আরমান ভূঁইয়া

কারা হেফাজতে থাকা বন্দীদের মৃত্যুর সংখ্যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে ২০২৫ সালে সবচেয়ে বেশি কমেছে। কিন্তু দেশের ৭৫টি কারাগারে থাকা প্রায় ৮৪ হাজার বন্দীর জন্য চিকিৎসক আছেন মাত্র দুজন। প্রতিটি কারাগারে অন্তত একজন করে স্থায়ী চিকিৎসক থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে প্রায় সব কারাগারেই সেই পদ শূন্য।
সিভিল সার্জনের দপ্তর থেকে কিছু অস্থায়ী চিকিৎসক প্রেষণে বা সংযুক্ত হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও তারা নিয়মিত থাকেন না। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা অফিস সময় শেষে জেলখানা থেকে চলে যান। ফলে কোনো বন্দী গুরুতর অসুস্থ হযে পড়লে তাৎক্ষণিক চিকিৎসা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
কারা কর্মকর্তা ও মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, চিকিৎসকের তীব্র সংকট, অতিরিক্ত বন্দী ও অব্যবস্থাপনার কারণে কারাবন্দীরা যথাযথ চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। দীর্ঘদিন ধরেই এই সংকটের কথা বলা হলেও কার্যকর কোনো সমাধান হয়নি।
ধারণক্ষমতার দ্বিগুণ বন্দী, বিচারাধীনই বেশি
কারা অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, দেশে ১৪টি কেন্দ্রীয় ও ৬১টি জেলা কারাগার রয়েছে। এসব কারাগারের মোট ধারণক্ষমতা ৪৬ হাজার। সর্বশেষ ১৩ জানুয়ারির তথ্য অনুযায়ী এসব কারাগারে বন্দী রয়েছেন প্রায় ৮৪ হাজার। এর মধ্যে পুরুষ বন্দী ৮১ হাজার ৫০০ জন এবং নারী বন্দী প্রায় আড়াই হাজার। বন্দীদের বড় অংশই বিচারাধীন। এর বাইরে হাজতির সংখ্যা ৬৩ হাজার ৭০০ জন।
বছরের পর বছর ধরে ধারণক্ষমতার প্রায় দ্বিগুণ বন্দী কারাগারে রাখা হলেও আবাসন ও চিকিৎসা সংকট নিরসনে বড় ধরনের কোনো উদ্যোগই দেখা যায়নি। এ নিয়ে দপ্তরগুলোর মধ্যে চিঠি চালাচালি হলেও বাস্তবে ফলাফল শূন্য।

অনুমোদিত চিকিৎসক ১৪৮, আছেন ২ জন
কারা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৭৫টি কারা হাসপাতালের জন্য অনুমোদিত চিকিৎসক পদ ১৪৮টি। অর্থাৎ প্রতিটি হাসপাতালে দুইজন করে স্থায়ী চিকিৎসক থাকার কথা। কিন্তু সারা দেশে স্থায়ী চিকিৎসক রয়েছেন মাত্র দুজন। তাদের একজন মানিকগঞ্জ জেলা কারাগারে এবং আরেকজন রাজশাহী কারা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে কর্মরত।
স্থায়ী চিকিৎসক না থাকায় সিভিল সার্জনের দপ্তর থেকে ১০১ জন চিকিৎসক অস্থায়ী ভিত্তিতে কারা হাসপাতালগুলোতে কাজ করছেন। তবে কারা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এসব চিকিৎসক সকালে এসে দুপুর বা বিকেলের মধ্যেই চলে যান। অধিকাংশের আবাসস্থল কারাগার থেকে দূরে হওয়ায় রাতে কোনো বন্দী অসুস্থ হলে তাৎক্ষণিক চিকিৎসা দেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
বাড়ছে রোগী, নেই বিশেষজ্ঞ
কারা হাসপাতালের একটি সূত্র জানায়, কারাগারে থাকা বন্দীদের মধ্যে হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি ও লিভারের রোগ, ডায়াবেটিস, চর্মরোগ, দাঁতের সমস্যাসহ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। এসব রোগীর নিয়মিত চিকিৎসা প্রয়োজন হলেও বাস্তবে তা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। কোনো বন্দীর অবস্থা গুরুতর হলে তখন কারা কর্তৃপক্ষের নির্দেশে তাকে বাইরের হাসপাতালে পাঠানো হয়।
