আমেরিকা এখন যেটি করছে, সেটি হচ্ছে পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় উত্তেজনা সৃষ্টি করা। তারপর সেগুলো তার প্রক্সির হাতে ছেড়ে দিয়ে অন্য জায়গায় সংঘর্ষ শুরু করা।
বদরুল আলম খান

ইরানের হাতে যুক্তরাষ্ট্রের পরাজয় প্রায় আসন্ন। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের জগতে পরাজয় মেনে নেওয়ার নানা পথ আছে। ইতিমধ্যে তার নানা আলামত লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আমেরিকা এখনো সাদা পতাকা তুলে তার পরাজয় মেনে নেয়নি। কিন্তু বেশ কয়েকটি ঘটনা তার সাক্ষী বলে মনে করি। আমেরিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ৭ মে এক সংবাদ সম্মেলনে জাতিসংঘের দায়িত্বের কথা স্মরণ করেছেন। তিনি বলেছেন, ইরান যেভাবে হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণ করছে, সেটি আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী। তারা পণ্যবাহী জাহাজের ওপর গোলাবর্ষণ করছে। জাতিসংঘের দায়িত্ব এই পরিস্থিতিতে জোরালো ভূমিকা পালন করা এবং ইরানকে নিবৃত করা।
তার বক্তব্যের অর্থ দাঁড়ায়, আমেরিকা তার পরাক্রমশালী নৌবাহিনী এবং বিমানবাহিনীর ক্ষমতা ব্যবহারে আগ্রহী নয়। পররাষ্ট্রমন্ত্রী রুবিও ইতিমধ্যে হয়ত বুঝতে পেরেছেন যে, হরমুজ প্রণালি খোলার কোনো সামর্থ্য আমেরিকার নেই। এটি আমেরিকার পরাজয়ের প্রথম উপসর্গ। কয়েক দিন আগেও আমেরিকা ইরানকে প্রস্তর যুগে পাঠাতে ব্যস্ত ছিল। বেআইনিভাবে ইরানকে আক্রমনের আগে আমেরিকা জাতিসংঘের কথা ভুলে গিয়েছিল কেন, সে প্রশ্ন এক্ষেত্রে অবান্তর নয়।
যাই হোক, এখন পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালিতে এক ধরনের অচলায়তন বিরাজ করছে। মাঝে মধ্যে একে অপরের ওপর আক্রমনের খবর আসছে। কিন্তু কোনো পক্ষই পুনরায় ‘হট ওয়ারে’ ফেরার চিন্তা করছে না। যদিও উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়ের ঘাটতি দেখছি না। প্রশ্ন হচ্ছে, যুদ্ধের গতি কোন দিকে মোড় নেবে। এই ধরনের ‘না যুদ্ধ, না শান্তি’ পরিস্থিতি কি চলতেই থাকবে? অবশ্যই সেটি আশা করা যায় না। ইতিমধ্যে আমেরিকার দেওয়া প্রস্তাব সম্পর্কে ইরানের প্রত্যুত্তর পাকিস্থানের মাধ্যমে ওয়াশিংটনে পৌঁছেছে। প্রেসিডেন্ট ট্র্যাম্প সেটি প্রত্যাখ্যান করেছেন। প্রত্যুত্তরে ইরান তার দাবির তালিকা বৃদ্ধি করে একটি বাড়তি দাবি যোগ করেছে।
হরমুজ প্রণালিকে ইন্টারনেট যোগাযোগের ‘লুকানো হাইওয়ে’ বলা যেতে পারে। বস্তুত পারস্য উপসাগরের তলদেশ দিয়ে ইন্টারনেট কেবলের বিশাল নেটওয়ার্ক আছে। এই নেটওয়ার্ক ৩০ শতাংশ ইন্টারনেট সংযোগ প্রদান করে এবং এর মাধ্যমে প্রতিদিন ৩০ ট্রিলিয়ন ডলারের লেনদেন হয়। ইরান বলছে, আমেরিকা তার দাবি মেনে না নিলে সাতটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ফাইবার অপটিক্স তারা বিছিন্ন করতে পারে।
