কাজী সাজিদুল হক

গত মে মাসে ভারতের একটি গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়, ভারত বাংলাদেশিদের জন্য ট্যুরিস্ট ভিসা এক মাসের মধ্যে চালু করবে। হলোও তাই। আজ বৃহস্পতিবার বাংলাদেশিদের জন্য ভারতের পর্যটন ভিসা আবারও চালুর ঘোষণা দিয়েছেন ঢাকায় নিযুক্ত নতুন ভারতীয় দূত দীনেশ ত্রিবেদী।
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের কাছে ক্রেডেনশিয়াল জমা দেওয়ার পরই ঢাকার ভারতীয় ভিসা সেন্টারে গিয়ে নতুন হাইকমিশনার ট্যুরিস্ট ভিসা চালুর ঘোষণা দিলেন।
ভারতের নানা পদক্ষেপ নিয়ে বাংলাদেশের মানুষদের বড় একটা অংশের মধ্যে অনেক প্রশ্ন আছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দিলে নয়াদিল্লির ওপর নারাজ হন অনেকে। সেই প্রেক্ষাপটে পরে ক্ষমতায় বসা অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক তলানিতে নামে।
গত বছরের ডিসেম্বরে ইনকিলাব মঞ্চের নেতা শরীফ ওসমান হাদির মৃত্যুর পর ১৮ ডিসেম্বর রাতে ঢাকায় প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার অফিস এবং ছায়ানট ভবনে হামলা হয়। ওই রাতে চট্টগ্রামে ভারতীয় সহকারী হাইকমিশন কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ দেখায় একদল মানুষ, সে সময় মিশনে ঢিলও ছোড়া হয়।
এসব ঘটনায় টানাপোড়েন আরও বাড়ে। ভারতে বাংলাদেশের কয়েকটি মিশনের সামনে বিক্ষোভ হয়। দিল্লি ও আগরতলা মিশন থেকে ভিসা এবং কনস্যুলার সেবা স্থগিত রাখার ঘোষণা দেয় বাংলাদেশ।
মুহাম্মদ ইউনূসের সরকারের সময় দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের ভারত নিয়ে নানা বক্তব্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ভারতীয় গণমাধ্যমে উগ্র নানা আলোচনা দেখে মনে হয় ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের যুদ্ধ চলছে যেন।

প্রবাদ আছে, “রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয়, উলুখাগড়ার প্রাণ যায়।” এই উলুখাগড়া যে সাধারণ মানুষ, সেটা বলা বাহুল্য। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক গত দুই বছর যে জায়গায় গিয়েছিল, তার আঁচ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খুব দেখা গিয়েছিল। দুই পক্ষেরই কিছু মানুষের উগ্র ভাবনার আঁচ ভালোই টের পাওয়া গিয়েছিল গণমাধ্যমেও।
কিন্তু ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক; অর্থাৎ কূটনৈতিক সম্পর্কের বাইরেও একটা বিষয় আছে। সেটা হচ্ছে বাংলাভাষীদের মধ্যকার সম্পর্ক। সংস্কৃতির অনেক উপাদানে একই আবেগ ধারণ করে এই দুই পক্ষ।
ট্যুরিস্ট ভিসা চালুর খবরে অনেকেই উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন। অবশ্য কেউ কেউ বিভিন্ন গণমাধ্যমের ভিডিওর নিচে উগ্র ভাবনা লিখে প্রকাশ করেনি–এমন নয়।
গত ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পায় বিএনপি। বাংলাদেশে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতা নেওয়ার পর উভয় দেশ ভিসা কার্যক্রম আবার স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেয়। টানা দুই মাস ভিসা কার্যক্রম বন্ধ রাখার পর বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার তিন দিনের মাথায় ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে সব ধরনের ভিসা দেওয়া শুরু করে দিল্লির বাংলাদেশ হাইকমিশন।
