অর্ণব সান্যাল

গতকাল বৃহস্পতিবার ছিল এই দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন। এদিনই ফয়সালা হয়েছে দেশের আবার গণতন্ত্রের পথে উত্তরণের বিষয়টি। এতটুকু অন্তত নিশ্চিত হয়েছে যে– যেভাবেই হোক, নির্বাচিত সরকারই এখন ক্ষমতা গ্রহণের পথে। কিন্তু এই বহুল প্রতীক্ষিত নির্বাচনও কারচুপির অভিযোগ থেকে মুক্তি পায়নি। তবে কি বাংলাদেশের নির্বাচন কি প্রকৌশলবিদ্যার কবল থেকে আর মুক্তি পাবে না?
নির্বাচনে অংশ নেওয়া দুটি প্রধান রাজনৈতিক জোটই ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অভিযোগ তুলেছে। ভোটের দিন সন্ধ্যার পর থেকেই এ নিয়ে ফিসফাস শুরু হয়ে যায় রাজনৈতিক অঙ্গনে। এরপর রাত যত গড়িয়েছে, গুঞ্জন তত তীব্র হয়েছে। উত্তেজনা বাড়তে বাড়তে তা রাজপথেও গড়িয়েছে। এবং এই সময়টায় বিএনপির পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলন করে অভিযোগ করা হয় যে, বেশ কিছু আসনে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং করা হচ্ছে বিএনপিকে হারানোর জন্য। আর কাছাকাছি সময়ে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকেও একই ধরণের পাল্টা অভিযোগ ওঠে। বলা হয়, অনিয়ম, কারচুপি হচ্ছে, বিএনপিকে জেতানো হচ্ছে জোর করে।
বুঝে দেখুন, নির্বাচনে অংশ নেওয়া দুটি প্রধান রাজনৈতিক জোটই যদি এমন অভিযোগ তোলে, তাহলে জনসাধারণের মধ্যে সেই প্রশ্নের অনুরণন কি আরও তীব্র হবে না? তীব্রতা বৃদ্ধির উসকানি কি রাজনৈতিক দলগুলোই দিল না?
এবার একটু পটভূমি জানা যাক। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মূলত দুটি রাজনৈতিক জোট প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে। একটি ছিল জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট। অন্যটি বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১০ দলীয় জোট। এই দুই জোটের মধ্যে আবার একটি ডানের দিকে থাকা এবং আরেকটি রাজনৈতিক দর্শনে মাঝমাঝি অবস্থানে আছে বলে জনপরিসরে পরিচিতি পেয়েছিল। আবার এই দুই জোট সেসব পরিচয়ের সপক্ষে নানা কর্মকাণ্ডও জারি রেখেছিল। ফলে জনপরিসরে প্রসারিত জনশ্রুতির ভিত্তি ছিল শক্ত ও যৌক্তিক।
গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল থেকে বেশ শান্তিপূর্ণ পরিবেশেই দেশে ভোটগ্রহণ শুরু হয় এবং সারাদিন তেমনই ছিল। কিছু টুকরো ঘটনা বাদে তেমন কোনো বড় সংঘাতের খবর পাওয়া যায়নি। এটি অবশ্যই বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে বড় সফলতা এবং হয়তো একমাত্রও! ভোটের দিন অন্তত দেশজুড়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়নি। ফলে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ করার বিষয়টি স্বস্তিদায়ক হয়েছে। এটুকুর জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের ধন্যবাদ প্রাপ্য বটে।