এখানেও রয়েছে সংকট। ৭৫টি কারা হাসপাতালের জন্য অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে মাত্র ২৭টি। ফলে অনেক সময় অ্যাম্বুলেন্স পাওয়া যায় না। তখন অক্সিজেনবিহীন অন্য যানবাহনে অসুস্থ বন্দীকে হাসপাতালে নিতে হয়, যা ঝুঁকি আরও বাড়ে।

পাঁচ বছরে মৃত্যু ১৩৬৬ জন, সবচেয়ে কম ২০২৫ এ
কারা অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, কারা হেফাজতে বন্দীদের মৃত্যুর হার তুলনামূলকভাবে কমেছে। গত পাঁচ বছরের মধ্যে ২০২৫ সালে মৃত্যুর সংখ্যা ছিল সবচেয়ে কম। গত বছর কারা হেফাজতে মারা গেছেন ১৪৭ জন বন্দী। তবে সব চেয়ে বেশি ছিল ২০২৩ সালে। সে সময় ৩৭৬ জন বন্দী মারা গেছে।
পাঁচ বছরে মোট মারা গেছেন এক হাজার ৩৬৬ জন বন্দী, যার মধ্যে ৪৭ জন নারী। এই হিসাবে বছরে গড়ে প্রায় ২৭৩ জন বন্দীর মৃত্যু হয়।
২০২৪ সালে ৩১৯ জন বন্দী, ২০২৩ সালে ৩৭৬ জন, ২০২২ সালে ২২৩ জন এবং ২০২১ সালে ৩০১ জন বন্দী মারা গেছে। গত পাঁচ বছরের তথ্য অনুযায়ী কারা হাসপাতালে মারা গেছেন মাত্র তিনজন। আর বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন ৮৮৩ জন। এছাড়া হাসপাতালে নেওয়ার পথে এবং হাসপাতালে নেওয়া পর মৃত ঘোষণা করা হয় ৪৮৩ জন বন্দীকে।
চিকিৎসকরা কারাগারে থাকতে চান না
কারা কর্মকর্তারা জানান, কারা হাসপাতালে চিকিৎসকদের ‘প্রেষণে’ বা ‘সংযুক্ত’ হিসেবে পাঠানো হয়। কিন্তু অধিকাংশ চিকিৎসক সেখানে থাকতে চান না। কারণ হিসেবে তারা জানান,পদোন্নতির সুযোগ নেই, কাজের চাপ বেশি এবং বিসিএস ক্যাডার কর্মকর্তা হয়েও নন-ক্যাডার কর্মকর্তার অধীনে দায়িত্ব পালন করতে হয়। পাশাপাশি অনেক চিকিৎসক নির্দিষ্ট ডিউটির বাইরে ব্যক্তিগত চেম্বারে বেশি আগ্রহী।
মানবাধিকারকর্মী মো. নূর খান চরচাকে বলেন, “গত ১০ বছরেও কারা হাসপাতালগুলোর দুরবস্থার কোনো বাস্তব উন্নতি হয়নি। বন্দীদের চিকিৎসা ও খাবার নিয়ে দুর্নীতি হচ্ছে। এসব বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরেই মানবাধিকারকর্মীরা কথা বলছেন, কিন্তু কাজের কাজ কিছু হচ্ছে না।”
রাষ্ট্রের দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে এই মানবাধিকারকর্মী আরও বলেন, “বন্দীরা রাষ্ট্রের হেফাজতে থাকেন। তাদের ভালো চিকিৎসা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। অবহেলায় কোনো বন্দীর মৃত্যু হলে সেই দায় রাষ্ট্র কোনোভাবেই এড়াতে পারে না।”
সংকট কাটাতে উদ্যোগের কথা বলছে কারা কর্তৃপক্ষ
কারা সদর দপ্তরের উপ-মহাপরিদর্শক (স্বাস্থ্য) লে. কর্নেল মোহাম্মদ আখতার হাসিব দেওয়ান বলেন, “স্বাস্থ্য ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সঙ্গে কাজ শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে একাধিক বৈঠক করা হয়েছে। কীভাবে আরও চিকিৎসক যুক্ত করা যায় এবং পরোক্ষভাবে নয়, সরাসরি কীভাবে চিকিৎসকদের এই ব্যবস্থার আওতায় আনা যায়-সে বিষয়ে আলোচনা চলছে।”
