ড. শাফিউল ইসলাম

একটি জাতির শক্তি কেবল তার অর্থনীতি, সামরিক সক্ষমতা কিংবা অবকাঠামোর ওপর নির্ভর করে না। তার প্রকৃত শক্তি নির্ভর করে জ্ঞানচর্চা, মূল্যবোধ, উদ্ভাবনক্ষমতা এবং নেতৃত্ব তৈরির সক্ষমতার ওপর। এই চার শক্তির কেন্দ্রবিন্দু হলো বিশ্ববিদ্যালয়। তাই বিশ্ববিদ্যালয় দুর্বল হলে জাতিও দুর্বল হবে–এ কথা কোনো অলংকারমূলক উক্তি নয়; এটি ইতিহাস, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও উন্নয়ন অর্থনীতির এক কঠোর সত্য।
আজকের বিশ্বে উন্নয়নকে অনেকে দৃশ্যমান অবকাঠামোর সঙ্গে একাকার করে ফেলেন। কিন্তু ইতিহাস বলে, যে জাতি কেবল ইট-পাথরের উন্নয়ন করেছে অথচ জ্ঞানভিত্তিক প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল হতে দিয়েছে, সে জাতি দীর্ঘমেয়াদে পিছিয়ে পড়েছে। কারণ সেতু নির্মাণ রাষ্ট্রকে চলাচলের সুবিধা দেয়, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণ রাষ্ট্রকে ভবিষ্যৎ দেয়।
বিশ্ববিদ্যালয় কেন জাতির শক্তির উৎস
প্রাচীন গ্রিসে প্লেটোর একাডেমি, ভারতের নালন্দা, ইসলামী বিশ্বের আল-কারাউইন, ইউরোপের বোলোনিয়া ও অক্সফোর্ড–এসব প্রতিষ্ঠান শুধু পাঠদান করেনি; তারা সভ্যতার দিকনির্দেশনা দিয়েছে। ফ্রান্সিস বেকনের বহুল উদ্ধৃত উক্তি, “Knowledge is power”– আজও সমান সত্য। জ্ঞানই যদি শক্তি হয়, তবে বিশ্ববিদ্যালয় সেই শক্তির ভাণ্ডার। ফলে যে সমাজ তার বিশ্ববিদ্যালয়কে দুর্বল হতে দেয়, সে সমাজ নিজের শক্তির উৎসকেই ক্ষয় করে।
জন হেনরি নিউম্যান তার The Idea of a University গ্রন্থে বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘Universal knowledge’-এর কেন্দ্র বলে বর্ণনা করেছিলেন। তার মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ কেবল পেশাজীবী তৈরি করা নয়; বরং বুদ্ধিবৃত্তিক মানুষ তৈরি করা। আজ যদি বিশ্ববিদ্যালয় শুধু সনদ বিতরণের কেন্দ্রে পরিণত হয়, তবে জাতি দক্ষ শ্রমিক পেতে পারে, কিন্তু দূরদর্শী চিন্তক, নৈতিক নেতা ও সৃজনশীল উদ্ভাবক পাবে না।
দুর্বল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ফল: জ্ঞানচর্চার মৃত্যু
বিশ্ববিদ্যালয় দুর্বল হওয়ার প্রথম লক্ষণ দেখা যায় জ্ঞানচর্চার অবক্ষয়ে। যেখানে মুক্ত বিতর্ক নেই, গবেষণার স্বাধীনতা নেই, প্রশ্ন করার সাহস নেই–সেখানে ডিগ্রি হয়তো দেওয়া যায়, কিন্তু শিক্ষা দেওয়া যায় না। এখানে শিক্ষা নয়–সনদ উৎপাদন হয়। মুখস্থবিদ্যা, নকল সংস্কৃতি, দলীয় আনুগত্য কিংবা প্রশাসনিক ভীতি যখন জ্ঞানচর্চাকে প্রতিস্থাপন করে, তখন জাতির বৌদ্ধিক মেরুদণ্ড ভেঙে পড়ে। আর বিশ্ববিদ্যালয় যদি সত্য অনুসন্ধানের জায়গা না হয়ে সুবিধা বণ্টনের জায়গা হয়, তবে সেখান থেকে সৃজনশীল বিজ্ঞানী, স্বাধীন চিন্তক, নীতিনিষ্ঠ বিচারক বা দূরদর্শী প্রশাসক বের হবে না। বের হবে কেবল মানিয়ে নেওয়া মানুষ–যারা প্রশ্ন করে না, কেবল অনুসরণ করে।