কিন্তু ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পর থেকেই ক্রমে উত্তেজনা বাড়তে থাকে। যখন প্রাথমিক ফলাফল আসতে শুরু করে, তবে প্রতিদ্বন্দ্বী দুই জোটের প্রার্থীদের মধ্যকার হাড্ডাহাড্ডি লড়াই ও খুবই সামান্য পরিমাণ ভোটের ব্যবধান প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই ‘ভোট কারচুপি’ বিষয়ক সুনির্দিষ্ট অভিযোগ নিয়ে চাপানউতোর শুরু হয়। একপর্যায়ে তা সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে আসে। এরপর আসে সাংগঠনিকভাবে, প্রকাশ্য সংবাদ সম্মেলনে। এবং এই অভিযোগ দুই প্রধান রাজনৈতিক জোটই তোলে। আঙুল ছিল একে-অপরের দিকেই। ভোটের সাথে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনও দুই পক্ষের অভিযোগের তিরের মুখে পড়ে, ওঠে কারচুপিতে সহায়তার অভিযোগও।
ভোটে কারচুপির অভিযোগ আনার সংস্কৃতি বাংলাদেশে নতুন কিছু নয়। ১৯৯১ সালে গণতান্ত্রিক উত্তরণের পর থেকে প্রতি সংসদ নির্বাচনেই এমন অভিযোগ উঠেছে। সাধারণত প্রতিবারই দেখা যেত যে, নির্বাচনে হেরে যাওয়া রাজনৈতিক দলটি ভোটগ্রহণের দিনটি পার হওয়ার পর পরই, ফল বুঝে ফেলার সাথে সাথেই দাবি করত কারচুপির ভোট আয়োজনের। অভিযোগ করা হতো যে, পুরো নির্বাচনই জালিয়াতির মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে। নির্বাচনের ফল না মানার ঘোষণাও দেওয়া হতো সাড়ম্বরে।

অর্থাৎ, নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার রাজনীতি এই দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর অতি সাধারণ একটি রাজনৈতিক চর্চা। এটি বহুল চর্চিতও বটে। ২০১৪ সালের আগ পর্যন্ত এ বিষয়টিকে কিছুটা সাধারণভাবেই গ্রহণ করত মানুষ। রাজনৈতিক দলের কর্মীরাও নিয়মিত কর্মকাণ্ড হিসেবেই দেখত। তবে ২০১৪ সালের পর থেকে বিষয়টি আরও সাধারণ থাকেনি। কারণ তখন থেকে যে সত্যিকারের একতরফা নির্বাচনের উদাহরণ মিলতে থাকে হরেদরে। ২০১৮ সালের নির্বাচনের পর দেশের মানুষ বুঝতে পারে ভোট আসলে দিনের পাশাপাশি রাতেও দেওয়া যায়! আবার ২০২৪ সালের নির্বাচন দেখিয়ে দিয়েছিল ‘আমি-ডামি’র শক্তি। ফলে সংসদ নির্বাচনের বিতর্কিত রূপটি চরম বাস্তব হিসেবেই ধরা দেয়। আর নির্বাচন কমিশন তো ঐতিহাসিকভাবে সব সময়ে সব নির্বাচনকেই ‘অবাধ’ ও ‘সুষ্ঠু’ দাবি করে এসেছে। এমনকি দিনের বদলে আগের রাতে ভোট হয়ে গেলেও সেই অসম্ভব দাবির কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি!
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর আওয়ামী সরকারের পতন ঘটে। ক্ষমতায় আসে অন্তর্বর্তী সরকার। এই সরকার অনেকটাই একচেটিয়া স্বভাবে কাজ করেছে। অনেক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে একতরফাভাবে। এমনকি নির্বাচন প্রক্রিয়া থেকেও একটি রাজনৈতিক দলকে নির্বাহী আদেশে নিষিদ্ধ করে রাখা হয়। কোনো রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত হলে, সেই অনুযায়ী যেকোনো পদক্ষেপ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী নেওয়া যায়। যদিও সেটিও এক ধরনের বিতর্কের জন্ম দিতে পারে। আর সেখানে যদি সরকারের নির্বাহী আদেশে কোনো রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করে রাখা হয়, তা আসলে কতটা গণতান্ত্রিক, সেই প্রশ্ন যেকোনো গণতন্ত্রমনা নাগরিক তুলতেই পারেন। যদিও সেই প্রশ্ন তোলাটাকে একটা ‘জাতীয় লজ্জা’র মোড়কে মুড়ে ফেলেছে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার, যেন