চরচা ডেস্ক

চীনের অভ্যন্তরীণ অঞ্চলের অনেক শহরের মতো পশ্চিমাঞ্চলীয় গানসু প্রদেশের তিয়ানশুই শহরেও রয়েছে অসংখ্য ধুলোমাখা ও পরিত্যক্ত কারখানা। তবে গত এক দশকে শহরটি অপ্রত্যাশিতভাবে একটি প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। এখানে গড়ে উঠেছে নতুন নতুন শিল্পপার্ক, যেখানে কোম্পানিগুলোকে সস্তায় বিদ্যুৎ, সহজ অর্থায়ন ও জমির সুবিধা দেওয়া হচ্ছে।
ভবিষ্যতে যেসব আধুনিক পণ্য তৈরির আশা করছে শহরটি, সেগুলো প্রদর্শনের জন্য ইতোমধ্যে ‘তিয়ানশুই ইন্ডাস্ট্রি ২০৫০’ নামে একটি প্রদর্শনী হলও তৈরি করা হয়েছে। এসব উদ্যোগ রাজধানী বেইজিংয়ের নীতিনির্ধারকদের খুশি করার মতোই। তারা চান, চীনের পুরোনো শিল্পনির্ভর অঞ্চলগুলো প্রযুক্তির মাধ্যমে নতুন করে ঘুরে দাঁড়াক। গত সপ্তাহেও তারা নগর পুনর্গঠনের আরেকটি পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে। এতে স্থবির শহরগুলোকে উদ্ভাবনী শহরে রূপান্তর এবং বাসিন্দাদের জন্য ‘উচ্চমানের জীবন’ নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।
ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, এত প্রচার-প্রচারণার পরও তিয়ানশুইয়ের সাধারণ মানুষের অবস্থার খুব একটা উন্নতি হয়নি। নতুন কারখানাগুলো শহরের সামগ্রিক অর্থনৈতিক মন্দা কাটাতে পারেনি। ১০ বছর আগে তিয়ানশুইয়ের মাথাপিছু জিডিপি ছিল বেইজিংয়ের ১৬ শতাংশের সমান, এখন তা নেমে এসেছে ১৪ শতাংশে। ২০২৫ সালে শহরটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও জাতীয় গড়ের চেয়ে ২ শতাংশ পয়েন্ট কম ছিল।
স্থানীয়দের অভিযোগ, স্বয়ংক্রিয় বা অটোমেশননির্ভর এসব কারখানা তাদের জন্য তেমন কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারেনি। ফলে ভালো সুযোগের খোঁজে অনেক তরুণ শহর ছেড়ে চলে যাচ্ছে। গত এক দশকে তিয়ানশুইয়ের জনসংখ্যা প্রায় ৫ লাখ কমে ২৯ লাখে নেমে এসেছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৫০ সালের মধ্যে শহরে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা আরও কমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
তিয়ানশুইয়ের গল্প চীনের উন্নত উৎপাদনশিল্পের সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে। চীনের কমিউনিস্ট পার্টি মনে করে, দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে বিশ্বসেরা প্রযুক্তিপণ্য তৈরির ওপর। তাই তিয়ানশুইয়ের মতো দেশজুড়ে শত শত শহর এখন প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প গড়ে তুলতে মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে।

দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, চীনের এই প্রযুক্তি-নির্ভর উন্নয়ন কিছু মেধাবী, যোগাযোগে এগিয়ে থাকা এবং ধনী শহরকে আরও সমৃদ্ধ করলেও অনেক শহর সেই সুযোগ নিতে পারছে না। কারণ তাদের কাছে প্রয়োজনীয় সরবরাহব্যবস্থা (সাপ্লাই চেইন) বা দক্ষ জনশক্তি নেই। বাস্তবতা হলো, চীনের মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৬০ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ৫০ কোটি মানুষ, উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্তও পড়াশোনা করেনি। এদের বড় অংশই ছোট ও তুলনামূলক দরিদ্র শহরগুলোতে বাস করে।
