স্তুতি শর্মা

ছয় বছর আগের ঘটনা। তখন আহানের (ছদ্মনাম) বয়স ছিল ১৭ বছর।
একদিন বিকেলে গ্রামের কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছিল আহান। হঠাৎ সেখানে পুলিশ আসে। কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই কয়েকজন তরুণকে আটক করা হয়। কী ঘটছে–বুঝে ওঠার আগেই আহান নিজেকে একটি হাজতখানায় আবিষ্কার করে।
আহান বলেন, “আমাকে কেন গ্রেপ্তার করা হলো, সেটাই জানতাম না। মাদকের সঙ্গে আমার কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না। ভুল সময়ে ভুল জায়গায় থাকা ছাড়া আমার কোনো দোষ ছিল না।”
আহানের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা করা হয়। অভিযোগ আনা হয়, সে অবৈধ মাদক পরিবহনের সঙ্গে জড়িত। অথচ অভিযোগটি ছিল সম্পূর্ণ মিথ্যা।
জামিনের টাকা জোগাড় করতে হিমশিম খেতে হয় এই তরুণের পরিবারকে। দুই মাস কারাগারে থাকার পর সে জামিনে মুক্তি পায়। কিন্তু এক বছর পর সেই জামিন বাতিল হয়ে যায়। ফলে তাকে আবার চার মাস কারাভোগ করতে হয়।

মায়ের সঙ্গে ফোনে কথা বলছে আহান। ছবি: ইউনিসেফের সৌজন্যে শিশু আইন ২০১৩ অনুযায়ী, শিশুদের বিরুদ্ধে করা মামলার বিচার আদালতে প্রথম হাজিরার ৩৬০ দিনের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু আহানের মামলা সেই সময়সীমা অনেক আগেই পেরিয়ে যায়। আর্থিক ও সামাজিকভাবে প্রভাবশালী অনেকেই খালাস পেলেও সে দীর্ঘ ও জটিল আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে আটকে থাকে।
আহান বলেন, “ওখানে আমার কোনো বন্ধু ছিল না। সব সময় মন খারাপ থাকত। আমার পরিবার জানত আমি নির্দোষ। সুযোগ পেলেই ভাইবোনেরা আমাকে দেখতে আসত। সেটাই আমাকে শক্তি দিত।”
দ্বিতীয়বার জামিনে মুক্তি পাওয়ার পরও তার জীবন সহজ হয়নি। প্রতি দুই মাস পরপর তাকে থানায় গিয়ে হাজিরা দিতে হতো। তবে কাগজপত্রের ঝামেলার চেয়েও কঠিন ছিল মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি। প্রতিবেশী, সহপাঠী ও বন্ধুরা তার থেকে দূরে সরে যায়।
একপর্যায়ে আহান স্কুলে যাওয়াও বন্ধ করে দেয়।
আহানের গল্প বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার একটি বড় দুর্বলতার চিত্র তুলে ধরে। মিথ্যা মামলায় অভিযুক্ত হয়ে সে যথাযথ আইনি সহায়তা ছাড়া দীর্ঘদিন আটকে ছিল, আর যাদের অর্থ ও প্রভাব ছিল তারা সহজেই মুক্তি পেয়েছিল। আইনজীবী বদলানো ও পর্যাপ্ত আইনি সহায়তার অভাবে তার মনে হতো, সে কখনোই ন্যায়বিচার পাবে না।
অবশেষে ২০২৪ সালে এক প্রবেশন কর্মকর্তা তার মামলাটি শনাক্ত করেন এবং তাকে ইউনিসেফের সহায়তা পাওয়া এক সমাজকর্মীর সঙ্গে যুক্ত করে দেন। জীবনে প্রথমবারের মতো সে নিয়মিত আইনি পরামর্শ ও মানসিক সহায়তা পেতে শুরু করে। এরপর তার মামলার অগ্রগতি হয়। একসময় তার বিরুদ্ধে আনা মিথ্যা অভিযোগ প্রত্যাহার করা হয়।
অবশেষে আহান মুক্তি পায়।