দ্বিতীয় ফল: গবেষণাহীন অর্থনীতি
আধুনিক রাষ্ট্রে বিশ্ববিদ্যালয় শুধু পাঠদান প্রতিষ্ঠান নয়; এটি গবেষণা ও উদ্ভাবনের কেন্দ্র। যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি বিপ্লব (সিলিকন ভ্যালি), জার্মানির প্রকৌশল উৎকর্ষ, দক্ষিণ কোরিয়ার শিল্পায়ন, জাপানের যুদ্ধোত্তর পুনর্গঠন–সব ক্ষেত্রেই শক্তিশালী বিশ্ববিদ্যালয়ব্যবস্থা ছিল কেন্দ্রীয় চালিকা শক্তি।
ক্লার্ক কের তার The Uses of the University গ্রন্থে দেখিয়েছেন, আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম ইঞ্জিনে পরিণত হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় দুর্বল হলে গবেষণা দুর্বল হয়; গবেষণা দুর্বল হলে শিল্প দুর্বল হয়; শিল্প দুর্বল হলে কর্মসংস্থান দুর্বল হয়। তখন জাতি প্রযুক্তি আমদানি করে, মেধা রপ্তানি করে। যে দেশ নিজে জ্ঞান উৎপাদন করতে পারে না, তাকে অন্যের জ্ঞান কিনে নিতে হয়। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল রাষ্ট্রে যদি বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণায় পিছিয়ে থাকে, তবে আমরা অন্যের প্রযুক্তি কিনব, অন্যের তত্ত্ব ধার করব, অন্যের সমাধানের ওপর নির্ভর করব। এতে জাতির আত্মনির্ভরতা দুর্বল হয়।
তৃতীয় ফল: নেতৃত্বের সংকট
বিশ্ববিদ্যালয় দুর্বল হলে নেতৃত্ব সংকট তৈরি হয়। ইতিহাসে দেখা যায়, বহু গণতান্ত্রিক আন্দোলন, মুক্তিসংগ্রাম, সামাজিক সংস্কার ও সাংস্কৃতিক জাগরণের নেতৃত্ব এসেছে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে। ভারতীয় উপমহাদেশে ভাষা আন্দোলন, স্বাধীনতা সংগ্রাম, গণতান্ত্রিক আন্দোলন– সবখানেই শিক্ষার্থীদের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিশ্ববিদ্যালয় তরুণদের কেবল তথ্য দেয় না, চেতনা দেয়; কেবল পেশা দেয় না, দায়িত্ববোধ শেখায়। কারণ তরুণ মন যখন জ্ঞান, যুক্তি ও নৈতিক সাহসের সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন সমাজ এগোয়। বাংলাদেশে চব্বিশের জুলাই বিপ্লব তারই একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
কিন্তু যখন বিশ্ববিদ্যালয় সহিংসতা, দলীয় দখল, ভয়ভীতি ও অনিয়মের কেন্দ্রে পরিণত হয়, তখন নেতৃত্ব নয়–গোষ্ঠীস্বার্থ জন্ম নেয়। অনুসারী তৈরি হয়, সুবিধাভোগী তৈরি হয় কিন্তু নাগরিক তৈরি হয় না। মতের ভিন্নতা সহ্য না করার সংস্কৃতি পরে জাতীয় রাজনীতিতেও ছড়িয়ে পড়ে।
আজ ক্যাম্পাসে ভিন্নমত দমন করা হয়। সংসদে তা পুনরাবৃত্তি হয়। আজ যদি ছাত্ররাজনীতি সেবার বদলে শক্তিপ্রদর্শনে সীমাবদ্ধ হয়, কাল জাতীয় রাজনীতিও তাই হবে–এটি আমরা দেখেছি।
