কনভারসেশনের প্রতিবেদন
চরচা ডেস্ক

বিশ্বের অর্ধেকের বেশি মানুষের প্রধান খাবার হলো ধান থেকে আসা চাল বা ভাত। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার পাহাড়ের ঢাল থেকে শুরু করে চীন ও ভারতের সেচ দেওয়া বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ–কোটি কোটি মানুষের প্রতিদিনের খাবার জোগায় এই ধান। কিন্তু সমস্যা হলো, ধান চাষের জন্য জমে থাকা জল বা কাদা মাটি কিছু অণুজীব তৈরির আদর্শ পরিবেশ তৈরি করে। আর সেসব অণুজীব জলবায়ু বিপর্যয়ের জন্য দায়ী গ্যাসের নির্গমন বাড়ায়।
পরিবেশ ও কৃষি বিজ্ঞানীদের একটি নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৬০-এর দশকের পর থেকে বিশ্বজুড়ে ধানক্ষেত থেকে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ২০১০-এর দশকে এর পরিমাণ ছিল বছরে গড়ে প্রায় ১১০ কোটি টন কার্বন ডাই-অক্সাইডের সমান। সহজ কথায়, এটি প্রায় ২৪ কোটি (২৩৯ মিলিয়ন) গাড়ি থেকে প্রতি বছর বের হওয়া ধোঁয়ার সমান ক্ষতিকর!
এর ফলে গবাদি পশুর পর এই ধান চাষই এখন গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের সবচেয়ে বড় উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ সামনে চাল বা ভাতের চাহিদা আরও বাড়বে।
তবে আশার কথা হলো, ধান চাষের পরিমাণ না কমিয়েও ক্ষেতের এই নির্গমন কমানোর কিছু কার্যকর উপায় কৃষকদের হাতে রয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, বর্তমানে যে ‘জলবায়ুবান্ধব’ প্রযুক্তিগুলো রয়েছে, সেসব সঠিকভাবে ব্যবহার করা গেলে ২০৫০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক ধানচাষজনিত নির্গমন অন্তত ১০% কমানো সম্ভব। যদিও জলবায়ু পরিবর্তনের এই গতি ধীর করতে এর চেয়ে আরও বড় মাত্রার কিছু কৌশল দরকার হবে।
ধানক্ষেতের নির্গমন কেন বাড়ছে?
ধানচাষ থেকে নির্গমন বৃদ্ধির পেছনে মূলত দুটি কারণ কাজ করছে: ধান চাষের জমির পরিমাণ বৃদ্ধি এবং অধিক উৎপাদনের জন্য ইচ্ছেমতো এসব জমির ব্যবহার।
বিশ্বব্যাপী অর্ধেকেরও বেশি গ্যাস নির্গমন বাড়ার কারণ হলো নতুন নতুন এলাকায় ধান চাষ শুরু হওয়া। যেমন– আফ্রিকায় ১৯৬০ সালের পর থেকে ধান চাষের জমি দ্বিগুণ হয়েছে, যার ফলে সেখানে মিথেন গ্যাস নির্গমনও দ্বিগুণ হয়েছে। অধিকন্তু, কৃষকেরা এখন বেশি সার, খড়, গোবরসহ জৈব উপাদান ব্যবহার করছেন, উচ্চফলনশীল জাত লাগানো হচ্ছে এবং গাছগুলো কাছাকাছি রোপণ করা হচ্ছে। এতে ফলন বেশি হচ্ছে, কিন্তু গ্রিনহাউস গ্যাসও বাড়ছে।

