পরিবহন খাত: সমঝোতার চাঁদাবাজি, নাকি চাঁদাবাজির সমঝোতা?

পরিবহন খাত: সমঝোতার চাঁদাবাজি, নাকি চাঁদাবাজির সমঝোতা?
ছবি: চরচা

দেশের যে খাতের সঙ্গে চাঁদাবাজি শব্দটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত, তা পরিবহন। বরাবরই এ খাত ঘিরেই চলে আলোচনা-সমালোচনা। সম্প্রতি নতুন সরকার গঠনের পরপরই সড়ক-পরিবহন এবং সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের এক মন্তব্যে সমালোচনার ঝড় ওঠে। সচিবালয়ে এক সভা শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী জানান মালিক-শ্রমিক নিজেদের কল্যাণে সমঝোতার ভিত্তিতে খরচের জন্য যে টাকা সংগ্রহ করে, তা চাঁদা নয়; কেউ চাপ দিয়ে টাকা আদায় করলে তাকে চাঁদা বলা যাবে। তার এমন মন্তব্যে দায়িত্ব নেওয়ার কয়েকদিনের মধ্যেই তুমুল সমালোচনার মুখে পড়ে বিএনপি সরকার।

দেশের পরিবহন খাতে চাঁদাবাজির বাস্তব চিত্রের ধারণা পেতে সরেজমিন অনুসন্ধান চালায় চরচা। মালিক-চালকদের সঙ্গে কথা বলে বাস, ট্রাক, লেগুনা, সিএনজিচালিত অটোরিকশাসহ সকল বাহনের সড়কে চলাচলের ক্ষেত্রে দৈনিক খরচের হিসাব যাচাই করেন চরচার প্রতিবেদকরা।

সরেজমিনে দেখা যায়, মূলত মালিক-শ্রমিক সমিতির নেতাদের রাজনৈতিক প্রভাব এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ‘ম্যানেজ’ করতে গিয়ে বড় অঙ্কের টাকা খরচ করতে হয় পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের। সমঝোতা নয়; বরং টাকা না পেলে রাস্তায় ঘুরবেনা গাড়ির চাকা–এমন অঘোষিত নিয়মের জালেই বন্দী থাকে পরিবহন খাত।

দূরপাল্লার বাসে চাঁদা কত?

৫ আগস্ট-পরবর্তী সময় থেকে দূরপাল্লার বাসের ক্ষেত্রে প্রতিদিন একটি বাস থেকে গড়ে ৬৫০ টাকা চাঁদা তোলেন সংশ্লিষ্টরা। এই টাকার মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে সরকার নির্ধারিত ৩০ টাকা যায় মালিক সমিতি এবং আরও ৩০ টাকা যায় শ্রমিক কল্যাণ তহবিলে, আর দৈনিক পার্কিং খরচ ৫০ টাকা। একটি বড় অংশ রাখা হয় স্থানীয় থানা-পুলিশ এবং ট্রাফিক পুলিশদের মাসোহারার জন্য। কিছু অংশ খরচ হয় বিভিন্ন টিকিট কাউন্টারের স্টাফদের দৈনিক মজুরির জন্য। আর খরচের পর বেঁচে যাওয়া অর্থ ওই নির্দিষ্ট পরিবহন কোম্পানির মালিকরা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয়। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগ পর্যন্ত এখনকার ৬৫০ টাকার হিসাব গিয়ে ঠেকত দৈনিক নূন্যতম ১২০০ টাকা পর্যন্ত। অন্যসব খরচ প্রায় একই থাকলেও সরকারের নির্ধারিত মালিক সমিতি এবং শ্রমিক ফেডারেশনের ৬০ টাকার চাঁদা হয়েছিল ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত। সঙ্গে যোগ হতো দলীয় পরিচয়ে বিভিন্ন খাতের চাঁদা।

ছবি: এআই দিয়ে তৈরি
ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

ঢাকা–কুমিল্লা মহাসড়কে চলাচলকারী এশিয়া লাইন কোম্পানির একজন বাস মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে চরচাকে বলেন, “এখন দৈনিক ৬০০ থেকে ৬৫০ টাকা তুললেই আমাদের সব খরচ হয়ে যাচ্ছে। আগে ১২-১৩ শ টাকা তুলেও আমরা খরচ মেটাতে পারতাম না। ৫ আগেস্টর পর আগের কমিটিগুলো বাতিল হয়েছে, কেউ পালিয়েছে, কমিটি-সমিতির নামে টাকা তুলছে না।”