তত দিনে আহানের বয়স ২১ বছর। নতুন করে জীবন শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। এক চাচাতো ভাইয়ের সঙ্গে ঢাকায় এসে একটি জুতা তৈরির কারখানায় কাজ পান। কাজটি কঠিন, তবে এতে তার জীবনে কিছুটা স্থিতি এসেছে।
তবে একটি বিষয় বদলায়নি– তিনি এখনও স্বপ্ন দেখেন।
আহান বলেন, “একদিন নিজের ব্যবসা করতে চাই। কিছু টাকা জমাতে পারলে বাড়ি ফিরে কাপড়ের ব্যবসা শুরু করব। আমার মনে হয়, এ কাজে আমি ভালো করতে পারব।”
তবে আহানের গল্প কোনো ব্যতিক্রম নয়।
বাংলাদেশে শিশুদের ন্যায়বিচার পাওয়ার পথে থাকা চ্যালেঞ্জগুলো বিবেচনায় নিয়ে ২০২১ সালে ‘রিইম্যাজিন জাস্টিস ফর চিলড্রেন’ কর্মসূচি চালু করে ইউনিসেফ। এর লক্ষ্য হলো বিচারব্যবস্থাকে এমনভাবে গড়ে তোলা, যাতে তা শিশুদের আরও ভালোভাবে সুরক্ষা ও সহায়তা দিতে পারে।
বাংলাদেশে হাজারো শিশুর জন্য বিচারব্যবস্থার মুখোমুখি হওয়ার মানে হলো আটক হওয়া, পড়াশোনায় বাধা, সমাজের অবহেলা এবং দীর্ঘস্থায়ী মানসিক ক্ষতির শিকার হওয়া। অনেক ক্ষেত্রে আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসার আগেই এসব কিছু সহ্য করতে হয় তাদের।
অন্যদিকে, অপরাধের শিকার শিশুরাও প্রায় একই ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়। বিচারপ্রক্রিয়ায় তাদের জন্য নির্দিষ্ট অধিকার নেই, বাধ্যতামূলক সহায়তার ব্যবস্থা নেই, এমনকি শিশুদের জন্য বিশেষ সুরক্ষাও অনেক ক্ষেত্রে নিশ্চিত করা হয় না। তবে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ ও উদ্যোগ থাকলে এসব সমস্যা সমাধান করা সম্ভব।
বাংলাদেশে শিশুদের ন্যায়বিচার পাওয়ার পথে থাকা চ্যালেঞ্জগুলো বিবেচনায় নিয়ে ২০২১ সালে ‘রিইম্যাজিন জাস্টিস ফর চিলড্রেন’ কর্মসূচি চালু করে ইউনিসেফ। এর লক্ষ্য হলো বিচারব্যবস্থাকে এমনভাবে গড়ে তোলা, যাতে তা শিশুদের আরও ভালোভাবে সুরক্ষা ও সহায়তা দিতে পারে।
এ কর্মসূচির আওতায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিচার বিভাগ এবং বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে কাজ করছে ইউনিসেফ। শিশু আইন ২০১৩-এর সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করা, শিশুদের আটক না করে বিকল্প ব্যবস্থার সুযোগ বাড়ানো এবং বিচারপ্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপে শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার জন্য তারা কাজ করছে।
আইনের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়া হাজারো শিশুর জন্য এসব উদ্যোগের অর্থ হলো, তারা যেন শৈশবের মূল্যবান বছরগুলো হারিয়ে ফেলে। সেই সঙ্গে নতুন করে বেড়ে ওঠা, শেখা ও জীবনে এগিয়ে যাওয়ার আরেকটি সুযোগ পায়।
লেখক: গল্পকার, কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও শিক্ষার্থী, বর্তমানে বাংলাদেশে ইউনিসেফের সঙ্গে কাজ করছেন

