Advertisement Banner

আমাদের দেশে হবে ‘ককরোচ পার্টি’ কবে?

আমাদের দেশে হবে ‘ককরোচ পার্টি’ কবে?
ককরোচ জনতা পার্টি। ছবি: সংগৃহীত

নর্দমা কিংবা ঘরের আবর্জনা থেকে উঠে আসা একটা ডানাওয়ালা পোকা হুট করে ড্রয়িংরুমের মাঝখানে উড়তে শুরু করলে যেভাবে পুরো ঘরে হুড়োহুড়ি পড়ে যায়, ভারতের রাজনীতিতে ঠিক সেই কাণ্ডটাই ঘটাল ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপি।

ভারতের প্রধান বিচারপতি যখন এক শুনানিতে ক্ষোভ উগরে দিয়ে বেকার যুবকদের ‘তেলাপোকা’ বা সমাজের ‘পরজীবী’র সঙ্গে তুলনা করলেন, তখন সেই যুবসমাজ দমে যায়নি। তারা সেই গালিটাকেই বাজপাখির মতো করে লুফে নিল। জন্ম হলো এক অদ্ভুত রাজনৈতিক ব্যঙ্গ আন্দোলনের–‘ককরোচ জনতা পার্টি’। আর এই নিয়েই গত কয়েক দিন ধরে তোলপাড় সংবাদমাধ্যম।

মাত্র কয়েক দিনে ইনস্টাগ্রামে কোটি কোটি তরুণের ভিড় জমিয়ে ‘তেলাপোকার’ ভার্চুয়াল দল পেছনে ফেলে দিয়েছিল খোদ ক্ষমতাসীন বিজেপিকে। যে তেলাপোকাকে পারমাণবিক বিস্ফোরণেও মরতে না পারার অদম্য সহনশীলতার প্রতীক ধরা হয়, সেই তেলাপোকার নামেই শুরু হলো রাষ্ট্র ব্যবস্থার পিলে চমকে দেওয়া এক ‘ডিজিটাল প্রতিরোধ’।

ভারতের জেন-জি বা তরুণ প্রজন্ম ‘মিম’ আর ‘স্যাটায়ারকে’ অস্ত্র বানিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করল বেকারত্ব আর প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো নির্মম বাস্তবতার বিরুদ্ধে।

ভারতের এই রাজনৈতিক দৃশ্যপট যখন ফেসবুক স্ক্রল কিংবা সংবাদমাধ্যমের খবরে দেখা দেয়, তখন বুকের ভেতর একটা প্রশ্ন আসে–বাংলাদেশে কেন এমন একটা ‘ককরোচ পার্টি’ নেই? কুসুমকুমারী দাশ ‘আদর্শ ছেলে’ কবিতায় বলেছিলেন, “আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে?”–এর আদলে বলতে ইচ্ছে করে, “আমাদের দেশে হবে ককরোচ পার্টি কবে?”

তুলনাটা যখন ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির, তখন একটা বড় ফারাক স্পষ্ট। ভারতের সিজেপি কিন্তু কোনো প্রথাগত বোমাবাজি বা রাজপথের রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের ফসল নয়। এটি ক্ষমতার অহংকারকে বুড়ো আঙুল দেখানো এক তুমুল সৃষ্টিশীল চপেটাঘাত।

রাষ্ট্র যখন সাধারণ মানুষকে নাগরিক না ভেবে অনুগত প্রজা ভাবতে শুরু করে, তখন ব্যঙ্গ বা কৌতুকই হয়ে ওঠে প্রতিবাদের সবচেয়ে ধারালো ভাষা।

ছবি: রয়টার্স
ছবি: রয়টার্স

আর নরেন্দ্র মোদির দল বিজেপি যখন একের পর এক রাজ্য পকেটে পুরে নিচ্ছে, জয়রথ থামানোর যখন কোনো শক্ত প্রতিপক্ষ নেই, একক দাপটে যখন ভারত কোণঠাসা, তখন এই ককরোচ পার্টিই তাদের পিলে চমকে দিয়েছে। এর প্রমাণ তো বিজেপির পরবর্তী কার্যক্রমেই।