অন্যদিকে, ইরানের ‘ইসলামিক রেভলুসনারি গার্ড কোর’ বা আইআরজিসি দাবি করছে মার্কিন কোম্পানি মেটা, আমাজন ও মাইক্রোসফট যে ক্যাবল ব্যবহার করে, তার জন্য ইরানকে ডিজিটাল টোল দিতে হবে।
ইতিমধ্যে নিওকনদের গুরু হিসেবে পরিচিত রবার্ট কেগান ‘আটলান্টিক’ পত্রিকায় একটি লেখা ছাপিয়েছেন। কেগান রেজিম চেঞ্জের ক্ষেত্রে সিদ্ধহস্ত কুখ্যাত ভিক্টোরিয়া নুল্যান্দের স্বামী। ওই লেখায় তিনি ইরান যুদ্ধকে আমেরিকার নাস্তানাবুদ হওয়ার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। যাই হোক, তার উপদেশ হচ্ছে, ইরানে মার্কিন সামরিক বাহিনীর স্থল অভিযান ছাড়া বিকল্প কোনো পথ নেই। বিলম্ব না করে এখনই ওই যুদ্ধ শুরু করা প্রয়োজন। তার অর্থ হচ্ছে ডোনাল্ড ট্রাম্প তার উপদেশ মতো যুদ্ধকে তীব্র করার কথা ভাবতে পারেন।
কারণ এখন যেটি মনে হয়, ট্রাম্প নিওকনদের হাতে জিম্মি। সেক্ষেত্রে পুনরায় যুদ্ধ শুরুর আশংকা প্রবল। তবে সেটি কখন শুরু হবে জানি না। প্রেসিডেন্ট ট্র্যাম্প ১৫ মে দুই দিনের সফরে চীন যাচ্ছেন। সেখানে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিনপিঙের সঙ্গে তার আলাপ হবে। ওই আলাপের মুল বিষয়বস্তু দুটি। এক. হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার ব্যাপারে চীনের সাহায্য প্রার্থনা। দুই. ইরান থেকে চীনের পেট্রোলিয়াম ক্রয় সংক্রান্ত আলাপ এবং একই সাথে মার্কিন-চীন বাণিজ্য উত্তেজনা নিয়ে আলোচনা। ফলে আগামি কয়েক দিনের মধ্যে পুনরায় যুদ্ধ শুরুর সম্ভবনা কম। তবে এমনো হতে পারে যে বেজিংএ থাকাকালীন সময়ে প্রেসিডেন্ট ট্র্যাম্প আক্রমনের আদেশ দিলেও দিতে পারেন। সেটি তার চরিত্রগত খামখেয়ালিপনার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ দেখাবে।
তবে যে পরিস্থিতি বিশ্ব ব্যবস্থায় এখন বিরাজ করছে, সেটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এই পরিস্থিতি প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রারম্ভিক কালকে স্মরণ করিয়ে দেয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ঠিক আগে নানা ধরনের উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। ঠিক সেই ধরনের উত্তেজনা আজ আমরা লক্ষ্য করছি বিশ্বব্যাপী। রুশ ইউক্রেন যুদ্ধ এখনো চলছে। আমেরিকা ও ইউরোপ যুদ্ধ চালিয়ে যেতে চায় এই কারণে না যে, তারা ইউক্রেনের জনগণের মঙ্গল নিয়ে উদ্বিগ্ন। বরং ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়াকে ব্যস্ত রেখে ইউরোপ তার সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করার সুযোগ নিতে চায়। তারপর রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করার পরিকল্পনা করবে।