চতুর্থ ফল: সামাজিক বৈষম্য বৃদ্ধি
বিশ্ববিদ্যালয় দুর্বল হলে সামাজিক বৈষম্য বাড়ে। শক্তিশালী বিশ্ববিদ্যালয় দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীর জন্য সামাজিক গতিশীলতার পথ খুলে দেয়। নিম্নবিত্ত পরিবারের একজন ছাত্র বা ছাত্রী উচ্চশিক্ষার মাধ্যমে মধ্যবিত্ত কিংবা নেতৃত্বের স্তরে উঠতে পারে। কিন্তু যখন শিক্ষার মান নেমে যায়, সেশনজট বাড়ে, নিয়োগে অনিয়ম হয়, গবেষণার সুযোগ সংকুচিত হয়-তখন কেবল বিত্তবান শ্রেণি বিদেশে বা ব্যয়বহুল বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চলে যায়, আর সাধারণ মানুষ আটকে পড়ে নিম্নমানের ব্যবস্থায়। ফলে শিক্ষা সমতার হাতিয়ার না হয়ে বৈষম্যের যন্ত্রে পরিণত হয়।
বাংলাদেশের বাস্তবতা
বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই প্রশ্ন আরও জরুরি। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অনেক সাফল্য আছে–মেধাবী শিক্ষক, প্রতিভাবান শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়া গবেষণাও আছে। কিন্তু একই সঙ্গে আছে বাজেট সংকট, গবেষণায় স্বল্প বিনিয়োগ, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, প্রশাসনিক জটিলতা, দলীয় প্রভাব, শিক্ষক নিয়োগে বিতর্ক, শিক্ষার্থী রাজনীতির সহিংসতা, এবং বিশ্বমানের র্যাংকিংয়ে পিছিয়ে থাকা। এই সমস্যাগুলো দীর্ঘমেয়াদে জাতির সক্ষমতাকে ক্ষয় করে। কারণ বিশ্ববিদ্যালয় দুর্বল থাকলে প্রশাসন দুর্বল হবে, চিকিৎসা দুর্বল হবে, প্রকৌশল দুর্বল হবে, বিচারব্যবস্থা দুর্বল হবে–অর্থাৎ রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতিটি স্তরে এর প্রতিফলন পড়বে।
ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ ও দার্শনিক আর্নল্ড টয়েনবি লিখেছিলেন, সভ্যতার পতন ঘটে বাইরে থেকে আঘাতে নয়, ভেতরের সৃজনশীল শক্তি নিঃশেষ হলে। বিশ্ববিদ্যালয় সেই সৃজনশীল শক্তির প্রধান উৎস। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের সংকট কেবল শিক্ষা খাতের সংকট নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং সাংস্কৃতিক ভবিষ্যতের সংকট।
উন্নয়ন বনাম জ্ঞান: ভুল দ্বন্দ্ব
অনেকে মনে করেন, আগে অবকাঠামো, পরে শিক্ষা। বাস্তবে এই বিভাজন ভুল। উন্নয়ন ও বিশ্ববিদ্যালয় পরস্পরের বিকল্প নয়; পরস্পরের শর্ত। দক্ষ প্রকৌশলী, পরিকল্পনাবিদ, অর্থনীতিবিদ, বিজ্ঞানী, প্রশাসক ছাড়া বড় উন্নয়ন প্রকল্পও টেকসই হয় না।
সেতু নির্মাণের জন্যও বিশ্ববিদ্যালয় লাগে। ডিজিটাল অর্থনীতির জন্যও বিশ্ববিদ্যালয় লাগে। জলবায়ু অভিযোজনের জন্যও বিশ্ববিদ্যালয় লাগে। স্বাস্থ্যনীতি, কৃষি উদ্ভাবন, নগর পরিকল্পনা– সবকিছুর ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয় আছে।
সমাধান কী?
