ভূরাজনীতির খেল: পর্ব ১
ফজলুল কবির

‘উইন্টার ইজ কামিং’–কী পরিচিত লাগছে? ‘গেম অব থ্রোনস’-এর ভক্তকূল নিশ্চয় চিনতে পারছেন? অনেক দৃশ্য নিশ্চয় মনে আসছে? আসাটাই স্বাভাবিক। উইন্টারফলের সবচেয়ে উচ্চারিত সতর্কবার্তা এটি। তারপর তো কত জল গড়াল। সত্যি সত্যি ক্ষমতার দ্বন্দ্ব যখন তুঙ্গে উঠল দর্শকদের কাছে ধীরে স্পষ্ট হলো–শীতের আগমন বার্তা কেন সতর্ক সংকেত হিসেবে সামনে এসেছে।
অনুরূপ না হলেও কাছাকাছি একটা সতর্কবার্তা সামনে এসেছে। সেটি হলো–আইস ইজ মেল্টিং। বরফ গলার কথা শুনলে তো খুশি হওয়ার কথা। কিন্তু এ বরং দুশ্চিন্তার ভাঁজ নিয়ে আসছে কপালে। কারণ কী?
এই ‘মেল্টিং আইস’ শব্দবন্ধ এই সময়ে হাজির হচ্ছে সতর্কসংকেত হিসেবে। আর এই সতর্কসংকেত কোনো একটি জাতিগোষ্ঠী বা আর্কটিক অঞ্চলে যে গুটিকয় মানুষের বাস, তাদের উদ্দেশে নয়। বরং গোটা বিশ্বের জন্যই এক সতর্কবার্তা।
এর দুটি দিক আছে। একটি জলবায়ু পরিবর্তন ও তার কারণে সৃষ্ট নানা নেতিবাচক প্রভাব; এবং দ্বিতীয়টি ভূরাজনৈতিক নানা সমীকরণ।
বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে নানা আলোচনা আছে। এই তো কিছুদিন আগেই ব্রাজিলে শেষ হলো জলবায়ু সম্মেলন। এ সম্মেলনে বরাবরের মতোই বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বৃদ্ধি, এর কুপ্রভাব এবং তার ফলে মেরু অঞ্চলের বরফ দ্রুত গলে যাওয়ার মতো বিষয়গুলো ব্যাপক গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়েছে। প্রতি বছরই এমন আলোচনা হয়, সঙ্গে থাকে একগাদা প্রতিশ্রুতিগুচ্ছ। তাতে অবশ্য না কমে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন, না থামে মেরু অঞ্চলের বরফ গলা। এ ক্ষেত্রে প্রতিবারই বৈশ্বিক উষ্ণায়ন দেড় ডিগ্রি সেলসিয়াসে সীমায়িত করতে ধনী দেশগুলোর আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে অন্য অংশীজনেরা।
যদিও উত্তর মেরু বা আর্কটিক অঞ্চলের বরফ গলা ও তার সঙ্গে ক্রমেই যুক্ত হয়ে যাওয়া রাজনৈতিক, আরও ভালো করে বললে ভূরাজনৈতিক নানা সমীকরণ বলছে, প্রশ্নটি তাদের আন্তরিকতার নয়, বরং বরফ গলাতে তাদের উদ্যোগ নিয়ে হওয়া উচিত।
কী একটু অদ্ভুত লাগছে কি শুনতে? একটু খোলাসা করা যাক। উত্তর মেরু আগের মতো আর অগম্য নয়। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের দরুন ক্রমাগত বরফ গলছে। শীতনিদ্রা কাটিয়ে জেগে উঠছে ভূমি। আর এই ভূমির জাগরণ একদিকে সম্পদের সঙ্গে সঙ্গে প্যান্ডোরার বাক্সও খুলে দিচ্ছে। সেটা কী রকম?
