চরচা ডেস্ক

গত ষাটের দশকের মাঝামাঝি মার্কিন প্রেসিডেন্ট লিন্ডন জনসন দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে ‘নিঃশর্ত যুদ্ধ’ ঘোষণা করেন। যার হাত ধরেই জন্ম নেয় আধুনিক আমেরিকার জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রকাঠামো। ১৯৬৪ সালে দেশজুড়ে চালু হয় খাদ্য সহায়তা কর্মসূচি ‘ফুড স্ট্যাম্প’। এর ঠিক পরের বছরই জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষায় দুটি বিশাল বিমা প্রকল্প চালু হয়। প্রবীণদের জন্য ‘মেডিকেয়ার’ এবং দরিদ্রদের জন্য ‘মেডিকেইড’।
ব্রিটিশ প্রভাবশালী সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্টের এক নিবন্ধে বলা হয়েছে, পরবর্তী এক দশকে সমাজকল্যাণ খাতে বরাদ্দের পরিমাণ বার্ষিক ১৫ শতাংশের বেশি হারে বৃদ্ধি পায়। বর্তমানে প্রতি আটজন আমেরিকান নাগরিকের মধ্যে একজন ফুড স্ট্যাম্প সহায়তা নিচ্ছেন। সব মিলিয়ে, আমেরিকার এই জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতি বছর দেশটির মোট জিডিপির প্রায় ১৫ শতাংশের সমান আর্থিক সহায়তা দিয়ে থাকে।
তবে রক্ষণশীলরা দীর্ঘকাল ধরেই দাবি করে আসছেন যে, জনসনের এই কর্মসূচিগুলো আসলে ব্যর্থ। তাদের মতে, দরিদ্রদের হাতে সরাসরি এভাবে অর্থ তুলে দেওয়া আসলে তাদের কর্মস্পৃহা ও উদ্যমকে নষ্ট করে দিয়েছে, যা শেষ পর্যন্ত মানুষকে অভাবের চক্রেই বন্দি করে ফেলেছে। ১৯৮৮ সালে প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগান বলেছিলেন, “ফেডারেল সরকার দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল, আর সেই যুদ্ধে দারিদ্র্যই জয়ী হয়েছে।”
হুভার ইনস্টিটিউশনের ৯৫ বছর বয়সী প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ এবং বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অত্যন্ত জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব থমাস সোয়েল যুক্তি দিয়েছেন যে, সহমর্মিতার আবরণে তৈরি এই কর্মসূচিগুলো উল্টো এমন সব আচরণকে উৎসাহিত করেছে যা মানুষকে অভাবী করে রাখে। দীর্ঘ সময় ধরে অধিকাংশ অর্থনীতিবিদ সোয়েলের এই যুক্তিগুলোকে কেবল একজন কট্টর দক্ষিণপন্থী আদর্শবাদীর প্রলাপ বলে উড়িয়ে দিলেও, বর্তমান প্রেক্ষাপটে দেখা যাচ্ছে যে নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে সোয়েলই সঠিক ছিলেন।
কর্নেল ইউনিভার্সিটির রিচার্ড বার্কহাউসার এবং মুক্তবাজারপন্থী থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক ‘আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউট’-এর কেভিন করিন্থের একটি নতুন গবেষণাপত্র ১৯৩০-এর দশক থেকে আমেরিকার দারিদ্র্যের গতিধারা নিয়ে এক বিস্ময়কর চিত্র তুলে ধরেছে। এটি মূলত পুরনো আদমশুমারির তথ্য ব্যবহার করে পারিবারিক আয় নিরূপণের একনিষ্ঠ গবেষণার ফসল। এই গবেষণার গাণিতিক চুলচেরা বিশ্লেষণগুলো মাথা ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো জটিল। গবেষকদ্বয় ১৯৩৯ সালে খামার শ্রমিকদের আবাসন ও খাওয়া-দাওয়ার খরচ থেকে শুরু করে ১৯৫৯ সালের যুদ্ধফেরত সৈনিকদের ভাতার আর্থিক মূল্য পর্যন্ত প্রতিটি খুঁটিনাটি বিষয় এখানে হিসাবভুক্ত করেছেন। এই গবেষণাপত্রটি মূলত দুটি বার্তা দেয়-যার একটি আশাব্যঞ্জক এবং অন্যটি বেশ উদ্বেগজনক।