বিশেষ করে একটি পদ্ধতি উল্লেখ করার মতো–ধান কাটার পর খড় জমিতে রেখে তা মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া। এটি মাটির উর্বরতা বাড়ালেও মাটিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়। পরে অণুজীব এসব ভেঙে মিথেন গ্যাস তৈরি করে। গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৬০-এর পর থেকে ধানচাষের মোট নির্গমন বৃদ্ধির প্রায় ১৮ শতাংশের জন্য এই পদ্ধতি দায়ী। কারণ, এই খড় মাটিতে জৈব উপাদান বাড়িয়ে দেয়, যা অণুজীবকে পচাতে শুরু করে এবং প্রচুর পরিমাণে মিথেন গ্যাস তৈরি হয়।
এরপর বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে মাটির অণুজীব আরও সক্রিয় হয়ে উঠছে, ফলে গ্যাস নির্গমন আরও বাড়ছে।
সারও এই দূষণের আরেকটি বড় কারণ। ২০০০ সালের পর থেকে কৃত্রিম নাইট্রোজেন সারের ব্যবহার প্রায় ৭৬% বেড়েছে। এটি ‘নাইট্রাস অক্সাইড’ নামের আরেকটি শক্তিশালী গ্রিনহাউস গ্যাস তৈরি করে, যা মানুষের কারণে সৃষ্ট মোট বৈশ্বিক গ্যাস নির্গমন বৃদ্ধির প্রায় ৯ শতাংশের জন্য দায়ী।
চাষাবাদের একটি চর্চাও গ্যাস নির্গমনে প্রভাব ফেলে। অতীতে পুরো মৌসুমজুড়ে ধানক্ষেত পানিতে ডুবিয়ে রাখা হতো। এতে ভেজা পরিবেশে থাকায় অণুজীব অবিরাম গ্যাস উৎপন্ন করত। কিন্তু গত দুই দশকে অনেক কৃষক ‘মাঝেমধ্যে জমি শুকিয়ে আবার পানি দেওয়ার পদ্ধতি’ গ্রহণ করেছেন। এতে মিথেন নির্গমন কমেছে। তবে মাটি শুকানো ও ভেজানোর চক্রে কিছুটা নাইট্রাস অক্সাইড বেড়েছে। কারণ এ সময় অণুজীব নাইট্রোজেনকে গ্যাসে রূপান্তর করে।
জলবায়ুতে ধানচাষের প্রভাব
ধান উৎপাদনের সম্পূর্ণ জলবায়ু-প্রভাব নির্ধারণ করা শুধু একটি গ্রিনহাউস গ্যাসের পরিমাণ মাপার চেয়ে অনেক বেশি জটিল।
ধানক্ষেতের ভেজা বা পানিতে ডুবে থাকা মাটি থেকে মিথেন ও নাইট্রাস অক্সাইড গ্যাস নির্গত হয়। আবার ধান গাছ বেড়ে ওঠার সময় বাতাস থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণও করে। একই সঙ্গে দুই ফসলের মধ্যবর্তী সময়ে মাটি থেকে কার্বনও হারিয়ে যায়।
তাই বৈশ্বিক পর্যায়ে নির্ভরযোগ্য হিসাব করতে হলে বিভিন্ন ধরনের গ্যাস, মাটির কার্বনের পরিবর্তন এবং সময় ও স্থানভেদে তথ্য সংগ্রহের অনিশ্চয়তা–সবকিছু একসঙ্গে বিবেচনায় নিতে হয়।
তাই প্রকৃত জলবায়ু প্রভাব বোঝার জন্য গবেষকেরা তিনটি পদ্ধতি একসঙ্গে ব্যবহার করেছেন:
Ø ইকোসিস্টেম কম্পিউটার মডেলে ধানের বৃদ্ধি, পানির অবস্থা এবং মাটির প্রক্রিয়াগুলো পর্যবেক্ষণ করে মিথেন, নাইট্রাস অক্সাইড এবং মাটির কার্বনের পরিবর্তন হিসাব করা হয়।
Ø যেসব এলাকার তথ্য কম, এআই বা মেশিন লার্নিংয়ের মাধ্যমে সেসব অঞ্চলের হিসাব নিখুঁত করে পুরো বিশ্বের একটি চিত্র তৈরি করা যেতে পারে।
Ø বিশ্বের ১,২০০টিরও বেশি মাঠপর্যায়ের পরীক্ষার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা হয়েছে যে, সেচ, সার ও খড়ের ব্যবস্থাপনা কীভাবে নির্গমনে প্রভাব ফেলে।
