আরমান ভূঁইয়া

বিগত বছরে ২০২৫ সাল বাংলাদেশে সাংবাদিকদের জন্য অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ সময় হিসেবে চিহ্নিত করেছে মানবাধিকার সংস্থাগুলো। তারা বলছে, পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে হামলা, মামলা, প্রাণনাশের হুমকি, গ্রেপ্তার এমনকি হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন শত শত সাংবাদিক। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য বলছে, রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি–উভয় পক্ষের চাপ, রাজনৈতিক সহিংসতা, মব আক্রমণ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ–সব মিলিয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের নিরাপত্তা পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অন্তত ৩৮১টি নিপীড়ন, হামলা ও হয়রানির ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে হামলা, সংবাদের জেরে মামলা, প্রাণনাশের হুমকি ও হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন সাংবাদিকরা।
আসকের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি ঘটনা ঘটেছে পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে হামলার শিকার হওয়ার, যার সংখ্যা ১১৮টি। এ ছাড়া প্রকাশিত সংবাদের কারণে ৭১টি মামলা হয়েছে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে, যা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য গুরুতর হুমকি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
এ বছর সন্ত্রাসীদের হামলা, নির্যাতন ও বোমা নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে ৪৫টি। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের দ্বারা ৩০টি, আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের বিরুদ্ধে ১টি, এবং জাতীয় পার্টি ও সহযোগী সংগঠনের বিরুদ্ধে ২টি ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের রাজনৈতিক সংবাদ সংগ্রহ এবং সংবাদ প্রকাশ-পরবর্তী ক্ষোভের কারণে হামলা চালিয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধেও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। পুলিশসহ বিভিন্ন বাহিনীর দ্বারা সাংবাদিকদের নির্যাতন, হয়রানি ও হুমকির ঘটনা ঘটেছে ২৩টি। পাশাপাশি সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দ্বারা হুমকি ও হয়রানির ঘটনা ঘটেছে ৩টি।

এ ছাড়া ২০টি ঘটনায় সাংবাদিকদের প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়েছে। বছরের বিভিন্ন সময়ে তিনজন সাংবাদিক দুর্বৃত্তদের হাতে নিহত হন, এবং চারটি ঘটনায় সাংবাদিকদের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
একের পর এক হত্যাকাণ্ড
গত বছর সাংবাদিক হত্যাকাণ্ড দেশজুড়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি করে। গত ৭ আগস্ট গাজীপুরের চান্দনা চৌরাস্তায় প্রকাশ্যে কুপিয়ে ও গলা কেটে হত্যা করা হয় দৈনিক প্রতিদিনের কাগজের গাজীপুর প্রতিনিধি মো. আসাদুজ্জামান তুহিনকে (৩৮)।
এরপর ১ সেপ্টেম্বর খুলনার খানজাহান আলী (রূপসা) সেতুর নিচ থেকে উদ্ধার করা হয় সাংবাদিক ওয়াহেদ-উজ-জামান বুলুর (৬০) মরদেহ। তার শরীরে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়। তিনি দীর্ঘ তিন দশক ধরে জাতীয় গণমাধ্যমে কাজ করেছেন।
গত ২২ আগস্ট নারায়ণগঞ্জের মেঘনা নদী থেকে উদ্ধার করা হয় সাংবাদিক ও কলামিস্ট বিভুরঞ্জন সরকারের মরদেহ। যদিও এ ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের দাবি পেশাগত ও অর্থনৈতিক কারণে তিনি আত্মহত্যা করতে পারেন। তিনি দৈনিক আজকের পত্রিকায় কর্মরত ছিলেন। ধারণা করা হয়, পেশাগত ও অর্থনৈতিক হতাশা থেকে তিনি আত্মহত্যা করেন।
এ ছাড়া ৪ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারে তরুণ সাংবাদিক মোহাম্মদ আমিন (২৩) এবং ৩ অক্টোবর বাগেরহাটে দৈনিক ভোরের চেতনার স্টাফ রিপোর্টার এ এস এম হায়াত উদ্দিন (৪৩) হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। ১৯ অক্টোবর ঢাকায় একটি বাসা থেকে উদ্ধার করা হয় গণমাধ্যমকর্মী স্বর্ণময়ী বিশ্বাসের ঝুলন্ত মরদেহ।
