আরমান ভূঁইয়া

সত্তরোর্ধ্ব সামছুর গাজী সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার একজন ভূমিহীন বাসিন্দা। তার স্ত্রী হাসিনা বিবি (৫৫) জরায়ু ক্যানসারে আক্রান্ত। চিকিৎসার জন্য গত তিন মাস ধরে ঢাকার জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সামনে খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাচ্ছেন এই বৃদ্ধ দম্পতি। টাকার অভাবে থমকে আছে চিকিৎসা।
গত ১৬ এপ্রিল দুপুরে হাসপাতালের সামনে চট বিছিয়ে বসে থাকতে দেখা যায় সামছুরকে। হাতে কাগজপত্র, চোখে অশ্রু। তিনি জানান, গত বছরের ডিসেম্বরে তাদের একমাত্র সম্বল ভাঙা ঘরটি পাঁচ হাজার টাকায় বিক্রি করে স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য ঢাকায় আসেন। প্রথমে জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে যান। সেখানে চিকিৎসা নেওয়ার পর চিকিৎসকের পরামর্শে গত ১ জানুয়ারি ক্যানসার হাসপাতালে ভর্তি করেন স্ত্রী হাসিনাকে। প্রায় ১৫ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর অর্থাভাবে তা বন্ধ হয়ে যায়।
চিকিৎসকরা হাসিনাকে কেমোথেরাপি নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তবে প্রয়োজনীয় ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে হবে, যা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। সামছুর বলেন, “জীবনে কোনো টাকা জমাতি পারিনি। অনেক কষ্টে পাঁচ মেয়ে ও এক ছেলেকে বিয়ে দিছি। ছেলেও অন্যের বাড়িতে কাজ করে। এখানে এক বেলা খালি (খেলে) আরেক বেলা না খেয়ি থাকি। ওষুধ কিনার টাকা পাব কনতে?”
প্রতি দিন শতশত ক্যানসার রোগী হাসপাতালের এ প্রান্ত-ও প্রান্তে ছুটছে। তবুও মিলছে না আশানুরূপ চিকিৎসা। সরেজমিনে দেখা যায়, হাসপাতালের ডি-ব্লকের নিচতলায় শতাধিক রোগী কেমো কিংবা রেডিওথেরাপি জন্য লাইন ধরে দাঁড়িয়ে আছে। ডাক্তার এক-দুই মাস এমনকি কোনো কোনো রোগীকে এক বছর পরও সিরিয়াল দিচ্ছেন। অথচ ওই রোগী ছয় মাস বাঁচবেন কি না, তার নিশ্চয়তা নেই।
ষাটোর্ধ্ব হোসনে আরা বেগম জরায়ু ও ব্রেইন ক্যানসারে আক্রান্ত। তার চিকিৎসার জন্য দ্রুত কেমো ও রেডিওথেরাপি দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসারা। অথচ গত আট মাস ধরে হাসপাতালের বারান্দায় ঘুরছেন তিনি। কিন্তু সিরিয়াল মেলেনি।
হোসনে আরার ছেলে সিরাজুল ইসলাম চরচাকে বলেন, “ডাক্তাররা মাকে ৩৫টি রেডিওথেরাপি ও ১০ রাউন্ড কেমোথেরাপি দিতে বলছে। বাইরে থেকে কয়েক রাউন্ড কেমোথেরাপি দিছি। অনেক টাকা লাগছে। আমাদের কাছে আর টাকা নাই। এখন পর্যন্ত ছয়বার সিরিয়ালের জন্য হাসপাতালে আসছি। আবার ১৫ দিন পর আসতে বলছে।”
হোসনে আরা বা হাসিনা বিবি–দুটি নাম শুধু। শত শত রোগীর অবস্থা এমনই। ক্যানসার আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিতে গিয়ে বিশেষায়িত এই হাসপাতালে গিয়ে ধুঁকতে হচ্ছে তাদের। এখানেই শেষ নয়। অবকাঠামো থেকে শুরু করে জনবল, দরকারি পরীক্ষা সরঞ্জাম সব মিলিয়ে হাসপাতালটি নিজেই রয়েছে মৃত্যুশয্যায়। সংকটের ফিরিস্তি নিতে গেলে পাতা ভরে যাচ্ছে। কিন্তু কে রক্ষা করবে–তার হদিস পাওয়া মুশকিল।