আশার কথা হলো, অতীতে আমেরিকায় দরিদ্র মানুষের সংখ্যা যে পর্যায়ে ছিল, বর্তমানে তা অভাবনীয়ভাবে কমে এসেছে। এই তথ্যটি দীর্ঘদিনের প্রচলিত ধারণা বা ‘অফিশিয়াল পোভার্টি মেজার’ (ওপিএম)-কে চ্যালেঞ্জ করে-যে মানদণ্ড অনুযায়ী ২০২৪ সালে বছরে প্রায় ১৬ হাজার ডলারের কম আয় করা ব্যক্তিকে দরিদ্র হিসেবে গণ্য করা হয়।
গত ৫০ বছর ধরে এই ওপিএম অনুযায়ী দারিদ্র্যের হার মোটের ওপর জনসংখ্যার প্রায় ১২ শতাংশে স্থবির হয়ে আছে। ডানপন্থীরা একে প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরে দাবি করেন যে, সরকারি কল্যাণমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা মানুষের মধ্যে পরনির্ভরশীলতার এক নেতিবাচক মানসিকতা তৈরি করে।
অন্যদিকে, বামপন্থীরা মনে করেন এটি প্রমাণ করে যে আমেরিকার কল্যাণ ব্যবস্থা সম্পদ পুনর্বণ্টনে যথেষ্ট ভূমিকা রাখতে পারছে না। কিন্তু বাস্তবে ওপিএম পদ্ধতিটি নিজেই ত্রুটিপূর্ণ; কারণ এটি কর, সরাসরি নগদ নয় এমন সরকারি সহায়তা এবং অন্যান্য অনেক আর্থিক সুবিধাকে হিসেবে ধরতে ব্যর্থ হয়।
বার্কহাউসার ও করিন্থ দারিদ্র্য পরিমাপের জন্য একটি ভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন, যা কর, সরকারি অনুদান এবং বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার হিসাবও রাখে। এই পদ্ধতিতে কাউকে দরিদ্র বলা হবে তখনই, যদি তার প্রকৃত আয় ১৯৬৩ সালের দরিদ্রতম ২০ শতাংশ আমেরিকানদের সমপর্যায়ের হয়।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে এর অর্থ হলো বছরে প্রায় ১২ হাজার ডলারের কম আয় করা। এই নতুন মানদণ্ড অনুযায়ী দেখা যায়, ১৯৩৯ সালে আমেরিকার ৪৯ শতাংশ মানুষ দরিদ্র ছিল; যা ২০২৩ সালে নাটকীয়ভাবে কমে মাত্র ৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। আর যদি এই হিসাবে স্বাস্থ্যবিমাকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়, তবে অগ্রগতির চিত্রটি আরও অভাবনীয় হয়ে ওঠে-দারিদ্র্যের হার ১৯৩৯ সালের সেই উচ্চমাত্রা থেকে কমে বর্তমানে মাত্র ১.৬ শতাংশে নেমে এসেছে।
এই গবেষণাপত্রটির সম্ভবত সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক অংশটি হলো কৃষ্ণাঙ্গ শিশুদের নিয়ে করা পরিসংখ্যান। গবেষকদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, এই গোষ্ঠীর মধ্যে দারিদ্র্যের হার ১৯৩৯ সালের ৯০ শতাংশ থেকে বর্তমানে ১০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। বামপন্থীদের মধ্যে একটি হতাশাজনক ধারণা প্রবল যে-আমেরিকা হচ্ছে মূলত দরিদ্র মানুষে ঠাসা একটি ধনী দেশ-এই তথ্য সেই ধারণাকে সরাসরি নাকচ করে দেয়।

আপাতদৃষ্টিতে জনসনের ‘দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ সফল বলেই মনে হতে পারে। কিন্তু গবেষণাপত্রটির দ্বিতীয় অংশ এই সিদ্ধান্তকে বড়সড় একটি প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। প্রশ্নটি হলো-এই কল্যাণমূলক রাষ্ট্রকাঠামো কি সত্যিই অপরিহার্য ছিল, নাকি দারিদ্র্য এমনিতেই কমে আসত?