আসকের তথ্য অনুযায়ী, আগের বছরেও সাংবাদিক নিপীড়নের প্রবণতা ছিল এ যাবৎকালের মধ্যে সবচেয় বেশি। সে বছর; অর্থাৎ, ২০২৪ সালে ৫৩১টি ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া ২০২৩ সালে ২৯২টি, ২০২২ সালে ২২৬টি, ২০২১ সালে ২১০টি এবং ২০২০ সালে ২৪৭টি ঘটনা নথিভুক্ত করে আসক।
আন্তর্জাতিক সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান
বিশ্বে সাংবাদিকদের নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক সংস্থা রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স (আরএসএফ) বলছে, ২০২৫ সালে গণমাধ্যম স্বাধীনতার সূচকে ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৪৯তম। দেশের স্কোর দাঁড়িয়েছে ৩৩.৭১। আরও উদ্বেগজনক হলো, নিরাপত্তা সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ১৫৯তম। একই বছরে বিভিন্ন অভিযোগ ও মামলায় কমপক্ষে পাঁচজন সাংবাদিক আটক হয়েছেন।
আরএসএফের বিশ্লেষণে বলা হয়, বাংলাদেশের গণমাধ্যম পরিমণ্ডলে রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি উভয় খাত সক্রিয় থাকলেও রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম–বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি), বাংলাদেশ বেতার এবং রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদ সংস্থা বাসস কার্যত সরকারের প্রচারমাধ্যম হিসেবে পরিচালিত হয় এবং সেখানে সম্পাদকীয় স্বাধীনতার অভাব রয়েছে।
অন্যদিকে বেসরকারি খাতে প্রায় ৩ হাজার প্রিন্ট মিডিয়া, ৩০টি রেডিও, ৩০টি টিভি চ্যানেল ও কয়েক শ অনলাইন সংবাদমাধ্যম সক্রিয়। যমুনা টিভি, সময় টিভি ও একাত্তর টিভির মতো চ্যানেলগুলো অতীতে ক্ষমতাসীন সরকারের প্রতি সহায়ক ছিল এবং বর্তমানে অন্তর্বর্তী সরকারের সমালোচনা থেকে বিরত রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। তবে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার এখনো সীমিত পরিসরে হলেও সম্পাদকীয় স্বাধীনতা বজায় রাখতে সক্ষম।
এমএসএফ ও এইচআরএসএসের উদ্বেগ
মানবাধিকার সাংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ) জানায়, ২০২৫ সালে ২৮৯টি ঘটনায় ৬৪১ জন সাংবাদিক হত্যা, হামলা, হুমকি ও আইনি হয়রানির শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ১ জন নিহত, ২৯৫ জন আহত, ১৬৩ জন লাঞ্ছিত বা হুমকির শিকার এবং ১৭০ জন আইনি হয়রানির মুখে পড়েছেন। এ সময় ৪৬টি মামলায় ১২ জন সাংবাদিক গ্রেপ্তার হন।

এমএসএফ বলছে, ১৮ ডিসেম্বর প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার-এর কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ গণমাধ্যম স্বাধীনতার জন্য অশনিসংকেত। ঘটনাস্থলে গেলে নিউ এজ-এর সম্পাদক নুরুল কবীর হেনস্তার শিকার হন।
আরেক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) জানায়, ২০২৫ সালে ৩১৮টি ঘটনায় অন্তত ৫৩৯ জন সাংবাদিক হত্যা, নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। এ ঘটনায় ৩ জন নিহত, ২৭৩ জন আহত, ৫৭ জন লাঞ্ছিত, ৮৩ জন হুমকির মুখে পড়েছেন এবং ১৭ জন গ্রেপ্তার হয়েছেন।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, সাংবাদিকদের ওপর ধারাবাহিক সহিংসতা ও দমন-পীড়ন গণতন্ত্র, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও আইনের শাসনের জন্য মারাত্মক হুমকি। তারা সাংবাদিক হত্যাকাণ্ড ও নিপীড়নের প্রতিটি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং গণমাধ্যমকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রের জরুরি পদক্ষেপ দাবি করেছে।
সুরক্ষা আইন না থাকায় ঝুঁকি বাড়ছে
গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রধান কামাল আহমেদ বলেন, সাংবাদিকদের ওপর হামলা নতুন নয়, তবে বর্তমানে ঝুঁকি বহুগুণ বেড়েছে। তিনি জানান, কমিশনের পক্ষ থেকে গত ২২ মার্চ সরকারকে একটি সাংবাদিক সুরক্ষা আইন প্রণয়নের সুপারিশ দেওয়া হয়েছিল। আশ্বাস মিললেও আইনটি বাস্তবায়ন হয়নি।
