Advertisement Banner

কোরবানি নিয়ে ‘গো-জীবন’-এ মীর মশাররফ কী বলেছিলেন?

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
কোরবানি নিয়ে ‘গো-জীবন’-এ মীর মশাররফ কী বলেছিলেন?
মীর মশাররফ হোসেন। ছবি: সংগৃহীত

ভারতে ঈদুল আজহায় প্রয়োজনীয় সনদপত্র ছাড়া ষাঁড়, বলদ, গরু, বাছুর ও মহিষ জবাইয়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা বহাল রেখেছেন কলকাতা হাইকোর্ট। শুধু তাই নয়, আদালত বলেছে, ইসলাম ধর্মে গরু কোরবানি করা কোনো বাধ্যতামূলক ধর্মীয় প্রথা নয়। পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার ১৩ মে (২০২৬) এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়ে দেয়, ষাঁড়, বলদ, গরু, বাছুর ও মহিষের মতো পশু সুনির্দিষ্ট সনদপত্র ছাড়া জবাই করা যাবে না। ২০১৮ সালে হাইকোর্টের একটি নির্দেশনার আলোকেই রাজ্য সরকার বিজ্ঞপ্তিটি জারি করেছিল।

১৮৮৯ সালে প্রকাশিত হয় মশাররফ হোসেনের ‘গো-জীবন’ শিরোনামের প্রবন্ধের বই। এই বইয়ে তিনি মুসলমানদের গরু জবাইয়ের তীব্র বিরোধিতা করেন। বই প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে তাকে সে সময়ের মুসলিম সমাজের নিন্দার মুখে পড়তে হয়। ‘আখবারে এসলামিয়া’ পত্রিকায় প্রতিবাদ ছাপা হয়, তার বিরুদ্ধে ফতোয়া জারি ও মামলা হয়। শুধু তাই নয়, সভা ডেকে তাকে কাফের এবং তার স্ত্রীকে হারাম ঘোষণাও করা হয়েছিল। তাকে ‘তওবা’ করতে চাপ দেওয়া হয়। মশাররফ হোসেন বইটি ছাপা বন্ধ করে দিলে মুসলিম সমাজের ক্ষোভ কমে আসে।

খাদ্য সম্বন্ধে বিধি আছে যে, খাওয়া যাইতে পারে, খাইতেই হইবে, গোমাংস না খাইলে মোসলমানি থাকিবে না, মহাপাপী হইয়া নরক যন্ত্রণা ভোগ করিতে হইবে—এ কথাও কোথাও লিখা নাই।

‘গো-জীবন’ প্রবন্ধে আসলে কী লিখেছিলেন তিনি? লিখেছেন, “শাস্ত্রে একথা লেখা নাই যে গোহাড় কামড়াতেই হইবে, গোমাংস গলাধ করিতেই হইবে, না করিলে নরকে পচিতে হইবে। বরং যাহা অখাদ্য—যথা বরাহ সে বিষয় পবিত্র কোরান শরিফে স্পষ্টভাবে বরাহ নাম উল্লেখে ‘খাইওনা’ লিখা আছে। খাইলে প্রধান নরক ‘জাহান্নাম’, তাহাতেই চিরবাস করিতে হইবে, আর নিস্তার নাই। খাদ্য সম্বন্ধে বিধি আছে যে, খাওয়া যাইতে পারে, খাইতেই হইবে, গোমাংস না খাইলে মোসলমানি থাকিবে না, মহাপাপী হইয়া নরক যন্ত্রণা ভোগ করিতে হইবে—এ কথাও কোথাও লিখা নাই।”