আমেরিকা এখন যেটি করছে, সেটি হচ্ছে পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় উত্তেজনা সৃষ্টি করা। তারপর সেগুলো তার প্রক্সির হাতে ছেড়ে দিয়ে অন্য জায়গায় সংঘর্ষ শুরু করা। ইরানে যুদ্ধ শুরুর কোনো কারণ ছিল না। কিন্তু আমেরিকার উদ্দেশ্য চীন ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকে মধ্যপ্রাচ্যের তেল থেকে বঞ্চিত করা। তারপর আমেরিকার তেল বা গ্যাসের ওপর তাদেরকে নির্ভরশীল করে রাখা।
আফ্রিকা অশান্ত হয়ে উঠছে। মালি নামের দেশটিতে ফ্রান্স ও ইউক্রেনের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় আকস্মিক হামলা লক্ষ্য করা গেল। এই হামলায় ফ্রান্স ও ইউক্রেন এখন আল কায়েদা বা ইসলামিক স্টেটের ক্ষুদ্রাংশকে সার্বভৌম রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিচ্ছে। ওই দেশটি ইউরেনিয়াম এবং অন্যান্য দুষ্প্রাপ্য খনিজ পদার্থে সমৃদ্ধ। ফ্রান্সের অধীনে থাকাকালে দেশটি ফ্রান্সকে ইউরেনিয়াম বিক্রি করত টন প্রতি ২৫ ডলার মুল্যে। অথচ আন্তর্জাতিক বাজারে তার মুল্য ছিল ২৫০ ডলার। ফ্রান্স এই সুবিধা হারায় মালিতে নতুন দেশপ্রেমিক সরকার ক্ষমতা আসার পর।

আফ্রিকার অন্যান্য দেশেও উত্তেজনা বৃদ্ধির পথে। এভাবে বিশ্ব পরিস্থিতি ক্রমান্বয়ে উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। অদুর ভবিষ্যতে আমেরিকা কিউবা আক্রমণ করতে পারে। গ্রিনল্যান্ডও বাদ যাবে না হয়তবা। দক্ষিণ এশিয়ায় উত্তেজনা বৃদ্ধি পেতে পারে। সব মিলিয়ে প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটসাদৃশ্য পরিস্থিতির উদ্ভব হচ্ছে বলে মনে করি।
প্রথম মহাযুদ্ধের পেছনে মূল কারণ ছিল উপনিবেশিক সম্প্রসারণ। সে সময় ব্রিটেন, ফ্রান্স, ডাচ, স্পেন ও জার্মানদের মধ্যে উপনিবেশ দখল নিয়ে রাজনৈতিক সংঘর্ষ চলছিল। নানা ধরনের আঁতাত গড়ে উঠছিল। ফ্রান্স-জার্মান যুদ্ধ শুরু হয় ১৮৭০ সালের দিকে। রাশিয়ায় গৃহযুদ্ধ পরিস্থিতি দেখা দেয়। জার্মানি ব্রিটেনের মধ্যে অস্ত্র প্রতিযোগিতা শুরু থেকে উত্তেজনা বৃদ্ধি পেতে থাকে। ১৮৮২ সালে জার্মানি, ইটালি এবং অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি একটি আঁতাত গঠন করে। এই আঁতাতের উদ্দেশ্য ছিল ফ্রান্সকে নিয়ন্ত্রণে রাখা। একে ট্রিপল অ্যালায়েন্স বলা হয়। এর প্রত্যুত্তরে ১৯০৭ সালে ফ্রান্স, ব্রিটেন ও রাশিয়া ভিন্ন একটি আঁতাতে যোগ দেয়। উদ্দেশ্য, জার্মানিকে ঘায়েল করা। তার নাম ত্রিপল আন্তান্তে। ১৮৯৪ সালে ফ্রান্স ও রাশিয়ার মধ্যে একটি আঁতাত গড়ে ওঠে। এইভাবে পৃথিবী ধীরে ধীরে দুই ভাগে ভাগ হয়ে যায়। এরপর উত্তেজনা তীব্র আকার নেয়। শুরু হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটটিও অনুরূপ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ইউরোপের আন্তঃরাষ্ট্রীয় সংঘাতের সমাধান দিতে পারেনি । ফলে ইউরোপ পুনরায় দুই শিবিরে বিভক্ত হয়। ১৯২১ সালে