Advertisement Banner

গণ-অভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক সরকারের প্রথম বাজেট আজ

গণ-অভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক সরকারের প্রথম বাজেট আজ
জাতীয় সংসদ। ছবি: সংগৃহীত

জুলাই ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের পর নয়া রাজনৈতিক বন্দোবস্তে নির্বাচিত প্রথম সরকারের প্রথম জাতীয় বাজেট আজ বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে উত্থাপিত হতে যাচ্ছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এক ভগ্ন, ভঙ্গুর ও দীর্ঘদিনের নীতিগত ভুল সিদ্ধান্তে ক্ষতবিক্ষত অর্থনীতির মাঝে দাঁড়িয়ে পেশ করতে যাচ্ছেন বাংলাদেশের ইতিহাসের সর্ববৃহৎ ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার এই বিশাল বাজেট।

একদিকে জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনাকে ধারণ করে জনআকাঙ্ক্ষা পূরণের ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক দায়; অন্যদিকে তলানিতে নামা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও রাজস্ব ঘাটতির মতো সামষ্টিক অর্থনীতির তীব্র সংকট। এক নজিরবিহীন বৈপরীত্যের মুখে দাঁড়িয়ে অর্থমন্ত্রী এই বাজেট প্রণয়ন করেছেন, যা দেশের অর্থনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম জটিল এক পরীক্ষা হতে যাচ্ছে।

সালেহউদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বাধীন বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের বাজেটটি ছিল মূলত কোনো সংসদীয় বা গণ-অনুমোদনহীন এবং আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের শর্তের আবর্তে বন্দি এক সংকোচনমূলক অন্তর্বর্তী দলিল। তার বিপরীতে নবনির্বাচিত এই রাজনৈতিক সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট ধারণ করেছে এক গভীর রাজনৈতিক অর্থ। এবারের বাজেটের মূল প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘অর্থনৈতিক গণতন্ত্রায়ণ ও বিকেন্দ্রীকরণ, ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির পথে বাংলাদেশ’।

এই প্রতিপাদ্যের মাধ্যমে নতুন রাজনৈতিক শক্তি স্পষ্ট বার্তা দিতে চায় যে, বিগত দেড় দশকের স্বৈরাচারী ও ক্রোনি ক্যাপিটালিজমের বা চাটুকার তোষণকারী অর্থনীতির অবসান ঘটিয়ে দেশের সম্পদ ও অর্থনৈতিক সুযোগ সবার জন্য উন্মুক্ত করা হবে। তবে দায়িত্ব নেওয়ার পর এই প্রথম বাজেট তৈরিতে অর্থমন্ত্রীকে এক বিশাল কাঠামোগত চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে।

বর্তমানে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির চিত্রকে অনেকটাই নাজুক ও চ্যালেঞ্জিং হিসেবে দেখছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা। ২০২২-২৩ অর্থবছর থেকে শুরু হওয়া ধারাবাহিক মূল্যস্ফীতির চাপ এখনও সাধারণ মানুষের জীবনকে বিপর্যস্ত করে রেখেছে। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি যেখানে ১৪ দশমিক ১০ শতাংশের রেকর্ড উচ্চতায় উঠেছিল, তা ২০২৬ সালের মে মাসে কিছুটা কম, ৯ দশমিক ৪৩ শতাংশ। তবে এখনও সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতায় তীব্র প্রভাব ফেলছে। বেসরকারি বিনিয়োগ ঐতিহাসিকভাবে সর্বনিম্ন স্তরে নেমে এসেছে এবং শিল্প উৎপাদনে চলছে দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতা।

বৈশ্বিক বাণিজ্যের টানাপড়েনে রপ্তানি আয় ৩ দশমিক ২ শতাংশ কমে গেছে, যদিও রেমিট্যান্সের প্রবাহ বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের সামান্য উন্নতি সাময়িক স্বস্তি দিচ্ছে। কিন্তু এর বিপরীতে বেকারত্ব ও দারিদ্র্যের হার নতুন করে বৃদ্ধি পাওয়ার লক্ষণ স্পষ্ট। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত, যা আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল ও সারের আমদানি ব্যয় মারাত্মকভাবে বাড়িয়ে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করেছে।

এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক বা এডিবির প্রাক্কলন অনুযায়ী, এই সংঘাতের নেতিবাচক প্রভাবে দক্ষিণ এশিয়ার প্রবৃদ্ধি ১ শতাংশ পয়েন্ট পর্যন্ত কমে যেতে পারে। এমন এক সময়ে এই বাজেট আসছে যখন বাংলাদেশের কর ও জিডিপি অনুপাত দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে অন্যতম সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে, যা অভ্যন্তরীণ সম্পদ সংগ্রহের সক্ষমতাকে চরমভাবে সীমিত করে ফেলেছে।

এই তীব্র প্রতিকূলতার মধ্যেই নতুন বাজেটে কিছু নিশ্চিত এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও কাঠামোগত পরিবর্তনের আভাস পাওয়া গেছে। ইতিহাসের সর্ববৃহৎ ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার এই বাজেটে মোট রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে প্রায় ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ।

এবারের বাজেটের একটি বড় ইতিবাচক দিক হলো বিগত বছরগুলোর ভৌত অবকাঠামো বা মেগা প্রজেক্টের সংস্কৃতি থেকে সরে এসে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মানব উন্নয়ন খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দের ঘোষিত নীতি। এর অংশ হিসেবে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা খাতে ৫০ হাজার ৩০২ কোটি টাকা এবং স্বাস্থ্য খাতে ৪৩ হাজার ১৮ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হচ্ছে। সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীকে শক্তিশালী করতে ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় দেশের ৪৮ লাখ পরিবার বা প্রায় ২ কোটি ৬০ লাখ মানুষকে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যার জন্য বরাদ্দ থাকছে ১৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা এবং এই অর্থ সরাসরি উপকারভোগীর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে স্থানান্তরিত হবে।

