Advertisement Banner

পাকিস্তানকে কাছে টেনে ভারতকে কি দূরে সরাতে পারবে বাংলাদেশ?

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
পাকিস্তানকে কাছে টেনে ভারতকে কি দূরে সরাতে পারবে বাংলাদেশ?
তারেক রহমান। ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া

ভারত, চীন ও পাকিস্তানকে ঘিরে বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থান বিশ্বমঞ্চে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। পাকিস্তানে বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ, চীনের সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং একই সময়ে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের উদ্যোগ—এই পদক্ষেপগুলোকে বাংলাদেশের নতুন সরকারের একটি সুনিপুণ ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির অংশ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা। তবে ঢাকার এই কৌশলগত পরিবর্তন ভারতীয় নীতিনির্ধারক মহলে নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক প্রভাব নিয়ে নতুন উদ্বেগেরও সৃষ্টি করেছে।

হংকংভিত্তিক সংবাদমাধ্যম সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, বহু বছর ধরে ভারতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানই ছিল বাংলাদেশের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের অন্যতম প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। পাশাপাশি প্রশাসনিক সহায়তা ও আঞ্চলিক দিকনির্দেশনার ক্ষেত্রেও ভারত ছিল বড় অংশীদার। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের কিছু কর্মকর্তা এখন পাকিস্তানে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রতীকী পরিবর্তন নয়াদিল্লিকে বেশ অস্বস্তিতে ফেলেছে এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে ঢাকা আগামীতে কী ধরনের সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায়, এটি তারই একটি প্রাথমিক ইঙ্গিত।

গত ৪ মে থেকে ২১ মে পর্যন্ত বাংলাদেশের ১২ জন জ্যেষ্ঠ আমলা লাহোরের সিভিল সার্ভিসেস একাডেমিতে একটি উচ্চপর্যায়ের নির্বাহী প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে অংশ নেন। বিশ্লেষকদের ধারণা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আমলে ঢাকা ভারতের সঙ্গে একতরফা ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখলেও, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশের জন্য আরও বেশি কূটনৈতিক পরিসর তৈরি করতে চাইছেন। এই পদক্ষেপ মূলত সেই কৌশলেরই প্রতিফলন।

সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট আরও উল্লেখ করেছে যে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির গতিপ্রকৃতি অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে প্রতিবেশী ভারত। বিশেষ করে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ এবং জামায়াতে ইসলামীর মতো ইসলামপন্থী দলগুলোর ক্রমবর্ধমান প্রভাব নিয়ে দিল্লির সুনির্দিষ্ট উদ্বেগ রয়েছে। ভারতের আশঙ্কা, এর ফলে তাদের পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্তে নিরাপত্তা-সংক্রান্ত পুরোনো ঝুঁকিগুলো আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে।

ফাইল ছবি
ফাইল ছবি

তবে ভারতের পর্যবেক্ষকেরা বলছেন, পাকিস্তানে অল্পসংখ্যক কর্মকর্তা প্রশিক্ষণ নিতে গেলেও ভারত এখনো ই-গভর্ন্যান্স, জননীতি ও শিক্ষাসহ নানা বিষয়ে বাংলাদেশের একাধিক প্রতিনিধি দলকে নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও দ্বিপাক্ষিক সফরের সুযোগ দিয়ে আসছে।

একই সময়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারও ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের বিদ্যমান টানাপোড়েন কমিয়ে নতুনভাবে কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলার বাস্তবমুখী উদ্যোগ নিয়েছে। উল্লেখ্য, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দুই দেশের সম্পর্কে দীর্ঘ সময় ধরে এক ধরনের অস্বস্তি বিরাজ করছিল।

সেই অস্বস্তি কাটাতে গত মাসে ভারতের দিল্লি সফর করেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। ঢাকায় নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এটিই ছিল দুই দেশের মধ্যে প্রথম উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক যোগাযোগ।

ভারতের হরিয়ানাভিত্তিক ও.পি. জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক শ্রীরাধা দত্ত বলেন, “বাংলাদেশ সরকার মূলত এই অঞ্চলে একটি শক্তির ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করছে।” তার মতে, শেখ হাসিনার সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের মধ্যে আবেগ ও বিশেষ ঘনিষ্ঠতার একটি দিক ছিল। তবে বর্তমান ঢাকা প্রশাসন সম্ভবত আরও বাস্তবভিত্তিক ও ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গিতে এগোবে, যাতে দুই দেশই সমানভাবে লাভবান হয়—এমন চুক্তি সম্পাদন করা যায়।