ফ্রান্স ও পোল্যান্ডের মধ্যে একটি চুক্তি হয়। যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে তারা একে অপরকে সাহায্য করবে–এই ছিল আঁতাতের উদ্দেশ্য। ওই বছর পোল্যান্ড ও রুমানিয়ার মধ্যে আঁতাত গড়ে ওঠে। ১৯৩৫ সালে জার্মানিকে নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য ফ্রান্স এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন একটি চুক্তি সই করে। ১৯৩৯ সালে ব্রিটিশ ও পোল্যান্ডের মধ্যে আঁতাত গড়ে ওঠে ঠিক হিটলারের আক্রমণের আগমুহূর্তে।
পৃথিবীতে যত যুদ্ধ শুরু হয়েছে তার পেছনে ইউরোপ এবং আমেরিকার প্রত্যক্ষ অবদান ছিল। ইউরোপ উপনিবেশিক শক্তি। পৃথিবীর সম্পদ তারা প্রায় চার শতাব্দী ধরে ভোগ করেছে। সেই সুযোগ এখন সীমিত হয়ে আসায় তারা অনেকটা মরিয়া হয়ে পুনরায় যুদ্ধের পাঁয়তারা করছে। এ সব একাধিক যুদ্ধের উদ্দেশ্য বিশ্ব ব্যবস্থায় তার হারানো প্রভাব ফিরিয়ে আনা। যুদ্ধই সেখানে একমাত্র সমাধান। তবে সাম্প্রতিককালের যুদ্ধ উপনিবেশ নিয়ে নয়। এ যুদ্ধ খনিজ সম্পদ এবং বিশ্ব অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণের যুদ্ধ। সেদিক থেকে যদি ভাবি তাহলে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ হয়তবা ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। সময় এসেছে যুদ্ধের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া এবং তার আশঙ্কাকে রোধ করা।
লেখক: ওয়েস্টার্ন সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক।

ইরানের হাতে যুক্তরাষ্ট্রের পরাজয় প্রায় আসন্ন। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের জগতে পরাজয় মেনে নেওয়ার নানা পথ আছে। ইতিমধ্যে তার নানা আলামত লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আমেরিকা এখনো সাদা পতাকা তুলে তার পরাজয় মেনে নেয়নি। কিন্তু বেশ কয়েকটি ঘটনা তার সাক্ষী বলে মনে করি। আমেরিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ৭ মে এক সংবাদ সম্মেলনে জাতিসংঘের দায়িত্বের কথা স্মরণ করেছেন। তিনি বলেছেন, ইরান যেভাবে হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণ করছে, সেটি আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী। তারা পণ্যবাহী জাহাজের ওপর গোলাবর্ষণ করছে। জাতিসংঘের দায়িত্ব এই পরিস্থিতিতে জোরালো ভূমিকা পালন করা এবং ইরানকে নিবৃত করা।
তার বক্তব্যের অর্থ দাঁড়ায়, আমেরিকা তার পরাক্রমশালী নৌবাহিনী এবং বিমানবাহিনীর ক্ষমতা ব্যবহারে আগ্রহী নয়। পররাষ্ট্রমন্ত্রী রুবিও ইতিমধ্যে হয়ত বুঝতে পেরেছেন যে, হরমুজ প্রণালি খোলার কোনো সামর্থ্য আমেরিকার নেই। এটি আমেরিকার পরাজয়ের প্রথম উপসর্গ। কয়েক দিন আগেও আমেরিকা ইরানকে প্রস্তর যুগে পাঠাতে ব্যস্ত ছিল। বেআইনিভাবে ইরানকে আক্রমনের আগে আমেরিকা জাতিসংঘের কথা ভুলে গিয়েছিল কেন, সে প্রশ্ন এক্ষেত্রে অবান্তর নয়।