কয়েক শতাব্দী ধরে অর্থনৈতিক কেন্দ্রের চেয়ে সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবেই বেশি পরিচিত ছিল তিয়ানশুই। প্রচলিত কিংবদন্তি অনুযায়ী, চীনের প্রথম সম্রাট যিনি অর্ধেক মানুষ ও অর্ধেক সাপের আকৃতির ছিলেন–তিনি এই শহরে জন্মেছিলেন। শহরের কাছের পাহাড়ি খাড়াইয়ে এখনো বৌদ্ধ গুহামন্দির খোদাই করা রয়েছে।
তবে ১৯৬০-এর দশকে তিয়ানশুই দ্রুত শিল্পায়নের পথে এগোয়। রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্পকেন্দ্রে পরিণত হয় শহরটি। এখানকার কারখানাগুলোতে ট্র্যাক্টর, বল বিয়ারিং ও দেশলাই তৈরি হতো। ক্রমবর্ধমান শ্রমিকদের জন্য নির্মাণ করা হয় আবাসন, স্কুল ও হাসপাতাল।
সেই সময়ের এক শ্রমিক ছিলেন ডং নামের এক নারী, যার বয়স এখন ৮০ বছরের বেশি। তিনি একটি ছাপাখানায় স্থায়ী সরকারি চাকরি করতেন, যাকে চীনে ‘আয়রন রাইস বোল’ বা আজীবন চাকরির নিশ্চয়তা বলা হয়। তিনি চল্লিশের কোটায় অবসর নেন, ভালো পেনশন পান এবং তার ছেলের জন্যও একই চাকরি পাওয়ার নিশ্চয়তা ছিল।
কিন্তু ১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকে চীন যখন ধীরে ধীরে বাজারভিত্তিক অর্থনীতিতে রূপান্তরিত হতে শুরু করে, তখন তিয়ানশুইয়ের বেশিরভাগ কারখানা প্রতিযোগিতায় টিকতে পারেনি। ফলে একসময়কার সেই শিল্পসমৃদ্ধ শহর ধীরে ধীরে পিছিয়ে পড়তে শুরু করে।
দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, গত এক দশকে তিয়ানশুইয়ে সেন্সর, মেশিন টুলসসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিপণ্য উৎপাদনকারী নতুন প্রজন্মের অনেক কারখানা গড়ে উঠেছে। কিন্তু এসব কারখানা খুব বেশি কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারেনি। তিয়ানশুইয়ের জাদুঘরের একটি প্রদর্শনীতে বিভিন্ন সময়ের কারখানার ছবি রাখা হয়েছে। সেখানে দেখা যায়, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শ্রমিকের সংখ্যা কমেছে, আর বেড়েছে রোবটের ব্যবহার।
স্থানীয়দের মতে, বর্তমানে যেসব কারখানায় চাকরি পাওয়া যায়, সেগুলোর বেশির ভাগের মাসিক বেতন প্রায় ৩ হাজার ইউয়ান (প্রায় ৪৪০ ডলার)। অথচ সাংহাইয়ের মতো বড় শহরে একই ধরনের কাজ করে এর দ্বিগুণ আয় করা সম্ভব।
তিয়ানশুইয়ের বাসিন্দা ২৭ বছর বয়সী ওয়েন জিন এখন পূর্বাঞ্চলের সমৃদ্ধ জিয়াংসু প্রদেশে কাজ করেন। তিনি বলেন, “আমি তিয়ানশুইয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে চাই। কিন্তু তরুণদের জন্য সেখানে ভালো চাকরি নেই।”
আরেক স্থানীয় তরুণ মা সিনও মনে করেন, শহরটির সেরা সময় অনেক আগেই পেরিয়ে গেছে। তিনিও সুযোগ পেলেই অন্য কোথাও চলে যেতে চান।