এসব মিলিয়ে ১৯৬১ থেকে ২০২০ পর্যন্ত ধানক্ষেতের নির্গমন, তার কারণ এবং সম্ভাব্য সমাধান বিশ্লেষণ করেছেন গবেষকেরা।
কোন পদ্ধতি কার্যকর
ফলন না কমিয়েও গ্রিনহাউস গ্যাস কমানোর বেশ কিছু উপায় এই গবেষণায় উঠে এসেছে। সার ও খড়ের ব্যবহার কমানো, সেচ ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনা (মাঝে মাঝে জমি শুকানো) এবং জমি চাষ বা লাঙল দেওয়ার পরিমাণ কমিয়ে একসঙ্গে এই শতাব্দীর মাঝামাঝি নাগাদ ১০% গ্যাস নির্গমন কমানো সম্ভব।
তবে গবেষণায় কিছু চমকপ্রদ তথ্যও পাওয়া গেছে। রাসায়নিক সারের বদলে জৈব উপাদান ব্যবহারকে ভালো মনে করা হলেও গ্রিনহাউস গ্যাসের দিক থেকে এটি সবসময় উপকারী নয়।
মাটিতে পরিমিত খড় রাখা উর্বরতার জন্য ভালো, কিন্তু বেশি হলে তা মিথেন বাড়ায়। এর একটি দারুণ বিকল্প হলো খড়কে কম অক্সিজেনে পুড়িয়ে ‘বায়োচার’ বা এক ধরনের কয়লা তৈরি করা এবং তা মাটিতে মেশানো। এটি মাটিতে কার্বন ধরে রাখে এবং মিথেন কমায়।
পানি ব্যবস্থাপনার উন্নতি গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমানোর একটি শক্তিশালী উপায় হতে পারে। নির্দিষ্ট সময় পরপর ধানক্ষেতের পানি বের করে দিলে মিথেন গ্যাসের উৎপাদন কমে যায়। যদিও এতে নাইট্রাস অক্সাইডের নির্গমন সামান্য বাড়তে পারে। এ পদ্ধতি বিশেষভাবে কার্যকর সেসব অঞ্চলে, যেখানে নির্ভরযোগ্য সেচব্যবস্থা রয়েছে। এশিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকাও এর অন্তর্ভুক্ত।
সারের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করাও নির্গমন কমানোর একটি কার্যকর কৌশল। বিশেষ করে যেসব এলাকায় অতিরিক্ত সার ব্যবহার করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে চীনের কিছু অঞ্চল ও দক্ষিণ এশিয়া। অতিরিক্ত নাইট্রোজেন ব্যবহারে ফসলের উৎপাদন তেমন না বাড়লেও নাইট্রাস অক্সাইডের নির্গমন এবং পানিদূষণ বেড়ে যায়। তাই প্রয়োজনের অতিরিক্ত সার ব্যবহার কমালে একদিকে যেমন নির্গমন ও পানিদূষণ কমে, অন্যদিকে কৃষকদের খরচও সাশ্রয় হয়।

ফসলের মৌসুমের মাঝখানে জমি চাষ বা মাটি উল্টে দেওয়ার প্রভাব অঞ্চলভেদে ভিন্ন, যাকে আসলে টিলিং বলা হয়। সাধারণভাবে কম টিলিংকে জলবায়ুবান্ধব বলা হলেও গবেষণায় দেখা গেছে, পানিবদ্ধ ধানক্ষেতে এটি সবসময় মোট নির্গমন কমায় না। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মতো নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে অপেক্ষাকৃত ঠান্ডা আবহাওয়া মিথেন উৎপাদন সীমিত রাখে। ফলে কম টিলিংয়ের মাধ্যমে মাটিতে কার্বন ধরে রাখার সুফল বেশি পাওয়া যায়।
কিন্তু উষ্ণ এবং দীর্ঘসময় পানিবদ্ধ অঞ্চলে অক্সিজেনের স্বল্পতা অণুজীবের কার্যক্রম বাড়িয়ে দেয়। ফলে মিথেন উৎপাদন বেড়ে যায় এবং মাটির কার্বন দ্রুত হারিয়ে যেতে থাকে।