তিনি আরও বলেন, “খুব শিগগিরই একটি নিয়োগ নীতিমালা প্রণয়ন করা হচ্ছে, যার মাধ্যমে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে সরাসরি চিকিৎসক নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হবে। বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে চিকিৎসকের সংখ্যা বাড়ানো এবং বিদ্যমান চিকিৎসা সহকারীদের প্রশিক্ষিত করার কাজ চলছে।”
বন্দীদের মৃত্যুর কারণ প্রসঙ্গে আখতার হাসিব দেওয়ান বলেন, “সামগ্রিকভাবে হৃদরোগজনিত মৃত্যুর সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি।”
কারা অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে বলা আছে-বন্দীদের সঙ্গে মানবিক আচরণ করা, যথাযথ বাসস্থান, খাদ্য ও চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং পুনর্বাসনের লক্ষ্যে প্রশিক্ষণ দেওয়া তাদের লক্ষ্য। কিন্তু বাস্তবতায় কারাগারগুলোতে বন্দীদের গাদাগাদি করে রাখা হয়, খাবারের মান নিম্ন এবং চিকিৎসা সুবিধা অপ্রতুল।
অতিরিক্ত বন্দী, চিকিৎসকের সংকট ও অব্যবস্থাপনার এই চিত্র কবে বদলাবে, সেই প্রশ্নই সবচেয়ে বড় হয়ে উঠেছে।

কারা অধিদপ্তরের সহকারী কারা মহাপরিদর্শক (উন্নয়ন) মো. জান্নাত-উল ফরহাদ বলেন, “দেশের কারাগারগুলোতে ধারণক্ষমতার তুলনায় বন্দী বেশি হওয়ায় স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। এ অবস্থায় কারা হাসপাতালগুলোর অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সংযোজন এবং চিকিৎসাসেবা শক্তিশালী করতে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। কারা হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো এবং বন্দীদের মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে কাজ করা হচ্ছে।”
চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর সংকট নিরসনে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে জানিয়ে এই কারা কর্মকর্তা বলেন, “কারাগারে চিকিৎসাসেবা উন্নত করতে অ্যাম্বুলেন্স সংখ্যা বৃদ্ধি, হাসপাতালের সুযোগ-সুবিধা সম্প্রসারণ এবং আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার আওতায় আনার কাজ চলছে।”
এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে কারা হাসপাতালগুলোর বর্তমান সংকট অনেকটাই কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

কারা হেফাজতে থাকা বন্দীদের মৃত্যুর সংখ্যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে ২০২৫ সালে সবচেয়ে বেশি কমেছে। কিন্তু দেশের ৭৫টি কারাগারে থাকা প্রায় ৮৪ হাজার বন্দীর জন্য চিকিৎসক আছেন মাত্র দুজন। প্রতিটি কারাগারে অন্তত একজন করে স্থায়ী চিকিৎসক থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে প্রায় সব কারাগারেই সেই পদ শূন্য।
সিভিল সার্জনের দপ্তর থেকে কিছু অস্থায়ী চিকিৎসক প্রেষণে বা সংযুক্ত হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও তারা নিয়মিত থাকেন না। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা অফিস সময় শেষে জেলখানা থেকে চলে যান। ফলে কোনো বন্দী গুরুতর অসুস্থ হযে পড়লে তাৎক্ষণিক চিকিৎসা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