অবশ্য উচ্চপ্রযুক্তি শিল্প কিছু ভালো বেতনের চাকরিও তৈরি করে, বিশেষ করে গবেষণা ও উন্নয়ন (আরঅ্যান্ডডি) খাতে। তবে এসব চাকরি মূলত চীনের উপকূলীয় বড় শহরগুলোতেই কেন্দ্রীভূত। বেইজিং, সাংহাই ও শেনঝেনের মতো শহরে রয়েছে দেশের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়, সবচেয়ে মেধাবী স্নাতক এবং শক্তিশালী শিল্প সরবরাহব্যবস্থা।
ফলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এসব শহরের প্রযুক্তি খাতের বেতন দ্রুত বেড়েছে। কিছু ক্ষেত্রে বার্ষিক আয় ১০ লাখ ইউয়ানও ছাড়িয়ে গেছে।
পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ইউরেশিয়া গ্রুপের এর বিশ্লেষক ড্যান ওয়াং দ্য ইকোনমিস্টকে বলেন, চীনের ভেতর দিকের অঞ্চলের খুব কম শহরেরই এ ধরনের উচ্চ আয়ের চাকরি আকর্ষণ করার সুযোগ আছে। তার মতে, “চীনের অধিকাংশ শহর তাদের বর্তমান অবস্থার মধ্যেই আটকে আছে।”
চীনের নতুন অর্থনৈতিক মডেল থেকে তিয়ানশুই খুব বেশি সুবিধা নিতে না পারলেও, পুরোনো অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সমস্যাগুলো এখনো তাকে ভোগাচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে গেছে। এর অন্যতম কারণ দীর্ঘস্থায়ী আবাসন খাতের সংকট। তিয়ানশুইয়ের মতো ছোট শহরগুলোতে বাড়ির দাম সবচেয়ে দ্রুত কমেছে। শহরের উপকণ্ঠজুড়েও পড়ে রয়েছে অসমাপ্ত কংক্রিটের আবাসন প্রকল্প। গত বছর সেখানে আবাসন খাতে বিনিয়োগ ৪০ শতাংশেরও বেশি কমেছে।

এর প্রভাব পড়েছে ভোক্তা ব্যয়ের ওপরও। মানুষ নিজেদের আগের চেয়ে গরিব মনে করায় খরচ কমিয়ে দিচ্ছে। ২০২৫ সালে তিয়ানশুইয়ে খুচরা বিক্রি ৫ শতাংশের বেশি কমেছে। শহরের অনেক শপিংমলে এখন বন্ধ দোকান আর ফাঁকা রেস্তোরাঁর সারি দেখা যায়।
বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, তিয়ানশুইয়ের মতো ছোট শহরগুলোর এই পরিস্থিতি যদি সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে ধনী ও দরিদ্র অঞ্চলের বৈষম্য আরও বেড়ে যেতে পারে।
চীনের পূর্বাঞ্চলের হাংঝৌ শহরের ঝেজিয়াং বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক লি শি-এর সংগৃহীত তথ্য বলছে, অর্থনৈতিক মন্দার সবচেয়ে বেশি ধাক্কা লেগেছে নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর। চলতি বছরের এপ্রিল মাসে প্রকাশিত এক গবেষণায় তিনি উল্লেখ করেন, ২০১৮ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে চীনে আয়ের দিক থেকে সবচেয়ে নিচের ১০ শতাংশ শ্রমিকের আয় বছরে গড়ে মাত্র ২ শতাংশ বেড়েছে। অথচ একই সময়ে জাতীয় গড় আয় বৃদ্ধির হার ছিল প্রায় ৫ শতাংশ।
চীনের সরকারও জানে, শুধু উচ্চপ্রযুক্তির কারখানা গড়ে তুললেই সব সমস্যার সমাধান হবে না। রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া এ বছর এক প্রতিবেদনে বলেছে, যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য অবকাঠামোয় বিনিয়োগ চীনের অর্থনৈতিক উত্থানে বড় ভূমিকা রেখেছে, কিন্তু এখন সেই বিনিয়োগের সুফল ধীরে ধীরে কমে আসছে।