সমাধান আছে। প্রথমত, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, গবেষণায় জিডিপির উল্লেখযোগ্য অংশ বিনিয়োগ করতে হবে। তৃতীয়ত, শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতিতে স্বচ্ছতা ও মেধাকে প্রধান মানদণ্ড করতে হবে। চতুর্থত, ক্যাম্পাসে সহিংসতার বদলে বুদ্ধিবৃত্তিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। পঞ্চমত, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, ডিজিটাল লাইব্রেরি, ল্যাবরেটরি ও উদ্ভাবন তহবিল বাড়াতে হবে। ষষ্ঠত, বিশ্ববিদ্যালয়কে ধ্বংসের পাঁয়তারাকারীদের চিহ্নিত করে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সপ্তমত, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে লেজুড়বৃত্তিক সকল রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করতে হবে। অষ্টমত, নেতৃত্ব বিকাশে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্র সংসদ অরাজনৈতিক বৈশিষ্ট্য নিশ্চিত করতে নিয়মিত শিক্ষার্থীদের দিয়ে চালু রাখতে হবে। নবমত, ক্যাম্পাসে সহিংসতার বদলে বিতর্ক ও সহনশীলতার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। দশমত, শিল্পখাত-বিশ্ববিদ্যালয় সংযোগ বড়াতে হবে।
সর্বোপরি, বিশ্ববিদ্যালয়কে রাজনৈতিক ক্ষমতার ময়দান বা লুটের ক্ষেত্র নয়, জাতি গঠনের পবিত্র প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়কে রাজনৈতিক সম্পদ নয়–জাতীয় সম্পদ হিসেবে দেখতে হবে।
নেলসন ম্যান্ডেলা বলেছিলেন, “Education is the most powerful weapon which you can use to change the world.” শিক্ষা যদি পরিবর্তনের অস্ত্র হয়, তবে বিশ্ববিদ্যালয় সেই অস্ত্রের কারখানা। সেই শিক্ষার সর্বোচ্চ কারখানা বা দুর্গ যদি দুর্বল হয়, তবে জাতির হাতে আর কোনো শক্তিশালী অস্ত্র অবশিষ্ট থাকে না। তাই বিশ্ববিদ্যালয় রক্ষা করা মানে কেবল কিছু ক্যাম্পাস রক্ষা করা নয়; এটি জাতির ভবিষ্যৎ রক্ষা করা।
স্মরণ রাখা দরকার–রাস্তা, সেতু, মেট্রোরেল, বিদ্যুৎকেন্দ্র একটি দেশকে দৃশ্যমান উন্নয়ন দেয়; কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় দেয় অদৃশ্য শক্তি–চিন্তা, চরিত্র, উদ্ভাবন ও নেতৃত্ব। দৃশ্যমান উন্নয়ন ভেঙে পড়তে পারে; কিন্তু অদৃশ্য শক্তি টিকে থাকলে জাতি আবার উঠে দাঁড়ায়। আর সে কারণেই বলা যায়, বিশ্ববিদ্যালয় দুর্বল হলে, জাতিও দুর্বল হবে।
তাই আজ প্রশ্ন: আমরা কি কেবল ভবন তুলব, নাকি ভবিষ্যৎ গড়ব? ক্ষমতায় ময়দান বানাবো নাকি জ্ঞান চর্চার কেন্দ্র বানাব? উত্তর পেতেই হবে। অন্যথা নয়। কারণ সত্যটি নির্মম–বিশ্ববিদ্যালয় দুর্বল হলে, জাতিও দুর্বল হবে।
লেখক: প্রফেসর, লোকপ্রশাসন বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