সব মিলিয়ে গবেষকেরা দেখেছেন, সব অঞ্চলের জন্য একক কোনো পদ্ধতি কার্যকর নয়। নির্গমন কমাতে প্রতিটি অঞ্চলকে তাদের নিজস্ব পরিবেশ ও কৃষি ব্যবস্থার সঙ্গে মানানসই সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি বেছে নিতে হবে।
ধানচাষের তাহলে কী হবে
গবেষণার মূল বার্তাটি যেমন আশার, তেমনি ভাবনারও। সঠিক ও পরিকল্পিত চাষাবাদ পদ্ধতি ব্যবহার করে ফলন না কমিয়েই বড় আকারে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমানো সম্ভব। তবে বৈশ্বিকভাবে এই জাদুকরি পরিবর্তনের ক্ষমতা প্রায় ১০ শতাংশের কাছাকাছি, যা জলবায়ু সংকট পুরোপুরি মোকাবিলার জন্য যথেষ্ট নয়।
এর চেয়েও বেশি গ্যাস কমাতে হলে কৃষকদের জৈব সারের সঠিক পরিমাণ নির্ধারণে আরও উন্নত পদ্ধতি দিতে হবে। এমন নতুন প্রযুক্তি আবিষ্কার করতে হবে, যা ফলন না কমিয়েই ক্ষতিকর গ্যাস নির্গমন আরও কমিয়ে আনবে।

বিশ্বের অর্ধেকের বেশি মানুষের প্রধান খাবার হলো ধান থেকে আসা চাল বা ভাত। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার পাহাড়ের ঢাল থেকে শুরু করে চীন ও ভারতের সেচ দেওয়া বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ–কোটি কোটি মানুষের প্রতিদিনের খাবার জোগায় এই ধান। কিন্তু সমস্যা হলো, ধান চাষের জন্য জমে থাকা জল বা কাদা মাটি কিছু অণুজীব তৈরির আদর্শ পরিবেশ তৈরি করে। আর সেসব অণুজীব জলবায়ু বিপর্যয়ের জন্য দায়ী গ্যাসের নির্গমন বাড়ায়।
পরিবেশ ও কৃষি বিজ্ঞানীদের একটি নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৬০-এর দশকের পর থেকে বিশ্বজুড়ে ধানক্ষেত থেকে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ২০১০-এর দশকে এর পরিমাণ ছিল বছরে গড়ে প্রায় ১১০ কোটি টন কার্বন ডাই-অক্সাইডের সমান। সহজ কথায়, এটি প্রায় ২৪ কোটি (২৩৯ মিলিয়ন) গাড়ি থেকে প্রতি বছর বের হওয়া ধোঁয়ার সমান ক্ষতিকর!
এর ফলে গবাদি পশুর পর এই ধান চাষই এখন গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের সবচেয়ে বড় উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ সামনে চাল বা ভাতের চাহিদা আরও বাড়বে।
তবে আশার কথা হলো, ধান চাষের পরিমাণ না কমিয়েও ক্ষেতের এই নির্গমন কমানোর কিছু কার্যকর উপায় কৃষকদের হাতে রয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, বর্তমানে যে ‘জলবায়ুবান্ধব’ প্রযুক্তিগুলো রয়েছে, সেসব সঠিকভাবে ব্যবহার করা গেলে ২০৫০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক ধানচাষজনিত নির্গমন অন্তত ১০% কমানো সম্ভব। যদিও জলবায়ু পরিবর্তনের এই গতি ধীর করতে এর চেয়ে আরও বড় মাত্রার কিছু কৌশল দরকার হবে।
ধানক্ষেতের নির্গমন কেন বাড়ছে?