এ কারণেই মার্চে প্রকাশিত চীনের নতুন পাঁচ বছর মেয়াদি পরিকল্পনায় ২০৩০ সাল পর্যন্ত শুধু কারখানায় নয়, মানুষের পেছনেও বিনিয়োগের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। লক্ষ্য হলো অর্থনীতিকে আরও সমতাভিত্তিক করা। বাস্তবে এর অর্থ, বিশেষ করে দরিদ্র পরিবারের শিশুদের শিক্ষায় সরকারকে আরও বেশি অর্থ ব্যয় করতে হবে, যাতে তারা ভালো চাকরি পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও জ্ঞান অর্জন করতে পারে।
কিন্তু তিয়ানশুইয়ের বাসিন্দারা বলছেন, কথায় যত সহজ, বাস্তবে তা তত নয়। ধনী শহরগুলোর তুলনায় তিয়ানশুইয়ের বাজেট অনেক ছোট। উদাহরণ হিসেবে, বেইজিং একজন শিক্ষার্থীর পেছনে যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে, তিয়ানশুই তার এক-তৃতীয়াংশেরও কম খরচ করতে পারে।
এর ওপর অর্থনৈতিক মন্দা পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করছে। গত বছর শহরটির রাজস্ব আয় প্রায় ১০ শতাংশ কমেছে। ফলে শিক্ষা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ করাও কঠিন হয়ে পড়ছে।
তিয়ানশুইয়ের খুব কম শিক্ষার্থীই দেশের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পায়। ১২ বছর বয়সী এক মেয়ের মা শি টিংটিং বলেন, “এখানে শিশুদের জন্য প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা খুব কঠিন। শেষ পর্যন্ত তারা একই জায়গায় আটকে যায়।”

চীনের অভ্যন্তরীণ অঞ্চলের অনেক শহরের মতো পশ্চিমাঞ্চলীয় গানসু প্রদেশের তিয়ানশুই শহরেও রয়েছে অসংখ্য ধুলোমাখা ও পরিত্যক্ত কারখানা। তবে গত এক দশকে শহরটি অপ্রত্যাশিতভাবে একটি প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। এখানে গড়ে উঠেছে নতুন নতুন শিল্পপার্ক, যেখানে কোম্পানিগুলোকে সস্তায় বিদ্যুৎ, সহজ অর্থায়ন ও জমির সুবিধা দেওয়া হচ্ছে।
ভবিষ্যতে যেসব আধুনিক পণ্য তৈরির আশা করছে শহরটি, সেগুলো প্রদর্শনের জন্য ইতোমধ্যে ‘তিয়ানশুই ইন্ডাস্ট্রি ২০৫০’ নামে একটি প্রদর্শনী হলও তৈরি করা হয়েছে। এসব উদ্যোগ রাজধানী বেইজিংয়ের নীতিনির্ধারকদের খুশি করার মতোই। তারা চান, চীনের পুরোনো শিল্পনির্ভর অঞ্চলগুলো প্রযুক্তির মাধ্যমে নতুন করে ঘুরে দাঁড়াক। গত সপ্তাহেও তারা নগর পুনর্গঠনের আরেকটি পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে। এতে স্থবির শহরগুলোকে উদ্ভাবনী শহরে রূপান্তর এবং বাসিন্দাদের জন্য ‘উচ্চমানের জীবন’ নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।
ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, এত প্রচার-প্রচারণার পরও তিয়ানশুইয়ের সাধারণ মানুষের অবস্থার খুব একটা উন্নতি হয়নি। নতুন কারখানাগুলো শহরের সামগ্রিক অর্থনৈতিক মন্দা কাটাতে পারেনি। ১০ বছর আগে তিয়ানশুইয়ের মাথাপিছু জিডিপি ছিল বেইজিংয়ের ১৬ শতাংশের সমান, এখন তা নেমে এসেছে ১৪ শতাংশে। ২০২৫ সালে শহরটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও জাতীয় গড়ের চেয়ে ২ শতাংশ পয়েন্ট কম ছিল।