ক্যানসার আক্রান্ত রোগীদের জন্য দেশে একমাত্র সরকারি ও বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান ‘জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল’। ৫০০ শয্যার এই হাসপাতালে সাতটি রেডিওথেরাপি মেশিনের মধ্যে পাঁচটিই নষ্ট। দুই মেশিনে গড়ে এক শ’র কম থেরাপি দেওয়া যায়। অন্যদিকে ওষুধের স্বল্পতায় কেমোথেরাপি প্রায় বন্ধ। কেমোথেরাপির জন্য হাসপাতালে প্রয়োজনীয় ওষুধ না থাকায় বিনা মূল্যে চিকিৎসা পাচ্ছে না রোগীরা। থেরাপির জন্য প্রায় ছয় হাজার রোগী হাসপাতালে অপেক্ষায় রয়েছে। অনেক রোগী বাইরে থেকে ওষুধ কিনে কেমোথেরাপি দেওয়ার সুযোগ পেলেও বেশির ভাগ রোগীর পক্ষে তা সম্ভব হচ্ছে না।

এ ছাড়া হাসপাতালে রি-এজেন্ট না থাকায় গত চার মাস ধরে ক্যানসার নির্ণয়ের প্রধান প্রধান পরীক্ষা-নিরীক্ষাও বন্ধ রয়েছে। ফলে বাইরে থেকে পরীক্ষা করেও বিপাকে পড়ছেন রোগীরা। চিকিৎসার অভাবে হাসপাতালেই প্রতিদিন মৃত্যু হচ্ছে অন্তত দুজনের। বিশেষায়িত হাসপাতালটি যেন নিজেই ধুঁকছে চিকিৎসা সংকটে।
হাসপাতালটিতে প্রতিদিন চিকিৎসা নিতে আসেন এক হাজারের বেশি রোগী। তবে এই সেবা দুপুরের পরই থেমে যায়। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ক্যানসার আক্রান্ত রোগীরা চিকিৎসা না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরে যান। বিত্তহীন অনেক রোগীকে দুপুরের পরই হাসপাতালের সামনে চট বিছিয়ে পরদিনের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। অন্তত একবার থেরাপি দেওয়ার জন্য তাদের এই অপেক্ষা। আর এই সুযোগে উন্নত চিকিৎসার নামে বিভিন্ন ক্লিনিকে নিয়ে বেশি দামে থেরাপি নিতে প্রলুব্ধ করে দালালরা।
ক্যানসার বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা গ্লোবক্যানের সর্বশেষ তথ্য বলছে, বর্তমানে বাংলাদেশে ক্যানসার রোগীর সংখ্যা ১৩ থেকে ১৫ লাখ। প্রতি বছর নতুন করে প্রায় দুই লাখ মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে এবং প্রতিদিন গড়ে প্রায় তিন শতাধিক মানুষ মারা যাচ্ছে।
জাতীয় ক্যানসার হাসপাতালের ২০২৫ সালের তথ্য বলছে, ওই বছর হাসপাতালের বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছে তিন লাখ ১৪ হাজার ৬০৯ জন রোগী। এ সময় জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছে ১১ হাজার ৪৯২ জন। এর মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছে ১৫ হাজার ২৫৪ জন। চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছে ৬১৫ জন। অর্থাৎ, গড়ে দৈনিক দুজন রোগী মারা গেছে।
হাসপাতালের তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে হাসপাতালে ৩ হাজার ২৬০ জন রোগীর অস্ত্রোপচার হয়েছে। হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটার রয়েছে পাঁচটি। যদিও বছরে প্রায় ছয় হাজার রোগীর অস্ত্রোপচারের সক্ষমতা রয়েছে হাসপাতালটির।
গত বছর বিভিন্ন ধরনের ক্যানসার রোগীকে ১ লাখ ১৭ হাজার ১৮১টি কেমোথেরাপি দেওয়া হয়। যেখানে প্রতিটি ক্যানসার রোগীকে গড়ে ১০ থেকে ১৫টি কেমোথেরাপি দিতে হয় বলে জানিয়েছে চিকিৎসকরা। এ ছাড়া ২০২৫ সালে মাত্র ৭৯৬টি ব্র্যাকিথেরাপি ও ১৯ হাজার ৮৯২টি রেডিওথেরাপি দেওয়া হয়েছে। যেখানে একজন রোগীর জন্য গড়ে ১৫ থেকে ৩৫টি রেডিওথেরাপি দেওয়া প্রয়োজন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে হাসপাতালের এক চিকিৎসক বলেন, “আমাদের তিনটি ইউনিট মিলিয়ে বর্তমানে প্রায় ৫ হাজার ৬০০-এর বেশি রোগী ওয়েটিং লিস্টে রয়েছে। অথচ মেশিন ক্যাপাসিটি মাত্র দেড় শ’র মতো। দুটি মেশিন দিয়ে প্রতিদিন সর্বোচ্চ ১০টি করে সেশন পরিচালনা করা যায়। যদি আরো পাঁচটি মেশিন যোগ করা হয়, তবুও বর্তমান গতিতে রোগীদের ২০২৭ সাল পর্যন্ত তারিখ দিতে হচ্ছে। কিন্তু ক্যানসার রোগী কি এতদিন অপেক্ষা করতে পারবেন?”
সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত হাসপাতালের ডি-ব্লকের বহির্বিভাগে রোগী দেখেন চিকিৎসকরা। এরপর আবার পরদিনের জন্য অপেক্ষায় থাকে শত শত রোগী। হাসপাতালের শুধু চিকিৎসা ব্যবস্থার ঘাটতিই নয়–রয়েছে অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ, শয্যার ঘাটতি, চিকিৎসক, নার্স ও স্টাফের স্বল্পতা, এমনকি পরীক্ষা-নিরীক্ষার অভাব।

হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে এই হাসপাতালে প্রায় ৫০টির বেশি পরীক্ষা করা যাচ্ছে। তবে ক্যানসার নির্ণয়ের জন্য যেসব পরীক্ষা বেশি প্রয়োজন, বিশেষ করে AFP, Anti HCV- IM, CA-125, AC-15-3, AC-19-9, CEA, FT4, HBsAg(lm), PSA, TSH, Serum-hCG অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও গত চার মাস ধরে তা বন্ধ রয়েছে।
হাসপাতালের অনাক্রম্য বিজ্ঞান ও আণবিক জীববিজ্ঞান বিভাগের মেডিকেল টেকনোলজিস্ট মো. ফরহাদ চরচাকে বলেন, “এসব টেস্ট করার জন্য যেসব রি-এজেন্ট প্রয়োজন তা না থাকায় গত ১৫ জানুয়ারি থেকে এসব টেস্ট বন্ধ রয়েছে।”
হাসপাতালের পরীক্ষা-নিরীক্ষা বিভাগে কর্মরত এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “প্রত্যেক রোগীকে চিকিৎসার জন্য বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার পাশাপাশি ইকো টেস্ট দেওয়া হয়। অথচ এই হাসপাতালে ইকো এবং এমআরআই টেস্ট নেই।”
রি-এজেন্ট (ওষুধ) সংকটে কেমোথেরাপি ও ক্যানসারের গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রায় বন্ধ রয়েছে-বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী চরচাকে বলেন, “এ বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে ইতোমধ্যে আলোচনা হয়েছে। আশা করছি, খুব শিগগিরই অর্থ ছাড়ের মাধ্যমে রি-এজেন্ট সংকটের সমাধান হবে।”
চিকিৎসক ও দক্ষ জনবলের ঘাটতির কথাও বলছেন হাসপাতালে সংশ্লিষ্টরা। বর্তমানে হাসপাতালে কর্মরত চিকিৎসক রয়েছে ১৯৮ জন, শূন্য পদ রয়েছে ৪২টি। নার্স রয়েছে ৫৭৪ জন, আর মেডিকেল টেকনোলজি ও স্টাফ রয়েছে ২০৯ জন এবং আউটসোর্সিংয়ে রয়েছে ১১৯ জন কর্মী।
হাসপাতালের মোট জনবল দিয়ে এই ধরনের বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান চালানো ‘কঠিন’ বলে মন্তব্য করেছেন প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. মোস্তফা আজিজ সুমন।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন অনুবিভাগ) মনোয়ারা ইশরাত চরচাকে চলেন, “হাসপাতালের অন্যান্য বিষয় আমার জানা নেই। তবে জনবল সংকট নিরসনে আমরা কাজ করছি। জনপ্রশাসন বিভাগের মাধ্যমে জনবল বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।”
পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. মোস্তফা আজিজ চরচাকে বলেন, “এটি দেশের একমাত্র বিশেষায়িত ক্যানসার হাসপাতাল। এখানে প্রতিদিন অন্তত এক হাজারের বেশি রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। তারা সবাই বিভিন্নভাবে ক্যানসার আক্রান্ত। দেশে প্রতিদিন মানুষ যে হারে ক্যানসারে আক্রান্ত হচ্ছে, তাতে দুই হাজার শয্যার প্রয়োজন।”

গত তিন মাস ধরে হাসপাতালে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা-নিরীক্ষা বন্ধ, কেমোথেরাপি হচ্ছে না, রেডিওথেরাপির মেশিন নষ্ট। তাহলে চিকিৎসা সেবা কীভাবে চলছে জানতে চাইলে পরিচালক মোস্তফা আজিজ বলেন, “হাসপাতালে মেডিসিন কেনার জন্য যে বাজেট আসে, তাতে দুই মাসের বেশি চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব নয়। বিষয়টি নিয়ে আমরা স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। সমাধান বের করার চেষ্টা চলছে।”
পরিচালক জানান, হাসপাতালটিতে প্রায় ২০ বছর আগে রেডিওথেরাপির মেশিন আসে। একটি মেশিনের মেয়াদ থাকে গড়ে ১০ বছর। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নতুন করে আরো দুটি মেশিন দেওয়া হয়। তিনি বলেন, “চাইলেই রাতারাতি এসব মেশিন স্থাপন করা সম্ভব নয়। এগুলোর সেটআপ প্রক্রিয়া অনেক জটিল। তাই দ্রুত সমাধানের জন্য আমরা থেরাপি বিভাগে তিনটি শিফট চালুর উদ্যোগ নিচ্ছি। এতে প্রতিদিন আরও বেশি রোগীকে থেরাপির দেওয়া যাবে।”

সত্তরোর্ধ্ব সামছুর গাজী সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার একজন ভূমিহীন বাসিন্দা। তার স্ত্রী হাসিনা বিবি (৫৫) জরায়ু ক্যানসারে আক্রান্ত। চিকিৎসার জন্য গত তিন মাস ধরে ঢাকার জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সামনে খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাচ্ছেন এই বৃদ্ধ দম্পতি। টাকার অভাবে থমকে আছে চিকিৎসা।
গত ১৬ এপ্রিল দুপুরে হাসপাতালের সামনে চট বিছিয়ে বসে থাকতে দেখা যায় সামছুরকে। হাতে কাগজপত্র, চোখে অশ্রু। তিনি জানান, গত বছরের ডিসেম্বরে তাদের একমাত্র সম্বল ভাঙা ঘরটি পাঁচ হাজার টাকায় বিক্রি করে স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য ঢাকায় আসেন। প্রথমে জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে যান। সেখানে চিকিৎসা নেওয়ার পর চিকিৎসকের পরামর্শে গত ১ জানুয়ারি ক্যানসার হাসপাতালে ভর্তি করেন স্ত্রী হাসিনাকে। প্রায় ১৫ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর অর্থাভাবে তা বন্ধ হয়ে যায়।
চিকিৎসকরা হাসিনাকে কেমোথেরাপি নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তবে প্রয়োজনীয় ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে হবে, যা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। সামছুর বলেন, “জীবনে কোনো টাকা জমাতি পারিনি। অনেক কষ্টে পাঁচ মেয়ে ও এক ছেলেকে বিয়ে দিছি। ছেলেও অন্যের বাড়িতে কাজ করে। এখানে এক বেলা খালি (খেলে) আরেক বেলা না খেয়ি থাকি। ওষুধ কিনার টাকা পাব কনতে?”