থমাস সোয়েল বারবার একটি যুক্তি দিয়েছেন যে, দারিদ্র্য কমার এই ধারা ১৯৬০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ের অনেক আগে থেকেই শুরু হয়েছিল। অর্থাৎ, দারিদ্র্য দূর করার জন্য মুক্তবাজার পুঁজিবাদের জাদুকরী শক্তিই যথেষ্ট ছিল।
গবেষণাপত্রের লেখকদ্বয় তথ্যের ভিত্তিতে দেখিয়েছেন যে সোয়েলের দাবিই সঠিক। তারা দেখতে পেয়েছেন যে, দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার পরবর্তী সময়ে দারিদ্র্য বিমোচনের গতি আগের তুলনায় মোটেও ত্বরান্বিত হয়নি। বরং একে একটি অবমূল্যায়নও বলা যেতে পারে: ১৯৩৯ থেকে ১৯৬৩ সাল পর্যন্ত দারিদ্র্যের হার কমেছিল প্রায় ২৯ শতাংশ; অথচ তার পরবর্তী দীর্ঘ ৬০ বছরে তা কমেছে মাত্র ১৬ শতাংশের মতো।
গবেষকরা দারিদ্র্য হ্রাসের পেছনের কারণগুলো বিশ্লেষণ করে দেখেছেন যে, ১৯৬০-এর দশকের আগে দারিদ্র্য কমেছিল মানুষের নিজস্ব আয় বৃদ্ধির কারণে তখন রাষ্ট্রপ্রদত্ত ভাতার কোনো বিশেষ ভূমিকা ছিল না। এই তথ্যগুলো কল্যাণমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থাকে পুরোপুরি অপ্রয়োজনীয় প্রমাণের জন্য ‘অকাট্য দলিল’ না হলেও, বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে ভাবার যথেষ্ট খোরাক দেয়।
১৯৬০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে প্রেক্ষাপট দ্রুত বদলে যেতে শুরু করে। দারিদ্র্যের হার তখনও কমছিল ঠিকই, কিন্তু এর পেছনে মূল চালিকাশক্তি ছিল ক্রমবর্ধমান সরকারি সুযোগ-সুবিধা ও ভাতার প্রসার। মানুষের নিজস্ব আয়ের উন্নতি বা বাজারভিত্তিক আয় এক্ষেত্রে ক্রমেই গৌণ হয়ে পড়ে। ফলে সৃষ্টি হয় এক ধরণের ‘কল্যাণ-নির্ভরতা’।
উদাহরণস্বরূপ, ১৯৭০-এর দশকের মধ্যেই প্রায় ৩০ শতাংশ কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকান তাদের জীবনযাত্রার ব্যয়ের অন্তত অর্ধেকটার জন্য সরাসরি সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। যে দেশটি একসময় কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে নাগরিকদের দারিদ্র্য জয়ের সুযোগ করে দিত, সেটি ধীরে ধীরে এমন এক রাষ্ট্রে পরিণত হলো যা কেবল চেক লিখে বা নগদ অনুদান বিলিয়ে দারিদ্র্য মোচনের পথ বেছে নিল।
দৃষ্টিভঙ্গির সংঘাত
অবশ্য এমনটা হতেই পারে যে, জনসনের এই উদ্যোগগুলো না থাকলেও ১৯৬০-এর দশকের পর মার্কিন বাজারভিত্তিক আয়ের সেই চনমনে প্রবৃদ্ধি এমনিতেই স্তিমিত হয়ে আসত। সর্বোপরি, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সেই অভাবনীয় অর্থনৈতিক সুসময় তো আর চিরকাল টিকে থাকার কথা ছিল না। আবার এটাও হতে পারে যে, শিক্ষা কিংবা শারীরিক সক্ষমতার অভাবের কারণে কিছু মানুষের পক্ষে কখনোই দারিদ্র্যের সীমা অতিক্রম করা সম্ভব হতো না। যদি আমরা তা-ই ধরে নেই, তবে দারিদ্র্য হ্রাসের ধারা বজায় রাখতে এই বিশাল কল্যাণমূলক রাষ্ট্রকাঠামোই হয়তো ছিল একমাত্র উপায়। তবে এই সিদ্ধান্তটি বড্ড বেশি হতাশাবাদী মনে হয়; কারণ ১৯৯০-এর দশকের সমাজকল্যাণ সংস্কারের পর দেখা গেছে যে, দারিদ্র্য এবং সরকারি নির্ভরতা-উভয়ই হ্রাস পেয়েছে এবং বাজারভিত্তিক আয়ের প্রবৃদ্ধি সেই শূন্যস্থান সফলভাবে পূরণ করেছে।