যাই হোক, এখন পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালিতে এক ধরনের অচলায়তন বিরাজ করছে। মাঝে মধ্যে একে অপরের ওপর আক্রমনের খবর আসছে। কিন্তু কোনো পক্ষই পুনরায় ‘হট ওয়ারে’ ফেরার চিন্তা করছে না। যদিও উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়ের ঘাটতি দেখছি না। প্রশ্ন হচ্ছে, যুদ্ধের গতি কোন দিকে মোড় নেবে। এই ধরনের ‘না যুদ্ধ, না শান্তি’ পরিস্থিতি কি চলতেই থাকবে? অবশ্যই সেটি আশা করা যায় না। ইতিমধ্যে আমেরিকার দেওয়া প্রস্তাব সম্পর্কে ইরানের প্রত্যুত্তর পাকিস্থানের মাধ্যমে ওয়াশিংটনে পৌঁছেছে। প্রেসিডেন্ট ট্র্যাম্প সেটি প্রত্যাখ্যান করেছেন। প্রত্যুত্তরে ইরান তার দাবির তালিকা বৃদ্ধি করে একটি বাড়তি দাবি যোগ করেছে।
হরমুজ প্রণালিকে ইন্টারনেট যোগাযোগের ‘লুকানো হাইওয়ে’ বলা যেতে পারে। বস্তুত পারস্য উপসাগরের তলদেশ দিয়ে ইন্টারনেট কেবলের বিশাল নেটওয়ার্ক আছে। এই নেটওয়ার্ক ৩০ শতাংশ ইন্টারনেট সংযোগ প্রদান করে এবং এর মাধ্যমে প্রতিদিন ৩০ ট্রিলিয়ন ডলারের লেনদেন হয়। ইরান বলছে, আমেরিকা তার দাবি মেনে না নিলে সাতটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ফাইবার অপটিক্স তারা বিছিন্ন করতে পারে।
অন্যদিকে, ইরানের ‘ইসলামিক রেভলুসনারি গার্ড কোর’ বা আইআরজিসি দাবি করছে মার্কিন কোম্পানি মেটা, আমাজন ও মাইক্রোসফট যে ক্যাবল ব্যবহার করে, তার জন্য ইরানকে ডিজিটাল টোল দিতে হবে।
ইতিমধ্যে নিওকনদের গুরু হিসেবে পরিচিত রবার্ট কেগান ‘আটলান্টিক’ পত্রিকায় একটি লেখা ছাপিয়েছেন। কেগান রেজিম চেঞ্জের ক্ষেত্রে সিদ্ধহস্ত কুখ্যাত ভিক্টোরিয়া নুল্যান্দের স্বামী। ওই লেখায় তিনি ইরান যুদ্ধকে আমেরিকার নাস্তানাবুদ হওয়ার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। যাই হোক, তার উপদেশ হচ্ছে, ইরানে মার্কিন সামরিক বাহিনীর স্থল অভিযান ছাড়া বিকল্প কোনো পথ নেই। বিলম্ব না করে এখনই ওই যুদ্ধ শুরু করা প্রয়োজন। তার অর্থ হচ্ছে ডোনাল্ড ট্রাম্প তার উপদেশ মতো যুদ্ধকে তীব্র করার কথা ভাবতে পারেন।
কারণ এখন যেটি মনে হয়, ট্রাম্প নিওকনদের হাতে জিম্মি। সেক্ষেত্রে পুনরায় যুদ্ধ শুরুর আশংকা প্রবল। তবে সেটি কখন শুরু হবে জানি না। প্রেসিডেন্ট ট্র্যাম্প ১৫ মে দুই দিনের সফরে চীন যাচ্ছেন। সেখানে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিনপিঙের সঙ্গে তার আলাপ হবে। ওই আলাপের মুল বিষয়বস্তু দুটি। এক. হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার ব্যাপারে চীনের সাহায্য প্রার্থনা। দুই. ইরান থেকে চীনের পেট্রোলিয়াম ক্রয় সংক্রান্ত আলাপ এবং একই সাথে মার্কিন-চীন বাণিজ্য উত্তেজনা নিয়ে আলোচনা। ফলে আগামি কয়েক দিনের মধ্যে পুনরায় যুদ্ধ শুরুর সম্ভবনা কম। তবে এমনো হতে পারে যে বেজিংএ থাকাকালীন সময়ে প্রেসিডেন্ট ট্র্যাম্প আক্রমনের আদেশ দিলেও দিতে পারেন। সেটি তার চরিত্রগত খামখেয়ালিপনার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ দেখাবে।