স্থানীয়দের অভিযোগ, স্বয়ংক্রিয় বা অটোমেশননির্ভর এসব কারখানা তাদের জন্য তেমন কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারেনি। ফলে ভালো সুযোগের খোঁজে অনেক তরুণ শহর ছেড়ে চলে যাচ্ছে। গত এক দশকে তিয়ানশুইয়ের জনসংখ্যা প্রায় ৫ লাখ কমে ২৯ লাখে নেমে এসেছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৫০ সালের মধ্যে শহরে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা আরও কমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
তিয়ানশুইয়ের গল্প চীনের উন্নত উৎপাদনশিল্পের সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে। চীনের কমিউনিস্ট পার্টি মনে করে, দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে বিশ্বসেরা প্রযুক্তিপণ্য তৈরির ওপর। তাই তিয়ানশুইয়ের মতো দেশজুড়ে শত শত শহর এখন প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প গড়ে তুলতে মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে।

দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, চীনের এই প্রযুক্তি-নির্ভর উন্নয়ন কিছু মেধাবী, যোগাযোগে এগিয়ে থাকা এবং ধনী শহরকে আরও সমৃদ্ধ করলেও অনেক শহর সেই সুযোগ নিতে পারছে না। কারণ তাদের কাছে প্রয়োজনীয় সরবরাহব্যবস্থা (সাপ্লাই চেইন) বা দক্ষ জনশক্তি নেই। বাস্তবতা হলো, চীনের মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৬০ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ৫০ কোটি মানুষ, উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্তও পড়াশোনা করেনি। এদের বড় অংশই ছোট ও তুলনামূলক দরিদ্র শহরগুলোতে বাস করে।
কয়েক শতাব্দী ধরে অর্থনৈতিক কেন্দ্রের চেয়ে সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবেই বেশি পরিচিত ছিল তিয়ানশুই। প্রচলিত কিংবদন্তি অনুযায়ী, চীনের প্রথম সম্রাট যিনি অর্ধেক মানুষ ও অর্ধেক সাপের আকৃতির ছিলেন–তিনি এই শহরে জন্মেছিলেন। শহরের কাছের পাহাড়ি খাড়াইয়ে এখনো বৌদ্ধ গুহামন্দির খোদাই করা রয়েছে।
তবে ১৯৬০-এর দশকে তিয়ানশুই দ্রুত শিল্পায়নের পথে এগোয়। রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্পকেন্দ্রে পরিণত হয় শহরটি। এখানকার কারখানাগুলোতে ট্র্যাক্টর, বল বিয়ারিং ও দেশলাই তৈরি হতো। ক্রমবর্ধমান শ্রমিকদের জন্য নির্মাণ করা হয় আবাসন, স্কুল ও হাসপাতাল।
সেই সময়ের এক শ্রমিক ছিলেন ডং নামের এক নারী, যার বয়স এখন ৮০ বছরের বেশি। তিনি একটি ছাপাখানায় স্থায়ী সরকারি চাকরি করতেন, যাকে চীনে ‘আয়রন রাইস বোল’ বা আজীবন চাকরির নিশ্চয়তা বলা হয়। তিনি চল্লিশের কোটায় অবসর নেন, ভালো পেনশন পান এবং তার ছেলের জন্যও একই চাকরি পাওয়ার নিশ্চয়তা ছিল।