তার মতে, ওই আইন কার্যকর হলে সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও হয়রানির ঘটনায় বিচার নিশ্চিত করা যেত এবং ভবিষ্যতে হামলা নিরুৎসাহিত হতো। আইন না হওয়া এবং সরকারের নিষ্ক্রিয়তার কারণেই ঝুঁকি বেড়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সাংবাদিক কামাল আহমেদ বলেন, “সাংবাদিক সমাজের ভেতরের বিভাজনও একটি বড় সমস্যা। রাজনৈতিক দলীয়করণের কারণে সাংবাদিকদের ঐক্য দুর্বল হয়েছে।” তিনি বলেন, “সম্প্রতি ডেইলি স্টার, প্রথম আলোসহ কয়েকটি গণমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের ওপর হামলা বিশেষ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। এসব ঠেকাতে সাংবাদিকদের পাশাপাশি পেশাজীবী ও রাজনৈতিক শক্তিগুলোর সম্মিলিত প্রতিরোধ প্রয়োজন।”
মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটন চরচাকে বলেন, “সাংবাদিকদের ওপর হামলা, নির্যাতন ও হয়রানি ক্রমেই একটি কাঠামোগত সংকটে পরিণত হচ্ছে। পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে শারীরিক হামলা, মামলা বা হুমকির শিকার হওয়া সাংবাদিকদের মধ্যে ভয় তৈরি করছে এবং সমাজের সত্য জানার অধিকারকে সীমিত করছে। এর ফলে গণতন্ত্রের ভিত্তি দুর্বল হচ্ছে এবং স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।”
এই মানবাধিকার কর্মী বলেন, “এই সংকট থেকে উত্তরণে রাষ্ট্রের প্রথম দায়িত্ব হলো দ্রুত ও নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করা। এ ছাড়া কার্যকর সাংবাদিক সুরক্ষা আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরপেক্ষ ভূমিকা, সাংবাদিক সমাজের মধ্যে ঐক্য এবং নাগরিক ও পেশাজীবী সংগঠন ও রাজনৈতিক দলের সমন্বিত প্রতিরোধই মূল প্রতিকার। এসব পদক্ষেপ না নিলে সাংবাদিকরা নিরাপদ থাকতে পারবে না এবং গণতন্ত্রে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।”

বিগত বছরে ২০২৫ সাল বাংলাদেশে সাংবাদিকদের জন্য অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ সময় হিসেবে চিহ্নিত করেছে মানবাধিকার সংস্থাগুলো। তারা বলছে, পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে হামলা, মামলা, প্রাণনাশের হুমকি, গ্রেপ্তার এমনকি হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন শত শত সাংবাদিক। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য বলছে, রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি–উভয় পক্ষের চাপ, রাজনৈতিক সহিংসতা, মব আক্রমণ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ–সব মিলিয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের নিরাপত্তা পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অন্তত ৩৮১টি নিপীড়ন, হামলা ও হয়রানির ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে হামলা, সংবাদের জেরে মামলা, প্রাণনাশের হুমকি ও হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন সাংবাদিকরা।
আসকের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি ঘটনা ঘটেছে পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে হামলার শিকার হওয়ার, যার সংখ্যা ১১৮টি। এ ছাড়া প্রকাশিত সংবাদের কারণে ৭১টি মামলা হয়েছে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে, যা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য গুরুতর হুমকি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
এ বছর সন্ত্রাসীদের হামলা, নির্যাতন ও বোমা নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে ৪৫টি। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের দ্বারা ৩০টি, আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের বিরুদ্ধে ১টি, এবং জাতীয় পার্টি ও সহযোগী সংগঠনের বিরুদ্ধে ২টি ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের রাজনৈতিক সংবাদ সংগ্রহ এবং সংবাদ প্রকাশ-পরবর্তী ক্ষোভের কারণে হামলা চালিয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধেও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। পুলিশসহ বিভিন্ন বাহিনীর দ্বারা সাংবাদিকদের নির্যাতন, হয়রানি ও হুমকির ঘটনা ঘটেছে ২৩টি। পাশাপাশি সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দ্বারা হুমকি ও হয়রানির ঘটনা ঘটেছে ৩টি।