বাংলাদেশে রাজনৈতিক বাস্তবতার দিকে তাকালে দেখা যায়, এখানকার তরুণদের ক্ষোভ, হতাশা বা অসন্তোষ প্রকাশের ভাষাটা বড্ড বেশি সংকুচিত, অথবা বড্ড বেশি মেরুকৃত। হয় চিরচেনা ভাঙচুর-জ্বালাওপোড়াওয়ের বৃত্তে ঢুকতে হয়, না হয় চায়ের কাপে তুফান তুলে ফেসবুকে ছদ্মনামে আক্ষেপ করতে হয়।

প্রশ্নপত্র ফাঁস, তীব্র কর্মসংস্থান সংকট কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতার অভাব– দেশের তরুণদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে যাওয়ার গল্পগুলো ভারতের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। এখন তো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও আর প্রতিবাদের হাতিয়ার হয়ে উঠছে না। কেননা একটি প্রতিবাদে ‘বট আইডি’ দিয়ে হাজারো পাল্টা আক্রমণ এখানে স্বাভাবিক হয়ে পড়েছে।

নানা কারণেই এই বিপুল অসন্তোষকে একটা অহিংস, বুদ্ধিদীপ্ত এবং ক্ষমতাকে নাড়িয়ে দেওয়ার মতো রাজনৈতিক স্যাটায়ারে রূপ দেওয়ার কোনো মঞ্চ আমাদের এখানে গড়ে ওঠেনি।

এক্ষেত্রে হয়তো অনেকে জুলাই আন্দোলনের কথা বলবেন। কিন্তু জুলাইয়ে ফসল কী? সেই উত্তর এতদিনে হয়তো সবাই জেনে-বুঝে গেছেন। ওই সময় তরুণদের তাজা প্রাণ আর বিপ্লবী চেতনা মসনদ থেকে ক্ষমতাসীনদের হটিয়ে দিলেও আজও ভালো নেই বাংলাদেশ। তা দেশের সামাজিক অবক্ষয় ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি দেখতে ভালো করেই বোঝা যায়।

ভারতের এই ‘ককরোচ পার্টি’ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনস্টাগ্রামে এক পোস্টে নিজেদের লক্ষ্যের কথা জানিয়ে দিয়েছে। পোস্টের শিরোনাম ‘ককরোচ বা তেলাপোকারা সবে যাত্রা শুরু করেছে’। তাদের লক্ষ্য, ভারত সরকারকে জবাবদিহির আওতায় আনা এবং তরুণদের কণ্ঠস্বরকে জোরালো করতে তরুণদের নেতৃত্বে একটি স্বাধীন আন্দোলন গড়ে তোলা।

পোস্টে আরও বলা হয়, ‘চরম প্রতিকূল অবস্থায়ও শেষ পর্যন্ত তেলাপোকা টিকে থাকতে পারে– অন্ধকার ফাঁকফোকরে দিব্যি বেঁচে থাকে এবং তাদের শেষ করার সব প্রচেষ্টাকেই তারা পেরিয়ে যায়। এ দেশে তরুণদের অনেকটা এমনই মনে হয়– অবহেলিত, অবমূল্যায়িত ও উপেক্ষিত, কিন্তু তবু কখনো তারা জীবনের আশা ছাড়েন না।’