তবে যে পরিস্থিতি বিশ্ব ব্যবস্থায় এখন বিরাজ করছে, সেটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এই পরিস্থিতি প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রারম্ভিক কালকে স্মরণ করিয়ে দেয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ঠিক আগে নানা ধরনের উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। ঠিক সেই ধরনের উত্তেজনা আজ আমরা লক্ষ্য করছি বিশ্বব্যাপী। রুশ ইউক্রেন যুদ্ধ এখনো চলছে। আমেরিকা ও ইউরোপ যুদ্ধ চালিয়ে যেতে চায় এই কারণে না যে, তারা ইউক্রেনের জনগণের মঙ্গল নিয়ে উদ্বিগ্ন। বরং ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়াকে ব্যস্ত রেখে ইউরোপ তার সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করার সুযোগ নিতে চায়। তারপর রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করার পরিকল্পনা করবে।
আমেরিকা এখন যেটি করছে, সেটি হচ্ছে পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় উত্তেজনা সৃষ্টি করা। তারপর সেগুলো তার প্রক্সির হাতে ছেড়ে দিয়ে অন্য জায়গায় সংঘর্ষ শুরু করা। ইরানে যুদ্ধ শুরুর কোনো কারণ ছিল না। কিন্তু আমেরিকার উদ্দেশ্য চীন ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকে মধ্যপ্রাচ্যের তেল থেকে বঞ্চিত করা। তারপর আমেরিকার তেল বা গ্যাসের ওপর তাদেরকে নির্ভরশীল করে রাখা।
আফ্রিকা অশান্ত হয়ে উঠছে। মালি নামের দেশটিতে ফ্রান্স ও ইউক্রেনের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় আকস্মিক হামলা লক্ষ্য করা গেল। এই হামলায় ফ্রান্স ও ইউক্রেন এখন আল কায়েদা বা ইসলামিক স্টেটের ক্ষুদ্রাংশকে সার্বভৌম রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিচ্ছে। ওই দেশটি ইউরেনিয়াম এবং অন্যান্য দুষ্প্রাপ্য খনিজ পদার্থে সমৃদ্ধ। ফ্রান্সের অধীনে থাকাকালে দেশটি ফ্রান্সকে ইউরেনিয়াম বিক্রি করত টন প্রতি ২৫ ডলার মুল্যে। অথচ আন্তর্জাতিক বাজারে তার মুল্য ছিল ২৫০ ডলার। ফ্রান্স এই সুবিধা হারায় মালিতে নতুন দেশপ্রেমিক সরকার ক্ষমতা আসার পর।

আফ্রিকার অন্যান্য দেশেও উত্তেজনা বৃদ্ধির পথে। এভাবে বিশ্ব পরিস্থিতি ক্রমান্বয়ে উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। অদুর ভবিষ্যতে আমেরিকা কিউবা আক্রমণ করতে পারে। গ্রিনল্যান্ডও বাদ যাবে না হয়তবা। দক্ষিণ এশিয়ায় উত্তেজনা বৃদ্ধি পেতে পারে। সব মিলিয়ে প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটসাদৃশ্য পরিস্থিতির উদ্ভব হচ্ছে বলে মনে করি।