ইতিহাসের এই ‘যদি-তবে’র হিসাব মেলানো অসম্ভব; অর্থাৎ লিন্ডন জনসন প্রেসিডেন্ট না হলে দারিদ্র্যের চিত্রটা কেমন হতো, তা আমরা কখনোই নিশ্চিতভাবে জানতে পারব না। তবে যা স্পষ্টভাবে বোঝা যায় তা হলো, দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধে আমেরিকাকে এক বিশাল ‘বিনিময়’ বা ‘ট্রেড-অফ’ করতে হয়েছে।
ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলারের ফেডারেল ফান্ড হয়তো সাময়িকভাবে অভাব মিটিয়েছে, কিন্তু তা একই সাথে মানুষের নিজ প্রচেষ্টায় ভাগ্য বদলানোর চিরন্তন প্রেরণা ও উদ্যোগকে অনেকটা ভোঁতা করে দিয়েছে। এই বিশাল পরিমাণ অর্থ হয়তো চিকিৎসা গবেষণার মতো অন্য কোনো দীর্ঘমেয়াদী খাতেও ব্যয় করা যেত। এই ঝুঁকি আর ‘সুযোগ-ব্যয়’ কতটা যুক্তিসঙ্গত ছিল-তা নিয়ে বিবেকবান মানুষের মধ্যে আজীবন মতভেদ থাকবে। তবে স্বস্তির বিষয় হলো, সেই বিতর্কের জন্য এখন আমাদের হাতে আগের চেয়ে অনেক বেশি বস্তুনিষ্ঠ তথ্য-প্রমাণ রয়েছে।

গত ষাটের দশকের মাঝামাঝি মার্কিন প্রেসিডেন্ট লিন্ডন জনসন দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে ‘নিঃশর্ত যুদ্ধ’ ঘোষণা করেন। যার হাত ধরেই জন্ম নেয় আধুনিক আমেরিকার জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রকাঠামো। ১৯৬৪ সালে দেশজুড়ে চালু হয় খাদ্য সহায়তা কর্মসূচি ‘ফুড স্ট্যাম্প’। এর ঠিক পরের বছরই জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষায় দুটি বিশাল বিমা প্রকল্প চালু হয়। প্রবীণদের জন্য ‘মেডিকেয়ার’ এবং দরিদ্রদের জন্য ‘মেডিকেইড’।
ব্রিটিশ প্রভাবশালী সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্টের এক নিবন্ধে বলা হয়েছে, পরবর্তী এক দশকে সমাজকল্যাণ খাতে বরাদ্দের পরিমাণ বার্ষিক ১৫ শতাংশের বেশি হারে বৃদ্ধি পায়। বর্তমানে প্রতি আটজন আমেরিকান নাগরিকের মধ্যে একজন ফুড স্ট্যাম্প সহায়তা নিচ্ছেন। সব মিলিয়ে, আমেরিকার এই জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতি বছর দেশটির মোট জিডিপির প্রায় ১৫ শতাংশের সমান আর্থিক সহায়তা দিয়ে থাকে।
তবে রক্ষণশীলরা দীর্ঘকাল ধরেই দাবি করে আসছেন যে, জনসনের এই কর্মসূচিগুলো আসলে ব্যর্থ। তাদের মতে, দরিদ্রদের হাতে সরাসরি এভাবে অর্থ তুলে দেওয়া আসলে তাদের কর্মস্পৃহা ও উদ্যমকে নষ্ট করে দিয়েছে, যা শেষ পর্যন্ত মানুষকে অভাবের চক্রেই বন্দি করে ফেলেছে। ১৯৮৮ সালে প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগান বলেছিলেন, “ফেডারেল সরকার দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল, আর সেই যুদ্ধে দারিদ্র্যই জয়ী হয়েছে।”