ইতিমধ্যে দুই দেশ ধাপে ধাপে আবার ভিসা সেবা চালু করেছে। একই সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক চুক্তির অংশ হিসেবে ভারত বাংলাদেশকে জরুরি জ্বালানি সহায়তাও দিয়েছে। বিশেষ করে, সাম্প্রতিক ইরান যুদ্ধজনিত বৈশ্বিক সংকটের সময় তীব্র জ্বালানি ঘাটতি সামাল দিতে বাংলাদেশকে অতিরিক্ত ডিজেল সরবরাহ করে পাশে দাঁড়িয়েছে ভারত।

অধ্যাপক শ্রীরাধা দত্ত আরও যোগ করেন, “তারা ভারতের সঙ্গে কাজ করতে চায়, এ নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই। বাংলাদেশি কর্মকর্তারা খুব ভালো করেই বুঝতে পারেন যে দেশের বর্তমান অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে ভারতের সহযোগিতা কতটা প্রয়োজন।”

অর্থনৈতিক সংকট ও পাকিস্তানের সীমাবদ্ধতা

বর্তমানে বাংলাদেশ একাধিক অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সমস্যার মুখোমুখি। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি শ্লথ হয়ে যাওয়া, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাওয়া এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে পরিস্থিতি বেশ কঠিন হয়ে উঠেছে। বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি ও সারের দাম বেড়ে যাওয়ায় এই সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিনের নিজস্ব অর্থনৈতিক সমস্যায় জর্জরিত থাকা পাকিস্তানের উৎপাদন সক্ষমতা ও বাণিজ্যিক অবকাঠামো কোনোভাবেই বাংলাদেশের বিশাল আমদানি চাহিদা পূরণের জন্য যথেষ্ট নয়।

শ্রীরাধা দত্তের মতে, বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনে পাকিস্তান অত্যন্ত আগ্রহী। আর সে কারণেই সরকারি কর্মকর্তাদের এই প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালিয়ে যেতে রাজি হয়েছে ঢাকার নতুন সরকার; কারণ তারা এই ধরনের কেবল প্রশাসনিক সহযোগিতায় কোনো কৌশলগত ক্ষতি দেখছে না।

মতাদর্শের দ্বন্দ্ব ও ঐতিহাসিক বাস্তবতা

তবে পর্যবেক্ষকদের মতে, পাকিস্তানে সরকারি কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে পাঠানোর মতো নীতিগত পদক্ষেপের অর্থ এই নয় যে বাংলাদেশ ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের রক্তক্ষয়ী ইতিহাস ভুলে গেছে। পশ্চিম পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দমনপীড়ন থেকে মুক্ত হতে এক মহাসংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীন হয়েছিল বাংলাদেশ।

দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক লেখক ও লন্ডনভিত্তিক গবেষক প্রিয়জিৎ দেবসরকার বলেন, বাংলাদেশে মূলত দুটি বড় ধরনের রাজনৈতিক ও সামাজিক মতধারা রয়েছে। একটি হলো—মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে যুক্ত রক্ষণশীল ধারা। অন্যটি হলো—ইসলামপন্থী ধারা, যারা পাকিস্তানের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা বজায় রাখতে চায়।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান।

তার ভাষ্যমতে, দ্বিতীয় ধারার সমর্থকেরা মূলত ‘ইসলামি উম্মাহ’-র ধারণাকে সমর্থন করে, যেখানে বিভিন্ন মুসলিম দেশ পাকিস্তানের নেতৃত্বে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত থাকবে। তবে দেবসরকার মনে করেন, এই ধারণা বাস্তবায়ন বাংলাদেশের জন্য সহজ নয়। কারণ সাম্প্রতিক সময়ে ইরান যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট জ্বালানি সংকট কিংবা বিগত কোভিড-১৯ মহামারির মতো কঠিন সময়ে ভারতই সবসময় দ্রুত বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়েছে।