এসব প্রশ্ন তোলাটাই অপরাধ। এসব বৈশিষ্ট্য একনায়কতান্ত্রিক ঘরানারই বটে। এরপর যখন নির্বাচনের দিনটি ঘনিয়ে এলো, স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ ভোটারদের আশা ছিল, অন্তত যেন বিতর্কিত না হয় এই নির্বাচন, প্রশ্নবিদ্ধ না হয়। অথচ সকালে বা দুপুরে কিংবা বিকেলেও যে ভোট শান্তিপূর্ণ ছিল, সব পক্ষের কাছে ‘সুন্দর’ বলে বোধ হচ্ছিল, সেই ভাবনা সন্ধ্যার পর থেকেই কেমন যেন ১৮০ ডিগ্রিতে উল্টে গেল! ভোটে অংশ নেওয়া এবং জুলাই অভ্যুত্থানের স্টেকহোল্ডার দাবি করা দুই রাজনৈতিক জোটই কারচুপির অভিযোগ আনল। এবং এই দাবিতে তারা এখনও অনড় আছে। একে-অপরের প্রতি একধরনের আক্রমণাত্মক মনোভাব, যা মানসিক ও শারীরিকভাবেও প্রকাশিত হয়েছে প্রবলভাবে। সেটি যে শেষপর্যন্ত প্রবল সহিংসতায় এখনও রূপ নেয়নি, সেটিই এ দেশের মানুষের সৌভাগ্য।
কথা হলো, তিনটি একতরফা নির্বাচনের ফলস্বরূপ যে একচেটিয়া সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, সেই সরকারের বিদায়ের পর একটি নিখুঁত নির্বাচন জাতির জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ছিল। যদিও বর্তমান সিইসি এরই মধ্যে বলে দিয়েছেন যে, ‘পারফেক্ট নির্বাচন’ হয়নি বা হয় না, কিন্তু বাংলাদেশের জন্য সেটি আদতে ছিল জীবনরক্ষাকারী ওষুধ। সেটি যে আর হলো না, তা বিএনপি ও জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটের পাল্টাপাল্টি ভোট কারচুপির অভিযোগেই প্রমাণ হয়ে গেছে। এখন এই নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও প্রবল প্রশ্ন তোলা হয় কিনা, তাও দেখার।
আমাদের দেশে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং দেখে দেখে মানুষ অভ্যস্ত। অনেক বছর ধরেই তারা দেখেছে। ফলে তারা লক্ষণ চেনে এবং সেগুলো চেনা কঠিন কিছুও নয়। তাই দুপুর ১২টা বা ২টাতেও ভোট পড়ার হার জানানো ইসি কেন ভোটগ্রহণ শেষের ১২ বা ১৫ ঘণ্টা পরও মোট ভোটের হার জানাতে পারেনি, সেটি নিয়ে প্রশ্ন তোলা অস্বাভাবিক কিছু নয়। একই সাথে প্রশ্ন উঠতে পারে হুটহাট ভোটের সংখ্যার হালনাগাদ তথ্যের বিপুল উত্থান, পতন নিয়েও। আর বেশ কিছু সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত জাল ভোট দেওয়ার ছবি, ভিডিও তো আছেই। ফলে সমালোচকেরা এসব নিয়ে বিতর্ক উসকে দিতেই পারে। কারণ এবারের নির্বাচন নিয়ে দেশের মানুষের মধ্যে আকাঙ্ক্ষা ও প্রত্যাশা ছিল আকাশ ছোঁয়া। এমন অভাগা দেশে এতটা প্রত্যাশা পূরণ করাটাও একটা চ্যালেঞ্জ আসলে।
সুতরাং, এই দেশটায় নির্বাচন প্রক্রিয়াটার আদতে আর প্রকৌশলবিদ্যা থেকে মুক্তি পাওয়া হলো না। অন্তত বর্তমান রাজনৈতিক দলগুলোর প্রকাশ্য অভিযোগ বিবেচনায় নিলে এমনটাই মনে হতে বাধ্য। কারণ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া এবং পরবর্তী গণতান্ত্রিক সরকার গঠন করতে যাওয়া রাজনৈতিক দলটিও যে একই অভিযোগ তুলেছে!
তাই এই বেলায় বাংলাদেশে ইঞ্জিনিয়ারিংকে আর ইলেকশন থেকে বিযুক্ত করা হয়তো গেল না। এখন বিযুক্তির পথে অন্তত যেন হাঁটা শুরু হয় জোরেশোরে, সেটিই হোক প্রত্যাশা। এ দেশের ম্যাংগো পিপলরা এতটুকু আশা তো করতেই পারে, নাকি!