মালিক সমিতি ও শ্রমিক ফেডারেশনের নামে কত টাকা তোলা হতো জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এর কোনো শেষ ছিল না। সরকার ঠিক করে দিয়েছিল ৩০ টাকা করে মোট ৬০ টাকা। কিন্তু কে শুনত সরকারের কথা? সরকারের মধ্যে তারাই ছিল আরেক সরকার। একেক সময় একেক কমিটি আসত, আর ৫০-৬০ টাকা করে বাড়িয়ে দিত। সবশেষ ২০২৪ সালের জুলাই মাস পর্যন্ত ৪৫০-৫০০ টাকা করে নিয়েছে মালিক-শ্রমিক সমিতির নামে।”

৬০ টাকার জায়গায় ৪-৫ শ কেন দিতেন–এমন প্রশ্নে চমকে উঠলেন এই বাস মালিক। বললেন, “কী বলেন ভাই, টাকা না দিলে গাড়ি নামবে কীভাবে? সরকারি দলের নেতারাই কমিটির লোক হয়। তাদের ওপর কথা বলবে কে?”

ঢাকা-খুলনা রুটের ঈগল পরিবহনের বাসচালক আব্দুল কুদ্দুছ মাখন বলেন, “২০২৪ সালের ৫ আগেস্টর পর আমরা শান্তিতে আছি। কোনো কমিটির উৎপাত নাই। এমন থাকলে আমাদের সমস্যা নাই। কিন্তু এখন আবার সরকারি দল ক্ষমতায় আইছে। দেখেন, কমিটি হোক; সব শকুনের মতো লাফাই পরব (লাফিয়ে পড়বে)। কয়দিন শান্তিতে আছিলাম। সেই দিন শেষ।”

৫ আগস্ট-পরবর্তী সময় থেকে দূরপাল্লার বাসের ক্ষেত্রে প্রতিদিন একটি বাস থেকে গড়ে ৬৫০ টাকা চাঁদা তোলেন সংশ্লিষ্টরা। ছবি: চরচা
৫ আগস্ট-পরবর্তী সময় থেকে দূরপাল্লার বাসের ক্ষেত্রে প্রতিদিন একটি বাস থেকে গড়ে ৬৫০ টাকা চাঁদা তোলেন সংশ্লিষ্টরা। ছবি: চরচা

মহানগরে পুলিশ ‘ম্যানেজেই’ খরচ বেশি

সিটি সার্ভিসের ক্ষেত্রে বর্তমানে দৈনিক চাঁদার হার বাসপ্রতি গড়ে ৮০০ টাকা। মতিঝিল-মিরপুর রুটে প্রতিদিন মালিককে প্রায় ৮৫০ টাকা গুনতে হয়। এর মধ্যে ৪৫০ টাকা টার্মিনাল চাঁদা এবং ৩৩০ টাকা সিরিয়াল ও সড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে দিতে হয়। শিকড় পরিবহনের বাস চালান সুজন। তিনি জানান, যাত্রাবাড়ি থেকে বের হতে সিটি করপোরেশনের জন্য ৬০ টাকা, পৌরসভা ফি ৪০ টাকা! পয়েন্ট ফি (স্টপেজ ফি) বাবদ গুলিস্তানে ৭০ ও যাত্রাবাড়িতে ৩০ টাকা দিতে হয়।

মুগদা-মোহাম্মদপুর রুটের মালিকদের তথ্যে, এই রুটে প্রতিদিন বাস প্রতি ১,০০০ টাকার বেশি চাঁদা গুনতে হয়। মহাখালী টার্মিনাল থেকে ছেড়ে যাওয়া বাসগুলোকে ‘রিলিজ পারমিট’ বাবদ ৫২০ টাকা এবং সিরিয়ালের জন্য ২০০-৩০০ টাকা দিতে হয়। শহরতলীর বাসগুলোকে গন্তব্যে পৌঁছানো পর্যন্ত একটি বাসকে ধাপে ধাপে চাঁদা দিতে হয়। এর পরিমাণ দেড় হাজার টাকা পর্যন্ত হয়। সবশেষ আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এই দৈনিক চাঁদার হার ছিল এখনকার দ্বিগুণ।