ধানচাষ থেকে নির্গমন বৃদ্ধির পেছনে মূলত দুটি কারণ কাজ করছে: ধান চাষের জমির পরিমাণ বৃদ্ধি এবং অধিক উৎপাদনের জন্য ইচ্ছেমতো এসব জমির ব্যবহার।
বিশ্বব্যাপী অর্ধেকেরও বেশি গ্যাস নির্গমন বাড়ার কারণ হলো নতুন নতুন এলাকায় ধান চাষ শুরু হওয়া। যেমন– আফ্রিকায় ১৯৬০ সালের পর থেকে ধান চাষের জমি দ্বিগুণ হয়েছে, যার ফলে সেখানে মিথেন গ্যাস নির্গমনও দ্বিগুণ হয়েছে। অধিকন্তু, কৃষকেরা এখন বেশি সার, খড়, গোবরসহ জৈব উপাদান ব্যবহার করছেন, উচ্চফলনশীল জাত লাগানো হচ্ছে এবং গাছগুলো কাছাকাছি রোপণ করা হচ্ছে। এতে ফলন বেশি হচ্ছে, কিন্তু গ্রিনহাউস গ্যাসও বাড়ছে।

বিশেষ করে একটি পদ্ধতি উল্লেখ করার মতো–ধান কাটার পর খড় জমিতে রেখে তা মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া। এটি মাটির উর্বরতা বাড়ালেও মাটিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়। পরে অণুজীব এসব ভেঙে মিথেন গ্যাস তৈরি করে। গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৬০-এর পর থেকে ধানচাষের মোট নির্গমন বৃদ্ধির প্রায় ১৮ শতাংশের জন্য এই পদ্ধতি দায়ী। কারণ, এই খড় মাটিতে জৈব উপাদান বাড়িয়ে দেয়, যা অণুজীবকে পচাতে শুরু করে এবং প্রচুর পরিমাণে মিথেন গ্যাস তৈরি হয়।
এরপর বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে মাটির অণুজীব আরও সক্রিয় হয়ে উঠছে, ফলে গ্যাস নির্গমন আরও বাড়ছে।
সারও এই দূষণের আরেকটি বড় কারণ। ২০০০ সালের পর থেকে কৃত্রিম নাইট্রোজেন সারের ব্যবহার প্রায় ৭৬% বেড়েছে। এটি ‘নাইট্রাস অক্সাইড’ নামের আরেকটি শক্তিশালী গ্রিনহাউস গ্যাস তৈরি করে, যা মানুষের কারণে সৃষ্ট মোট বৈশ্বিক গ্যাস নির্গমন বৃদ্ধির প্রায় ৯ শতাংশের জন্য দায়ী।
চাষাবাদের একটি চর্চাও গ্যাস নির্গমনে প্রভাব ফেলে। অতীতে পুরো মৌসুমজুড়ে ধানক্ষেত পানিতে ডুবিয়ে রাখা হতো। এতে ভেজা পরিবেশে থাকায় অণুজীব অবিরাম গ্যাস উৎপন্ন করত। কিন্তু গত দুই দশকে অনেক কৃষক ‘মাঝেমধ্যে জমি শুকিয়ে আবার পানি দেওয়ার পদ্ধতি’ গ্রহণ করেছেন। এতে মিথেন নির্গমন কমেছে। তবে মাটি শুকানো ও ভেজানোর চক্রে কিছুটা নাইট্রাস অক্সাইড বেড়েছে। কারণ এ সময় অণুজীব নাইট্রোজেনকে গ্যাসে রূপান্তর করে।
জলবায়ুতে ধানচাষের প্রভাব
ধান উৎপাদনের সম্পূর্ণ জলবায়ু-প্রভাব নির্ধারণ করা শুধু একটি গ্রিনহাউস গ্যাসের পরিমাণ মাপার চেয়ে অনেক বেশি জটিল।