লেখক: বার্তা সম্পাদক, চরচা

গতকাল বৃহস্পতিবার ছিল এই দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন। এদিনই ফয়সালা হয়েছে দেশের আবার গণতন্ত্রের পথে উত্তরণের বিষয়টি। এতটুকু অন্তত নিশ্চিত হয়েছে যে– যেভাবেই হোক, নির্বাচিত সরকারই এখন ক্ষমতা গ্রহণের পথে। কিন্তু এই বহুল প্রতীক্ষিত নির্বাচনও কারচুপির অভিযোগ থেকে মুক্তি পায়নি। তবে কি বাংলাদেশের নির্বাচন কি প্রকৌশলবিদ্যার কবল থেকে আর মুক্তি পাবে না?
নির্বাচনে অংশ নেওয়া দুটি প্রধান রাজনৈতিক জোটই ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অভিযোগ তুলেছে। ভোটের দিন সন্ধ্যার পর থেকেই এ নিয়ে ফিসফাস শুরু হয়ে যায় রাজনৈতিক অঙ্গনে। এরপর রাত যত গড়িয়েছে, গুঞ্জন তত তীব্র হয়েছে। উত্তেজনা বাড়তে বাড়তে তা রাজপথেও গড়িয়েছে। এবং এই সময়টায় বিএনপির পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলন করে অভিযোগ করা হয় যে, বেশ কিছু আসনে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং করা হচ্ছে বিএনপিকে হারানোর জন্য। আর কাছাকাছি সময়ে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকেও একই ধরণের পাল্টা অভিযোগ ওঠে। বলা হয়, অনিয়ম, কারচুপি হচ্ছে, বিএনপিকে জেতানো হচ্ছে জোর করে।
বুঝে দেখুন, নির্বাচনে অংশ নেওয়া দুটি প্রধান রাজনৈতিক জোটই যদি এমন অভিযোগ তোলে, তাহলে জনসাধারণের মধ্যে সেই প্রশ্নের অনুরণন কি আরও তীব্র হবে না? তীব্রতা বৃদ্ধির উসকানি কি রাজনৈতিক দলগুলোই দিল না?
এবার একটু পটভূমি জানা যাক। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মূলত দুটি রাজনৈতিক জোট প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে। একটি ছিল জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট। অন্যটি বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১০ দলীয় জোট। এই দুই জোটের মধ্যে আবার একটি ডানের দিকে থাকা এবং আরেকটি রাজনৈতিক দর্শনে মাঝমাঝি অবস্থানে আছে বলে জনপরিসরে পরিচিতি পেয়েছিল। আবার এই দুই জোট সেসব পরিচয়ের সপক্ষে নানা কর্মকাণ্ডও জারি রেখেছিল। ফলে জনপরিসরে প্রসারিত জনশ্রুতির ভিত্তি ছিল শক্ত ও যৌক্তিক।
গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল থেকে বেশ শান্তিপূর্ণ পরিবেশেই দেশে ভোটগ্রহণ শুরু হয় এবং সারাদিন তেমনই ছিল। কিছু টুকরো ঘটনা বাদে তেমন কোনো বড় সংঘাতের খবর পাওয়া যায়নি। এটি অবশ্যই বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে বড় সফলতা এবং হয়তো একমাত্রও! ভোটের দিন অন্তত দেশজুড়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়নি। ফলে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ করার বিষয়টি স্বস্তিদায়ক হয়েছে। এটুকুর জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের ধন্যবাদ প্রাপ্য বটে।
