ভারতকে ভোগানো যুদ্ধবিমান কিনলে কতটা সুবিধা পাবে বাংলাদেশ?

চরচা প্রতিবেদক
চরচা প্রতিবেদক
ভারতকে ভোগানো যুদ্ধবিমান কিনলে কতটা সুবিধা পাবে বাংলাদেশ?

এবার জেএফ–১৭ থান্ডার যুদ্ধ বিমান কেনার আগ্রহ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ সম্প্রতি পাকিস্তান সফরে গিয়ে তাদের কাছ থেকে জেএফ–১৭ থান্ডার ব্লক–থ্রি যুদ্ধবিমান কেনার আগ্রহ জানিয়েছেন।

বিমানবাহিনী প্রধানের পাকিস্তান সফরের এই খবর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বেশ আগ্রহ সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে ভারতীয় গণমাধ্যমে। বাংলাদেশ অনেক দিন ধরেই বিমানবাহিনীর জন্য মাল্টি রোল যুদ্ধবিমান সংগ্রহের চেষ্টা ও প্রক্রিয়া চালিয়ে আসছে। ২০০০ সালে বিমানবাহিনীর বহরে রাশিয়া থেকে মিগ–২৯ যুদ্ধবিমান সংযোজিত হওয়ার পর গত ২৬ বছরে বিমানবাহিনীতে কোনো মাল্টিরোল যুদ্ধবিমান সংযুক্ত হয়নি। এ মুহূর্তে বিমান বাহিনীর ব্যাকবোন হচ্ছে চীনের এফ–৭ বিজি যুদ্ধবিমান। এটি রাশিয়ার মিগ–২১ যুদ্ধবিমানের চীনা সংস্করণ।

পাকিস্তান বিমানবাহিনীর একজন মুখপাত্রের বরাতে বিবিসি জানিয়েছে, বাংলাদেশ বিমানবাহিনী প্রধান পাকিস্তান ও চীনের যৌথ উদ্যোগে তৈরি জেএফ–১৭ থান্ডার ব্লক থ্রি যুদ্ধবিমান কিনতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। দুই দেশের মধ্যে এ নিয়ে কোনো চুক্তি অবশ্য হয়নি।

কিছু দিন আগেই ইতালির তৈরি শক্তিশালী মাল্টিরোল যুদ্ধবিমান ইউরো ফাইটার টাইফুন কেনার জন্য লিওনার্দো এসপিএর সঙ্গে লেটার অব ইন্টেন্টে সই করেছে। এই লিওনার্দো এসপিএ ইউরোফাইটারের সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান। এর আগে, বাংলাদেশের গণমাধ্যমে খবর বেরিয়েছিল বাংলাদেশ চীনের চেংদু কোম্পানির তৈরি ২০টি জে–১০সিই মাল্টিরোল যুদ্ধবিমান কিনতে যাচ্ছে। এ নিয়ে যথেষ্ট তোলপাড়ই হয়েছে। প্রতিরক্ষা বিষয়ে আগ্রহীদের মধ্যে উদ্দীপনারও সৃষ্টি হয়েছিল। এখন সবার কৌতূহল, বাংলাদেশ বিমানবাহিনীতে আসলে কোন যুদ্ধবিমান আসতে যাচ্ছে? বাংলাদেশ কী জে–১০ সিই আনছে? নাকি ইউরো ফাইটার টাইফুন আনছে? নাকি শেষ পর্যন্ত জেএফ–১৭ থান্ডার ব্লক থ্রি দিয়েই বিমান বাহিনীকে আধুনিক করবে বাংলাদেশ?

ভারতকে ঝামেলায় ফেলা পাকিস্তানের যুদ্ধবিমান কিনবে বাংলাদেশ? ছবি: রয়টার্স
ভারতকে ঝামেলায় ফেলা পাকিস্তানের যুদ্ধবিমান কিনবে বাংলাদেশ? ছবি: রয়টার্স

জেএফ–১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান নিয়ে আগ্রহের অন্য একটা কারণও আছে। চীনের সহযোগিতায় পাকিস্তান এই যুদ্ধবিমান তৈরি করেছে। শুধু তা–ই নয়, এই যুদ্ধবিমান এরই মধ্যে যুদ্ধক্ষেত্রে কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। ২০১৯ ও ২০২৫ সালে ভারতের সঙ্গে উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে জেএফ–১৭ থান্ডার ভারতীয় বিমানবাহিনীকে যথেষ্ট সমস্যায় ফেলেছিল। ৪.৫ প্রজন্মের এই যুদ্ধবিমান শক্তিশালী রাডার ও দূরপাল্লার ক্ষেপনাস্ত্র দিয়ে সজ্জিত। ইউরোফাইটার কিংবা জে–১০ সিই বাদ দিন, বাংলাদেশ যদি শুধু জেএফ–১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমানও সংযোজন করে, বিমানবাহিনীর সক্ষমতা বেড়ে যাবে অনেকটাই। একই সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার ভূ–রাজনৈতিক দৃশ্যপটেও বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা দেবে।