প্রতি দিন শতশত ক্যানসার রোগী হাসপাতালের এ প্রান্ত-ও প্রান্তে ছুটছে। তবুও মিলছে না আশানুরূপ চিকিৎসা। সরেজমিনে দেখা যায়, হাসপাতালের ডি-ব্লকের নিচতলায় শতাধিক রোগী কেমো কিংবা রেডিওথেরাপি জন্য লাইন ধরে দাঁড়িয়ে আছে। ডাক্তার এক-দুই মাস এমনকি কোনো কোনো রোগীকে এক বছর পরও সিরিয়াল দিচ্ছেন। অথচ ওই রোগী ছয় মাস বাঁচবেন কি না, তার নিশ্চয়তা নেই।
ষাটোর্ধ্ব হোসনে আরা বেগম জরায়ু ও ব্রেইন ক্যানসারে আক্রান্ত। তার চিকিৎসার জন্য দ্রুত কেমো ও রেডিওথেরাপি দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসারা। অথচ গত আট মাস ধরে হাসপাতালের বারান্দায় ঘুরছেন তিনি। কিন্তু সিরিয়াল মেলেনি।
হোসনে আরার ছেলে সিরাজুল ইসলাম চরচাকে বলেন, “ডাক্তাররা মাকে ৩৫টি রেডিওথেরাপি ও ১০ রাউন্ড কেমোথেরাপি দিতে বলছে। বাইরে থেকে কয়েক রাউন্ড কেমোথেরাপি দিছি। অনেক টাকা লাগছে। আমাদের কাছে আর টাকা নাই। এখন পর্যন্ত ছয়বার সিরিয়ালের জন্য হাসপাতালে আসছি। আবার ১৫ দিন পর আসতে বলছে।”
হোসনে আরা বা হাসিনা বিবি–দুটি নাম শুধু। শত শত রোগীর অবস্থা এমনই। ক্যানসার আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিতে গিয়ে বিশেষায়িত এই হাসপাতালে গিয়ে ধুঁকতে হচ্ছে তাদের। এখানেই শেষ নয়। অবকাঠামো থেকে শুরু করে জনবল, দরকারি পরীক্ষা সরঞ্জাম সব মিলিয়ে হাসপাতালটি নিজেই রয়েছে মৃত্যুশয্যায়। সংকটের ফিরিস্তি নিতে গেলে পাতা ভরে যাচ্ছে। কিন্তু কে রক্ষা করবে–তার হদিস পাওয়া মুশকিল।
ক্যানসার আক্রান্ত রোগীদের জন্য দেশে একমাত্র সরকারি ও বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান ‘জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল’। ৫০০ শয্যার এই হাসপাতালে সাতটি রেডিওথেরাপি মেশিনের মধ্যে পাঁচটিই নষ্ট। দুই মেশিনে গড়ে এক শ’র কম থেরাপি দেওয়া যায়। অন্যদিকে ওষুধের স্বল্পতায় কেমোথেরাপি প্রায় বন্ধ। কেমোথেরাপির জন্য হাসপাতালে প্রয়োজনীয় ওষুধ না থাকায় বিনা মূল্যে চিকিৎসা পাচ্ছে না রোগীরা। থেরাপির জন্য প্রায় ছয় হাজার রোগী হাসপাতালে অপেক্ষায় রয়েছে। অনেক রোগী বাইরে থেকে ওষুধ কিনে কেমোথেরাপি দেওয়ার সুযোগ পেলেও বেশির ভাগ রোগীর পক্ষে তা সম্ভব হচ্ছে না।

এ ছাড়া হাসপাতালে রি-এজেন্ট না থাকায় গত চার মাস ধরে ক্যানসার নির্ণয়ের প্রধান প্রধান পরীক্ষা-নিরীক্ষাও বন্ধ রয়েছে। ফলে বাইরে থেকে পরীক্ষা করেও বিপাকে পড়ছেন রোগীরা। চিকিৎসার অভাবে হাসপাতালেই প্রতিদিন মৃত্যু হচ্ছে অন্তত দুজনের। বিশেষায়িত হাসপাতালটি যেন নিজেই ধুঁকছে চিকিৎসা সংকটে।
