলার পক্ষে জোরালো প্রচার চালিয়েছিলেন নেতানিয়াহু। ছবি: রয়টার্স

ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ক্যারিয়ার বরাবরই বিতর্কে ঘেরা। তবে ২০২৫-২৬ সালের বর্তমান প্রেক্ষাপটে তিনি যে পথে হাঁটছেন, সেটিকে বিশ্লেষকরা বলছেন ‘সবচেয়ে বড় জুয়া’ হিসেবে। প্রশ্ন উঠেছে, ইরানের সঙ্গে এই সংঘাত কি দেশের নিরাপত্তার স্বার্থে, নাকি কেবল নিজের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার এক মরিয়া চেষ্টা?

ইসরায়েলে এটি নির্বাচনের বছর। নেতানিয়াহুর জন্য এবারের নির্বাচন কেবল ক্ষমতা ধরে রাখার লড়াই নয়, বরং তার আইনি জটিলতা এবং অভ্যন্তরীণ ক্ষোভ থেকে বাঁচার শেষ ঢাল। বিশ্লেষকরা বলছেন, যুদ্ধের ডামাডোল এবং জাতীয় নিরাপত্তার উন্মাদনা ভোটারদের মনস্তত্ত্বে বড় প্রভাব ফেলে। নেতানিয়াহু এই বাজি ধরেছেন যে, ইরানের মতো এক ‘অস্তিত্বগত শত্রু’র বিরুদ্ধে যুদ্ধ তাকে একজন ত্রাণকর্তা হিসেবে চিত্রিত করবে।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই বাজিতে জেতার শর্ত অত্যন্ত কঠিন। ইসরায়েলি সমাজে ক্যাজুয়ালটি বা হতাহতের হার সহ্য করার ক্ষমতা খুবই সীমিত। যদি দেশের ভেতরে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বাড়ে, তবে এই যুদ্ধই হতে পারে তার পতনের কারণ। বর্তমানে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়ই একটি ‘বেস্ট-কেস সিনারিও’ বা আদর্শ পরিস্থিতির ওপর ভরসা করে আছে, যেখানে ইরানের সামরিক সক্ষমতা গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে অথচ ইসরায়েলের খুব একটা ক্ষতি হবে না। বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রে যা অর্জন করা প্রায় অসম্ভব।

নেতানিয়াহুর রণকৌশলের একটি বড় অংশ জুড়ে আছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি ধরে নিয়েছেন, ইরানে শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন না আসা পর্যন্ত ট্রাম্পের অকুণ্ঠ সমর্থন তিনি পাবেন। কিন্তু ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতি বরাবরই অনিশ্চিত। কোনো সুনির্দিষ্ট সামরিক বা রাজনৈতিক সমাধান ছাড়াই ট্রাম্প হঠাৎ করে নিজেকে ‘বিজেতা’ ঘোষণা করে সরে দাঁড়াতে পারেন এমন উদাহরণ অতীতেও রয়েছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স

এর চেয়েও বড় ঝুঁকি হলো যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি। যদি এই যুদ্ধের প্রভাবে মার্কিন অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং রিপাবলিকানরা মধ্যবর্তী নির্বাচনে হেরে যায়, তবে পুরো দায়ভার পড়বে ইসরায়েলের ঘাড়ে। ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে আগে থেকেই ইসরায়েলের আগ্রাসী নীতির প্রতি এক ধরনের সংশয় বাড়ছে। এই যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে দশকের পর দশক ধরে চলা মার্কিন-ইসরায়েল মৈত্রীর মূলে আঘাত করতে পারে।

গত বছরের জুনে ইরানের সাথে যুদ্ধের পর নেতানিয়াহু সদম্ভে ঘোষণা করেছিলেন, ইরানের অস্তিত্বগত হুমকি চিরতরে নির্মূল করা হয়েছে। সেই ‘ঐতিহাসিক বিজয়’কে তিনি প্রজন্মের পর প্রজন্মের রক্ষাকবচ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। কিন্তু মাত্র আট মাস পর সেই একই কারণে, একই শত্রুর বিরুদ্ধে আরও তীব্র যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া তার আগের দাবিগুলোকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে। এটি প্রমাণ করে যে, সামরিক শক্তি দিয়ে ইরানকে দমানোর কৌশলটি দীর্ঘমেয়াদী সুফল আনছে না।

বিশ্লেষকরা বলছেন, নেতানিয়াহুর নেতৃত্বে ইসরায়েল আজ আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন। নিজের মিত্র দেশগুলোর রাজধানীতেও তিনি আজ অনাকাঙ্ক্ষিত এক ব্যক্তি। কোনো জোরালো আন্তর্জাতিক সমর্থন ছাড়াই তিনি মধ্যপ্রাচ্যকে এক চরম অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দিচ্ছেন।

ইরানে আমেরিকা-ইসরায়েলের যৌথ হামলা। ছবি: রয়টার্স
ইরানে আমেরিকা-ইসরায়েলের যৌথ হামলা। ছবি: রয়টার্স

অনেকেই মনে করেন, ইরানকে পারমাণবিক সামরিক সক্ষমতা অর্জন থেকে বিরত রাখা, তাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা সীমিত করা কিংবা ইসরায়েলের সীমান্তের কাছাকাছি থাকা শত্রুদের ইরান যাতে সহায়তা করতে না পারে তা নিশ্চিত করা এগুলো সবই বৈধ দাবি।

তাদের মতে, নেতানিয়াহু এখন তার জীবনের অন্যতম জুয়াটি খেলছেন। যদি এই বাজি সফল হয়, তবে তিনি হয়তো আরও কয়েক বছর ক্ষমতায় টিকে থাকবেন। কিন্তু বাজি হারলে কেবল তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার নয়, বরং ইসরায়েলের দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক গ্রহণযোগ্যতা ধুলোয় মিশে যাবে। সাংবাদিকতা এবং রাজনৈতিক ইতিহাসের পাতায় এই অধ্যায়টি কি ‘দেশপ্রেম’ হিসেবে লেখা হবে, নাকি ‘স্বার্থপর ক্ষমতা লিপ্সা’ হিসেবে তা বলে দেবে সময়।

তথ্যসূত্র: চ্যাথাম হাউস, টাইমস অব ইসরায়েল, দ্য গার্ডিয়ান, হিন্দুস্তান টাইমস

সম্পর্কিত