এরপর ভারতের ভিসা কার্যক্রম স্বাভাবিক করার বিষয়েও আলোচনা শুরু হয়। দ্য হিন্দু বিজনেস লাইনের খবরে বলা হয়েছিল, গত এপ্রিলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের দিল্লি সফর দুই সরকারের মধ্যে জমে থাকা বরফ গলানোর কাজ করেছে। ঢাকার বড় ধনের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সেটাই ছিল প্রথম উচ্চপর্যায়ের কোনো বৈঠক।
২০২৪ সালের আগস্টের আগপর্যন্ত বাংলাদেশিদের জন্য ভারত প্রতিদিন প্রায় ৬ থেকে ৭ হাজার ভিসা ইস্যু করত, যা ২০২৬ সালের শুরুর দিকে কমে প্রতিদিন এক থেকে দেড় হাজারে নেমে আসে। চিকিৎসা এবং অন্যান্য জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ভিসা দেওয়া বন্ধ করে দেয় দিল্লি।
এসব সিদ্ধান্ত সবই সরকারি পর্যায়ের। তাতে সমস্যায় পড়ে সাধারণ মানুষ। যাদের বিভিন্ন প্রয়োজনে ভারত যেতে হয়, তারা সবচেয়ে বিপাকে পড়ে। আর পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় বিপাকে পড়ে নিউমার্কেট এলাকার ব্যবসায়ীরা। কারণ, ওই এলাকায় বাংলাদেশিদের ভিড় থাকে সবচেয়ে বেশি। এটাকে ঘিরে স্থানীয় একটি অর্থনীতি গড়ে উঠেছে। এ নিয়ে দুই দেশের গণমাধ্যমেও নানা প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে।
বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আমরা এও শুনেছি, ঢাকা থেকে রিকশা চালিয়ে গিয়ে কলকাতা নাকি দখল করা হবে। ইউরেনিয়াম নিয়ে হাস্যকর কথার বিষয়টি নতুন করে বলার বোধহয় দরকার নেই।

পুরো বিষয়টির দিকে যদি দেখা হয়, তাহলে বোঝা যাবে ভারত ও বাংলাদেশ নিয়ে দুই পক্ষে যত কথা হয়েছে, সবই ক্ষমতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা দলের। সাধারণ মানুষের সেখানে কোনো ধরনের অংশ নেই। অর্থাৎ, উলুখাগড়াদের সম্পর্কই নেই রাজার সঙ্গে।
দুটি দেশের মধ্যে সম্পর্কের সবচেয়ে বড় দিক হচ্ছে মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক। সেই সম্পর্ক শক্তিশালী হয় যাতায়াতের মাধ্যমে। সামনাসামনি কথা না হলে মনোভাব বোঝা অনেক ক্ষেত্রে কঠিন হয়ে পড়ে। সেজন্যই দুই দেশের মানুষের সঙ্গে সম্পর্কটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। ভিসা চালু হওয়ায় এই সম্পর্ক বাড়বে বৈ কমবে না। তবে একটা বিষয় খেয়াল রাখতে হবে, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের জট খুলতে শুরু করেছে রাজনৈতিক সরকারের সময়ে। জনগণের ভোটে নির্বাচিত বিএনপি দেশের ক্ষমতায় বসে প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সম্পর্ক সহজ করার উদ্যোগ নেয়। ভারতও এগিয়ে আসে। কারণ, তাদেরও স্বার্থ আছে। অর্থাৎ, রাজনীতি এখানে খুব গুরুত্বপূর্ণ। আর সেই রাজনীতি হচ্ছে জনসম্পৃক্ত রাজনীতি। অরাজনৈতিক চেহারা নিয়ে অন্য কারও উদ্দেশ্য সফল করার রাজনীতি জনগণের বিপক্ষে কাজ করে সবসময়।
লেখক: জ্যেষ্ঠ যুগ্ম বার্তা সম্পাদক, চরচা