এ ছাড়া ২০টি ঘটনায় সাংবাদিকদের প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়েছে। বছরের বিভিন্ন সময়ে তিনজন সাংবাদিক দুর্বৃত্তদের হাতে নিহত হন, এবং চারটি ঘটনায় সাংবাদিকদের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
একের পর এক হত্যাকাণ্ড
গত বছর সাংবাদিক হত্যাকাণ্ড দেশজুড়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি করে। গত ৭ আগস্ট গাজীপুরের চান্দনা চৌরাস্তায় প্রকাশ্যে কুপিয়ে ও গলা কেটে হত্যা করা হয় দৈনিক প্রতিদিনের কাগজের গাজীপুর প্রতিনিধি মো. আসাদুজ্জামান তুহিনকে (৩৮)।
এরপর ১ সেপ্টেম্বর খুলনার খানজাহান আলী (রূপসা) সেতুর নিচ থেকে উদ্ধার করা হয় সাংবাদিক ওয়াহেদ-উজ-জামান বুলুর (৬০) মরদেহ। তার শরীরে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়। তিনি দীর্ঘ তিন দশক ধরে জাতীয় গণমাধ্যমে কাজ করেছেন।
গত ২২ আগস্ট নারায়ণগঞ্জের মেঘনা নদী থেকে উদ্ধার করা হয় সাংবাদিক ও কলামিস্ট বিভুরঞ্জন সরকারের মরদেহ। যদিও এ ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের দাবি পেশাগত ও অর্থনৈতিক কারণে তিনি আত্মহত্যা করতে পারেন। তিনি দৈনিক আজকের পত্রিকায় কর্মরত ছিলেন। ধারণা করা হয়, পেশাগত ও অর্থনৈতিক হতাশা থেকে তিনি আত্মহত্যা করেন।
এ ছাড়া ৪ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারে তরুণ সাংবাদিক মোহাম্মদ আমিন (২৩) এবং ৩ অক্টোবর বাগেরহাটে দৈনিক ভোরের চেতনার স্টাফ রিপোর্টার এ এস এম হায়াত উদ্দিন (৪৩) হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। ১৯ অক্টোবর ঢাকায় একটি বাসা থেকে উদ্ধার করা হয় গণমাধ্যমকর্মী স্বর্ণময়ী বিশ্বাসের ঝুলন্ত মরদেহ।
আসকের তথ্য অনুযায়ী, আগের বছরেও সাংবাদিক নিপীড়নের প্রবণতা ছিল এ যাবৎকালের মধ্যে সবচেয় বেশি। সে বছর; অর্থাৎ, ২০২৪ সালে ৫৩১টি ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া ২০২৩ সালে ২৯২টি, ২০২২ সালে ২২৬টি, ২০২১ সালে ২১০টি এবং ২০২০ সালে ২৪৭টি ঘটনা নথিভুক্ত করে আসক।
আন্তর্জাতিক সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান
বিশ্বে সাংবাদিকদের নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক সংস্থা রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স (আরএসএফ) বলছে, ২০২৫ সালে গণমাধ্যম স্বাধীনতার সূচকে ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৪৯তম। দেশের স্কোর দাঁড়িয়েছে ৩৩.৭১। আরও উদ্বেগজনক হলো, নিরাপত্তা সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ১৫৯তম। একই বছরে বিভিন্ন অভিযোগ ও মামলায় কমপক্ষে পাঁচজন সাংবাদিক আটক হয়েছেন।
আরএসএফের বিশ্লেষণে বলা হয়, বাংলাদেশের গণমাধ্যম পরিমণ্ডলে রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি উভয় খাত সক্রিয় থাকলেও রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম–বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি), বাংলাদেশ বেতার এবং রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদ সংস্থা বাসস কার্যত সরকারের প্রচারমাধ্যম হিসেবে পরিচালিত হয় এবং সেখানে সম্পাদকীয় স্বাধীনতার অভাব রয়েছে।
অন্যদিকে বেসরকারি খাতে প্রায় ৩ হাজার প্রিন্ট মিডিয়া, ৩০টি রেডিও, ৩০টি টিভি চ্যানেল ও কয়েক শ অনলাইন সংবাদমাধ্যম সক্রিয়। যমুনা টিভি, সময় টিভি ও একাত্তর টিভির মতো চ্যানেলগুলো অতীতে ক্ষমতাসীন সরকারের প্রতি সহায়ক ছিল এবং বর্তমানে অন্তর্বর্তী সরকারের সমালোচনা থেকে বিরত রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। তবে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার এখনো সীমিত পরিসরে হলেও সম্পাদকীয় স্বাধীনতা বজায় রাখতে সক্ষম।