হাসপাতালটিতে প্রতিদিন চিকিৎসা নিতে আসেন এক হাজারের বেশি রোগী। তবে এই সেবা দুপুরের পরই থেমে যায়। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ক্যানসার আক্রান্ত রোগীরা চিকিৎসা না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরে যান। বিত্তহীন অনেক রোগীকে দুপুরের পরই হাসপাতালের সামনে চট বিছিয়ে পরদিনের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। অন্তত একবার থেরাপি দেওয়ার জন্য তাদের এই অপেক্ষা। আর এই সুযোগে উন্নত চিকিৎসার নামে বিভিন্ন ক্লিনিকে নিয়ে বেশি দামে থেরাপি নিতে প্রলুব্ধ করে দালালরা।
ক্যানসার বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা গ্লোবক্যানের সর্বশেষ তথ্য বলছে, বর্তমানে বাংলাদেশে ক্যানসার রোগীর সংখ্যা ১৩ থেকে ১৫ লাখ। প্রতি বছর নতুন করে প্রায় দুই লাখ মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে এবং প্রতিদিন গড়ে প্রায় তিন শতাধিক মানুষ মারা যাচ্ছে।
জাতীয় ক্যানসার হাসপাতালের ২০২৫ সালের তথ্য বলছে, ওই বছর হাসপাতালের বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছে তিন লাখ ১৪ হাজার ৬০৯ জন রোগী। এ সময় জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছে ১১ হাজার ৪৯২ জন। এর মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছে ১৫ হাজার ২৫৪ জন। চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছে ৬১৫ জন। অর্থাৎ, গড়ে দৈনিক দুজন রোগী মারা গেছে।
হাসপাতালের তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে হাসপাতালে ৩ হাজার ২৬০ জন রোগীর অস্ত্রোপচার হয়েছে। হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটার রয়েছে পাঁচটি। যদিও বছরে প্রায় ছয় হাজার রোগীর অস্ত্রোপচারের সক্ষমতা রয়েছে হাসপাতালটির।
গত বছর বিভিন্ন ধরনের ক্যানসার রোগীকে ১ লাখ ১৭ হাজার ১৮১টি কেমোথেরাপি দেওয়া হয়। যেখানে প্রতিটি ক্যানসার রোগীকে গড়ে ১০ থেকে ১৫টি কেমোথেরাপি দিতে হয় বলে জানিয়েছে চিকিৎসকরা। এ ছাড়া ২০২৫ সালে মাত্র ৭৯৬টি ব্র্যাকিথেরাপি ও ১৯ হাজার ৮৯২টি রেডিওথেরাপি দেওয়া হয়েছে। যেখানে একজন রোগীর জন্য গড়ে ১৫ থেকে ৩৫টি রেডিওথেরাপি দেওয়া প্রয়োজন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে হাসপাতালের এক চিকিৎসক বলেন, “আমাদের তিনটি ইউনিট মিলিয়ে বর্তমানে প্রায় ৫ হাজার ৬০০-এর বেশি রোগী ওয়েটিং লিস্টে রয়েছে। অথচ মেশিন ক্যাপাসিটি মাত্র দেড় শ’র মতো। দুটি মেশিন দিয়ে প্রতিদিন সর্বোচ্চ ১০টি করে সেশন পরিচালনা করা যায়। যদি আরো পাঁচটি মেশিন যোগ করা হয়, তবুও বর্তমান গতিতে রোগীদের ২০২৭ সাল পর্যন্ত তারিখ দিতে হচ্ছে। কিন্তু ক্যানসার রোগী কি এতদিন অপেক্ষা করতে পারবেন?”
সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত হাসপাতালের ডি-ব্লকের বহির্বিভাগে রোগী দেখেন চিকিৎসকরা। এরপর আবার পরদিনের জন্য অপেক্ষায় থাকে শত শত রোগী। হাসপাতালের শুধু চিকিৎসা ব্যবস্থার ঘাটতিই নয়–রয়েছে অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ, শয্যার ঘাটতি, চিকিৎসক, নার্স ও স্টাফের স্বল্পতা, এমনকি পরীক্ষা-নিরীক্ষার অভাব।

হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে এই হাসপাতালে প্রায় ৫০টির বেশি পরীক্ষা করা যাচ্ছে। তবে ক্যানসার নির্ণয়ের জন্য যেসব পরীক্ষা বেশি প্রয়োজন, বিশেষ করে AFP, Anti HCV- IM, CA-125, AC-15-3, AC-19-9, CEA, FT4, HBsAg(lm), PSA, TSH, Serum-hCG অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও গত চার মাস ধরে তা বন্ধ রয়েছে।
হাসপাতালের অনাক্রম্য বিজ্ঞান ও আণবিক জীববিজ্ঞান বিভাগের মেডিকেল টেকনোলজিস্ট মো. ফরহাদ চরচাকে বলেন, “এসব টেস্ট করার জন্য যেসব রি-এজেন্ট প্রয়োজন তা না থাকায় গত ১৫ জানুয়ারি থেকে এসব টেস্ট বন্ধ রয়েছে।”
হাসপাতালের পরীক্ষা-নিরীক্ষা বিভাগে কর্মরত এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “প্রত্যেক রোগীকে চিকিৎসার জন্য বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার পাশাপাশি ইকো টেস্ট দেওয়া হয়। অথচ এই হাসপাতালে ইকো এবং এমআরআই টেস্ট নেই।”
রি-এজেন্ট (ওষুধ) সংকটে কেমোথেরাপি ও ক্যানসারের গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রায় বন্ধ রয়েছে-বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী চরচাকে বলেন, “এ বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে ইতোমধ্যে আলোচনা হয়েছে। আশা করছি, খুব শিগগিরই অর্থ ছাড়ের মাধ্যমে রি-এজেন্ট সংকটের সমাধান হবে।”
চিকিৎসক ও দক্ষ জনবলের ঘাটতির কথাও বলছেন হাসপাতালে সংশ্লিষ্টরা। বর্তমানে হাসপাতালে কর্মরত চিকিৎসক রয়েছে ১৯৮ জন, শূন্য পদ রয়েছে ৪২টি। নার্স রয়েছে ৫৭৪ জন, আর মেডিকেল টেকনোলজি ও স্টাফ রয়েছে ২০৯ জন এবং আউটসোর্সিংয়ে রয়েছে ১১৯ জন কর্মী।
হাসপাতালের মোট জনবল দিয়ে এই ধরনের বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান চালানো ‘কঠিন’ বলে মন্তব্য করেছেন প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. মোস্তফা আজিজ সুমন।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন অনুবিভাগ) মনোয়ারা ইশরাত চরচাকে চলেন, “হাসপাতালের অন্যান্য বিষয় আমার জানা নেই। তবে জনবল সংকট নিরসনে আমরা কাজ করছি। জনপ্রশাসন বিভাগের মাধ্যমে জনবল বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।”
পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. মোস্তফা আজিজ চরচাকে বলেন, “এটি দেশের একমাত্র বিশেষায়িত ক্যানসার হাসপাতাল। এখানে প্রতিদিন অন্তত এক হাজারের বেশি রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। তারা সবাই বিভিন্নভাবে ক্যানসার আক্রান্ত। দেশে প্রতিদিন মানুষ যে হারে ক্যানসারে আক্রান্ত হচ্ছে, তাতে দুই হাজার শয্যার প্রয়োজন।”

গত তিন মাস ধরে হাসপাতালে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা-নিরীক্ষা বন্ধ, কেমোথেরাপি হচ্ছে না, রেডিওথেরাপির মেশিন নষ্ট। তাহলে চিকিৎসা সেবা কীভাবে চলছে জানতে চাইলে পরিচালক মোস্তফা আজিজ বলেন, “হাসপাতালে মেডিসিন কেনার জন্য যে বাজেট আসে, তাতে দুই মাসের বেশি চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব নয়। বিষয়টি নিয়ে আমরা স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। সমাধান বের করার চেষ্টা চলছে।”
পরিচালক জানান, হাসপাতালটিতে প্রায় ২০ বছর আগে রেডিওথেরাপির মেশিন আসে। একটি মেশিনের মেয়াদ থাকে গড়ে ১০ বছর। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নতুন করে আরো দুটি মেশিন দেওয়া হয়। তিনি বলেন, “চাইলেই রাতারাতি এসব মেশিন স্থাপন করা সম্ভব নয়। এগুলোর সেটআপ প্রক্রিয়া অনেক জটিল। তাই দ্রুত সমাধানের জন্য আমরা থেরাপি বিভাগে তিনটি শিফট চালুর উদ্যোগ নিচ্ছি। এতে প্রতিদিন আরও বেশি রোগীকে থেরাপির দেওয়া যাবে।”