বরফাচ্ছাদিত আর্কটিক অঞ্চলে রয়েছে বিপুল পরিমাণে প্রাকৃতিক গ্যাস, বিরল খনিজ (রেয়ার আর্থ), ক্রিটিক্যাল মিনারেলসের রিজার্ভ। বিশেষত প্রচলিত জ্বালানি হিসেবে প্রাকৃতিক গ্যাসের দিকে একটা ঝোঁক তো বিশ্বশক্তিগুলোর রয়েছেই। এর সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) উন্নয়ন ও আধুনিক সব ডিভাইস ও সামরিক সরঞ্জামের জন্য অতি জরুরি হিসেবে বিবেচিত বিরল খনিজের মজুত ও এর দখল নিয়ে একটা ইঁদুর দৌড় চলছে দুনিয়াজুড়ে। এই ইঁদুরদৌড়ের ক্ষেত্র হিসেবে এবার সামনে হাজির আর্কটিক অঞ্চল। বিশ্বের তাবড় তাবড় শক্তিগুলো এ অঞ্চলের বরফের আস্তরণের দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও পুরুত্বের দিকে রাখছে কড়া নজর।
বুলগেরিয়াভিত্তিক ওয়েব প্ল্যাটফর্ম মডার্ন ডিপ্লোম্যাসিতে গত বছরের নভেম্বরে আহমদ ইব্রাহিম এ নিয়ে একটি নিবন্ধ লেখেন। সেখানে তিনি বলছেন, আর্কটিকে রয়েছে বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদের সম্ভার, যা এখনো মানুষের আওতায় আসেনি। বিশেষত গ্রিনল্যান্ডের কথা বলা যায়, যেখানে রয়েছে বিরল মৃত্তিকা ধাতু বা সাধারণ্যে পরিচিত বিরল খনিজের বিপুল সম্ভার। সাইবেরিয়া জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খলের ক্ষেত্রে অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি এলাকা। এই সম্পদ বিশ্বের শক্তিগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণ করছে ভীষণভাবে। সাথে আছে বিকল্প বাণিজ্য রুট হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার হাতছানি। ফলে এই রুট দখলের নানা সমীকরণও সামনে হাজির।

আহমদ ইব্রাহিমের এই ভাষ্যটি ভীষণভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষত গ্রিনল্যান্ডের বিষয়টি উত্থাপনের সঙ্গে সঙ্গে অনেকেরই মনে পড়বার কথা যে, ডোনাল্ড ট্রাম্প এবার আমেরিকার মসনদে বসার পরপরই গ্রিনল্যান্ড কিনে নেওয়ার তীব্র ইচ্ছার কথা জানিয়েছিলেন। সাথে যদি কানাডা প্রসঙ্গে তার বক্তব্যটি ধর্তব্যে নেওয়া হয়, তবে এ বিষয়ে সতর্কবার্তা বা ভূরাজনীতির নয়া ছকটি ক্রমশ দৃশ্যমান হতে থাকে।
এবার একটু কাঠখোট্টা তথ্যের দিকে তাকানো যাক। আর্কটিক রিভিউয়ের তথ্যমতে, আর্কটিক অঞ্চল ক্রমাগত আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠার একটি কারণ বিরল মৃত্তিকা ধাতুর সম্ভাব্য মজুত, যা সাধারণ্যে বিরল খনিজ নামে পরিচিত। বিরল খনিজ হিসেবে স্বীকৃত ১৭টি মৌলের মধ্যে নিওডিমিয়াম, প্রেসিওডিমিয়াম থেকে শুরু করে টারবিয়াম ও ডিসপ্রোসিয়ামের ভালো মজুত রয়েছে এই অঞ্চলে। আর এই ধাতুগুলো জ্বালানি রূপান্তর থেকে শুরু করে আধুনিক প্রযুক্তি উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে বিশ্বের তাবৎ টেকজায়ান্ট এই বিরল খনিজের মালিকানা পেতে মরিয়া এবং সেই সূত্রে রাষ্ট্রগুলোও।