এমএসএফ ও এইচআরএসএসের উদ্বেগ
মানবাধিকার সাংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ) জানায়, ২০২৫ সালে ২৮৯টি ঘটনায় ৬৪১ জন সাংবাদিক হত্যা, হামলা, হুমকি ও আইনি হয়রানির শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ১ জন নিহত, ২৯৫ জন আহত, ১৬৩ জন লাঞ্ছিত বা হুমকির শিকার এবং ১৭০ জন আইনি হয়রানির মুখে পড়েছেন। এ সময় ৪৬টি মামলায় ১২ জন সাংবাদিক গ্রেপ্তার হন।

এমএসএফ বলছে, ১৮ ডিসেম্বর প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার-এর কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ গণমাধ্যম স্বাধীনতার জন্য অশনিসংকেত। ঘটনাস্থলে গেলে নিউ এজ-এর সম্পাদক নুরুল কবীর হেনস্তার শিকার হন।
আরেক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) জানায়, ২০২৫ সালে ৩১৮টি ঘটনায় অন্তত ৫৩৯ জন সাংবাদিক হত্যা, নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। এ ঘটনায় ৩ জন নিহত, ২৭৩ জন আহত, ৫৭ জন লাঞ্ছিত, ৮৩ জন হুমকির মুখে পড়েছেন এবং ১৭ জন গ্রেপ্তার হয়েছেন।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, সাংবাদিকদের ওপর ধারাবাহিক সহিংসতা ও দমন-পীড়ন গণতন্ত্র, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও আইনের শাসনের জন্য মারাত্মক হুমকি। তারা সাংবাদিক হত্যাকাণ্ড ও নিপীড়নের প্রতিটি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং গণমাধ্যমকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রের জরুরি পদক্ষেপ দাবি করেছে।
সুরক্ষা আইন না থাকায় ঝুঁকি বাড়ছে
গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রধান কামাল আহমেদ বলেন, সাংবাদিকদের ওপর হামলা নতুন নয়, তবে বর্তমানে ঝুঁকি বহুগুণ বেড়েছে। তিনি জানান, কমিশনের পক্ষ থেকে গত ২২ মার্চ সরকারকে একটি সাংবাদিক সুরক্ষা আইন প্রণয়নের সুপারিশ দেওয়া হয়েছিল। আশ্বাস মিললেও আইনটি বাস্তবায়ন হয়নি।
তার মতে, ওই আইন কার্যকর হলে সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও হয়রানির ঘটনায় বিচার নিশ্চিত করা যেত এবং ভবিষ্যতে হামলা নিরুৎসাহিত হতো। আইন না হওয়া এবং সরকারের নিষ্ক্রিয়তার কারণেই ঝুঁকি বেড়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সাংবাদিক কামাল আহমেদ বলেন, “সাংবাদিক সমাজের ভেতরের বিভাজনও একটি বড় সমস্যা। রাজনৈতিক দলীয়করণের কারণে সাংবাদিকদের ঐক্য দুর্বল হয়েছে।” তিনি বলেন, “সম্প্রতি ডেইলি স্টার, প্রথম আলোসহ কয়েকটি গণমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের ওপর হামলা বিশেষ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। এসব ঠেকাতে সাংবাদিকদের পাশাপাশি পেশাজীবী ও রাজনৈতিক শক্তিগুলোর সম্মিলিত প্রতিরোধ প্রয়োজন।”
মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটন চরচাকে বলেন, “সাংবাদিকদের ওপর হামলা, নির্যাতন ও হয়রানি ক্রমেই একটি কাঠামোগত সংকটে পরিণত হচ্ছে। পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে শারীরিক হামলা, মামলা বা হুমকির শিকার হওয়া সাংবাদিকদের মধ্যে ভয় তৈরি করছে এবং সমাজের সত্য জানার অধিকারকে সীমিত করছে। এর ফলে গণতন্ত্রের ভিত্তি দুর্বল হচ্ছে এবং স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।”
এই মানবাধিকার কর্মী বলেন, “এই সংকট থেকে উত্তরণে রাষ্ট্রের প্রথম দায়িত্ব হলো দ্রুত ও নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করা। এ ছাড়া কার্যকর সাংবাদিক সুরক্ষা আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরপেক্ষ ভূমিকা, সাংবাদিক সমাজের মধ্যে ঐক্য এবং নাগরিক ও পেশাজীবী সংগঠন ও রাজনৈতিক দলের সমন্বিত প্রতিরোধই মূল প্রতিকার। এসব পদক্ষেপ না নিলে সাংবাদিকরা নিরাপদ থাকতে পারবে না এবং গণতন্ত্রে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।”