একটি জাতির শক্তি কেবল তার অর্থনীতি, সামরিক সক্ষমতা কিংবা অবকাঠামোর ওপর নির্ভর করে না। তার প্রকৃত শক্তি নির্ভর করে জ্ঞানচর্চা, মূল্যবোধ, উদ্ভাবনক্ষমতা এবং নেতৃত্ব তৈরির সক্ষমতার ওপর। এই চার শক্তির কেন্দ্রবিন্দু হলো বিশ্ববিদ্যালয়। তাই বিশ্ববিদ্যালয় দুর্বল হলে জাতিও দুর্বল হবে–এ কথা কোনো অলংকারমূলক উক্তি নয়; এটি ইতিহাস, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও উন্নয়ন অর্থনীতির এক কঠোর সত্য।
আজকের বিশ্বে উন্নয়নকে অনেকে দৃশ্যমান অবকাঠামোর সঙ্গে একাকার করে ফেলেন। কিন্তু ইতিহাস বলে, যে জাতি কেবল ইট-পাথরের উন্নয়ন করেছে অথচ জ্ঞানভিত্তিক প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল হতে দিয়েছে, সে জাতি দীর্ঘমেয়াদে পিছিয়ে পড়েছে। কারণ সেতু নির্মাণ রাষ্ট্রকে চলাচলের সুবিধা দেয়, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণ রাষ্ট্রকে ভবিষ্যৎ দেয়।
বিশ্ববিদ্যালয় কেন জাতির শক্তির উৎস
প্রাচীন গ্রিসে প্লেটোর একাডেমি, ভারতের নালন্দা, ইসলামী বিশ্বের আল-কারাউইন, ইউরোপের বোলোনিয়া ও অক্সফোর্ড–এসব প্রতিষ্ঠান শুধু পাঠদান করেনি; তারা সভ্যতার দিকনির্দেশনা দিয়েছে। ফ্রান্সিস বেকনের বহুল উদ্ধৃত উক্তি, “Knowledge is power”– আজও সমান সত্য। জ্ঞানই যদি শক্তি হয়, তবে বিশ্ববিদ্যালয় সেই শক্তির ভাণ্ডার। ফলে যে সমাজ তার বিশ্ববিদ্যালয়কে দুর্বল হতে দেয়, সে সমাজ নিজের শক্তির উৎসকেই ক্ষয় করে।
জন হেনরি নিউম্যান তার The Idea of a University গ্রন্থে বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘Universal knowledge’-এর কেন্দ্র বলে বর্ণনা করেছিলেন। তার মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ কেবল পেশাজীবী তৈরি করা নয়; বরং বুদ্ধিবৃত্তিক মানুষ তৈরি করা। আজ যদি বিশ্ববিদ্যালয় শুধু সনদ বিতরণের কেন্দ্রে পরিণত হয়, তবে জাতি দক্ষ শ্রমিক পেতে পারে, কিন্তু দূরদর্শী চিন্তক, নৈতিক নেতা ও সৃজনশীল উদ্ভাবক পাবে না।
দুর্বল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ফল: জ্ঞানচর্চার মৃত্যু
বিশ্ববিদ্যালয় দুর্বল হওয়ার প্রথম লক্ষণ দেখা যায় জ্ঞানচর্চার অবক্ষয়ে। যেখানে মুক্ত বিতর্ক নেই, গবেষণার স্বাধীনতা নেই, প্রশ্ন করার সাহস নেই–সেখানে ডিগ্রি হয়তো দেওয়া যায়, কিন্তু শিক্ষা দেওয়া যায় না। এখানে শিক্ষা নয়–সনদ উৎপাদন হয়। মুখস্থবিদ্যা, নকল সংস্কৃতি, দলীয় আনুগত্য কিংবা প্রশাসনিক ভীতি যখন জ্ঞানচর্চাকে প্রতিস্থাপন করে, তখন জাতির বৌদ্ধিক মেরুদণ্ড ভেঙে পড়ে। আর বিশ্ববিদ্যালয় যদি সত্য অনুসন্ধানের জায়গা না হয়ে সুবিধা বণ্টনের জায়গা হয়, তবে সেখান থেকে সৃজনশীল বিজ্ঞানী, স্বাধীন চিন্তক, নীতিনিষ্ঠ বিচারক বা দূরদর্শী প্রশাসক বের হবে না। বের হবে কেবল মানিয়ে নেওয়া মানুষ–যারা প্রশ্ন করে না, কেবল অনুসরণ করে।