এ তো গেল বিরল খনিজের ব্যাপার। কিন্তু আর্কটিক অঞ্চলে শুধু বিরল খনিজের মজুতই নেই। আর্কটিক রিভিউ বলছে, বিরল খনিজের বাইরে মূল্যবান খনিজ সম্পদের উল্লেখযোগ্য মজুত রয়েছে এ অঞ্চলে। এর মধ্যে রয়েছে সোনা, লোহা, পারদ, শিসা, নিকেল, রূপা, জিঙ্কের মতো খনিজ। রয়েছে অবকাঠামো তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় বালু, নুড়ি পাথর, পাথরের মতো সম্পদ। এখানেই শেষ নয়, হিরা, রুবির মতো মূল্যবান রত্ন যেমন, তেমনি তেল, গ্যাস ও কয়লার উল্লেখযোগ্য মজুত রয়েছে এ অঞ্চলে। বরফ গলার সঙ্গে সঙ্গে এই সম্পদগুলোর দখল নিতে মরিয়া রাষ্ট্রগুলো। এই সম্পদ যদিও একেকটি রাষ্ট্রের সীমার মধ্যে পড়ছে, তবু এর দখল নিতে চলছে ক্ষমতাধর দেশগুলোর নানা ভূরাজনৈতিক চাল। তবে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে যে জিনিস, তা হলো–বরফের তলা থেকে ক্রমে মাথা তুলতে থাকা এক সমুদ্রপথ।
মজার বিষয় হচ্ছে এই সমুদ্রপথের দখল নিতে বা নিয়ন্ত্রণে নিতে একরকম প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেছে। এই প্রতিযোগিতা এখন দৃশ্যমান হলেও এ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীনের মতো ক্ষমতাধর দেশগুলো কিন্তু বেশ আগে থেকেই প্রস্তুতি নিচ্ছে। কত আগে থেকে, কী প্রস্তুতি–সে আলোচনা যথাস্থানে করা যাবে।
একদিকে আছে মূল্যবান সম্পদের মালিকানার হাতছানি, আরেকদিকে আছে বিকল্প নৌপথের দখল নেওয়ার ইঁদুর দৌড়–সব মিলিয়ে আর্কটিক অঞ্চলের বরফ সত্যিকার অর্থেই এক প্যান্ডোরার বাক্সের মুখ খেলে দিচ্ছে। বরফাচ্ছাদিত অঞ্চলটির বরফের পুরুত্ব যত কমছে, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা তত বাড়ছে। আর বর্ধিত উত্তেজনার পক্ষগুলোও চেনা খুব–যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া, এবং অতি উল্লেখযোগ্যভাবে ইউরোপও বটে।

অনেকের মনে হয়তো প্রশ্ন আসতে পারে–যুক্তরাষ্ট্রের কথা বলার পর ইউরোপের কথা আলাদা করে বলার দরকারটা কী? অর্থনৈতিক, সামরিক যে স্বার্থের কথাই বলা হোক না কেন, এরা তো একসঙ্গেই পথ চলে। তাদের গাঁটছড়া যে অনেক আগের। ঐতিহাসিক বললেও ভুল হবে না। ঢের পুরোনো হিসাব বাদ দিয়ে শুধু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের দিকে তাকালেই ইউরোপকে যুক্তরাষ্ট্রের জুড়িগাড়ি হিসেবে শনাক্ত করা যায়। নিরাপত্তা গ্যারান্টি থেকে শুরু করে অর্থনৈতিক নির্ভরতা মিলিয়ে এই জোড় এতটাই শক্ত যে, বহুবার বহু কারণে ছুটি ছুটি করেও তা এখনো অক্ষত। হ্যাঁ আগের চেয়ে নড়বড়ে হয়েছে, বিশেষত রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের জেরে। কিন্তু তা এতটাও নয় যে, ভেনেজুয়েলায় হামলা এবং দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীর অপহরণকে কেন্দ্র করে ইউরোপ কোনো জোরদার ভাষ্য হাজির করবে, যদিও সে জানে, এতে একা যুক্তরাষ্ট্রেরই লাভ; ইউরোপের কিচ্ছুটি নয়।