বাংলাদেশেও আজ একটি ‘ককরোচ পার্টি’র তাগিদ তীব্র হয়ে উঠেছে। এর মানে এই নয় যে, নির্বাচন কমিশনে গিয়ে একটি নতুন রাজনৈতিক দল নিবন্ধন করতে হবে। এর মানে হলো, যুবসমাজের এমন একটি যৌথ প্ল্যাটফর্ম বা মনস্তাত্ত্বিক ফ্রন্ট দরকার, যা ভয়ের সংস্কৃতিকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে হাসতে হাসতে রাষ্ট্রকে আয়নায় নিজের মুখ দেখাতে পারবে। আর বাংলাদেশের দুর্নীতির চিত্র তো সবার জানা।

ভারতের ককরোচ পার্টির ঢেউ লেগেছে পাকিস্তানেও। ছবি: সংগৃহীত
ভারতের ককরোচ পার্টির ঢেউ লেগেছে পাকিস্তানেও। ছবি: সংগৃহীত

সেগুলো ধরে ধরে সবার সামনে ‘প্যানডোরার বাক্স’ খুলে দেওয়াই যেতে পারে। সে জন্য প্ল্যাটফর্মের কোনো অভাব হবে বলে মনে হয় না। এ দেশের মানুষ এমন প্রতিবাদ লুফে নেওয়ারই কথা।

আমাদের দেশেও যখন শিক্ষিত যুবকেরা চাকরির বাজারে হন্যে হয়ে ঘুরে ‘বেকার’ তকমা পায়, কিংবা যেকোনো যৌক্তিক অধিকারের কথা বলতে গেলে ‘উচ্ছৃঙ্খল’ বা ‘ষড়যন্ত্রকারী’ গালি শুনতে হয়, তখন সেই গালিটাকেই প্রতিবাদের ব্যানার বানিয়ে ফেলা দরকার।

তেলাপোকা যেমন সব প্রতিকূলতার মধ্যেও টিকে থাকে, তরুণদেরও ঠিক সেই নাছোড়বান্দা মনোভাব নিয়ে ‘সিস্টেমের’ অনিয়মের মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে। গাম্ভীর্যের খোলস পরা রাজনীতিকদের সবচেয়ে বড় ভয় হলো কৌতুক আর মিম।

কারণ বুলেটের জবাব বুলেট দিয়ে দেওয়া সহজ। কিন্তু তীক্ষ্ণ রসাত্মক ব্যঙ্গের সামনে ক্ষমতার অহংকার বড্ড অসহায়।

পত্রিকার পাতা খুললেই যখন আমরা দেখি ক্ষমতার চেয়ার আঁকড়ে থাকা চেনা মুখগুলোর গম্ভীর ও একঘেয়ে বাদানুবাদ, তখন তরুণ প্রজন্মের জন্য রাজনীতি বড্ড রসকষহীন আর ভয়ের জায়গা হয়ে ওঠে। আর রাজনীতি মানেই তো আজকাল তোয়াজ করে চলা, একসময় যা ছিল ‘সহমত ভাই’। এই বৃত্ত ভাঙতে পারে কেবল তরুণের নিজস্ব ভাষা।

ভারতের তরুণরা যদি কোটি কোটি ফলোয়ার নিয়ে শাসকদলকে ডিজিটাল আঙিনায় কাঁপিয়ে দিতে পারে, তবে বাংলাদেশের তরুণদেরও সেই সৃজনশীলতা ও সাহস রয়েছে। নর্দমার তেলাপোকা যেভাবে প্রাসাদের দেয়াল বেয়ে ড্রয়িংরুমে ঢুকে পড়ে শান্তিপ্রিয়দের অস্বস্তি বাড়িয়ে দেয়; ঠিক তেমনি তরুণের মিম, অ্যানিমেশন আর রাজনৈতিক রসিকতাও ঢুকে পড়া উচিত নীতিনির্ধারকদের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে সুস্থ, প্রাণবন্ত ও জবাবদিহিমূলক করতে এই মুহূর্তে রাজপথের স্লোগানের চেয়েও বেশি জরুরি ক্ষমতাকে উপহাস করার এক অভিনব সাহসের। দরকার একটা ‘ককরোচ পার্টির!

সম্পর্কিত