অন্যান্য খাত একই থাকলেও, দূরপাল্লার তুলনায় রাজধানীতে থানা-পুলিশ ‘ম্যানেজে’ বেশি খরচ হয়। তাই খরচটাও বেশি। আকাশ পরিবহনের এক মালিক জানান সেই তথ্য। বলেন, “সিটিতে গাড়ি চালাতে গেলে কতগুলো থানার এলাকা ক্রস করতে হয়, একবার হিসাব করে দেখেন। বিভিন্ন জোনের ট্রাফিকও থাকে। সবাইকে ম্যানেজ না করলে গাড়ি চালানো সম্ভব না। এজন্য একটা ‘মান্থলি’ হিসাব হয়। আমরা মাসের একটা খরচ মাসের শুরুতেই দিয়ে দিই। না দিলে ছাল-বাকল ওঠা গাড়ি রাস্তায় চালাই কেমন করে?”

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) নিয়ম মেনে বাসের ফিটনেস ঠিক রাখলেই তো আর বাড়তি খরচ করতে হয় না; তাহলে অনিময়মের পথ তো বাস মালিকেরাই তৈরি করেন–প্রতিবেদকের এমন প্রশ্নে চওড়া হাসি এই বাস মালিকের। পাল্টা প্রশ্ন করেন, “ট্রাফিক পুলিশ চেনেন? একটা বাস নামান রাস্তায়, তারপর অটো (নিজেই) বুঝে যাবেন। পুলিশ এমন জিনিস যে, আপনি ফেরেশতা হলেও আপনার খুঁত ধরবে। তারচেয়ে ভালো তারাই টাকা খাক, আমরা শান্তিতে থাকি।”

একাধিক বাস মালিক এবং চালকের কথায় জানা যায়, ৫ আগস্টের পর পরিহবহন খাত-সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর কোনো দলীয় কমিটি না থাকায় বাড়তি টাকা তুলছে না কেউ। এ কারণেই আক্ষরিক অর্থে তেমন চাঁদাবাজি নেই এই খাতে। তবে সকলের আশঙ্কা–সরকারি দলের নেতারাই জায়গা করে নেবে মালিক সমিতি ও শ্রমিক ফেডারেশনের কমিটিগুলোতে, আর চাঁদাবাজি ফিরে পাবে তার পুরনো চেহারা।

রাজধানীর অন্যান্য গণবাহনগুলোর ক্ষেত্রেও সড়কে চাকা ঘোরানোর নিয়ম একই। রাজধানীর বেশ কয়েকটি স্বল্প দূরত্বের রুটে চলে লেগুনা। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের অনুমতি সাপেক্ষে জিগাতলা রুটে ২০টি ও মোহাম্মদপুরে ৩০টি লেগুনা চলার কথা। তবে এই দুই রুটে ১৪০টির বেশি লেগুনা চলে।

প্রতিটি গাড়ির জন্য ৫০০ টাকা করে দিতে হয়। এই চাঁদার ডাক নাম ‘জিপি’। এই হিসাবে প্রতিদিন ৭০ হাজার টাকা ও মাসে প্রায় ২১ লাখ টাকার চাঁদাবাজি হয় এই রুটে। মালিকপক্ষের প্রায় ৩০ জন সদস্যের একটি সমিতি আছে পুরো বিষয়টি দেখভালের জন্য। অনুমোদনের বাইরে গাড়ি চালানোর জন্য পুলিশ প্রশাসন ও সরকার দলীয় নেতাদের দিতে হয় এই চাঁদা। এই হলো বর্তমান চিত্র, আগের রাজনৈতিক সরকারের আমলে যা ছিল অন্তত ১ হাজার টাকা।

মোহাম্মদপুর স্ট্যান্ডে কথা হয় এক লেগুনা চালকের সঙ্গে। তিনি বলেন, “আগেও কাউয়্যা ছিল, এহনো আছে। ৫ আগস্টের আগে আওয়ামী লীগরা ছিল, এহন বিএনপি আইচে। তবে অন্য রাস্তার তুলনায় এই রুটে এখন কাউয়্যা কম। তাই জিপি কম দিতে হয়।”

আরেক চালক বলেন, “এই রুটে লেগুনার চাকা ঘুরাতে হলে দিনে ৫০০ টাকা জিপি দিতে হবে। এটা ছাড়া গাড়ি চালানো সম্ভব নয়। এটি দিলে রাস্তাঘাটের সব সমস্যার সমাধান। আর কোনো ঝামেলা নাই। হঠাৎ ২/১ বার পুলিশ ধরলে ২/৪ শ টাকা দিতে হয়।”