শুরুতে যে সতর্কবার্তার কথাটি বলা হয়েছে, সেই ‘মেল্টিং আইসের’ সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত না হলেও এরই বাইপ্রোডাক্ট হিসেবে সামনে আসছে–দক্ষিণ আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের একচেটিয়া আধিপত্যের আকাঙ্ক্ষার বিষয়টি। এ আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে মিশে আছে যুক্তরাষ্ট্রের সর্ব অর্থে আমেরিকা হয়ে ওঠার উদগ্র বাসনা। ইউরোপের ঐতিহ্যবাহী নেতৃত্বের যে আভিজাত্য, তার সঙ্গে নিরাপত্তা, অর্থ কিছু দিয়েই পাল্লা দিতে পারেনি ওয়াশিংটন। ফলে নিজস্ব পরিচয়বাদী রাজনীতি হাজির করছে তারা এখন। এর ধকটা এখন দেখা গেলেও যাত্রাটা কিন্তু শুরু হয়েছিল অনেক আগেই। ডোনাল্ড ট্রাম্প শুধু ‘মেক আমেরিকা গ্রেট আগেইন’ বা ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি ঘোষণার মধ্য দিয়ে তাকে একটি বাস্তব আকার দিচ্ছেন। এ হলো সেই যুগসন্ধিক্ষণ, যখন বিশ্বের পুরোনো সভ্যতাগুলো আবার মাথা তুলছে। আর তা তুলতে গিয়ে অর্থবিত্ত ও সামরিক শক্তি বিচারে সভ্যতাগুলোর বর্তমান পুরোধারা বাকি জাতিগোষ্ঠী ও ভূগোলগুলোকে এক অর্থে অস্বীকার করে বসছে।
এ যেন গেম অব থ্রোনসের সেই মহাযুদ্ধের পূর্বাবস্থা, যখন উত্তরের হীম রাজত্বে শুরু হয় প্রলয়, উত্তরের বরফ রাজত্বের অধিষ্ঠান পেতে মরিয়া হয়ে ওঠে সবাই। আজ এই সময়ের আগ পর্যন্ত হয়তো উত্তরের শ্বেত বরফের দুনিয়ার দিকে অস্ত্র কাঁধে এবং সদা সতর্ক চোখে তাকিয়ে থাকা সৈনিকেরা বুঝতেই পারেনি যে, কেন তারা তাকিয়ে, কেন তারা এত সতর্ক। ঠিক যেমন নাইট ওয়াচাররা জানত না। শুধু জানত তাদের সতর্ক পাহারায় থাকতে হবে। এ ঘাঁটি তারা ফাঁকা রেখে কোথাও যেতে পারবে না। না হলে শীতের দুনিয়া ওলটপালট হয়ে যাবে। পুরোনো ধারণা বা পুরোনো মতবাদ হিসেবে যদি মৃতদের সাম্রাজ্যকে পাঠ করা যায়, তবে ভীষণ জনপ্রিয় সেই সিরিয়ালে মৃতদের ফিরে আসার মধ্য দিয়েই সব অস্থির হয়ে উঠেছিল। আজকের দুনিয়ায় যে শীতরাতের আড়মোড় দিয়ে জেগে ওঠার আলামত পাওয়া যাচ্ছে, যে উত্তরে হাওয়ার জোর দাপট দেখা যাচ্ছে, শীতের সাম্রাজ্য দখলের যে দৌড় দেখা যাচ্ছে, তা যেন সেই সতর্কবার্তার কথাই বলে দিচ্ছে–উইন্টার ইজ কামিং। নাকি চলেই এসেছে? গলে যাওয়া বরফের তলা থেকে যে সম্পদ ও নৌরুটের উঁকি দেওয়ার হাতছানিতে সব বিশ্বমোড়ল প্রায় উন্মাদ হয়ে উঠেছে, সেই একই হাতছানি কিন্তু বরফ ভেদ করে বিচিত্র সব ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়াসহ অনুজীবগুলোও দিচ্ছে, যারা লাখো বছরের ঘুম ভাঙতে হঠাৎ হঠাৎ এপাশ-ওপাশ করছে। নৌরুট ও সম্পদ তো বটেই, অনুজীব, অসুখ ইত্যাদিও কিন্তু অনায়াসে বদলে দেয় ভূরাজনীতির ছক। (চলবে)

‘উইন্টার ইজ কামিং’–কী পরিচিত লাগছে? ‘গেম অব থ্রোনস’-এর ভক্তকূল নিশ্চয় চিনতে পারছেন? অনেক দৃশ্য নিশ্চয় মনে আসছে? আসাটাই স্বাভাবিক। উইন্টারফলের সবচেয়ে উচ্চারিত সতর্কবার্তা এটি। তারপর তো কত জল গড়াল। সত্যি সত্যি ক্ষমতার দ্বন্দ্ব যখন তুঙ্গে উঠল দর্শকদের কাছে ধীরে স্পষ্ট হলো–শীতের আগমন বার্তা কেন সতর্ক সংকেত হিসেবে সামনে এসেছে।
অনুরূপ না হলেও কাছাকাছি একটা সতর্কবার্তা সামনে এসেছে। সেটি হলো–আইস ইজ মেল্টিং। বরফ গলার কথা শুনলে তো খুশি হওয়ার কথা। কিন্তু এ বরং দুশ্চিন্তার ভাঁজ নিয়ে আসছে কপালে। কারণ কী?