কারা কর্মকর্তা ও মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, চিকিৎসকের তীব্র সংকট, অতিরিক্ত বন্দী ও অব্যবস্থাপনার কারণে কারাবন্দীরা যথাযথ চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। দীর্ঘদিন ধরেই এই সংকটের কথা বলা হলেও কার্যকর কোনো সমাধান হয়নি।
ধারণক্ষমতার দ্বিগুণ বন্দী, বিচারাধীনই বেশি
কারা অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, দেশে ১৪টি কেন্দ্রীয় ও ৬১টি জেলা কারাগার রয়েছে। এসব কারাগারের মোট ধারণক্ষমতা ৪৬ হাজার। সর্বশেষ ১৩ জানুয়ারির তথ্য অনুযায়ী এসব কারাগারে বন্দী রয়েছেন প্রায় ৮৪ হাজার। এর মধ্যে পুরুষ বন্দী ৮১ হাজার ৫০০ জন এবং নারী বন্দী প্রায় আড়াই হাজার। বন্দীদের বড় অংশই বিচারাধীন। এর বাইরে হাজতির সংখ্যা ৬৩ হাজার ৭০০ জন।
বছরের পর বছর ধরে ধারণক্ষমতার প্রায় দ্বিগুণ বন্দী কারাগারে রাখা হলেও আবাসন ও চিকিৎসা সংকট নিরসনে বড় ধরনের কোনো উদ্যোগই দেখা যায়নি। এ নিয়ে দপ্তরগুলোর মধ্যে চিঠি চালাচালি হলেও বাস্তবে ফলাফল শূন্য।

অনুমোদিত চিকিৎসক ১৪৮, আছেন ২ জন
কারা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৭৫টি কারা হাসপাতালের জন্য অনুমোদিত চিকিৎসক পদ ১৪৮টি। অর্থাৎ প্রতিটি হাসপাতালে দুইজন করে স্থায়ী চিকিৎসক থাকার কথা। কিন্তু সারা দেশে স্থায়ী চিকিৎসক রয়েছেন মাত্র দুজন। তাদের একজন মানিকগঞ্জ জেলা কারাগারে এবং আরেকজন রাজশাহী কারা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে কর্মরত।
স্থায়ী চিকিৎসক না থাকায় সিভিল সার্জনের দপ্তর থেকে ১০১ জন চিকিৎসক অস্থায়ী ভিত্তিতে কারা হাসপাতালগুলোতে কাজ করছেন। তবে কারা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এসব চিকিৎসক সকালে এসে দুপুর বা বিকেলের মধ্যেই চলে যান। অধিকাংশের আবাসস্থল কারাগার থেকে দূরে হওয়ায় রাতে কোনো বন্দী অসুস্থ হলে তাৎক্ষণিক চিকিৎসা দেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
বাড়ছে রোগী, নেই বিশেষজ্ঞ
কারা হাসপাতালের একটি সূত্র জানায়, কারাগারে থাকা বন্দীদের মধ্যে হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি ও লিভারের রোগ, ডায়াবেটিস, চর্মরোগ, দাঁতের সমস্যাসহ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। এসব রোগীর নিয়মিত চিকিৎসা প্রয়োজন হলেও বাস্তবে তা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। কোনো বন্দীর অবস্থা গুরুতর হলে তখন কারা কর্তৃপক্ষের নির্দেশে তাকে বাইরের হাসপাতালে পাঠানো হয়।
এখানেও রয়েছে সংকট। ৭৫টি কারা হাসপাতালের জন্য অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে মাত্র ২৭টি। ফলে অনেক সময় অ্যাম্বুলেন্স পাওয়া যায় না। তখন অক্সিজেনবিহীন অন্য যানবাহনে অসুস্থ বন্দীকে হাসপাতালে নিতে হয়, যা ঝুঁকি আরও বাড়ে।

পাঁচ বছরে মৃত্যু ১৩৬৬ জন, সবচেয়ে কম ২০২৫ এ
কারা অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, কারা হেফাজতে বন্দীদের মৃত্যুর হার তুলনামূলকভাবে কমেছে। গত পাঁচ বছরের মধ্যে ২০২৫ সালে মৃত্যুর সংখ্যা ছিল সবচেয়ে কম। গত বছর কারা হেফাজতে মারা গেছেন ১৪৭ জন বন্দী। তবে সব চেয়ে বেশি ছিল ২০২৩ সালে। সে সময় ৩৭৬ জন বন্দী মারা গেছে।