হুভার ইনস্টিটিউশনের ৯৫ বছর বয়সী প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ এবং বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অত্যন্ত জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব থমাস সোয়েল যুক্তি দিয়েছেন যে, সহমর্মিতার আবরণে তৈরি এই কর্মসূচিগুলো উল্টো এমন সব আচরণকে উৎসাহিত করেছে যা মানুষকে অভাবী করে রাখে। দীর্ঘ সময় ধরে অধিকাংশ অর্থনীতিবিদ সোয়েলের এই যুক্তিগুলোকে কেবল একজন কট্টর দক্ষিণপন্থী আদর্শবাদীর প্রলাপ বলে উড়িয়ে দিলেও, বর্তমান প্রেক্ষাপটে দেখা যাচ্ছে যে নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে সোয়েলই সঠিক ছিলেন।
কর্নেল ইউনিভার্সিটির রিচার্ড বার্কহাউসার এবং মুক্তবাজারপন্থী থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক ‘আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউট’-এর কেভিন করিন্থের একটি নতুন গবেষণাপত্র ১৯৩০-এর দশক থেকে আমেরিকার দারিদ্র্যের গতিধারা নিয়ে এক বিস্ময়কর চিত্র তুলে ধরেছে। এটি মূলত পুরনো আদমশুমারির তথ্য ব্যবহার করে পারিবারিক আয় নিরূপণের একনিষ্ঠ গবেষণার ফসল। এই গবেষণার গাণিতিক চুলচেরা বিশ্লেষণগুলো মাথা ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো জটিল। গবেষকদ্বয় ১৯৩৯ সালে খামার শ্রমিকদের আবাসন ও খাওয়া-দাওয়ার খরচ থেকে শুরু করে ১৯৫৯ সালের যুদ্ধফেরত সৈনিকদের ভাতার আর্থিক মূল্য পর্যন্ত প্রতিটি খুঁটিনাটি বিষয় এখানে হিসাবভুক্ত করেছেন। এই গবেষণাপত্রটি মূলত দুটি বার্তা দেয়-যার একটি আশাব্যঞ্জক এবং অন্যটি বেশ উদ্বেগজনক।
আশার কথা হলো, অতীতে আমেরিকায় দরিদ্র মানুষের সংখ্যা যে পর্যায়ে ছিল, বর্তমানে তা অভাবনীয়ভাবে কমে এসেছে। এই তথ্যটি দীর্ঘদিনের প্রচলিত ধারণা বা ‘অফিশিয়াল পোভার্টি মেজার’ (ওপিএম)-কে চ্যালেঞ্জ করে-যে মানদণ্ড অনুযায়ী ২০২৪ সালে বছরে প্রায় ১৬ হাজার ডলারের কম আয় করা ব্যক্তিকে দরিদ্র হিসেবে গণ্য করা হয়।
গত ৫০ বছর ধরে এই ওপিএম অনুযায়ী দারিদ্র্যের হার মোটের ওপর জনসংখ্যার প্রায় ১২ শতাংশে স্থবির হয়ে আছে। ডানপন্থীরা একে প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরে দাবি করেন যে, সরকারি কল্যাণমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা মানুষের মধ্যে পরনির্ভরশীলতার এক নেতিবাচক মানসিকতা তৈরি করে।
অন্যদিকে, বামপন্থীরা মনে করেন এটি প্রমাণ করে যে আমেরিকার কল্যাণ ব্যবস্থা সম্পদ পুনর্বণ্টনে যথেষ্ট ভূমিকা রাখতে পারছে না। কিন্তু বাস্তবে ওপিএম পদ্ধতিটি নিজেই ত্রুটিপূর্ণ; কারণ এটি কর, সরাসরি নগদ নয় এমন সরকারি সহায়তা এবং অন্যান্য অনেক আর্থিক সুবিধাকে হিসেবে ধরতে ব্যর্থ হয়।