দ্বিতীয় ফল: গবেষণাহীন অর্থনীতি
আধুনিক রাষ্ট্রে বিশ্ববিদ্যালয় শুধু পাঠদান প্রতিষ্ঠান নয়; এটি গবেষণা ও উদ্ভাবনের কেন্দ্র। যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি বিপ্লব (সিলিকন ভ্যালি), জার্মানির প্রকৌশল উৎকর্ষ, দক্ষিণ কোরিয়ার শিল্পায়ন, জাপানের যুদ্ধোত্তর পুনর্গঠন–সব ক্ষেত্রেই শক্তিশালী বিশ্ববিদ্যালয়ব্যবস্থা ছিল কেন্দ্রীয় চালিকা শক্তি।
ক্লার্ক কের তার The Uses of the University গ্রন্থে দেখিয়েছেন, আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম ইঞ্জিনে পরিণত হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় দুর্বল হলে গবেষণা দুর্বল হয়; গবেষণা দুর্বল হলে শিল্প দুর্বল হয়; শিল্প দুর্বল হলে কর্মসংস্থান দুর্বল হয়। তখন জাতি প্রযুক্তি আমদানি করে, মেধা রপ্তানি করে। যে দেশ নিজে জ্ঞান উৎপাদন করতে পারে না, তাকে অন্যের জ্ঞান কিনে নিতে হয়। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল রাষ্ট্রে যদি বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণায় পিছিয়ে থাকে, তবে আমরা অন্যের প্রযুক্তি কিনব, অন্যের তত্ত্ব ধার করব, অন্যের সমাধানের ওপর নির্ভর করব। এতে জাতির আত্মনির্ভরতা দুর্বল হয়।
তৃতীয় ফল: নেতৃত্বের সংকট
বিশ্ববিদ্যালয় দুর্বল হলে নেতৃত্ব সংকট তৈরি হয়। ইতিহাসে দেখা যায়, বহু গণতান্ত্রিক আন্দোলন, মুক্তিসংগ্রাম, সামাজিক সংস্কার ও সাংস্কৃতিক জাগরণের নেতৃত্ব এসেছে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে। ভারতীয় উপমহাদেশে ভাষা আন্দোলন, স্বাধীনতা সংগ্রাম, গণতান্ত্রিক আন্দোলন– সবখানেই শিক্ষার্থীদের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিশ্ববিদ্যালয় তরুণদের কেবল তথ্য দেয় না, চেতনা দেয়; কেবল পেশা দেয় না, দায়িত্ববোধ শেখায়। কারণ তরুণ মন যখন জ্ঞান, যুক্তি ও নৈতিক সাহসের সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন সমাজ এগোয়। বাংলাদেশে চব্বিশের জুলাই বিপ্লব তারই একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
কিন্তু যখন বিশ্ববিদ্যালয় সহিংসতা, দলীয় দখল, ভয়ভীতি ও অনিয়মের কেন্দ্রে পরিণত হয়, তখন নেতৃত্ব নয়–গোষ্ঠীস্বার্থ জন্ম নেয়। অনুসারী তৈরি হয়, সুবিধাভোগী তৈরি হয় কিন্তু নাগরিক তৈরি হয় না। মতের ভিন্নতা সহ্য না করার সংস্কৃতি পরে জাতীয় রাজনীতিতেও ছড়িয়ে পড়ে।
আজ ক্যাম্পাসে ভিন্নমত দমন করা হয়। সংসদে তা পুনরাবৃত্তি হয়। আজ যদি ছাত্ররাজনীতি সেবার বদলে শক্তিপ্রদর্শনে সীমাবদ্ধ হয়, কাল জাতীয় রাজনীতিও তাই হবে–এটি আমরা দেখেছি।
