Advertisement Banner

হামে শিশু মৃত্যুর জন্য দায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্বজ্ঞানহীনতা

জিয়াউদ্দীন আহমেদ
জিয়াউদ্দীন আহমেদ
হামে শিশু মৃত্যুর জন্য দায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্বজ্ঞানহীনতা
হাম নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া। ছবি: ফ্রিপিক

হামের উপসর্গ নিয়ে ইতোমধ্যে প্রায় ছয় হাজার শিশু আক্রান্ত এবং শতাধিক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এই দুর্যোগ নিয়ে বিভিন্ন মিডিয়ায় ব্যাপক সমালোচনার মুখে বিএনপি সরকার ইতোমধ্যে শিশুদের টিকা দেওয়া শুরু করেছে। দ্রুত টিকাদান শুরু করার জন্য সরকারকে অভিনন্দন! কিন্তু স্বাস্থ্যমন্ত্রী আওয়ামী লীগের মন্ত্রীদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে সব কৃতিত্ব প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের গতিশীল নেতৃত্ব ও বিচক্ষণতাকে অর্পণ করেছেন। সব কাজে প্রধানমন্ত্রীকে কৃতিত্ব দেওয়ার পুরানো রীতি অব্যাহত থাকলে কোনো মন্ত্রীর আইকিউ কোনো কালেই আর বাড়বে না। এমন তোষামোদির কারণেই সরকারে কোনো মন্ত্রীর ইমেজ তৈরি হয় না, জন্ম হয় স্বৈরতন্ত্রের। এজন্যই স্বাধীনতা লাভের পর থেকেই বাংলাদেশে গণতন্ত্রের লেবাসে সব সরকারের আমলেই স্বৈরতন্ত্র বিরাজ করেছে।

হাম ভাইরাসজনিত সংক্রামক ব্যাধি, বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিবছরই শিশুর জন্ম হচ্ছে, তাই প্রতিবছরই এই টিকা দিতে হয়। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি বা ইপিআই বাংলাদেশে শুরু হয় ১৯৭৯ সনে। শিশুদের টিকা দিয়ে বিভিন্ন সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ করাই ছিল এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য। প্রাথমিকভাবে এই কর্মসূচির অধীনে ছয়টি রোগের টিকা দেওয়া হতো-যক্ষ্মা, ডিপথেরিয়া, হুপিংকাশি, ধনুষ্টংকার, পোলিও এবং হাম। পরবর্তীকালে এই কর্মসূচির অধীনে অন্তর্ভুক্ত করা হয় হেপাটাইটিস বি, রুবেলা, নিউমোনিয়া, হিমোফাইলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা টাইপ বি এবং রোটাভাইরাস। ১৯৭৮ সনে উপরিল্লিখিত রোগগুলোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশে মাত্র ২ শতাংশ শিশুর ইউমিউনিটি বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ছিল। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং ইউনিসেফের উদ্যোগে বাংলাদেশে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি বা ইপিআই চালু হয়।

ইপিআই কর্মসূচির যথাযথ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আশির দশকের শুরুতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বাংলাদেশ থেকে চারজন কনসালটেন্ট নিয়োগ করে। এই চারজনের মধ্যে আমার এক ভাই ডা. জহির উদ্দিন আহমেদ ছিলেন একজন। তার কাছ থেকে তখন থেকেই ইপিআই নিয়ে নানা গল্প শুনে আসছি। তাই হাম নিয়ে প্রচুর আলোচনা শুরু হলে আবার লেখার তাগিদ অনুভব করেছি। চারজন কনসালটেন্টের নিবিড় তত্ত্বাবধানে ইপিআই কর্মসূচির সফল বাস্তবায়নের ফলে প্রতিবছর বাংলাদেশে প্রায় এক লাখ শিশুর মৃত্যু কমেছে। আর শিশুর মৃত্যুহার কমে যাওয়ায় বেড়েছে মানুষের গড় আয়ু।