গত মে মাসে ভারতের একটি গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়, ভারত বাংলাদেশিদের জন্য ট্যুরিস্ট ভিসা এক মাসের মধ্যে চালু করবে। হলোও তাই। আজ বৃহস্পতিবার বাংলাদেশিদের জন্য ভারতের পর্যটন ভিসা আবারও চালুর ঘোষণা দিয়েছেন ঢাকায় নিযুক্ত নতুন ভারতীয় দূত দীনেশ ত্রিবেদী।
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের কাছে ক্রেডেনশিয়াল জমা দেওয়ার পরই ঢাকার ভারতীয় ভিসা সেন্টারে গিয়ে নতুন হাইকমিশনার ট্যুরিস্ট ভিসা চালুর ঘোষণা দিলেন।
ভারতের নানা পদক্ষেপ নিয়ে বাংলাদেশের মানুষদের বড় একটা অংশের মধ্যে অনেক প্রশ্ন আছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দিলে নয়াদিল্লির ওপর নারাজ হন অনেকে। সেই প্রেক্ষাপটে পরে ক্ষমতায় বসা অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক তলানিতে নামে।
গত বছরের ডিসেম্বরে ইনকিলাব মঞ্চের নেতা শরীফ ওসমান হাদির মৃত্যুর পর ১৮ ডিসেম্বর রাতে ঢাকায় প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার অফিস এবং ছায়ানট ভবনে হামলা হয়। ওই রাতে চট্টগ্রামে ভারতীয় সহকারী হাইকমিশন কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ দেখায় একদল মানুষ, সে সময় মিশনে ঢিলও ছোড়া হয়।
এসব ঘটনায় টানাপোড়েন আরও বাড়ে। ভারতে বাংলাদেশের কয়েকটি মিশনের সামনে বিক্ষোভ হয়। দিল্লি ও আগরতলা মিশন থেকে ভিসা এবং কনস্যুলার সেবা স্থগিত রাখার ঘোষণা দেয় বাংলাদেশ।
মুহাম্মদ ইউনূসের সরকারের সময় দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের ভারত নিয়ে নানা বক্তব্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ভারতীয় গণমাধ্যমে উগ্র নানা আলোচনা দেখে মনে হয় ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের যুদ্ধ চলছে যেন।

প্রবাদ আছে, “রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয়, উলুখাগড়ার প্রাণ যায়।” এই উলুখাগড়া যে সাধারণ মানুষ, সেটা বলা বাহুল্য। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক গত দুই বছর যে জায়গায় গিয়েছিল, তার আঁচ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খুব দেখা গিয়েছিল। দুই পক্ষেরই কিছু মানুষের উগ্র ভাবনার আঁচ ভালোই টের পাওয়া গিয়েছিল গণমাধ্যমেও।
কিন্তু ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক; অর্থাৎ কূটনৈতিক সম্পর্কের বাইরেও একটা বিষয় আছে। সেটা হচ্ছে বাংলাভাষীদের মধ্যকার সম্পর্ক। সংস্কৃতির অনেক উপাদানে একই আবেগ ধারণ করে এই দুই পক্ষ।
ট্যুরিস্ট ভিসা চালুর খবরে অনেকেই উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন। অবশ্য কেউ কেউ বিভিন্ন গণমাধ্যমের ভিডিওর নিচে উগ্র ভাবনা লিখে প্রকাশ করেনি–এমন নয়।
গত ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পায় বিএনপি। বাংলাদেশে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতা নেওয়ার পর উভয় দেশ ভিসা কার্যক্রম আবার স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেয়। টানা দুই মাস ভিসা কার্যক্রম বন্ধ রাখার পর বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার তিন দিনের মাথায় ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে সব ধরনের ভিসা দেওয়া শুরু করে দিল্লির বাংলাদেশ হাইকমিশন।