কিন্তু ১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকে চীন যখন ধীরে ধীরে বাজারভিত্তিক অর্থনীতিতে রূপান্তরিত হতে শুরু করে, তখন তিয়ানশুইয়ের বেশিরভাগ কারখানা প্রতিযোগিতায় টিকতে পারেনি। ফলে একসময়কার সেই শিল্পসমৃদ্ধ শহর ধীরে ধীরে পিছিয়ে পড়তে শুরু করে।
দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, গত এক দশকে তিয়ানশুইয়ে সেন্সর, মেশিন টুলসসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিপণ্য উৎপাদনকারী নতুন প্রজন্মের অনেক কারখানা গড়ে উঠেছে। কিন্তু এসব কারখানা খুব বেশি কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারেনি। তিয়ানশুইয়ের জাদুঘরের একটি প্রদর্শনীতে বিভিন্ন সময়ের কারখানার ছবি রাখা হয়েছে। সেখানে দেখা যায়, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শ্রমিকের সংখ্যা কমেছে, আর বেড়েছে রোবটের ব্যবহার।
স্থানীয়দের মতে, বর্তমানে যেসব কারখানায় চাকরি পাওয়া যায়, সেগুলোর বেশির ভাগের মাসিক বেতন প্রায় ৩ হাজার ইউয়ান (প্রায় ৪৪০ ডলার)। অথচ সাংহাইয়ের মতো বড় শহরে একই ধরনের কাজ করে এর দ্বিগুণ আয় করা সম্ভব।
তিয়ানশুইয়ের বাসিন্দা ২৭ বছর বয়সী ওয়েন জিন এখন পূর্বাঞ্চলের সমৃদ্ধ জিয়াংসু প্রদেশে কাজ করেন। তিনি বলেন, “আমি তিয়ানশুইয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে চাই। কিন্তু তরুণদের জন্য সেখানে ভালো চাকরি নেই।”
আরেক স্থানীয় তরুণ মা সিনও মনে করেন, শহরটির সেরা সময় অনেক আগেই পেরিয়ে গেছে। তিনিও সুযোগ পেলেই অন্য কোথাও চলে যেতে চান।
অবশ্য উচ্চপ্রযুক্তি শিল্প কিছু ভালো বেতনের চাকরিও তৈরি করে, বিশেষ করে গবেষণা ও উন্নয়ন (আরঅ্যান্ডডি) খাতে। তবে এসব চাকরি মূলত চীনের উপকূলীয় বড় শহরগুলোতেই কেন্দ্রীভূত। বেইজিং, সাংহাই ও শেনঝেনের মতো শহরে রয়েছে দেশের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়, সবচেয়ে মেধাবী স্নাতক এবং শক্তিশালী শিল্প সরবরাহব্যবস্থা।
ফলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এসব শহরের প্রযুক্তি খাতের বেতন দ্রুত বেড়েছে। কিছু ক্ষেত্রে বার্ষিক আয় ১০ লাখ ইউয়ানও ছাড়িয়ে গেছে।
পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ইউরেশিয়া গ্রুপের এর বিশ্লেষক ড্যান ওয়াং দ্য ইকোনমিস্টকে বলেন, চীনের ভেতর দিকের অঞ্চলের খুব কম শহরেরই এ ধরনের উচ্চ আয়ের চাকরি আকর্ষণ করার সুযোগ আছে। তার মতে, “চীনের অধিকাংশ শহর তাদের বর্তমান অবস্থার মধ্যেই আটকে আছে।”
চীনের নতুন অর্থনৈতিক মডেল থেকে তিয়ানশুই খুব বেশি সুবিধা নিতে না পারলেও, পুরোনো অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সমস্যাগুলো এখনো তাকে ভোগাচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে গেছে। এর অন্যতম কারণ দীর্ঘস্থায়ী আবাসন খাতের সংকট। তিয়ানশুইয়ের মতো ছোট শহরগুলোতে বাড়ির দাম সবচেয়ে দ্রুত কমেছে। শহরের উপকণ্ঠজুড়েও পড়ে রয়েছে অসমাপ্ত কংক্রিটের আবাসন প্রকল্প। গত বছর সেখানে আবাসন খাতে বিনিয়োগ ৪০ শতাংশেরও বেশি কমেছে।