প্রান্তিক চাষিদের জন্য চালু হচ্ছে ‘ফার্মার্স কার্ড বা কৃষকদের জন্য বিশেষ কার্ড। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বা এডিপি ধরা হচ্ছে ৩ লাখ কোটি টাকা, যদিও এর ভেতরের ব্লক বরাদ্দ বা থোক বরাদ্দ নিয়ে এরইমধ্যেই বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে। এবারের বাজেটে আইএমএফের শর্তের প্রতিফলন অত্যন্ত স্পষ্ট, যেখানে রাজস্ব বৃদ্ধি, বিভিন্ন খাতের ভর্তুকি হ্রাস, বিনিময় হারে নমনীয়তা এবং ব্যাংকিং খাতের সংস্কারের সুনির্দিষ্ট বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

করদাতাদের স্বস্তি দিতে মিনিমাম ট্যাক্স রিফান্ড বা ন্যূনতম কর ফেরতের প্রস্তাব আনা হচ্ছে, যার ফলে ব্যক্তি করদাতারা ১২০ দিন এবং প্রাতিষ্ঠানিক করদাতারা ৩ বছরের মধ্যে রিফান্ড পাবেন। আর আগামী ২০২৭ অর্থবছরের মধ্যে মূল্যস্ফীতিকে ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার একটি দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যও নির্ধারণ করা হয়েছে এতে।

বিগত অর্থমন্ত্রীদের তুলনায় আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছে আগামী অর্থবছরের বাজেট প্রণয়নে। ২০১৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আ হ ম মুস্তফা কামালের বাজেটগুলো ছিল মূলত ‘উচ্চাভিলাষী সংখ্যার বাজেট’, যেখানে প্রতিবছর বিশাল ঘাটতি পূরণে ব্যাংক থেকে দেদারসে ঋণ নেওয়া এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের নোট ছাপানোর আত্মঘাতী পথ বেছে নেওয়া হতো, যার বাস্তবায়ন হার ছিল গড়ে মাত্র ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ। এরপর ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সালেহউদ্দিন আহমেদের বাজেটটি ছিল রাজনৈতিক ম্যান্ডেটহীন, যা কেবল অর্থনীতির পতন ঠেকাতে দাতাদের শর্ত মেনে করা এক রুটিন দায়িত্ব। কিন্তু আমির খসরু প্রথম নির্বাচিত সরকারের অর্থমন্ত্রী হিসেবে এক বহুমাত্রিক সংকটের আবর্তে পড়েছেন। তার সামনে একদিকে যেমন নিজেদের দলের দেওয়া জনতুষ্টির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি রক্ষা করার চাপ রয়েছে, ঠিক তেমনি আইএমএফের কঠোর ও অপ্রীতিকর শর্তগুলো বাস্তবায়নের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। একই সঙ্গে তাকে মূল্যস্ফীতির টুঁটি চেপে ধরতে হবে, বেসরকারি বিনিয়োগের খরা কাটাতে হবে, মধ্যপ্রাচ্য সংকটের মধ্যে দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে নতুন আরটিএ বা আঞ্চলিক বাণিজ্য চুক্তির বাধ্যবাধকতাগুলো মেনে চলতে হবে। এর পাশাপাশি এলডিসি (LDC) বা স্বল্পোন্নত দেশের কাতার থেকে উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাজারে যে রেয়াতি বাণিজ্য সুবিধাগুলো হারিয়ে যাবে, তার জন্য দেশের শিল্প খাতকে প্রস্তুত করার গুরুদায়িত্বও নিতে হচ্ছে বিএনপির এই বর্ষীয়ান নেতাকে। সেই সাথে আকাশচুম্বী জনপ্রত্যাশার চাপ তো আছেই।

বিএনপির বিগত আমলগুলোতে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমানের বাজেটগুলোকে সাধারণত ‘রক্ষণশীল কিন্তু বাস্তবসম্মত’ বা ফিসকাল কনজারভেটিজম হিসেবে দেখা হতো, যেখানে রাজস্বের লক্ষ্যমাত্রা সতর্কতার সাথে ধরা হতো, ভর্তুকি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হতো এবং মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর সংযম দেখানো হতো। সেই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও বর্তমানের বাস্তবতার নিরিখে আমির খসরুর এই প্রথম বাজেটকে পুরোপুরি রক্ষণশীল বলার সুযোগ নেই, বরং এটি একটি ‘রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও দাতা-শর্তের সংকটকালীন সমঝোতা’। এটি একই সাথে একটি উচ্চাকাঙ্ক্ষী কিন্তু চারপাশ থেকে তীব্রভাবে বাধাগ্রস্ত বাজেট।

একদিকে নতুন সরকারের রাজনৈতিক শক্তির জানান দিতে এবং ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির স্বপ্ন দেখাতে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বিশাল অবয়ব তৈরি করা হয়েছে; অন্যদিকে আইএমএফের সংস্কারের খাঁড়া এবং ভঙ্গুর সামষ্টিক অর্থনীতির কঠোর বাস্তবতা এই বাজেটের প্রতিটি পদক্ষেপকে শৃঙ্খলিত করে রেখেছে। শেষ পর্যন্ত এই বাজেট কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করবে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী কীভাবে এই রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার মধ্যকার সূক্ষ্ম ভারসাম্যটি রক্ষা করে তা বাস্তবায়ন করতে পারেন, তার ওপর।

সম্পর্কিত