Advertisement Banner

সত্যজিতের সিনেমা কি সত্যিই অরাজনৈতিক?

সত্যজিতের সিনেমা কি সত্যিই অরাজনৈতিক?
সত্যজিৎ রায়। ছবি: এআই

অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় একবার হীরক রাজার দেশের একটি ডিভিডি কভারে এক ক্ষুদে ভক্তের উদ্দেশে লিখেছিলেন, “যখন তুমি বড় হবে, তখন এই সিনেমাই তোমার কাছে এখনকার চেয়ে অনেক বেশি আলাদা মনে হবে।” এই ছোট কথাটিই সত্যজিতের চলচ্চিত্র দর্শনের মূল কথা। অথচ অনেক সমালোচকই মনে করতেন, কাছাকাছি সময়ের হয়েও সত্যজিৎ মৃণাল সেন বা ঋত্বিক ঘটকের মতো রাজনীতি সচেতন ছিলেন না, তার মধ্যে ছিল না রাজনৈতিক দৃঢ়তা। আসলেও কি তাই?

১৯৮২ সালে সিনেআস্ট ম্যাগাজিনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সত্যজিৎ রায়কে এই প্রশ্নটিই করা হয়। বলা হয়, অনেকেই মনে করেন তিনি তার চলচ্চিত্রে বড় কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য দিতে ভয় পান বা এড়িয়ে চলেন।

জবাবে বেশ আক্রমণাত্মকভাবে বলেছিলেন: “আমি মৃণাল সেনের চেয়েও অনেক বেশি স্পষ্টভাবে রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়েছি। জনঅরণ্য ছবিতে আমি এমন এক দৃশ্য রেখেছি, যেখানে একজন কংগ্রেস নেতা ভবিষ্যতের কাজ নিয়ে আলোচনা করছেন। তিনি বাজে কথা বলছেন, মিথ্যা বলছেন- কিন্তু সেই দৃশ্যটিতে তার উপস্থিতিটাই বড় একটি বিষয়। অন্য কোনো পরিচালক এই ছবি বানালে ওই দৃশ্যটি রাখতে দেওয়া হতো না। তবে একজন পরিচালকের ওপর অনেক বিধিনিষেধ থাকে। আপনি যখন জানেন যে, নির্দিষ্ট কিছু কথা বা দৃশ্য সেন্সর বোর্ড কিছুতেই পাস করবে না, তখন সেগুলো মিছেমিছি তৈরি করারই বা মানে কী?”

মৃণাল সেনের ওপর তার এই হঠাৎ করা আক্রমণ সরিয়ে রাখলে আমরা এখানে মূলত তিনটি বিষয় দেখতে পাই: ১. রায় মনে করতেন ‘জনঅরণ্য’ সমসাময়িক ভারতীয় সমাজ নিয়ে একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তা দিয়েছে; ২. তখনকার পরিস্থিতিতে এর চেয়ে বেশি রাজনৈতিক বার্তা দেওয়া কোনো সিনেমার পক্ষেই সম্ভব ছিল না; ৩. যেহেতু একজন চলচ্চিত্রকার জানেন যে, তিনি কতটুকু বলতে পারবেন আর কতটুকু পারবেন না, তাই এর চেয়ে বেশি স্পষ্ট হতে চাওয়াটা সময়ের অপচয় ছাড়া আর কিছুই নয়।

১৯৭৫ সালের ছবি ‘জনঅরণ্য’ মূলত সত্তরের দশকের কলকাতার ব্যক্তিগত ও সামাজিক দুর্নীতির এক চরম অন্ধকার ও হতাশাময় দলিল। এখানে দেখা যায়, এক মধ্যবিত্ত তরুণ বারবার চাকরির চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে শেষে ‘অর্ডার সাপ্লাই’ বা দালালি ব্যবসায় নাম লেখায়। ধীরে ধীরে সে এক অনৈতিক জগতে জড়িয়ে পড়ে, যেখানে টাকাই শেষ কথা। একপর্যায়ে নিজের বড় কাজের স্বার্থে সে একজন প্রভাবশালী মক্কেলের জন্য যৌনকর্মী জোগাড় করতে বাধ্য হয়। এটিই ছিল তার ব্যবসার প্রথম বড় সাফল্য। তার পরিবার, বিশেষ করে আদর্শবাদী বাবা এবং ধর্মভীরু বউদি, যারা তাকে কখনও অনৈতিক ভাবতে পারতেন না, তার এই সাফল্যে আনন্দিত হন। কেউ তাকে কোনো প্রশ্ন করে না।

দুর্নীতির এই অন্ধকার গলিতে নামার পথে তার পরিচয় হয় একজন প্রভাবশালী ও চতুর রাজনীতিবিদের সঙ্গে, যিনি সম্ভবত কংগ্রেস দলের মানুষ। ইন্দিরা গান্ধীর জারি করা ‘জরুরি অবস্থা’র ঠিক আগে ছবির শুটিং শেষ হলেও এটি মুক্তি পেয়েছিল ১৯৭৬ সালের শুরুতে।