এরপর ভারতের ভিসা কার্যক্রম স্বাভাবিক করার বিষয়েও আলোচনা শুরু হয়। দ্য হিন্দু বিজনেস লাইনের খবরে বলা হয়েছিল, গত এপ্রিলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের দিল্লি সফর দুই সরকারের মধ্যে জমে থাকা বরফ গলানোর কাজ করেছে। ঢাকার বড় ধনের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সেটাই ছিল প্রথম উচ্চপর্যায়ের কোনো বৈঠক।
২০২৪ সালের আগস্টের আগপর্যন্ত বাংলাদেশিদের জন্য ভারত প্রতিদিন প্রায় ৬ থেকে ৭ হাজার ভিসা ইস্যু করত, যা ২০২৬ সালের শুরুর দিকে কমে প্রতিদিন এক থেকে দেড় হাজারে নেমে আসে। চিকিৎসা এবং অন্যান্য জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ভিসা দেওয়া বন্ধ করে দেয় দিল্লি।
এসব সিদ্ধান্ত সবই সরকারি পর্যায়ের। তাতে সমস্যায় পড়ে সাধারণ মানুষ। যাদের বিভিন্ন প্রয়োজনে ভারত যেতে হয়, তারা সবচেয়ে বিপাকে পড়ে। আর পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় বিপাকে পড়ে নিউমার্কেট এলাকার ব্যবসায়ীরা। কারণ, ওই এলাকায় বাংলাদেশিদের ভিড় থাকে সবচেয়ে বেশি। এটাকে ঘিরে স্থানীয় একটি অর্থনীতি গড়ে উঠেছে। এ নিয়ে দুই দেশের গণমাধ্যমেও নানা প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে।
বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আমরা এও শুনেছি, ঢাকা থেকে রিকশা চালিয়ে গিয়ে কলকাতা নাকি দখল করা হবে। ইউরেনিয়াম নিয়ে হাস্যকর কথার বিষয়টি নতুন করে বলার বোধহয় দরকার নেই।

পুরো বিষয়টির দিকে যদি দেখা হয়, তাহলে বোঝা যাবে ভারত ও বাংলাদেশ নিয়ে দুই পক্ষে যত কথা হয়েছে, সবই ক্ষমতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা দলের। সাধারণ মানুষের সেখানে কোনো ধরনের অংশ নেই। অর্থাৎ, উলুখাগড়াদের সম্পর্কই নেই রাজার সঙ্গে।
দুটি দেশের মধ্যে সম্পর্কের সবচেয়ে বড় দিক হচ্ছে মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক। সেই সম্পর্ক শক্তিশালী হয় যাতায়াতের মাধ্যমে। সামনাসামনি কথা না হলে মনোভাব বোঝা অনেক ক্ষেত্রে কঠিন হয়ে পড়ে। সেজন্যই দুই দেশের মানুষের সঙ্গে সম্পর্কটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। ভিসা চালু হওয়ায় এই সম্পর্ক বাড়বে বৈ কমবে না। তবে একটা বিষয় খেয়াল রাখতে হবে, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের জট খুলতে শুরু করেছে রাজনৈতিক সরকারের সময়ে। জনগণের ভোটে নির্বাচিত বিএনপি দেশের ক্ষমতায় বসে প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সম্পর্ক সহজ করার উদ্যোগ নেয়। ভারতও এগিয়ে আসে। কারণ, তাদেরও স্বার্থ আছে। অর্থাৎ, রাজনীতি এখানে খুব গুরুত্বপূর্ণ। আর সেই রাজনীতি হচ্ছে জনসম্পৃক্ত রাজনীতি। অরাজনৈতিক চেহারা নিয়ে অন্য কারও উদ্দেশ্য সফল করার রাজনীতি জনগণের বিপক্ষে কাজ করে সবসময়।
লেখক: জ্যেষ্ঠ যুগ্ম বার্তা সম্পাদক, চরচা