কিন্তু ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পর থেকেই ক্রমে উত্তেজনা বাড়তে থাকে। যখন প্রাথমিক ফলাফল আসতে শুরু করে, তবে প্রতিদ্বন্দ্বী দুই জোটের প্রার্থীদের মধ্যকার হাড্ডাহাড্ডি লড়াই ও খুবই সামান্য পরিমাণ ভোটের ব্যবধান প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই ‘ভোট কারচুপি’ বিষয়ক সুনির্দিষ্ট অভিযোগ নিয়ে চাপানউতোর শুরু হয়। একপর্যায়ে তা সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে আসে। এরপর আসে সাংগঠনিকভাবে, প্রকাশ্য সংবাদ সম্মেলনে। এবং এই অভিযোগ দুই প্রধান রাজনৈতিক জোটই তোলে। আঙুল ছিল একে-অপরের দিকেই। ভোটের সাথে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনও দুই পক্ষের অভিযোগের তিরের মুখে পড়ে, ওঠে কারচুপিতে সহায়তার অভিযোগও।
ভোটে কারচুপির অভিযোগ আনার সংস্কৃতি বাংলাদেশে নতুন কিছু নয়। ১৯৯১ সালে গণতান্ত্রিক উত্তরণের পর থেকে প্রতি সংসদ নির্বাচনেই এমন অভিযোগ উঠেছে। সাধারণত প্রতিবারই দেখা যেত যে, নির্বাচনে হেরে যাওয়া রাজনৈতিক দলটি ভোটগ্রহণের দিনটি পার হওয়ার পর পরই, ফল বুঝে ফেলার সাথে সাথেই দাবি করত কারচুপির ভোট আয়োজনের। অভিযোগ করা হতো যে, পুরো নির্বাচনই জালিয়াতির মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে। নির্বাচনের ফল না মানার ঘোষণাও দেওয়া হতো সাড়ম্বরে।

অর্থাৎ, নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার রাজনীতি এই দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর অতি সাধারণ একটি রাজনৈতিক চর্চা। এটি বহুল চর্চিতও বটে। ২০১৪ সালের আগ পর্যন্ত এ বিষয়টিকে কিছুটা সাধারণভাবেই গ্রহণ করত মানুষ। রাজনৈতিক দলের কর্মীরাও নিয়মিত কর্মকাণ্ড হিসেবেই দেখত। তবে ২০১৪ সালের পর থেকে বিষয়টি আরও সাধারণ থাকেনি। কারণ তখন থেকে যে সত্যিকারের একতরফা নির্বাচনের উদাহরণ মিলতে থাকে হরেদরে। ২০১৮ সালের নির্বাচনের পর দেশের মানুষ বুঝতে পারে ভোট আসলে দিনের পাশাপাশি রাতেও দেওয়া যায়! আবার ২০২৪ সালের নির্বাচন দেখিয়ে দিয়েছিল ‘আমি-ডামি’র শক্তি। ফলে সংসদ নির্বাচনের বিতর্কিত রূপটি চরম বাস্তব হিসেবেই ধরা দেয়। আর নির্বাচন কমিশন তো ঐতিহাসিকভাবে সব সময়ে সব নির্বাচনকেই ‘অবাধ’ ও ‘সুষ্ঠু’ দাবি করে এসেছে। এমনকি দিনের বদলে আগের রাতে ভোট হয়ে গেলেও সেই অসম্ভব দাবির কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি!
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর আওয়ামী সরকারের পতন ঘটে। ক্ষমতায় আসে অন্তর্বর্তী সরকার। এই সরকার অনেকটাই একচেটিয়া স্বভাবে কাজ করেছে। অনেক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে একতরফাভাবে। এমনকি নির্বাচন প্রক্রিয়া থেকেও একটি রাজনৈতিক দলকে নির্বাহী আদেশে নিষিদ্ধ করে রাখা হয়। কোনো রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত হলে, সেই অনুযায়ী যেকোনো পদক্ষেপ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী নেওয়া যায়। যদিও সেটিও এক ধরনের বিতর্কের জন্ম দিতে পারে। আর সেখানে যদি সরকারের নির্বাহী আদেশে কোনো রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করে রাখা হয়, তা আসলে কতটা গণতান্ত্রিক, সেই প্রশ্ন যেকোনো গণতন্ত্রমনা নাগরিক তুলতেই পারেন। যদিও সেই প্রশ্ন তোলাটাকে একটা ‘জাতীয় লজ্জা’র মোড়কে মুড়ে ফেলেছে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার, যেন