ছয় বছর আগের ঘটনা। তখন আহানের (ছদ্মনাম) বয়স ছিল ১৭ বছর।
একদিন বিকেলে গ্রামের কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছিল আহান। হঠাৎ সেখানে পুলিশ আসে। কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই কয়েকজন তরুণকে আটক করা হয়। কী ঘটছে–বুঝে ওঠার আগেই আহান নিজেকে একটি হাজতখানায় আবিষ্কার করে।
আহান বলেন, “আমাকে কেন গ্রেপ্তার করা হলো, সেটাই জানতাম না। মাদকের সঙ্গে আমার কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না। ভুল সময়ে ভুল জায়গায় থাকা ছাড়া আমার কোনো দোষ ছিল না।”
আহানের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা করা হয়। অভিযোগ আনা হয়, সে অবৈধ মাদক পরিবহনের সঙ্গে জড়িত। অথচ অভিযোগটি ছিল সম্পূর্ণ মিথ্যা।
জামিনের টাকা জোগাড় করতে হিমশিম খেতে হয় এই তরুণের পরিবারকে। দুই মাস কারাগারে থাকার পর সে জামিনে মুক্তি পায়। কিন্তু এক বছর পর সেই জামিন বাতিল হয়ে যায়। ফলে তাকে আবার চার মাস কারাভোগ করতে হয়।

মায়ের সঙ্গে ফোনে কথা বলছে আহান। ছবি: ইউনিসেফের সৌজন্যে শিশু আইন ২০১৩ অনুযায়ী, শিশুদের বিরুদ্ধে করা মামলার বিচার আদালতে প্রথম হাজিরার ৩৬০ দিনের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু আহানের মামলা সেই সময়সীমা অনেক আগেই পেরিয়ে যায়। আর্থিক ও সামাজিকভাবে প্রভাবশালী অনেকেই খালাস পেলেও সে দীর্ঘ ও জটিল আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে আটকে থাকে।
আহান বলেন, “ওখানে আমার কোনো বন্ধু ছিল না। সব সময় মন খারাপ থাকত। আমার পরিবার জানত আমি নির্দোষ। সুযোগ পেলেই ভাইবোনেরা আমাকে দেখতে আসত। সেটাই আমাকে শক্তি দিত।”
দ্বিতীয়বার জামিনে মুক্তি পাওয়ার পরও তার জীবন সহজ হয়নি। প্রতি দুই মাস পরপর তাকে থানায় গিয়ে হাজিরা দিতে হতো। তবে কাগজপত্রের ঝামেলার চেয়েও কঠিন ছিল মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি। প্রতিবেশী, সহপাঠী ও বন্ধুরা তার থেকে দূরে সরে যায়।
একপর্যায়ে আহান স্কুলে যাওয়াও বন্ধ করে দেয়।
আহানের গল্প বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার একটি বড় দুর্বলতার চিত্র তুলে ধরে। মিথ্যা মামলায় অভিযুক্ত হয়ে সে যথাযথ আইনি সহায়তা ছাড়া দীর্ঘদিন আটকে ছিল, আর যাদের অর্থ ও প্রভাব ছিল তারা সহজেই মুক্তি পেয়েছিল। আইনজীবী বদলানো ও পর্যাপ্ত আইনি সহায়তার অভাবে তার মনে হতো, সে কখনোই ন্যায়বিচার পাবে না।
অবশেষে ২০২৪ সালে এক প্রবেশন কর্মকর্তা তার মামলাটি শনাক্ত করেন এবং তাকে ইউনিসেফের সহায়তা পাওয়া এক সমাজকর্মীর সঙ্গে যুক্ত করে দেন। জীবনে প্রথমবারের মতো সে নিয়মিত আইনি পরামর্শ ও মানসিক সহায়তা পেতে শুরু করে। এরপর তার মামলার অগ্রগতি হয়। একসময় তার বিরুদ্ধে আনা মিথ্যা অভিযোগ প্রত্যাহার করা হয়।
অবশেষে আহান মুক্তি পায়।