বিএনপি সরকারের নতুন করে সূচিত টিকাদান কর্মসূচি থেকে প্রতিপন্ন হয়, স্বাভাবিক নিয়মের টিকাদান কিছু দিন বন্ধ ছিল। কিন্তু কখন থেকে বন্ধ ছিল, তা নিয়ে নানা জনের নানা বক্তব্য। স্বাস্থ্যমন্ত্রী স্বয়ং বলেছেন যে, বিগত আট বছর হামের টিকা দেওয়া হয়নি। কিন্তু এই বক্তব্য সঠিক নয়। এই ভুল তথ্য পরিবেশন করার কারণে মন্ত্রীর ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। করোনাভাইরাসের প্রকোপ থেকে মুক্ত থাকতে করোনার সময় হামের টিকা প্রদানে কিছুটা বিঘ্ন হলেও তা বেশি দিনের জন্য ছিল না। ইউনিসেফের বক্তব্য অনুযায়ী ২০২০ সনের ডিসেম্বরে সারা দেশে ৩ কোটি ৬০ লাখ শিশুকে হাম ও রুবেলার টিকা দেওয়া হয়। এছাড়াও করোনার আগে-পরে নিয়মিত হামের টিকা দেওয়া হয়েছে। সচেতনামূলক প্রচারণাও করা হয়েছে ব্যাপকভাবে, ব্যতিক্রম শুধু ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের আমল।

২০২৪ সালের আগে টিকা প্রদানের হার ছিল ৯০ থেকে ৯৮ শতাংশ ; কিন্তু ইউনূস সরকারের আমলে এই হার ছিল মাত্র ৫৬.২ শতাংশ যা গত ৯ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। উল্লেখ্য যে, ৮০ শতাংশ শিশুকে টিকা দেওয়া হলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে সমাজে হার্ড ইমিউনিটি তৈরি হয়ে যায়, বাকি ২০ শতাংশ শিশুকে টিকা দেওয়ার আর প্রয়োজন হয় না ; অর্থাৎ একটি জনগোষ্ঠীর ৮০ শতাংশের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জিত হলে বাকি ২০ শতাংশের মধ্যে রোগটি সংক্রমিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না। কারণ তারাও স্বয়ংক্রিয়ভাবে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জন করে ফেলে। অথচ এই কথাটি উল্লেখ করে বিবৃতি দিতে বিএনপির স্বাস্থ্যমন্ত্রী লজ্জা পাচ্ছেন। লজ্জা পাওয়ারই কথা।

১৮ মাস ধরে অন্তর্বর্তী সরকার বিএনপি ও জামায়াতের সঙ্গে শলাপরামর্শ করে দেশ শাসন করেছে। তাই বিএনপি সরকার ইউনূস সরকারকে তাদের কোনো ভুল বা অপরাধের জন্য দায়ী করে না। দায়ী করে ‘বিগত ১৭ বছর’কে। কিন্তু দেশে হাম রোগের সংক্রমণ মহামারি রূপে ছড়িয়ে পড়ার পেছনে এবং প্রায় শতাধিক শিশুর মৃত্যুর জন্য দায়ী ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্বজ্ঞানহীনতা ও ঔদাসীন্য।

স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়নে দাতা সংস্থার সহায়তায় ১৯৯৮ সালে ৩৮টি সমজাতীয় সেক্টরকে একীভূত করে ‘স্বাস্থ্য জনসংখ্যা খাত উন্নয়ন কর্মসূচি’ চালু করা হয় এবং ২০০৩ সালে এর নামকরণ করা হয় ‘স্বাস্থ্য জনসংখ্যা ও পুষ্টিখাত কর্মসূচি বা এইচপিএনএসপি’। স্বাস্থ্যখাতের কর্মীদের কাছে এই কর্মসূচি ‘সেক্টর প্রোগ্রাম’ নামে পরিচিত। পাঁচ বছর মেয়াদি কর্মসূচির আওতায় এর মাধ্যমে সকল সেক্টরের জন্য অর্থ বরাদ্দ, কেনাকাটা, জনবল নিয়োগসহ যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালনা করা হতো। ৩৮টি সেক্টরের মধ্যে শিশু ও মাতৃ স্বাস্থ্য সেক্টরের আওতায় সারা দেশে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি বা ইপিআই পরিচালিত হতো এবং টিকা কেনা হতো আন্তর্জাতিক সংস্থা ইউনিসেফের মাধ্যমে। অর্থের যোগান দিত বাংলাদেশ সরকার ও বিভিন্ন দাতা সংস্থা। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দাতানির্ভরতা ও অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানোর পাশাপাশি নিজেদের আর্থিক ও কারিগরি সক্ষমতা বাড়িয়ে সেক্টর প্রোগ্রামগুলোকে রাজস্ব খাতের আওতায় আনার পরিকল্পনা করা হয়। কিন্তু ২০২৪ সালের ৮ আগস্টে অন্তর্বর্তী সরকার আসার পর তাদের পরিকল্পনার বাস্তবায়ন ভেস্তে যায়। সংস্কারের নানা পর্যালোচনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে প্রচলিত সেক্টর প্রোগ্রাম বন্ধ করে দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার ইউনিসেফকে বাদ দিয়ে নিজেরা টিকা কেনার সিদ্ধান্ত নেয়। অর্থ মন্ত্রণালয়ের আপত্তির মুখে পুনরায় ইউনিসেফকে আবারও টিকা কেনার প্রক্রিয়ায় যুক্ত করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। কিন্তু সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরও আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রিতায় ছয় মাস টিকা না কিনেই পার করে দেওয়া হয়।