এসব প্রশ্ন তোলাটাই অপরাধ। এসব বৈশিষ্ট্য একনায়কতান্ত্রিক ঘরানারই বটে। এরপর যখন নির্বাচনের দিনটি ঘনিয়ে এলো, স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ ভোটারদের আশা ছিল, অন্তত যেন বিতর্কিত না হয় এই নির্বাচন, প্রশ্নবিদ্ধ না হয়। অথচ সকালে বা দুপুরে কিংবা বিকেলেও যে ভোট শান্তিপূর্ণ ছিল, সব পক্ষের কাছে ‘সুন্দর’ বলে বোধ হচ্ছিল, সেই ভাবনা সন্ধ্যার পর থেকেই কেমন যেন ১৮০ ডিগ্রিতে উল্টে গেল! ভোটে অংশ নেওয়া এবং জুলাই অভ্যুত্থানের স্টেকহোল্ডার দাবি করা দুই রাজনৈতিক জোটই কারচুপির অভিযোগ আনল। এবং এই দাবিতে তারা এখনও অনড় আছে। একে-অপরের প্রতি একধরনের আক্রমণাত্মক মনোভাব, যা মানসিক ও শারীরিকভাবেও প্রকাশিত হয়েছে প্রবলভাবে। সেটি যে শেষপর্যন্ত প্রবল সহিংসতায় এখনও রূপ নেয়নি, সেটিই এ দেশের মানুষের সৌভাগ্য।
কথা হলো, তিনটি একতরফা নির্বাচনের ফলস্বরূপ যে একচেটিয়া সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, সেই সরকারের বিদায়ের পর একটি নিখুঁত নির্বাচন জাতির জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ছিল। যদিও বর্তমান সিইসি এরই মধ্যে বলে দিয়েছেন যে, ‘পারফেক্ট নির্বাচন’ হয়নি বা হয় না, কিন্তু বাংলাদেশের জন্য সেটি আদতে ছিল জীবনরক্ষাকারী ওষুধ। সেটি যে আর হলো না, তা বিএনপি ও জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটের পাল্টাপাল্টি ভোট কারচুপির অভিযোগেই প্রমাণ হয়ে গেছে। এখন এই নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও প্রবল প্রশ্ন তোলা হয় কিনা, তাও দেখার।
আমাদের দেশে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং দেখে দেখে মানুষ অভ্যস্ত। অনেক বছর ধরেই তারা দেখেছে। ফলে তারা লক্ষণ চেনে এবং সেগুলো চেনা কঠিন কিছুও নয়। তাই দুপুর ১২টা বা ২টাতেও ভোট পড়ার হার জানানো ইসি কেন ভোটগ্রহণ শেষের ১২ বা ১৫ ঘণ্টা পরও মোট ভোটের হার জানাতে পারেনি, সেটি নিয়ে প্রশ্ন তোলা অস্বাভাবিক কিছু নয়। একই সাথে প্রশ্ন উঠতে পারে হুটহাট ভোটের সংখ্যার হালনাগাদ তথ্যের বিপুল উত্থান, পতন নিয়েও। আর বেশ কিছু সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত জাল ভোট দেওয়ার ছবি, ভিডিও তো আছেই। ফলে সমালোচকেরা এসব নিয়ে বিতর্ক উসকে দিতেই পারে। কারণ এবারের নির্বাচন নিয়ে দেশের মানুষের মধ্যে আকাঙ্ক্ষা ও প্রত্যাশা ছিল আকাশ ছোঁয়া। এমন অভাগা দেশে এতটা প্রত্যাশা পূরণ করাটাও একটা চ্যালেঞ্জ আসলে।
সুতরাং, এই দেশটায় নির্বাচন প্রক্রিয়াটার আদতে আর প্রকৌশলবিদ্যা থেকে মুক্তি পাওয়া হলো না। অন্তত বর্তমান রাজনৈতিক দলগুলোর প্রকাশ্য অভিযোগ বিবেচনায় নিলে এমনটাই মনে হতে বাধ্য। কারণ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া এবং পরবর্তী গণতান্ত্রিক সরকার গঠন করতে যাওয়া রাজনৈতিক দলটিও যে একই অভিযোগ তুলেছে!
তাই এই বেলায় বাংলাদেশে ইঞ্জিনিয়ারিংকে আর ইলেকশন থেকে বিযুক্ত করা হয়তো গেল না। এখন বিযুক্তির পথে অন্তত যেন হাঁটা শুরু হয় জোরেশোরে, সেটিই হোক প্রত্যাশা। এ দেশের ম্যাংগো পিপলরা এতটুকু আশা তো করতেই পারে, নাকি!
লেখক: বার্তা সম্পাদক, চরচা