বার্কহাউসার ও করিন্থ দারিদ্র্য পরিমাপের জন্য একটি ভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন, যা কর, সরকারি অনুদান এবং বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার হিসাবও রাখে। এই পদ্ধতিতে কাউকে দরিদ্র বলা হবে তখনই, যদি তার প্রকৃত আয় ১৯৬৩ সালের দরিদ্রতম ২০ শতাংশ আমেরিকানদের সমপর্যায়ের হয়।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে এর অর্থ হলো বছরে প্রায় ১২ হাজার ডলারের কম আয় করা। এই নতুন মানদণ্ড অনুযায়ী দেখা যায়, ১৯৩৯ সালে আমেরিকার ৪৯ শতাংশ মানুষ দরিদ্র ছিল; যা ২০২৩ সালে নাটকীয়ভাবে কমে মাত্র ৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। আর যদি এই হিসাবে স্বাস্থ্যবিমাকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়, তবে অগ্রগতির চিত্রটি আরও অভাবনীয় হয়ে ওঠে-দারিদ্র্যের হার ১৯৩৯ সালের সেই উচ্চমাত্রা থেকে কমে বর্তমানে মাত্র ১.৬ শতাংশে নেমে এসেছে।
এই গবেষণাপত্রটির সম্ভবত সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক অংশটি হলো কৃষ্ণাঙ্গ শিশুদের নিয়ে করা পরিসংখ্যান। গবেষকদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, এই গোষ্ঠীর মধ্যে দারিদ্র্যের হার ১৯৩৯ সালের ৯০ শতাংশ থেকে বর্তমানে ১০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। বামপন্থীদের মধ্যে একটি হতাশাজনক ধারণা প্রবল যে-আমেরিকা হচ্ছে মূলত দরিদ্র মানুষে ঠাসা একটি ধনী দেশ-এই তথ্য সেই ধারণাকে সরাসরি নাকচ করে দেয়।

আপাতদৃষ্টিতে জনসনের ‘দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ সফল বলেই মনে হতে পারে। কিন্তু গবেষণাপত্রটির দ্বিতীয় অংশ এই সিদ্ধান্তকে বড়সড় একটি প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। প্রশ্নটি হলো-এই কল্যাণমূলক রাষ্ট্রকাঠামো কি সত্যিই অপরিহার্য ছিল, নাকি দারিদ্র্য এমনিতেই কমে আসত?
থমাস সোয়েল বারবার একটি যুক্তি দিয়েছেন যে, দারিদ্র্য কমার এই ধারা ১৯৬০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ের অনেক আগে থেকেই শুরু হয়েছিল। অর্থাৎ, দারিদ্র্য দূর করার জন্য মুক্তবাজার পুঁজিবাদের জাদুকরী শক্তিই যথেষ্ট ছিল।
গবেষণাপত্রের লেখকদ্বয় তথ্যের ভিত্তিতে দেখিয়েছেন যে সোয়েলের দাবিই সঠিক। তারা দেখতে পেয়েছেন যে, দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার পরবর্তী সময়ে দারিদ্র্য বিমোচনের গতি আগের তুলনায় মোটেও ত্বরান্বিত হয়নি। বরং একে একটি অবমূল্যায়নও বলা যেতে পারে: ১৯৩৯ থেকে ১৯৬৩ সাল পর্যন্ত দারিদ্র্যের হার কমেছিল প্রায় ২৯ শতাংশ; অথচ তার পরবর্তী দীর্ঘ ৬০ বছরে তা কমেছে মাত্র ১৬ শতাংশের মতো।
গবেষকরা দারিদ্র্য হ্রাসের পেছনের কারণগুলো বিশ্লেষণ করে দেখেছেন যে, ১৯৬০-এর দশকের আগে দারিদ্র্য কমেছিল মানুষের নিজস্ব আয় বৃদ্ধির কারণে তখন রাষ্ট্রপ্রদত্ত ভাতার কোনো বিশেষ ভূমিকা ছিল না। এই তথ্যগুলো কল্যাণমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থাকে পুরোপুরি অপ্রয়োজনীয় প্রমাণের জন্য ‘অকাট্য দলিল’ না হলেও, বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে ভাবার যথেষ্ট খোরাক দেয়।