এই ‘মেল্টিং আইস’ শব্দবন্ধ এই সময়ে হাজির হচ্ছে সতর্কসংকেত হিসেবে। আর এই সতর্কসংকেত কোনো একটি জাতিগোষ্ঠী বা আর্কটিক অঞ্চলে যে গুটিকয় মানুষের বাস, তাদের উদ্দেশে নয়। বরং গোটা বিশ্বের জন্যই এক সতর্কবার্তা।
এর দুটি দিক আছে। একটি জলবায়ু পরিবর্তন ও তার কারণে সৃষ্ট নানা নেতিবাচক প্রভাব; এবং দ্বিতীয়টি ভূরাজনৈতিক নানা সমীকরণ।
বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে নানা আলোচনা আছে। এই তো কিছুদিন আগেই ব্রাজিলে শেষ হলো জলবায়ু সম্মেলন। এ সম্মেলনে বরাবরের মতোই বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বৃদ্ধি, এর কুপ্রভাব এবং তার ফলে মেরু অঞ্চলের বরফ দ্রুত গলে যাওয়ার মতো বিষয়গুলো ব্যাপক গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়েছে। প্রতি বছরই এমন আলোচনা হয়, সঙ্গে থাকে একগাদা প্রতিশ্রুতিগুচ্ছ। তাতে অবশ্য না কমে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন, না থামে মেরু অঞ্চলের বরফ গলা। এ ক্ষেত্রে প্রতিবারই বৈশ্বিক উষ্ণায়ন দেড় ডিগ্রি সেলসিয়াসে সীমায়িত করতে ধনী দেশগুলোর আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে অন্য অংশীজনেরা।
যদিও উত্তর মেরু বা আর্কটিক অঞ্চলের বরফ গলা ও তার সঙ্গে ক্রমেই যুক্ত হয়ে যাওয়া রাজনৈতিক, আরও ভালো করে বললে ভূরাজনৈতিক নানা সমীকরণ বলছে, প্রশ্নটি তাদের আন্তরিকতার নয়, বরং বরফ গলাতে তাদের উদ্যোগ নিয়ে হওয়া উচিত।
কী একটু অদ্ভুত লাগছে কি শুনতে? একটু খোলাসা করা যাক। উত্তর মেরু আগের মতো আর অগম্য নয়। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের দরুন ক্রমাগত বরফ গলছে। শীতনিদ্রা কাটিয়ে জেগে উঠছে ভূমি। আর এই ভূমির জাগরণ একদিকে সম্পদের সঙ্গে সঙ্গে প্যান্ডোরার বাক্সও খুলে দিচ্ছে। সেটা কী রকম?