ধানক্ষেতের ভেজা বা পানিতে ডুবে থাকা মাটি থেকে মিথেন ও নাইট্রাস অক্সাইড গ্যাস নির্গত হয়। আবার ধান গাছ বেড়ে ওঠার সময় বাতাস থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণও করে। একই সঙ্গে দুই ফসলের মধ্যবর্তী সময়ে মাটি থেকে কার্বনও হারিয়ে যায়।
তাই বৈশ্বিক পর্যায়ে নির্ভরযোগ্য হিসাব করতে হলে বিভিন্ন ধরনের গ্যাস, মাটির কার্বনের পরিবর্তন এবং সময় ও স্থানভেদে তথ্য সংগ্রহের অনিশ্চয়তা–সবকিছু একসঙ্গে বিবেচনায় নিতে হয়।
তাই প্রকৃত জলবায়ু প্রভাব বোঝার জন্য গবেষকেরা তিনটি পদ্ধতি একসঙ্গে ব্যবহার করেছেন:
Ø ইকোসিস্টেম কম্পিউটার মডেলে ধানের বৃদ্ধি, পানির অবস্থা এবং মাটির প্রক্রিয়াগুলো পর্যবেক্ষণ করে মিথেন, নাইট্রাস অক্সাইড এবং মাটির কার্বনের পরিবর্তন হিসাব করা হয়।
Ø যেসব এলাকার তথ্য কম, এআই বা মেশিন লার্নিংয়ের মাধ্যমে সেসব অঞ্চলের হিসাব নিখুঁত করে পুরো বিশ্বের একটি চিত্র তৈরি করা যেতে পারে।
Ø বিশ্বের ১,২০০টিরও বেশি মাঠপর্যায়ের পরীক্ষার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা হয়েছে যে, সেচ, সার ও খড়ের ব্যবস্থাপনা কীভাবে নির্গমনে প্রভাব ফেলে।
এসব মিলিয়ে ১৯৬১ থেকে ২০২০ পর্যন্ত ধানক্ষেতের নির্গমন, তার কারণ এবং সম্ভাব্য সমাধান বিশ্লেষণ করেছেন গবেষকেরা।
কোন পদ্ধতি কার্যকর
ফলন না কমিয়েও গ্রিনহাউস গ্যাস কমানোর বেশ কিছু উপায় এই গবেষণায় উঠে এসেছে। সার ও খড়ের ব্যবহার কমানো, সেচ ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনা (মাঝে মাঝে জমি শুকানো) এবং জমি চাষ বা লাঙল দেওয়ার পরিমাণ কমিয়ে একসঙ্গে এই শতাব্দীর মাঝামাঝি নাগাদ ১০% গ্যাস নির্গমন কমানো সম্ভব।
তবে গবেষণায় কিছু চমকপ্রদ তথ্যও পাওয়া গেছে। রাসায়নিক সারের বদলে জৈব উপাদান ব্যবহারকে ভালো মনে করা হলেও গ্রিনহাউস গ্যাসের দিক থেকে এটি সবসময় উপকারী নয়।
মাটিতে পরিমিত খড় রাখা উর্বরতার জন্য ভালো, কিন্তু বেশি হলে তা মিথেন বাড়ায়। এর একটি দারুণ বিকল্প হলো খড়কে কম অক্সিজেনে পুড়িয়ে ‘বায়োচার’ বা এক ধরনের কয়লা তৈরি করা এবং তা মাটিতে মেশানো। এটি মাটিতে কার্বন ধরে রাখে এবং মিথেন কমায়।
পানি ব্যবস্থাপনার উন্নতি গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমানোর একটি শক্তিশালী উপায় হতে পারে। নির্দিষ্ট সময় পরপর ধানক্ষেতের পানি বের করে দিলে মিথেন গ্যাসের উৎপাদন কমে যায়। যদিও এতে নাইট্রাস অক্সাইডের নির্গমন সামান্য বাড়তে পারে। এ পদ্ধতি বিশেষভাবে কার্যকর সেসব অঞ্চলে, যেখানে নির্ভরযোগ্য সেচব্যবস্থা রয়েছে। এশিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকাও এর অন্তর্ভুক্ত।