এর প্রভাব পড়েছে ভোক্তা ব্যয়ের ওপরও। মানুষ নিজেদের আগের চেয়ে গরিব মনে করায় খরচ কমিয়ে দিচ্ছে। ২০২৫ সালে তিয়ানশুইয়ে খুচরা বিক্রি ৫ শতাংশের বেশি কমেছে। শহরের অনেক শপিংমলে এখন বন্ধ দোকান আর ফাঁকা রেস্তোরাঁর সারি দেখা যায়।
বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, তিয়ানশুইয়ের মতো ছোট শহরগুলোর এই পরিস্থিতি যদি সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে ধনী ও দরিদ্র অঞ্চলের বৈষম্য আরও বেড়ে যেতে পারে।
চীনের পূর্বাঞ্চলের হাংঝৌ শহরের ঝেজিয়াং বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক লি শি-এর সংগৃহীত তথ্য বলছে, অর্থনৈতিক মন্দার সবচেয়ে বেশি ধাক্কা লেগেছে নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর। চলতি বছরের এপ্রিল মাসে প্রকাশিত এক গবেষণায় তিনি উল্লেখ করেন, ২০১৮ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে চীনে আয়ের দিক থেকে সবচেয়ে নিচের ১০ শতাংশ শ্রমিকের আয় বছরে গড়ে মাত্র ২ শতাংশ বেড়েছে। অথচ একই সময়ে জাতীয় গড় আয় বৃদ্ধির হার ছিল প্রায় ৫ শতাংশ।
চীনের সরকারও জানে, শুধু উচ্চপ্রযুক্তির কারখানা গড়ে তুললেই সব সমস্যার সমাধান হবে না। রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া এ বছর এক প্রতিবেদনে বলেছে, যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য অবকাঠামোয় বিনিয়োগ চীনের অর্থনৈতিক উত্থানে বড় ভূমিকা রেখেছে, কিন্তু এখন সেই বিনিয়োগের সুফল ধীরে ধীরে কমে আসছে।
এ কারণেই মার্চে প্রকাশিত চীনের নতুন পাঁচ বছর মেয়াদি পরিকল্পনায় ২০৩০ সাল পর্যন্ত শুধু কারখানায় নয়, মানুষের পেছনেও বিনিয়োগের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। লক্ষ্য হলো অর্থনীতিকে আরও সমতাভিত্তিক করা। বাস্তবে এর অর্থ, বিশেষ করে দরিদ্র পরিবারের শিশুদের শিক্ষায় সরকারকে আরও বেশি অর্থ ব্যয় করতে হবে, যাতে তারা ভালো চাকরি পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও জ্ঞান অর্জন করতে পারে।
কিন্তু তিয়ানশুইয়ের বাসিন্দারা বলছেন, কথায় যত সহজ, বাস্তবে তা তত নয়। ধনী শহরগুলোর তুলনায় তিয়ানশুইয়ের বাজেট অনেক ছোট। উদাহরণ হিসেবে, বেইজিং একজন শিক্ষার্থীর পেছনে যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে, তিয়ানশুই তার এক-তৃতীয়াংশেরও কম খরচ করতে পারে।
এর ওপর অর্থনৈতিক মন্দা পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করছে। গত বছর শহরটির রাজস্ব আয় প্রায় ১০ শতাংশ কমেছে। ফলে শিক্ষা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ করাও কঠিন হয়ে পড়ছে।
তিয়ানশুইয়ের খুব কম শিক্ষার্থীই দেশের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পায়। ১২ বছর বয়সী এক মেয়ের মা শি টিংটিং বলেন, “এখানে শিশুদের জন্য প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা খুব কঠিন। শেষ পর্যন্ত তারা একই জায়গায় আটকে যায়।”