বরফাচ্ছাদিত আর্কটিক অঞ্চলে রয়েছে বিপুল পরিমাণে প্রাকৃতিক গ্যাস, বিরল খনিজ (রেয়ার আর্থ), ক্রিটিক্যাল মিনারেলসের রিজার্ভ। বিশেষত প্রচলিত জ্বালানি হিসেবে প্রাকৃতিক গ্যাসের দিকে একটা ঝোঁক তো বিশ্বশক্তিগুলোর রয়েছেই। এর সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) উন্নয়ন ও আধুনিক সব ডিভাইস ও সামরিক সরঞ্জামের জন্য অতি জরুরি হিসেবে বিবেচিত বিরল খনিজের মজুত ও এর দখল নিয়ে একটা ইঁদুর দৌড় চলছে দুনিয়াজুড়ে। এই ইঁদুরদৌড়ের ক্ষেত্র হিসেবে এবার সামনে হাজির আর্কটিক অঞ্চল। বিশ্বের তাবড় তাবড় শক্তিগুলো এ অঞ্চলের বরফের আস্তরণের দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও পুরুত্বের দিকে রাখছে কড়া নজর।
বুলগেরিয়াভিত্তিক ওয়েব প্ল্যাটফর্ম মডার্ন ডিপ্লোম্যাসিতে গত বছরের নভেম্বরে আহমদ ইব্রাহিম এ নিয়ে একটি নিবন্ধ লেখেন। সেখানে তিনি বলছেন, আর্কটিকে রয়েছে বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদের সম্ভার, যা এখনো মানুষের আওতায় আসেনি। বিশেষত গ্রিনল্যান্ডের কথা বলা যায়, যেখানে রয়েছে বিরল মৃত্তিকা ধাতু বা সাধারণ্যে পরিচিত বিরল খনিজের বিপুল সম্ভার। সাইবেরিয়া জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খলের ক্ষেত্রে অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি এলাকা। এই সম্পদ বিশ্বের শক্তিগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণ করছে ভীষণভাবে। সাথে আছে বিকল্প বাণিজ্য রুট হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার হাতছানি। ফলে এই রুট দখলের নানা সমীকরণও সামনে হাজির।

আহমদ ইব্রাহিমের এই ভাষ্যটি ভীষণভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষত গ্রিনল্যান্ডের বিষয়টি উত্থাপনের সঙ্গে সঙ্গে অনেকেরই মনে পড়বার কথা যে, ডোনাল্ড ট্রাম্প এবার আমেরিকার মসনদে বসার পরপরই গ্রিনল্যান্ড কিনে নেওয়ার তীব্র ইচ্ছার কথা জানিয়েছিলেন। সাথে যদি কানাডা প্রসঙ্গে তার বক্তব্যটি ধর্তব্যে নেওয়া হয়, তবে এ বিষয়ে সতর্কবার্তা বা ভূরাজনীতির নয়া ছকটি ক্রমশ দৃশ্যমান হতে থাকে।
এবার একটু কাঠখোট্টা তথ্যের দিকে তাকানো যাক। আর্কটিক রিভিউয়ের তথ্যমতে, আর্কটিক অঞ্চল ক্রমাগত আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠার একটি কারণ বিরল মৃত্তিকা ধাতুর সম্ভাব্য মজুত, যা সাধারণ্যে বিরল খনিজ নামে পরিচিত। বিরল খনিজ হিসেবে স্বীকৃত ১৭টি মৌলের মধ্যে নিওডিমিয়াম, প্রেসিওডিমিয়াম থেকে শুরু করে টারবিয়াম ও ডিসপ্রোসিয়ামের ভালো মজুত রয়েছে এই অঞ্চলে। আর এই ধাতুগুলো জ্বালানি রূপান্তর থেকে শুরু করে আধুনিক প্রযুক্তি উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে বিশ্বের তাবৎ টেকজায়ান্ট এই বিরল খনিজের মালিকানা পেতে মরিয়া এবং সেই সূত্রে রাষ্ট্রগুলোও।