সিএনজিচালিত অটোরিকশা, ব্যাটারিচালিত রিকশা কিংবা প্যাডেলচালিত রিকশা–এই বাহনগুলো ধরনে আলাদা হলেও সব ক্ষেত্রে চাঁদাবাজির চিত্র একই। যেসব এলাকায় রাজনৈতিক নেতাদের হাতবদল হয়নি, সেসব এলাকায় কিছুটি স্বস্তি থাকলেও অধিকাংশ এলাকায় চাঁদার হারে কোনো পার্থ্যক্য তৈরি করেনি গণঅভ্যুত্থান। ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা প্রতিদিন গুণতে হয় এই ছোট পরিবহণগুলোকেও।

ট্রাক-লরিতে পথে পথে সমঝোতা

তবে অন্য পরিবহনগুলো থেকে একটু আলাদা পদ্ধতিতে চাঁদাবাজির শিকার হন ট্রাকচালকরা। সরকারি নিয়মে দেশের সকল ট্রাকস্ট্যান্ডে পার্কিং করতে ৫০ টাকা ভাড়া গোনার কথা থাকলেও ভিআইপি এলাকা হিসেবে তা দ্বিগুণ হয়। এই যেমন রাজধানীর তেজগাঁও ট্রাকস্ট্যান্ড। এখানে ১০০ টাকার নিচে কোনো কথা নেই। নিয়ম অনুযায়ী ওজন মেপে সরকারি পথশুল্ক এবং পৌরসভার স্ট্যান্ড ব্যবহার করলে পার্কিং চার্জের বাইরে কোনো খরচ হওয়ার কথা নয় চালক-মালিকদের। তবে এ নিয়ম শুধুই কাগজে কলমে। বাস্তবতা হলো পার্কিং না করেও চার্জ আদায় ছাড়া নির্দিষ্ট পৌর এলাকার সড়ক পাড়ি দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই ট্রাক-পিকআপ-লরি চালকদের। তাই তাদের দৈনিক চাঁদার হার হিসাব করা যেন চালের মাঝে বালি খোঁজার মতো ঘটনা।

ট্রাকচালক মো. রফিক। তিনি ঢাকা থেকে দক্ষিণবঙ্গমুখী মালামাল পরিবহন করেন। গত বুধবার সকালে গাজীপুর কালিয়াকৈরের চাঁনদোনা এলাকা থেকে গার্মেন্টস পণ্য নিয়ে বরিশালের ভোলা জেলায় যান তিনি। যাত্রাপথে বোরহানউদ্দিন পৌরসভার নামে ১৮০ টাকা এবং লালমোহন পৌরসভার নামে ১৫০ টাকা চাঁদা দেন। পৌরসভার নামে চাঁদা না দিলে ‘ওই সড়ক দিয়ে যাওয়া যায় না’ বলে জানান রফিক।

আরেক চালক মো. ফজলু তার নোয়াখালী যাওয়ার অভিজ্ঞতা জানাতে গিয়ে বলেন, “সেখানে চাঁদপুর পৌরসভার নামে ২০০ টাকা, কচুয়া ও হাজীগঞ্জে পৌরসভা সড়ক দিয়ে যাওয়ার সময় ৫০ টাকা করে দিতে হয়েছে। এ ছাড়া লক্ষ্মীপুরে দিতে হয়েছে ১০০ টাকা। এসব সড়ক দিয়ে চলাচলের সময় স্থানীয়রা পৌরসভার নামে একটি রশিদ ধরিয়ে দিয়ে এসব টাকা আদায় করে। টাকা না দিতে চাইলে মারধর, এমনকি গাড়ি আটকে রাখে।”

এ ছাড়া ঢাকার প্রতিটি বাজার, আড়ৎ এবং কিছু কিছু সড়ক থেকে বিভিন্ন নামে চাঁদা তোলা হয় বলে জানান ট্রাক ও লরি চালকরা। কারওয়ান বাজার, গাবতলি, যাত্রাবাড়ি মাছের আড়ৎ, আব্দুল্লাহপুর থেকে গাড়িপ্রতি ২০০ থেকে ৩০০ টাকা করে চাঁদা আদায় করা হয়। তারা জানান, জুলাই আন্দোলনের পর কিছুদিন এসব চাাঁদাজি বন্ধ থাকলেও পরে আবারও স্থানীয় নেতারা এসব চাঁদা আদায় শুরু করে। নতুন সরকার আসার পরও এসব চাঁদাবাজি বহাল আছে।