প্রথম মহাযুদ্ধের পেছনে মূল কারণ ছিল উপনিবেশিক সম্প্রসারণ। সে সময় ব্রিটেন, ফ্রান্স, ডাচ, স্পেন ও জার্মানদের মধ্যে উপনিবেশ দখল নিয়ে রাজনৈতিক সংঘর্ষ চলছিল। নানা ধরনের আঁতাত গড়ে উঠছিল। ফ্রান্স-জার্মান যুদ্ধ শুরু হয় ১৮৭০ সালের দিকে। রাশিয়ায় গৃহযুদ্ধ পরিস্থিতি দেখা দেয়। জার্মানি ব্রিটেনের মধ্যে অস্ত্র প্রতিযোগিতা শুরু থেকে উত্তেজনা বৃদ্ধি পেতে থাকে। ১৮৮২ সালে জার্মানি, ইটালি এবং অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি একটি আঁতাত গঠন করে। এই আঁতাতের উদ্দেশ্য ছিল ফ্রান্সকে নিয়ন্ত্রণে রাখা। একে ট্রিপল অ্যালায়েন্স বলা হয়। এর প্রত্যুত্তরে ১৯০৭ সালে ফ্রান্স, ব্রিটেন ও রাশিয়া ভিন্ন একটি আঁতাতে যোগ দেয়। উদ্দেশ্য, জার্মানিকে ঘায়েল করা। তার নাম ত্রিপল আন্তান্তে। ১৮৯৪ সালে ফ্রান্স ও রাশিয়ার মধ্যে একটি আঁতাত গড়ে ওঠে। এইভাবে পৃথিবী ধীরে ধীরে দুই ভাগে ভাগ হয়ে যায়। এরপর উত্তেজনা তীব্র আকার নেয়। শুরু হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটটিও অনুরূপ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ইউরোপের আন্তঃরাষ্ট্রীয় সংঘাতের সমাধান দিতে পারেনি । ফলে ইউরোপ পুনরায় দুই শিবিরে বিভক্ত হয়। ১৯২১ সালে ফ্রান্স ও পোল্যান্ডের মধ্যে একটি চুক্তি হয়। যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে তারা একে অপরকে সাহায্য করবে–এই ছিল আঁতাতের উদ্দেশ্য। ওই বছর পোল্যান্ড ও রুমানিয়ার মধ্যে আঁতাত গড়ে ওঠে। ১৯৩৫ সালে জার্মানিকে নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য ফ্রান্স এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন একটি চুক্তি সই করে। ১৯৩৯ সালে ব্রিটিশ ও পোল্যান্ডের মধ্যে আঁতাত গড়ে ওঠে ঠিক হিটলারের আক্রমণের আগমুহূর্তে।
পৃথিবীতে যত যুদ্ধ শুরু হয়েছে তার পেছনে ইউরোপ এবং আমেরিকার প্রত্যক্ষ অবদান ছিল। ইউরোপ উপনিবেশিক শক্তি। পৃথিবীর সম্পদ তারা প্রায় চার শতাব্দী ধরে ভোগ করেছে। সেই সুযোগ এখন সীমিত হয়ে আসায় তারা অনেকটা মরিয়া হয়ে পুনরায় যুদ্ধের পাঁয়তারা করছে। এ সব একাধিক যুদ্ধের উদ্দেশ্য বিশ্ব ব্যবস্থায় তার হারানো প্রভাব ফিরিয়ে আনা। যুদ্ধই সেখানে একমাত্র সমাধান। তবে সাম্প্রতিককালের যুদ্ধ উপনিবেশ নিয়ে নয়। এ যুদ্ধ খনিজ সম্পদ এবং বিশ্ব অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণের যুদ্ধ। সেদিক থেকে যদি ভাবি তাহলে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ হয়তবা ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। সময় এসেছে যুদ্ধের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া এবং তার আশঙ্কাকে রোধ করা।
লেখক: ওয়েস্টার্ন সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক।