আরেকটি দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা হজম হবে তো?

আরেকটি দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা হজম হবে তো?
ছবি: উইকিপিডিয়া থেকে নেওয়া

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক ফল ঘোষণা এখনো হয়নি। তবে বেসরকারি ফল হিসেবে যা এরই মধ্যে সবার জানা হয়ে গেছে, তা হলো–অনেক উত্থান-পতনের পর হওয়া এ নির্বাচনে বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাচ্ছে। এটা এক রকম নিশ্চিতও। ফলে টানা পঞ্চমবারের মতো বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন দলের হাতে থাকছে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা। এতে সিঁদুরে মেঘ দেখার অনুভূতিই হচ্ছে।

একটু ব্যাখ্যা করা যাক। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা কখনোই বিতর্কের ঊর্ধ্বে থাকেনি। প্রথম সংসদ থেকেই এ বিতর্কের শুরু। ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে সদ্য স্বাধীন দেশে আওয়ামী লীগ অনুমিতভাবেই একচেটিয়া বিজয় অর্জন করে। দলটি ২৯৩টি আসনে জয় পায়। এ বিজয় স্বাধীন দেশকে একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যের দিকে দৃঢ়ভাবে এগিয়ে যাওয়ার দিকনির্দেশের বদলে ভুল পথে পরিচালিত করে। বাকশালের নামে একদলীয় শাসনব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যায় ক্ষমতাসীনরা।

এর পর ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের রক্তাক্ত পথ বাংলাদেশকে নিয়ে গেছে ভীষণ অস্থির এক সময়ের মধ্য দিয়ে। অভ্যুত্থান–পাল্টা অভ্যুত্থান বাংলাদেশের অন্যতম নিয়তি হিসেবে ধরা দেয়। এর একটা আপাত সমাধান হয় ১৯৭৯ সালের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে। ওই নির্বাচনে সদ্য গঠিত দল বিএনপি ২০৭ আসনে জয় পায়। কিন্তু সেই শাসনের অবসান হয় আরেকটি হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে হত্যার পর আরেকটি সেনাশাসন চেপে বসে।

ক্ষমতায় বসেন হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ। দীর্ঘ নয় বছরের সেই শাসনকাল অপশাসন হিসেবেই চিহ্নিত হয়ে আছে বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে। এই এরশাদ প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল জাতীয় পার্টিও সংসদে নেতৃত্ব দিয়েছে। উপহার দিয়েছে ১৯৮৬ ও ১৯৮৮ সালের বিতর্কিত নির্বাচন।

১৯৭৫ সালের পর থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ নানা সময়ে দেখেছে বিচিত্র সব সরকার কাঠামো। কখনো প্রেসিডেন্টের শাসন, কখনো পুতুল প্রেসিডেন্টকে সামনে রেখে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের শাসন, আবার কখনো আস্থা ভোটের প্রেসিডেন্ট। দেখেছে দুটি গণভোট, যেখানে ‘হ্যাঁ’ বিজয়ী হওয়াটাই ছিল অবধারিত।

তারপর সব তোলপাড় করা নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানে ওলটপালট হলো এরশাদের মসনদ। বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের অধীন হওয়া ভোটে কোনো দলই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। ১৪০ আসন পাওয়া বিএনপি সরকার গঠন করে জামায়াতে ইসলামীর সমর্থনে। আওয়ামী লীগ বসে বিরোধী দলের আসনে। এই সংসদ নির্বাচনের পর অনুষ্ঠিত হয় আরেকটি গণভোট। এই গণভোটের মধ্য দিয়েই বাংলাদেশ রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থা থেকে সংসদীয় ব্যবস্থায় প্রবেশ করে। বলে রাখা ভালো, এই গণভোটেও ‘হ্যাঁ’-এর বিজয় থেকে যায় অপরিবর্তিত।

গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর বিজয় বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক রকম নটআউট মর্যাদা পেয়ে যায়। ‘দান দান তিন দান’ বলে বাংলায় একটা কথা আছে। এবারও গণভোট হচ্ছে। সেখানেও ‘হ্যাঁ’ এবং ‘না’ আছে। এবং প্রবণতা বলছে, ‘হ্যাঁ’ বিজয়ী হতে যাচ্ছে। আর তেমনটাই ঘটলে আবারও সরকার ব্যবস্থায় এক বড় বদল আসার পথ খুলে যাবে, যা এ সময়ে সংস্কার বলেই বেশি উচ্চারিত।

এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে শুরুতে বলা সেই দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা। বিএনপি পাচ্ছে এই সংখ্যাগরিষ্ঠতা। নিকট অতীতে ২০০৮ সালের নির্বাচনে এই দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছিল আওয়ামী লীগ। প্রথম মেয়াদে নানা সমালোচনা সত্ত্বেও দলটি স্থির লক্ষ্য ধরেই এগিয়ে গিয়েছিল। সঙ্গে এই বিপুল জনসমর্থন তাকে ভেতরে ভেতরে করে তুলেছিল ভীষণ রকম একরোখা ও অপরিণামদর্শী। ফলাফল? আর কিছুই না, তিনটি বিতর্কিত নির্বাচন, যার ফলও ওই দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা। এর একটি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়, একটি রাতের ভোট, এবং শেষটি ২০২৪ সালের ‘আমি বনাম ডামি’ নির্বাচন। এই পুরো সময়ে আওয়ামী লীগের শাসন দেশের ভেতরে নানা পরিসরেই বিভিন্ন ইস্যুতে বিভাজনের রেখাকে স্পষ্ট করে তুলেছে। দুর্নীতির প্রবাদতুল্য মাত্রা, দলীয় স্বার্থে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর ব্যবহার, গুম, নিপীড়ন–কী হয়নি! এসব এখন সবারই জানা। কারণ, বাংলাদেশের মানুষ পতিত ক্ষমতাধরদের অপকর্ম তো বটেই খুঁত নিয়ে কথা বলতেও বড় ভালোবাসে। আর ক্ষমতাধরদের কোলে-কাঁখে চড়তেও ভীষণ পটু। সবচেয়ে পটু রাজা তো বটেই উজির-নাজিরদেরও পদলেহনে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আরেকটি অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সেই আওয়ামী শাসনের অবসান হয়। আসে অন্তর্বর্তী সরকার। এই সরকারও আসে মানুষের বিপুল সমর্থন নিয়ে। ফলে তার মধ্যেও দেখা দেয় একচেটিয়া রোগ। মানুষের সরাসরি ভোটে না এলেও মানুষের ওপর ছড়ি ঘোরানোর কায়দাটি যে এই সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ ও তাদের অমাত্যবর্গের বেশ জানা–তা বোঝা গেছে পুরো সময়টিতেই। অনেকটা রাজনৈতিক সরকারের মতোই এই তথাকথিত অরাজনৈতিক সরকারটি নিজেদের লক্ষ্য অর্জনে বারবার পথে ও সামাজিক মাধ্যমে আপন বাহিনী হিসেবে দেখিয়েছে মবের দাপট–যা নিয়ে কথা উঠলেই সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদধারীরা একে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে ‘প্রেশার গ্রুপ’ হিসেবে।

সে যাক। বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাচ্ছে। বাংলাদেশের মানুষ আবারও রাজনৈতিক প্রজ্ঞার বদলে আবেগের পরিচয়ই দিল। আরেকটি দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার সরকার মানে শক্তিশালী সরকার। বাংলাদেশের সামনে যেসব চ্যালেঞ্জ আছে, তাতে এটি ইতিবাচকও হতে পারত। কিন্তু উল্টো এটি কোথায় যেন শঙ্কার বাজনা বাজাচ্ছে। কারণ, বাংলাদেশের কপালে কখনোই এমন সরকার দীর্ঘমেয়াদি সুশাসন আনতে পারেনি। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এনেছে অস্থির সময়।

এবারের এই দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা বিএনপির দীর্ঘ রাজনৈতিক লড়াইয়ের একটা পুরস্কারও বটে। কিন্তু তার সামনে আছে পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ। এর অন্যতম হলো–জুলাই সনদের বাস্তবায়ন, যার জন্য গণভোট হলো। এই জুলাই সনদের ৮৪টি প্রস্তাবের মধ্যে বেশ কিছুতে রয়েছে বিএনপির ‘নোট অব ডিসেন্ট’। অন্যদিকে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট আছে এ বিষয়ে একবগ্গা নীতিতে।

আসন্ন সংসদটি একই সঙ্গে আইনসভা ও গণপরিষদ হিসেবে বিবেচিত হবে। জুলাই সনদে থাকা রাষ্ট্রের মৌলিক সংস্কার বিষয়ক নানা প্রস্তাব, বিশেষত সংবিধান সম্পর্কিত বিষয়াদির রফার সময় নির্বাচিত প্রতিনিধিরা গণপরিষদ সদস্য হিসেবে কাজ করবেন। সঙ্গে থাকবে সংসদ সদস্য হিসেবে নিয়মিত কাজ। গণপরিষদ সদস্য হিসেবে এই প্রতিনিধিদের এমন গুরুতর কিছু সিদ্ধান্ত নিতে হবে, যার মধ্যে রয়েছে–উচ্চকক্ষ গঠন, প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য, দুই মেয়াদের বেশি শীর্ষ ক্ষমতায় না থাকা, দল ও সরকার প্রধান একই ব্যক্তি হওয়া বা না হওয়ার মতো বিষয়গুলো। এসব বিষয়ে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করতে যাওয়া বিএনপির রয়েছে নোট অব ডিসেন্ট। এই নোট অব ডিসেন্টসহই বিএনপি জুলাই সনদে সই করেছিল।

ফলে অবধারিতভাবেই আসন্ন এই সংসদ ও সংসদের বাইরে থাকবে যথেষ্ট উত্তেজনা। বাঙালি উত্তেজনাপ্রিয় জাতি। অন্তত গেল কয়েক বছরের দিকে তাকালে এ নিয়ে কোনো আপত্তি থাকার কথা নয়। ফলে আসন্ন সংসদ কতটা স্থিতিশীলতা আনতে পারবে, তা নিয়ে সংশয় আছে বিস্তর।

এবার একটু অন্য প্রসঙ্গে আসা যাক। যতবার একচেটিয়া ক্ষমতার শেষ সীমায় বাংলাদেশ পৌঁছেছে, ততবার রাষ্ট্রকাঠামো বদলের পক্ষে জোয়ার উঠেছে এই দেশে। আর এই জোয়ারের সঙ্গে মানিকজোড় হয়ে হাজির হয়েছে বারবার দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা সম্পন্ন সরকার। আর এমন সরকার আসার পর কারও মধ্যেই পরিমিতি বোধ দেখা যায়নি সেভাবে। অনেকটা ‘সব পেয়েছি’ ভঙ্গিটাই প্রকাশ্য হয়েছে বারবার। কারও অল্প সময়ে, কারও ক্ষেত্রে এই ভঙ্গির প্রকাশটা হয়েছে একটু সময় নিয়ে। এই যা তফাৎ।

বাংলাদেশের মানুষ ভালো থাকতে চায়। বিশ্বের অন্য যেকোনো দেশের মানুষের মতো করেই তারা সুশাসন চায়। চায় নিজের অধিকারটুকু বুঝে নিতে। আর এই চাওয়া থেকেই সে বারবার নানাজনকে ভালোবেসে তার রাষ্ট্রক্ষমতায় বসায়। আর নিয়ম মেনেই যেন প্রতারিত হয়। ফলে অনেকটা শিশুর মতো করেই সে ব্যবস্থা বদলাতে চায়–‘এটা নয়, ওটা দাও’ বলে।

এই বদলের পথে সে কখনো প্রধানমন্ত্রী শাসিত সরকার থেকে গেছে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থায়। সেনাশাসনকে সে দু হাত তুলে জড়িয়ে ধরেছে। কখনো সে সেনা সমর্থিত পুতুল সরকারের হাতে নিজের দায়িত্ব তুলে দিয়েছে। আবার প্রতারিত হয়েছে। আবার রাষ্ট্রপতি থেকে ফিরেছে সংসদীয় ব্যবস্থায়। তারপর আবার প্রতারণা। এবং এবার সে চায় ভারসাম্য। বহুদূরের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর অনুকরণে একগাদা প্রস্তাব এখন তার হাতে। আর চোখে স্বপ্ন। এই স্বপ্নের ভার এবার সে দিয়েছে বিএনপির হাতে তুলে। সঙ্গে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা।

ফলে এই স্বপ্ন আবার দুঃস্বপ্নে পরিণত হবে কিনা, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে। এই দেশের মানুষ তো বারবার সুকথনের ফাঁদে পড়েছে। মন্দের ভালো খুঁজেছে। আর খুঁজতে খুঁজতে অতি আবেগে সে নিজেকে ভীষণভাবে সঁপে দিয়েছে কারও না কারও হাতে। আর যতবার সে এমন প্রাণমন উজাড় করে দিয়েছে, ততবার তার পরিণতি হয়েছে বাংলা সিনেমার সেই জীবনদুঃখী কপালপোড়া নায়িকার মতো, কান্নাই যার জীবনের একমাত্র পাওয়া, যার চিত্রনাট্য মেলোড্রামার প্রলম্বন। এ দেশের রাজনীতিকেরা, বিশেষত বিএনপি ও এর নেতৃত্ব এই মানুষগুলোর কথা এবার একটু মনে রাখলেই হয়।

লেখক: বার্তা সম্পাদক, চরচা

সম্পর্কিত