১৯৬০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে প্রেক্ষাপট দ্রুত বদলে যেতে শুরু করে। দারিদ্র্যের হার তখনও কমছিল ঠিকই, কিন্তু এর পেছনে মূল চালিকাশক্তি ছিল ক্রমবর্ধমান সরকারি সুযোগ-সুবিধা ও ভাতার প্রসার। মানুষের নিজস্ব আয়ের উন্নতি বা বাজারভিত্তিক আয় এক্ষেত্রে ক্রমেই গৌণ হয়ে পড়ে। ফলে সৃষ্টি হয় এক ধরণের ‘কল্যাণ-নির্ভরতা’।
উদাহরণস্বরূপ, ১৯৭০-এর দশকের মধ্যেই প্রায় ৩০ শতাংশ কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকান তাদের জীবনযাত্রার ব্যয়ের অন্তত অর্ধেকটার জন্য সরাসরি সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। যে দেশটি একসময় কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে নাগরিকদের দারিদ্র্য জয়ের সুযোগ করে দিত, সেটি ধীরে ধীরে এমন এক রাষ্ট্রে পরিণত হলো যা কেবল চেক লিখে বা নগদ অনুদান বিলিয়ে দারিদ্র্য মোচনের পথ বেছে নিল।
দৃষ্টিভঙ্গির সংঘাত
অবশ্য এমনটা হতেই পারে যে, জনসনের এই উদ্যোগগুলো না থাকলেও ১৯৬০-এর দশকের পর মার্কিন বাজারভিত্তিক আয়ের সেই চনমনে প্রবৃদ্ধি এমনিতেই স্তিমিত হয়ে আসত। সর্বোপরি, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সেই অভাবনীয় অর্থনৈতিক সুসময় তো আর চিরকাল টিকে থাকার কথা ছিল না। আবার এটাও হতে পারে যে, শিক্ষা কিংবা শারীরিক সক্ষমতার অভাবের কারণে কিছু মানুষের পক্ষে কখনোই দারিদ্র্যের সীমা অতিক্রম করা সম্ভব হতো না। যদি আমরা তা-ই ধরে নেই, তবে দারিদ্র্য হ্রাসের ধারা বজায় রাখতে এই বিশাল কল্যাণমূলক রাষ্ট্রকাঠামোই হয়তো ছিল একমাত্র উপায়। তবে এই সিদ্ধান্তটি বড্ড বেশি হতাশাবাদী মনে হয়; কারণ ১৯৯০-এর দশকের সমাজকল্যাণ সংস্কারের পর দেখা গেছে যে, দারিদ্র্য এবং সরকারি নির্ভরতা-উভয়ই হ্রাস পেয়েছে এবং বাজারভিত্তিক আয়ের প্রবৃদ্ধি সেই শূন্যস্থান সফলভাবে পূরণ করেছে।
ইতিহাসের এই ‘যদি-তবে’র হিসাব মেলানো অসম্ভব; অর্থাৎ লিন্ডন জনসন প্রেসিডেন্ট না হলে দারিদ্র্যের চিত্রটা কেমন হতো, তা আমরা কখনোই নিশ্চিতভাবে জানতে পারব না। তবে যা স্পষ্টভাবে বোঝা যায় তা হলো, দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধে আমেরিকাকে এক বিশাল ‘বিনিময়’ বা ‘ট্রেড-অফ’ করতে হয়েছে।
ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলারের ফেডারেল ফান্ড হয়তো সাময়িকভাবে অভাব মিটিয়েছে, কিন্তু তা একই সাথে মানুষের নিজ প্রচেষ্টায় ভাগ্য বদলানোর চিরন্তন প্রেরণা ও উদ্যোগকে অনেকটা ভোঁতা করে দিয়েছে। এই বিশাল পরিমাণ অর্থ হয়তো চিকিৎসা গবেষণার মতো অন্য কোনো দীর্ঘমেয়াদী খাতেও ব্যয় করা যেত। এই ঝুঁকি আর ‘সুযোগ-ব্যয়’ কতটা যুক্তিসঙ্গত ছিল-তা নিয়ে বিবেকবান মানুষের মধ্যে আজীবন মতভেদ থাকবে। তবে স্বস্তির বিষয় হলো, সেই বিতর্কের জন্য এখন আমাদের হাতে আগের চেয়ে অনেক বেশি বস্তুনিষ্ঠ তথ্য-প্রমাণ রয়েছে।