বাংলাদেশ ট্রাক-কাভার্ডভ্যান মালিক সমিতির সভাপতি হাজী মো. তোফাজ্জাল হোসেন মজুমদার জানান, তাদের টার্মিনালে পার্কিং চার্জ হিসেবে প্রতি গাড়ি থেকে ১০০ টাকা নেওয়া হয়। এ ছাড়া নাইটগার্ড ও পাহারাদারদের খরচের জন্য গাড়িপ্রতি ২০ টাকা এবং শ্রমিক কল্যাণ ট্রাস্টের জন্য আরও ২০ টাকা নেওয়া হয়। বাড়তি ৫০ টাকা পার্কিং চার্জের বিষয়ে তিনি জানান, ১/১১-এর পর নিজেদের উদ্যোগে যৌথভাবে ট্রাকস্ট্যান্ড উন্নয়ন কার্যক্রম চালায় মালিক সমিতি, ট্রান্সপোর্ট মালিক ও শ্রমিক ইউনিয়ন। এতে প্রায় চার কোটি টাকা ব্যয় হয়। তাই পার্কিং থেকে সংগৃহীত বাড়তি অর্থ তিনটি সংগঠনের মধ্যে ভাগ হয়ে যায়। খরচ করা এই অর্থ উঠে এলে সরকার নির্ধারিত ভাড়ায় চলবে তেজগাঁও ট্রাকস্ট্যান্ড।

তবে এ বিষয়ে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সভাপতি কফিল উদ্দিন আহাম্মদ চরচাকে বলেন, “ট্রাকস্ট্যান্ডের পার্কিং ভাড়া এবং মহাসড়ক ও সেতুর টোল ছাড়া অন্য কোনো চাঁদার দায় পরিবহন সমিতির নয়। এসবের সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন দলীয় নেতারা।”

কল্যাণ তহবিলের চাঁদা কেন ৩০ থেকে ৩০০?

পরিবহন খাতে বাংলাদেশে দুটি কল্যাণ সমিতির দেখা মিলে। একটি পরিবহন মালিক সমিতি, অপরটি শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন। প্রতিটি বিভাগ থেকে জেলা পর্যায়ে আছে এসব সংগঠনের আলাদা আলাদা কার্যালয় ও কমিটি। আলোচনার মাধ্যমে এসব সংগঠনের চাঁদা দৈনিক ৩০ টাকা করে নির্ধারণ করে দেয় সরকার। নিয়ম অনুযায়ী এই টাকা সংগ্রহ করে মালিক-শ্রমিকদের সুবিধা-অসুবিধায় নিজেদের তহবিল থেকে সহায়তা করার কথা সংগঠনগুলোর।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান ড্রাইভার ইউনিয়নের সভাপতি তালুকদার মোহাম্মদ মনির চরচাকে বলেন, “বাংলাদেশ ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান ড্রাইভার ইউনিয়ন-এর বয়স প্রায় ৫৪ বছর এবং এটি দীর্ঘদিন ধরে শ্রমিকদের কল্যাণে কাজ করছে। সংগঠনটি শ্রমিকদের জন্য মৃত্যুকালীন এককালীন ভাতা, অসহায় ভাতা, চিকিৎসা সহায়তা, পঙ্গু ভাতা, এমনকি বিয়ে-শাদির ক্ষেত্রেও আর্থিক সহায়তা প্রদান করে। সরকারের আইনের মাধ্যমে কল্যাণ তহবিল পরিচালনার অনুমতি থাকায় এসব সহায়তা বৈধভাবে দেওয়া হয়।”

ছবি: চরচা
ছবি: চরচা

এখন পর্যন্ত পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের প্রায় ১০ কোটি টাকার সহায়তা প্রদান করা হয়েছে বলে চরচাকে জানান বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সভাপতি কফিল উদ্দিন আহাম্মদ। তিনি বলেন, “বিভিন্ন সময়ে সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত মালিক-শ্রমিক এবং অবসরে যাওয়া শ্রমিকরা এসব সহায়তা পান সংগঠনের পক্ষ থেকে।”