এ তো গেল বিরল খনিজের ব্যাপার। কিন্তু আর্কটিক অঞ্চলে শুধু বিরল খনিজের মজুতই নেই। আর্কটিক রিভিউ বলছে, বিরল খনিজের বাইরে মূল্যবান খনিজ সম্পদের উল্লেখযোগ্য মজুত রয়েছে এ অঞ্চলে। এর মধ্যে রয়েছে সোনা, লোহা, পারদ, শিসা, নিকেল, রূপা, জিঙ্কের মতো খনিজ। রয়েছে অবকাঠামো তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় বালু, নুড়ি পাথর, পাথরের মতো সম্পদ। এখানেই শেষ নয়, হিরা, রুবির মতো মূল্যবান রত্ন যেমন, তেমনি তেল, গ্যাস ও কয়লার উল্লেখযোগ্য মজুত রয়েছে এ অঞ্চলে। বরফ গলার সঙ্গে সঙ্গে এই সম্পদগুলোর দখল নিতে মরিয়া রাষ্ট্রগুলো। এই সম্পদ যদিও একেকটি রাষ্ট্রের সীমার মধ্যে পড়ছে, তবু এর দখল নিতে চলছে ক্ষমতাধর দেশগুলোর নানা ভূরাজনৈতিক চাল। তবে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে যে জিনিস, তা হলো–বরফের তলা থেকে ক্রমে মাথা তুলতে থাকা এক সমুদ্রপথ।
মজার বিষয় হচ্ছে এই সমুদ্রপথের দখল নিতে বা নিয়ন্ত্রণে নিতে একরকম প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেছে। এই প্রতিযোগিতা এখন দৃশ্যমান হলেও এ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীনের মতো ক্ষমতাধর দেশগুলো কিন্তু বেশ আগে থেকেই প্রস্তুতি নিচ্ছে। কত আগে থেকে, কী প্রস্তুতি–সে আলোচনা যথাস্থানে করা যাবে।
একদিকে আছে মূল্যবান সম্পদের মালিকানার হাতছানি, আরেকদিকে আছে বিকল্প নৌপথের দখল নেওয়ার ইঁদুর দৌড়–সব মিলিয়ে আর্কটিক অঞ্চলের বরফ সত্যিকার অর্থেই এক প্যান্ডোরার বাক্সের মুখ খেলে দিচ্ছে। বরফাচ্ছাদিত অঞ্চলটির বরফের পুরুত্ব যত কমছে, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা তত বাড়ছে। আর বর্ধিত উত্তেজনার পক্ষগুলোও চেনা খুব–যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া, এবং অতি উল্লেখযোগ্যভাবে ইউরোপও বটে।

অনেকের মনে হয়তো প্রশ্ন আসতে পারে–যুক্তরাষ্ট্রের কথা বলার পর ইউরোপের কথা আলাদা করে বলার দরকারটা কী? অর্থনৈতিক, সামরিক যে স্বার্থের কথাই বলা হোক না কেন, এরা তো একসঙ্গেই পথ চলে। তাদের গাঁটছড়া যে অনেক আগের। ঐতিহাসিক বললেও ভুল হবে না। ঢের পুরোনো হিসাব বাদ দিয়ে শুধু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের দিকে তাকালেই ইউরোপকে যুক্তরাষ্ট্রের জুড়িগাড়ি হিসেবে শনাক্ত করা যায়। নিরাপত্তা গ্যারান্টি থেকে শুরু করে অর্থনৈতিক নির্ভরতা মিলিয়ে এই জোড় এতটাই শক্ত যে, বহুবার বহু কারণে ছুটি ছুটি করেও তা এখনো অক্ষত। হ্যাঁ আগের চেয়ে নড়বড়ে হয়েছে, বিশেষত রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের জেরে। কিন্তু তা এতটাও নয় যে, ভেনেজুয়েলায় হামলা এবং দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীর অপহরণকে কেন্দ্র করে ইউরোপ কোনো জোরদার ভাষ্য হাজির করবে, যদিও সে জানে, এতে একা যুক্তরাষ্ট্রেরই লাভ; ইউরোপের কিচ্ছুটি নয়।