এখন আসুন জেনে নেওয়া যাক জেএফ থান্ডার যুদ্ধবিমান আসলে কেমন? কতটা শক্তিশালী? এটি অত্যাধুনিক যুদ্ধ বিমান এতে কোনো সন্দেহ নেই। ওজনে খুবই হালকা। পাকিস্তান অ্যারোনটিক্যাল কমপ্লেক্স ও চীনের চেংদু এয়ারক্রাফট ইন্ডাস্ট্রি করপোরেশনের যৌথ উদ্যোগে এটি তৈরি। মূলত এটি চীনের টেকনোলজি দিয়েই তৈরি। এয়ার টু এয়ার ও এয়ার টু সারফেস কমব্যাটে জেএফ–১৭ থান্ডারের খুবই পারদর্শী। দিনে কিংবা রাতে দুই সময়ের যুদ্ধেই এটি সমান সক্ষমতা দেখাতে পারে।

এতে আছে কম্পিউটার কন্ট্রোলড ফ্লাইট ম্যানেজমেন্ট। সর্বশেষ প্রযুক্তির অস্ত্র খুব ভালোভাবেই বহন করতে পারে জেএফ থান্ডার–১৭। এর ম্যানুভার ক্ষমতাও দুর্দান্ত। ২০০৩ সালের আগস্টে এর প্রোটোটাইপ আকাশে উড়েছিল। যার নাম ছিল এফসি–১। এরপর আরও দুটি প্রোটোটাইপ তৈরি করা হয়। ২০০৭ সালে জেএফ–১৭ থান্ডার নামে এটি চূড়ান্ত রূপ নিয়ে আকাশে ওড়ে। পাকিস্তান বিমানবাহিনীতে ৭ স্কোয়াড্রন জেএফ–১৭ থান্ডার আছে। এখনো পর্যন্ত ১৪৭টি জেএফ–১৭ থান্ডার তৈরি করা হয়।

বাংলাদেশ বিমানবাহিনী প্রধান সম্প্রতি পাকিস্তান বিমান বাহিনী প্রধানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে জেএফ–১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান কেনার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। ছবি: পাকিস্তান আইএসপিআর
বাংলাদেশ বিমানবাহিনী প্রধান সম্প্রতি পাকিস্তান বিমান বাহিনী প্রধানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে জেএফ–১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান কেনার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। ছবি: পাকিস্তান আইএসপিআর

৬ হাজার ৪১১ কেজি ওজনের জেএফ-১৭ থান্ডার টেকঅফের সময় সর্বোচ্চ ১২ হাজার ৭০০ কেজি বহন করতে পারে। এই যুদ্ধবিমানের সর্বোচ্চ গতি প্রতি ঘণ্টায় ২ হাজার ২০৫ কিলোমিটার। এতে ব্রাজিলের মার-১ অ্যান্টি রেডিয়েশন ক্ষেপণাস্ত্র, ফ্রান্সের মাটরা ডুরানডাল অ্যান্টি রানওয়ে বোমা, ফ্রান্সের এম-৩৯ অ্যান্টিশিপ ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রও ব্যবহার করা হয়েছে। তবে বিকল্প হিসেবে একই ক্লাসের চীনা আর্মামেন্ট ব্যবহৃত হয়েছে।

পাকিস্তান এরই মধ্যে আজারবাইজান, মিয়ানমার ও নাইজেরিয়ার কাছে জেএফ থান্ডার–১৭ যুদ্ধবিমান বিক্রি করেছে। এ ছাড়াও সৌদি আরব, লিবিয়া ও ইরাকের সঙ্গে তাদের আলাপ চলছে।

বাংলাদেশ বিমানবাহিনীতে তিন ধরনের মাল্টিরোল যুদ্ধ বিমান সংযোজনের কথা উঠেছে। তবে এর মধ্যে শুধু ইউরোটাইফুনের ব্যাপারেই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকতার ব্যাপারটি দৃশ্যমান। এখন এসেছে জেএফ–১৭ থান্ডার বিষয়ক খবর। আসলে কোনটা কিনতে যাচ্ছে বাংলাদেশ বিমানবাহিনী? নাকি বহরে তিন ধরনের যুদ্ধ বিমানই সংযুক্ত হতে যাচ্ছে? পুরো ব্যাপারটি বিমানবাহিনী পরিস্কার না করলে আসলে চূড়ান্ত কিছুই বলা যাচ্ছে না।

যেটাই কেনা হোক বৈশ্বিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করাটাই মূল বিষয়। যেখানে ২৫ বছর ধরে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীতে কোনো মাল্টিরোল যুদ্ধবিমানের সংযোজন হয়নি, সেখানে এ মুহূর্তে উপযোগী সক্ষমতার যুদ্ধবিমান জরুরিই। তবে এক্ষেত্রে অবশ্যই বাংলাদেশ অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে আমলে নেওয়া উচিত বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তবে এটা ঠিক যে, জেএফ–১৭ থান্ডার যদি বাংলাদেশের বহরে যুক্ত হয়, সেটি উপমহাদেশের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বর্তমান চিত্র বদলে দেবে অনেকটাই।

সম্পর্কিত