চীনের প্রবেশ ও ভারতের নতুন ‘বাংলাদেশ নীতি’

ভারতের অশোকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক উদয় চন্দ্রের মতে, ঢাকার এই নতুন কৌশল হলো বিশ্বমঞ্চে দেশের অবস্থান শক্তিশালী করার একটি প্রয়াস, রাষ্ট্রের মৌলিক ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান বদলে ফেলার কোনো উদ্যোগ নয়। তিনি বলেন, “হাসিনা-পরবর্তী সময়ে নতুন সরকার নিজের জন্য আরও বেশি কূটনৈতিক স্বাধীনতা চাইছে। এর অংশ হিসেবেই চীন ও পাকিস্তানের সঙ্গে দৃশ্যমান যোগাযোগ বাড়ানো হচ্ছে।”

এরই ধারাবাহিকতায়, চলতি মাসের শুরুতে বাংলাদেশ তার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ 'তিস্তা নদী পুনরুদ্ধার প্রকল্পে' সহায়তার জন্য চীনের কাছে আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানিয়েছে। কৌশলগতভাবে এই নদীটি ভারতের শিলিগুড়ি করিডোরের অত্যন্ত কাছ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। ‘চিকেনস নেক’ নামে পরিচিত এই সরু ভূখণ্ডটি ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোকে দেশটির মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করেছে, যা ভারতের নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশ যেভাবে নতুন করে বেইজিং ও ইসলামাবাদের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ বাড়াচ্ছে, তা ভারতের কৌশলগত নিরাপত্তা উদ্বেগ বাড়াতে বাধ্য।

অধ্যাপক উদয় চন্দ্র বলেন, ভারতের এখন মূল উদ্বেগ হচ্ছে—ঢাকা হয়তো দিল্লির সঙ্গে সম্পর্ক নতুন করে নির্ধারণ বা দরকষাকষির ক্ষেত্রে চীন ও পাকিস্তানকে 'হাতিয়ার' হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। এই পরিস্থিতিতে ভারতের এখন স্পষ্টতই একটি নতুন ‘বাংলাদেশ নীতি’ প্রয়োজন। এই নতুন নীতি মূলত বাংলাদেশে কোনো নির্দিষ্ট দল বা ব্যক্তির ওপর কম নির্ভরশীল হবে এবং একই সঙ্গে বাংলাদেশের সামগ্রিক জনমতকে বেশি গুরুত্ব দেবে।

উদয় চন্দ্রের মতে, সীমান্ত হত্যা, তিস্তার পানি বণ্টন এবং শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থানের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে ঢাকার নতুন সরকার জনসমক্ষে আগের চেয়ে আরও কঠোর ও আপসহীন অবস্থান নিতে পারে। তবে তিনি মনে করেন, ভৌগোলিক অবস্থান, দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য, জ্বালানি এবং আঞ্চলিক যোগাযোগের মতো গভীর বাস্তবতার কারণে বাংলাদেশ এখনো ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত থাকতে বাধ্য।

বাণিজ্যিক নির্ভরতা ও ভবিষ্যৎ সমীকরণ

বিশেষজ্ঞদের সম্মিলিত মত হলো—ভৌগোলিক অভিন্নতা, একই সরবরাহব্যবস্থা এবং স্বল্প দূরত্বের পরিবহন ব্যবস্থার কারণে ভারত থেকে পণ্য আমদানি ও বাণিজ্য করা বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বেশি সাশ্রয়ী, কার্যকর এবং উভয় দেশের জন্যই লাভজনক।

বিশেষ করে খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে ভারতের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। নিত্যপ্রয়োজনীয় পেঁয়াজ, গম ও চালের মতো পণ্য এবং বাংলাদেশের প্রায় ৫ হাজার কোটি ডলারের তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচা তুলা ও সুতার একটি বিশাল অংশ ভারত থেকে আমদানি করতে হয়।

অধ্যাপক উদয় চন্দ্র পরিশেষে বলেন, “যেসব খাতে লাভ এবং জাতীয় স্বার্থ একদম স্পষ্ট—যেমন জ্বালানি, সার ও বিদ্যুৎ আমদানির ক্ষেত্রে, ঢাকা কোনো দ্বিধা ছাড়াই ভারতের সঙ্গে কৌশলগত সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে।”

সম্পর্কিত