তবে যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরীর মতে এসবই শুভঙ্করের ফাঁকি। তিনি বলেন, “সমিতির নামে চাঁদাবাজিকে বৈধতা দেওয়া ছাড়া (এগুলো) আর কিছু নয়। আমরা কখনো দেখিনি এই সংগঠনগুলো তাদের শ্রমিকদের সহায়তা করতে। করোনা মহামারির সময় কত চালক বেকার হয়েছে, কতজনকে তারা সহযোগিতা করেছে? উল্টো সে সময় যে মালিকের একটি বাস ছিল, তার তিনটি বাস হয়েছে। এটা মোটাদাগে সংগঠনের নামে দলীয় নেতাদের পকেট ভারী করার বাহানা। দলীয় ব্যানারে নেতারা আসে, আর চাঁদা বাড়িয়ে তাদের পকেট ভারী করে। আপনারা ভেবে দেখেন, এসব সংগঠন যদি সত্যিই সৎ উদ্দেশ্যে পরিচালিত হতো, তবে ৩০ টাকার সরকারি চাঁদা তারা ৩০০ টাকা নেয় কীভাবে? এসব টাকা ছোট নেতা থেকে শুরু করে থানার পুলিশ এমনকি এমপি-মন্ত্রীর পকেটেও যায়।”

মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরীর তোলা প্রশ্নের উত্তর দিলেন একাধিক বাস মালিক। নিজেদের পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে তারা চরচাকে জানান, মূলত ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের নেতা এবং পরিবহন শ্রমিক নেতারাই ঘুরে ফিরে এসব কমিটির দায়িত্ব পান। তিন বছর পরপর এসব কমিটিতে রদবদল হলেও পেছনে থাকে সেই রাজনৈতিক শক্তি। প্রতিবার নতুন কমিটি হলেই ৫০ টাকা থেকে ৭০ টাকা পর্যন্ত চাঁদা বাড়িয়ে দেওয়া হয়। এভাবেই সবশেষ আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ৩০ টাকার চাঁদা ৩০০ টাকা পর্যন্ত পৌঁছেছে। আর সহায়তা যা দেওয়া হয়, তা ঘুরেফিরে এসব কমিটির কাছের লোকদের পকেটেই যায়।

এই চাঁদা বাড়ার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সভাপতি কফিল উদ্দিন আহাম্মদ চরচাকে বলেন, “আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এসব অনিয়ম হয়েছে। এখন এসবের কোনো সুযোগ নেই। আমরা সরকার নির্ধারিত হারেই চাঁদা নিচ্ছি। তবে নানা বিষয়ে ব্যায় বাড়ার কারণে এই ৩০ টাকা চাঁদার হার খুবই অপ্রতুল। এই হার রিভিউ করতে সরকারকে আমরা প্রস্তাব দেব।”

সরকার রিভিউ না করলে নিজেরা ইচ্ছেমতো চাঁদা বাড়াবেন কি–প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “আমরা কোনো অন্যায় করব না।”

এদিকে সড়ক পরবহন এবং সেতুমন্ত্রীর চাঁদা নিয়ে সাম্প্রতিক মন্তব্যকে বাস্তবতা বিবর্জিত মনে করছেন পরিবহন খাত-সংশ্লিষ্টরা। যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, “মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বশীল জায়গা থেকে এমন অবাস্তব মন্তব্যের জন্য আমরা প্রতিবাদ জানিয়েছি। তিনি হয় পরিবহন সেক্টর নিয়ে কোনো ধারণা রাখেন না, অথবা চাঁদাবাজিকে তিনি বৈধতা দিতেই একে সমঝোতা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। সময়ে সময়ে পরিবহন সেক্টরকে চাঁদাবাজির কালো অধ্যায়ে মুড়িয়ে ফেলার কারণেই এই খাত-সংশ্লিষ্টদের জীবনমানে কোনো উন্নতি হয়নি। এই খাতকে চাঁদাবাজিমুক্ত করতে না পারলে অন্যান্য সরকারের মতো বিএনপিও ব্যর্থ সরকার হবে।”

সড়ক-মহাসড়কে বাহন-ভেদে চাঁদাবাজির চিত্র যখন এমন–তখন এ নিয়ে মন্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয় সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম ও প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদের সঙ্গে। কিন্তু দুজনের কেউই সাড়া দেননি। একাধিকবার ফোন করে এবং ম্যাসেজ পাঠিয়েও এ বিষয়ে তাদের বক্তব্য জানা যায়নি।

সম্পর্কিত