সারের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করাও নির্গমন কমানোর একটি কার্যকর কৌশল। বিশেষ করে যেসব এলাকায় অতিরিক্ত সার ব্যবহার করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে চীনের কিছু অঞ্চল ও দক্ষিণ এশিয়া। অতিরিক্ত নাইট্রোজেন ব্যবহারে ফসলের উৎপাদন তেমন না বাড়লেও নাইট্রাস অক্সাইডের নির্গমন এবং পানিদূষণ বেড়ে যায়। তাই প্রয়োজনের অতিরিক্ত সার ব্যবহার কমালে একদিকে যেমন নির্গমন ও পানিদূষণ কমে, অন্যদিকে কৃষকদের খরচও সাশ্রয় হয়।

ফসলের মৌসুমের মাঝখানে জমি চাষ বা মাটি উল্টে দেওয়ার প্রভাব অঞ্চলভেদে ভিন্ন, যাকে আসলে টিলিং বলা হয়। সাধারণভাবে কম টিলিংকে জলবায়ুবান্ধব বলা হলেও গবেষণায় দেখা গেছে, পানিবদ্ধ ধানক্ষেতে এটি সবসময় মোট নির্গমন কমায় না। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মতো নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে অপেক্ষাকৃত ঠান্ডা আবহাওয়া মিথেন উৎপাদন সীমিত রাখে। ফলে কম টিলিংয়ের মাধ্যমে মাটিতে কার্বন ধরে রাখার সুফল বেশি পাওয়া যায়।
কিন্তু উষ্ণ এবং দীর্ঘসময় পানিবদ্ধ অঞ্চলে অক্সিজেনের স্বল্পতা অণুজীবের কার্যক্রম বাড়িয়ে দেয়। ফলে মিথেন উৎপাদন বেড়ে যায় এবং মাটির কার্বন দ্রুত হারিয়ে যেতে থাকে।
সব মিলিয়ে গবেষকেরা দেখেছেন, সব অঞ্চলের জন্য একক কোনো পদ্ধতি কার্যকর নয়। নির্গমন কমাতে প্রতিটি অঞ্চলকে তাদের নিজস্ব পরিবেশ ও কৃষি ব্যবস্থার সঙ্গে মানানসই সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি বেছে নিতে হবে।
ধানচাষের তাহলে কী হবে
গবেষণার মূল বার্তাটি যেমন আশার, তেমনি ভাবনারও। সঠিক ও পরিকল্পিত চাষাবাদ পদ্ধতি ব্যবহার করে ফলন না কমিয়েই বড় আকারে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমানো সম্ভব। তবে বৈশ্বিকভাবে এই জাদুকরি পরিবর্তনের ক্ষমতা প্রায় ১০ শতাংশের কাছাকাছি, যা জলবায়ু সংকট পুরোপুরি মোকাবিলার জন্য যথেষ্ট নয়।
এর চেয়েও বেশি গ্যাস কমাতে হলে কৃষকদের জৈব সারের সঠিক পরিমাণ নির্ধারণে আরও উন্নত পদ্ধতি দিতে হবে। এমন নতুন প্রযুক্তি আবিষ্কার করতে হবে, যা ফলন না কমিয়েই ক্ষতিকর গ্যাস নির্গমন আরও কমিয়ে আনবে।