তারপর লিখেছেন, “খাইবার অনেক আছে। ঘোডা খাইতে পারি; –খাইনা। ফড়িং ধরিয়া ঘৃতে ভাজিয়া টপাটপ গিলিতে পারি—শাস্ত্রের কথা,–গিলি না। গোসাপ উদরসাৎ করিতে পারি—বিধি আছে, ভয়ে তাহার নিকটেও যাই না। ছাগলের মধ্যে পাঁঠাও খাদ্য, সে পাঁঠার দিকে তত ঘেষিনা, যে ছাগিতে দুগ্ধ দেয় তাহাকেই ‘আল্লাহ আকবর’ শুনাই। পাঁঠার সঙ্গে একেবারেই যে সম্বন্ধ নাই তাহা বলিতে পারি না। রসনা পরিতৃপ্ত আশ্রয়ে তাহার বংশবৃদ্ধির ক্ষমতা রহিত করিয়া দিয়া দিব্বি মোটাগোটা চব্বিদার জিনিস বানাইয়া কোরমা, কালিয়া, কাবাবে পেট পুরিয়া থাকি।

উট এদেশে নাই, থাকিলেও তাহার কাছে যাওয়া যাইত না। কারণ শরীরের গঠন দেখিয়াই পাকস্থলী ঠাণ্ডা হয়। মহিষ খাদ্য, তাহার কাছে ছুরি হাতে করিয়া যায় কে? কাজেই নিরীহ গোজাতির গলায় ছুরি বসাইতে আর এদিক ওদিক চাহি না। এত খাদ্য থাকিতেও কি গো-মাংস না খাইলেই চলে না? ঘোড়া, মহিষ, বনগরু, মেষ, ছাগল, মৃগ, খরগোস সকলি তো চলিতে পারে? এ সকল খাইলেও তো ক্ষুধা নিবৃত্ত হয়। এই থাকিতে গরুর মাংসে জিহ্বার জল পড়ে কেন? ইহার উত্তর কে দিবে?”

হিন্দু মোসলমানে কেহই কাহাকে পরিত্যাগ করিতে পারে না—-পরস্পর কেহই কাহাকে ছাড়িতে পারে না। জগত যত দিন—সম্বন্ধও ততদিন। এমন গুরুতর সম্বন্ধ যাঁহাদের সঙ্গে তাঁহাদের মনে ব্যথা দিতে আমাদের মনে কি একটুক ব্যথা লাগে না?

বঙ্গদেশে কেন গরু কোরবানি দেওয়া উচিত নয়, তার পক্ষে মশাররফ হোসেন আরও একটি যুক্তি উত্থাপন করেন, “এই বঙ্গরাজ্যে হিন্দু-মুসলমান উভয় জাতিই প্রধান। পরস্পর এমন ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ যে, ধর্ম্মে ভিন্ন, কিন্তু মর্মে এবং কর্ম্মে এক—সংসার কার্য্যে ভাই না বলিয়া আর থাকিতে পারি না। আপদে বিপদে, সুখে দুঃখে, সম্পদে পরস্পরের সাহায্য ভিন্ন উদ্ধার নাই। সুখ নাই, শেষ নাই, রক্ষার উপায় নাই। এমন ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ যাহাদের সঙ্গে এমন চিরসঙ্গি যাহারা, তাহাদের মনে ব্যথা দিয়া লাভ কি?

ধর্ম্মে আঘাত লাগে না, গোমাংস পরিত্যাগ করিলে ঘরকন্নারও ব্যাঘাত জন্মে না। উন্নতির পথেও কাঁটা পড়ে না। প্রাণের হানিও বোধহয়—হয় না। এ অবস্থায় গো হিংসা পরিত্যাগ করিলে হানি কি?” তিনি আরও বলেছেন, “গোবধে দণ্ড নাই বলিয়া ভ্রাতার মনে মর্মান্তিক আঘাত করিব? আমার মতে একথা কথাই নহে। কালে আমবা রাজাকে পরিত্যাগ কবিতে পারি। রাজাও আমাদিগকে পরিত্যাগ করিতে পাবেন। কিন্তু হিন্দু মোসলমানে কেহই কাহাকে পরিত্যাগ করিতে পারে না—-পরস্পর কেহই কাহাকে ছাড়িতে পারে না। জগত যত দিন—সম্বন্ধও ততদিন। এমন গুরুতর সম্বন্ধ যাঁহাদের সঙ্গে তাঁহাদের মনে ব্যথা দিতে আমাদের মনে কি একটুক ব্যথা লাগে না?”

সম্পর্কিত