চতুর্থ ফল: সামাজিক বৈষম্য বৃদ্ধি
বিশ্ববিদ্যালয় দুর্বল হলে সামাজিক বৈষম্য বাড়ে। শক্তিশালী বিশ্ববিদ্যালয় দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীর জন্য সামাজিক গতিশীলতার পথ খুলে দেয়। নিম্নবিত্ত পরিবারের একজন ছাত্র বা ছাত্রী উচ্চশিক্ষার মাধ্যমে মধ্যবিত্ত কিংবা নেতৃত্বের স্তরে উঠতে পারে। কিন্তু যখন শিক্ষার মান নেমে যায়, সেশনজট বাড়ে, নিয়োগে অনিয়ম হয়, গবেষণার সুযোগ সংকুচিত হয়-তখন কেবল বিত্তবান শ্রেণি বিদেশে বা ব্যয়বহুল বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চলে যায়, আর সাধারণ মানুষ আটকে পড়ে নিম্নমানের ব্যবস্থায়। ফলে শিক্ষা সমতার হাতিয়ার না হয়ে বৈষম্যের যন্ত্রে পরিণত হয়।
বাংলাদেশের বাস্তবতা
বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই প্রশ্ন আরও জরুরি। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অনেক সাফল্য আছে–মেধাবী শিক্ষক, প্রতিভাবান শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়া গবেষণাও আছে। কিন্তু একই সঙ্গে আছে বাজেট সংকট, গবেষণায় স্বল্প বিনিয়োগ, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, প্রশাসনিক জটিলতা, দলীয় প্রভাব, শিক্ষক নিয়োগে বিতর্ক, শিক্ষার্থী রাজনীতির সহিংসতা, এবং বিশ্বমানের র্যাংকিংয়ে পিছিয়ে থাকা। এই সমস্যাগুলো দীর্ঘমেয়াদে জাতির সক্ষমতাকে ক্ষয় করে। কারণ বিশ্ববিদ্যালয় দুর্বল থাকলে প্রশাসন দুর্বল হবে, চিকিৎসা দুর্বল হবে, প্রকৌশল দুর্বল হবে, বিচারব্যবস্থা দুর্বল হবে–অর্থাৎ রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতিটি স্তরে এর প্রতিফলন পড়বে।
ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ ও দার্শনিক আর্নল্ড টয়েনবি লিখেছিলেন, সভ্যতার পতন ঘটে বাইরে থেকে আঘাতে নয়, ভেতরের সৃজনশীল শক্তি নিঃশেষ হলে। বিশ্ববিদ্যালয় সেই সৃজনশীল শক্তির প্রধান উৎস। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের সংকট কেবল শিক্ষা খাতের সংকট নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং সাংস্কৃতিক ভবিষ্যতের সংকট।
উন্নয়ন বনাম জ্ঞান: ভুল দ্বন্দ্ব
অনেকে মনে করেন, আগে অবকাঠামো, পরে শিক্ষা। বাস্তবে এই বিভাজন ভুল। উন্নয়ন ও বিশ্ববিদ্যালয় পরস্পরের বিকল্প নয়; পরস্পরের শর্ত। দক্ষ প্রকৌশলী, পরিকল্পনাবিদ, অর্থনীতিবিদ, বিজ্ঞানী, প্রশাসক ছাড়া বড় উন্নয়ন প্রকল্পও টেকসই হয় না।
সেতু নির্মাণের জন্যও বিশ্ববিদ্যালয় লাগে। ডিজিটাল অর্থনীতির জন্যও বিশ্ববিদ্যালয় লাগে। জলবায়ু অভিযোজনের জন্যও বিশ্ববিদ্যালয় লাগে। স্বাস্থ্যনীতি, কৃষি উদ্ভাবন, নগর পরিকল্পনা– সবকিছুর ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয় আছে।
সমাধান কী?