কৌতূহলের বিষয় হলো, সেই সময় রাজ্যে ও কেন্দ্রে কংগ্রেস সরকার থাকা সত্ত্বেও ছবিটি সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা পেয়েছিল। এর কারণ যেমন হতে পারে ভারতের প্রধান চলচ্চিত্রকার হিসেবে সত্যজিতের বিশাল মর্যাদা, তেমনি এটিও হতে পারে যে, ছবির রাজনৈতিক বার্তাটি সরকারের কাছে ততটা অস্বস্তিকর ছিল না, যতটা সত্যজিৎ নিজে ভেবেছিলেন।

সত্যজিৎ মনে করতেন ছবি ‘কী বলছে’, তার চেয়ে ‘কীভাবে বলছে’ তা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তিনি এক বক্তৃতায় বলেছিলেন যে, একজন শিল্পী তার কাজের মাধ্যমেই সমাজের প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করেন। তিনি দর্শকদের বিনোদন দিতে পছন্দ করতেন, তাই তার রাজনৈতিক বার্তাগুলো আসত খুব সূক্ষ্মভাবে—কখনও রূপকের আড়ালে, কখনও বিদ্রুপের ছলে।

সত্যজিতের রাজনীতি কেবল সত্তর দশকেই শুরু হয়নি। তার প্রথম ছবি ‘পথের পাঁচালী’ ছিল এক প্রান্তিক ও দরিদ্র মানুষের গল্প। ১৯৬০ সালে ‘দেবী’ ছবিতে তিনি ধর্মের কুসংস্কারের বিরুদ্ধে কথা বলে রক্ষণশীল হিন্দুদের রোষাণলে পড়েছিলেন। মৃত্যুর আগে ‘গণশত্রু’ ছবিতেও তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে মন্দিরের চরণামৃতকে কেন্দ্র করে অন্ধবিশ্বাস ও রাজনীতি সাধারণ মানুষের জীবন বিপন্ন করে।

পথের পাঁচালী। ছবি: উইকিমিডিয়া কমনস
পথের পাঁচালী। ছবি: উইকিমিডিয়া কমনস

সত্যজিৎ সবসময় ছিলেন শোষিত এবং বঞ্চিত মানুষের দলে। রাজনীতি সচেতন না হলে কি তা সম্ভব ছিল?

‘নায়ক’ ছবিতে এক সফল মহাতারকা ও একজন শ্রমিক নেতার কথোপকথনের মাধ্যমে তিনি দেখিয়েছেন আভিজাত্যের আড়ালে কীভাবে মানুষ আদর্শচ্যুত হয়।

‘সদ্গতি’তে জাতপাত ও দলিত শোষণের যে বীভৎস রূপ তিনি দেখিয়েছেন, তা ভারতীয় সিনেমার অন্যতম শক্তিশালী রাজনৈতিক বক্তব্য।

‘মহানগর’-এ আরতি নামের এক সাধারণ নারী অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে নিজের চাকরি ছেড়ে দেয়, যা তার ব্যক্তিগত সাহসিকতা ও রাজনৈতিক চেতনার প্রতীক।

সন্দীপ রায় এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, সত্যজিৎ সরাসরি রাজনীতি করতে চাইতেন না। কারণ, তাতে সেন্সর বোর্ডের কাঁচি চালানোর ভয় ছিল। তাই তিনি ‘হীরক রাজার দেশে’র মতো রূপকথা তৈরি করেছিলেন। মগজ ধোলাই, স্বৈরশাসন আর সাধারণ শ্রমিকের কষ্টের কথা তিনি ছাড়া আর কে রূপকথার মোড়কে এমনভাবে বলেছিলেন, যা আজও যেকোনো একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের হাতিয়ার। হীরক রাজার বলা ‘এরা যত পড়ে, তত জানে, তত কম মানে’ আর প্রতিবাদে ‘দড়ি ধরে মারো টান, রাজা হবে খানখান’–এত বড় রাজ়নৈতিক রুপক আমরা কমই দেখেছি।

সত্যজিৎ রায় হয়তো কোনো রাজনৈতিক দলের ঝাণ্ডা ধরেননি। কিন্তু তিনি মনেপ্রাণে ছিলেন একজন রাজনীতি সচেতন মানুষ। তিনি জানতেন কীভাবে সমাজের গভীর ক্ষতগুলোকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে হয়। সেন্সর বোর্ডকে ফাঁকি দিয়ে কীভাবে সত্য কথা বলতে হয়, তা তার চেয়ে ভালো আর কেউ জানতেন না। তাই তিনি আজও প্রাসঙ্গিক। আর আজ়কের দিনে এত কথা বলার কারণ হলো–আজ এই মায়েস্ত্রোর জন্মদিন।

সম্পর্কিত