শুরুতে যে সতর্কবার্তার কথাটি বলা হয়েছে, সেই ‘মেল্টিং আইসের’ সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত না হলেও এরই বাইপ্রোডাক্ট হিসেবে সামনে আসছে–দক্ষিণ আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের একচেটিয়া আধিপত্যের আকাঙ্ক্ষার বিষয়টি। এ আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে মিশে আছে যুক্তরাষ্ট্রের সর্ব অর্থে আমেরিকা হয়ে ওঠার উদগ্র বাসনা। ইউরোপের ঐতিহ্যবাহী নেতৃত্বের যে আভিজাত্য, তার সঙ্গে নিরাপত্তা, অর্থ কিছু দিয়েই পাল্লা দিতে পারেনি ওয়াশিংটন। ফলে নিজস্ব পরিচয়বাদী রাজনীতি হাজির করছে তারা এখন। এর ধকটা এখন দেখা গেলেও যাত্রাটা কিন্তু শুরু হয়েছিল অনেক আগেই। ডোনাল্ড ট্রাম্প শুধু ‘মেক আমেরিকা গ্রেট আগেইন’ বা ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি ঘোষণার মধ্য দিয়ে তাকে একটি বাস্তব আকার দিচ্ছেন। এ হলো সেই যুগসন্ধিক্ষণ, যখন বিশ্বের পুরোনো সভ্যতাগুলো আবার মাথা তুলছে। আর তা তুলতে গিয়ে অর্থবিত্ত ও সামরিক শক্তি বিচারে সভ্যতাগুলোর বর্তমান পুরোধারা বাকি জাতিগোষ্ঠী ও ভূগোলগুলোকে এক অর্থে অস্বীকার করে বসছে।
এ যেন গেম অব থ্রোনসের সেই মহাযুদ্ধের পূর্বাবস্থা, যখন উত্তরের হীম রাজত্বে শুরু হয় প্রলয়, উত্তরের বরফ রাজত্বের অধিষ্ঠান পেতে মরিয়া হয়ে ওঠে সবাই। আজ এই সময়ের আগ পর্যন্ত হয়তো উত্তরের শ্বেত বরফের দুনিয়ার দিকে অস্ত্র কাঁধে এবং সদা সতর্ক চোখে তাকিয়ে থাকা সৈনিকেরা বুঝতেই পারেনি যে, কেন তারা তাকিয়ে, কেন তারা এত সতর্ক। ঠিক যেমন নাইট ওয়াচাররা জানত না। শুধু জানত তাদের সতর্ক পাহারায় থাকতে হবে। এ ঘাঁটি তারা ফাঁকা রেখে কোথাও যেতে পারবে না। না হলে শীতের দুনিয়া ওলটপালট হয়ে যাবে। পুরোনো ধারণা বা পুরোনো মতবাদ হিসেবে যদি মৃতদের সাম্রাজ্যকে পাঠ করা যায়, তবে ভীষণ জনপ্রিয় সেই সিরিয়ালে মৃতদের ফিরে আসার মধ্য দিয়েই সব অস্থির হয়ে উঠেছিল। আজকের দুনিয়ায় যে শীতরাতের আড়মোড় দিয়ে জেগে ওঠার আলামত পাওয়া যাচ্ছে, যে উত্তরে হাওয়ার জোর দাপট দেখা যাচ্ছে, শীতের সাম্রাজ্য দখলের যে দৌড় দেখা যাচ্ছে, তা যেন সেই সতর্কবার্তার কথাই বলে দিচ্ছে–উইন্টার ইজ কামিং। নাকি চলেই এসেছে? গলে যাওয়া বরফের তলা থেকে যে সম্পদ ও নৌরুটের উঁকি দেওয়ার হাতছানিতে সব বিশ্বমোড়ল প্রায় উন্মাদ হয়ে উঠেছে, সেই একই হাতছানি কিন্তু বরফ ভেদ করে বিচিত্র সব ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়াসহ অনুজীবগুলোও দিচ্ছে, যারা লাখো বছরের ঘুম ভাঙতে হঠাৎ হঠাৎ এপাশ-ওপাশ করছে। নৌরুট ও সম্পদ তো বটেই, অনুজীব, অসুখ ইত্যাদিও কিন্তু অনায়াসে বদলে দেয় ভূরাজনীতির ছক। (চলবে)