তত দিনে আহানের বয়স ২১ বছর। নতুন করে জীবন শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। এক চাচাতো ভাইয়ের সঙ্গে ঢাকায় এসে একটি জুতা তৈরির কারখানায় কাজ পান। কাজটি কঠিন, তবে এতে তার জীবনে কিছুটা স্থিতি এসেছে।
তবে একটি বিষয় বদলায়নি– তিনি এখনও স্বপ্ন দেখেন।
আহান বলেন, “একদিন নিজের ব্যবসা করতে চাই। কিছু টাকা জমাতে পারলে বাড়ি ফিরে কাপড়ের ব্যবসা শুরু করব। আমার মনে হয়, এ কাজে আমি ভালো করতে পারব।”
তবে আহানের গল্প কোনো ব্যতিক্রম নয়।
বাংলাদেশে শিশুদের ন্যায়বিচার পাওয়ার পথে থাকা চ্যালেঞ্জগুলো বিবেচনায় নিয়ে ২০২১ সালে ‘রিইম্যাজিন জাস্টিস ফর চিলড্রেন’ কর্মসূচি চালু করে ইউনিসেফ। এর লক্ষ্য হলো বিচারব্যবস্থাকে এমনভাবে গড়ে তোলা, যাতে তা শিশুদের আরও ভালোভাবে সুরক্ষা ও সহায়তা দিতে পারে।
বাংলাদেশে হাজারো শিশুর জন্য বিচারব্যবস্থার মুখোমুখি হওয়ার মানে হলো আটক হওয়া, পড়াশোনায় বাধা, সমাজের অবহেলা এবং দীর্ঘস্থায়ী মানসিক ক্ষতির শিকার হওয়া। অনেক ক্ষেত্রে আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসার আগেই এসব কিছু সহ্য করতে হয় তাদের।
অন্যদিকে, অপরাধের শিকার শিশুরাও প্রায় একই ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়। বিচারপ্রক্রিয়ায় তাদের জন্য নির্দিষ্ট অধিকার নেই, বাধ্যতামূলক সহায়তার ব্যবস্থা নেই, এমনকি শিশুদের জন্য বিশেষ সুরক্ষাও অনেক ক্ষেত্রে নিশ্চিত করা হয় না। তবে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ ও উদ্যোগ থাকলে এসব সমস্যা সমাধান করা সম্ভব।
বাংলাদেশে শিশুদের ন্যায়বিচার পাওয়ার পথে থাকা চ্যালেঞ্জগুলো বিবেচনায় নিয়ে ২০২১ সালে ‘রিইম্যাজিন জাস্টিস ফর চিলড্রেন’ কর্মসূচি চালু করে ইউনিসেফ। এর লক্ষ্য হলো বিচারব্যবস্থাকে এমনভাবে গড়ে তোলা, যাতে তা শিশুদের আরও ভালোভাবে সুরক্ষা ও সহায়তা দিতে পারে।
এ কর্মসূচির আওতায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিচার বিভাগ এবং বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে কাজ করছে ইউনিসেফ। শিশু আইন ২০১৩-এর সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করা, শিশুদের আটক না করে বিকল্প ব্যবস্থার সুযোগ বাড়ানো এবং বিচারপ্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপে শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার জন্য তারা কাজ করছে।
আইনের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়া হাজারো শিশুর জন্য এসব উদ্যোগের অর্থ হলো, তারা যেন শৈশবের মূল্যবান বছরগুলো হারিয়ে ফেলে। সেই সঙ্গে নতুন করে বেড়ে ওঠা, শেখা ও জীবনে এগিয়ে যাওয়ার আরেকটি সুযোগ পায়।
লেখক: গল্পকার, কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও শিক্ষার্থী, বর্তমানে বাংলাদেশে ইউনিসেফের সঙ্গে কাজ করছেন