সমাধান আছে। প্রথমত, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, গবেষণায় জিডিপির উল্লেখযোগ্য অংশ বিনিয়োগ করতে হবে। তৃতীয়ত, শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতিতে স্বচ্ছতা ও মেধাকে প্রধান মানদণ্ড করতে হবে। চতুর্থত, ক্যাম্পাসে সহিংসতার বদলে বুদ্ধিবৃত্তিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। পঞ্চমত, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, ডিজিটাল লাইব্রেরি, ল্যাবরেটরি ও উদ্ভাবন তহবিল বাড়াতে হবে। ষষ্ঠত, বিশ্ববিদ্যালয়কে ধ্বংসের পাঁয়তারাকারীদের চিহ্নিত করে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সপ্তমত, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে লেজুড়বৃত্তিক সকল রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করতে হবে। অষ্টমত, নেতৃত্ব বিকাশে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্র সংসদ অরাজনৈতিক বৈশিষ্ট্য নিশ্চিত করতে নিয়মিত শিক্ষার্থীদের দিয়ে চালু রাখতে হবে। নবমত, ক্যাম্পাসে সহিংসতার বদলে বিতর্ক ও সহনশীলতার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। দশমত, শিল্পখাত-বিশ্ববিদ্যালয় সংযোগ বড়াতে হবে।
সর্বোপরি, বিশ্ববিদ্যালয়কে রাজনৈতিক ক্ষমতার ময়দান বা লুটের ক্ষেত্র নয়, জাতি গঠনের পবিত্র প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়কে রাজনৈতিক সম্পদ নয়–জাতীয় সম্পদ হিসেবে দেখতে হবে।
নেলসন ম্যান্ডেলা বলেছিলেন, “Education is the most powerful weapon which you can use to change the world.” শিক্ষা যদি পরিবর্তনের অস্ত্র হয়, তবে বিশ্ববিদ্যালয় সেই অস্ত্রের কারখানা। সেই শিক্ষার সর্বোচ্চ কারখানা বা দুর্গ যদি দুর্বল হয়, তবে জাতির হাতে আর কোনো শক্তিশালী অস্ত্র অবশিষ্ট থাকে না। তাই বিশ্ববিদ্যালয় রক্ষা করা মানে কেবল কিছু ক্যাম্পাস রক্ষা করা নয়; এটি জাতির ভবিষ্যৎ রক্ষা করা।
স্মরণ রাখা দরকার–রাস্তা, সেতু, মেট্রোরেল, বিদ্যুৎকেন্দ্র একটি দেশকে দৃশ্যমান উন্নয়ন দেয়; কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় দেয় অদৃশ্য শক্তি–চিন্তা, চরিত্র, উদ্ভাবন ও নেতৃত্ব। দৃশ্যমান উন্নয়ন ভেঙে পড়তে পারে; কিন্তু অদৃশ্য শক্তি টিকে থাকলে জাতি আবার উঠে দাঁড়ায়। আর সে কারণেই বলা যায়, বিশ্ববিদ্যালয় দুর্বল হলে, জাতিও দুর্বল হবে।
তাই আজ প্রশ্ন: আমরা কি কেবল ভবন তুলব, নাকি ভবিষ্যৎ গড়ব? ক্ষমতায় ময়দান বানাবো নাকি জ্ঞান চর্চার কেন্দ্র বানাব? উত্তর পেতেই হবে। অন্যথা নয়। কারণ সত্যটি নির্মম–বিশ্ববিদ্যালয় দুর্বল হলে, জাতিও দুর্বল হবে।
লেখক: প্রফেসর, লোকপ্রশাসন বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।