সেক্টর প্রোগ্রাম থেকে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ছাড়া হঠাৎ বের হয়ে আসার কারণে শুধু হামের টিকা নয়, জীবন রক্ষাকারী বহু জরুরি ওষুধও কেনা হয়নি। কেনা হয়নি সাপে কাটার ওষুধ, র‍্যাবিস ভ্যাক্সিন, জন্মনিরোধক কনডম। শুধু তাই নয়, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রস্তুতি না থাকায় সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছে যক্ষ্মা, পোলিও, নিউমোনিয়া, ডিপথেরিয়া, হুপিংকাশি, ধনুষ্টংকারসহ বেশ কয়েকটি রোগের টিকার এবং বন্ধ ছিল ম্যালেরিয়া, যক্ষ্মা, এইডসসহ অন্যান্য স্বাস্থ্য কর্মসূচিও। উচ্চ মাত্রার সংক্রামক হাম থেকে শিশুদের বাঁচাতে হলে আগের সফল কর্মসূচি আবার চালু করতে হবে, টিকা সঙ্কট দূর করতে হবে, সচেতনতা বৃদ্ধির ক্যাম্পেইন জোরদার করতে হবে এবং যেসকল শিশু টিকার বাইরে রয়েছে তাদের দ্রুত টিকাদান কর্মসূচির আওতায় আনতে হবে এবং শিশুদের মৃত্যুর জন্য দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা জরুরি।

অধ্যাপক ইউনূস দেশের যতগুলা সেক্টর ধ্বংস করেছেন তার মধ্যে অন্যতম হল স্বাস্থ্য সেক্টর। অন্তর্বর্তী সরকারে একজন ভাবলেশহীন নির্বিকার স্বাস্থ্য উপদেষ্টাও ছিলেন, স্বাস্থ্য বিষয়ক সমস্যা সমাধানে তাকে কখনো সক্রিয় ও কর্মতৎপর হতে দেখা যায়নি। প্রায় সাত মাস আগে সস্ত্রীক জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে গিয়ে ‘সিবিসি’ ব্যতীত আর একটি পরীক্ষাও করাতে পারিনি। পারিনি ক্যান্সার হাসপাতালে স্তন ক্যান্সারের পরীক্ষাটি করাতেও। বিভিন্ন ক্লিনিকের লোকজন গাড়ি নিয়ে সেই হাসপাতালে অবস্থান করছে, বাধ্য হয়ে রোগীকে প্যাথলজিক্যাল টেস্টের জন্য ক্লিনিকের দ্বারস্থ হতে হচ্ছে।

সরকারি হাসপাতালের জন্য কোনো যন্ত্রপাতি কেনা হলে তা সচল থাকে না। সরকারি হাসপাতালের জোটবদ্ধ অপরাধ নিয়ন্ত্রণের কোনো ব্যবস্থা অদ্যাবধি কোনো সরকার নেয়নি। কোনো সরকার নিতেও পারবে না, কারণ সরকারি হাসপাতালগুলোতে দলীয় ডাক্তারদের স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধে সরকার চুপ থাকতে পছন্দ করে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘শূন্য সহনশীলতা’ নীতি কঠোরভাবে পালনের ঘোষণা দিয়েছেন বর্তমান স্বাস্থ্যমন্ত্রী। জিরো টলারেন্স বা শূন্য সহনশীলতার কথা শুনলেই ভয় করে; কারণ অতীতেও এই কথাটি অহর্নিশ শুনেছি। কোনো অপরাধ ‘শূন্য’ করা সহজ নয়, শূন্য করার দরকারও নেই, শুধু মন্ত্রী মহোদয়রা সচেতন, নিরপেক্ষ এবং সাফসুতরো থাকলে দেশে অর্ধেকের বেশি অপরাধ হ্রাস পাবে।

লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক।

সম্পর্কিত