পাঁচ বছরে মোট মারা গেছেন এক হাজার ৩৬৬ জন বন্দী, যার মধ্যে ৪৭ জন নারী। এই হিসাবে বছরে গড়ে প্রায় ২৭৩ জন বন্দীর মৃত্যু হয়।
২০২৪ সালে ৩১৯ জন বন্দী, ২০২৩ সালে ৩৭৬ জন, ২০২২ সালে ২২৩ জন এবং ২০২১ সালে ৩০১ জন বন্দী মারা গেছে। গত পাঁচ বছরের তথ্য অনুযায়ী কারা হাসপাতালে মারা গেছেন মাত্র তিনজন। আর বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন ৮৮৩ জন। এছাড়া হাসপাতালে নেওয়ার পথে এবং হাসপাতালে নেওয়া পর মৃত ঘোষণা করা হয় ৪৮৩ জন বন্দীকে।
চিকিৎসকরা কারাগারে থাকতে চান না
কারা কর্মকর্তারা জানান, কারা হাসপাতালে চিকিৎসকদের ‘প্রেষণে’ বা ‘সংযুক্ত’ হিসেবে পাঠানো হয়। কিন্তু অধিকাংশ চিকিৎসক সেখানে থাকতে চান না। কারণ হিসেবে তারা জানান,পদোন্নতির সুযোগ নেই, কাজের চাপ বেশি এবং বিসিএস ক্যাডার কর্মকর্তা হয়েও নন-ক্যাডার কর্মকর্তার অধীনে দায়িত্ব পালন করতে হয়। পাশাপাশি অনেক চিকিৎসক নির্দিষ্ট ডিউটির বাইরে ব্যক্তিগত চেম্বারে বেশি আগ্রহী।
মানবাধিকারকর্মী মো. নূর খান চরচাকে বলেন, “গত ১০ বছরেও কারা হাসপাতালগুলোর দুরবস্থার কোনো বাস্তব উন্নতি হয়নি। বন্দীদের চিকিৎসা ও খাবার নিয়ে দুর্নীতি হচ্ছে। এসব বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরেই মানবাধিকারকর্মীরা কথা বলছেন, কিন্তু কাজের কাজ কিছু হচ্ছে না।”
রাষ্ট্রের দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে এই মানবাধিকারকর্মী আরও বলেন, “বন্দীরা রাষ্ট্রের হেফাজতে থাকেন। তাদের ভালো চিকিৎসা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। অবহেলায় কোনো বন্দীর মৃত্যু হলে সেই দায় রাষ্ট্র কোনোভাবেই এড়াতে পারে না।”
সংকট কাটাতে উদ্যোগের কথা বলছে কারা কর্তৃপক্ষ
কারা সদর দপ্তরের উপ-মহাপরিদর্শক (স্বাস্থ্য) লে. কর্নেল মোহাম্মদ আখতার হাসিব দেওয়ান বলেন, “স্বাস্থ্য ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সঙ্গে কাজ শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে একাধিক বৈঠক করা হয়েছে। কীভাবে আরও চিকিৎসক যুক্ত করা যায় এবং পরোক্ষভাবে নয়, সরাসরি কীভাবে চিকিৎসকদের এই ব্যবস্থার আওতায় আনা যায়-সে বিষয়ে আলোচনা চলছে।”
তিনি আরও বলেন, “খুব শিগগিরই একটি নিয়োগ নীতিমালা প্রণয়ন করা হচ্ছে, যার মাধ্যমে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে সরাসরি চিকিৎসক নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হবে। বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে চিকিৎসকের সংখ্যা বাড়ানো এবং বিদ্যমান চিকিৎসা সহকারীদের প্রশিক্ষিত করার কাজ চলছে।”
বন্দীদের মৃত্যুর কারণ প্রসঙ্গে আখতার হাসিব দেওয়ান বলেন, “সামগ্রিকভাবে হৃদরোগজনিত মৃত্যুর সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি।”
কারা অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে বলা আছে-বন্দীদের সঙ্গে মানবিক আচরণ করা, যথাযথ বাসস্থান, খাদ্য ও চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং পুনর্বাসনের লক্ষ্যে প্রশিক্ষণ দেওয়া তাদের লক্ষ্য। কিন্তু বাস্তবতায় কারাগারগুলোতে বন্দীদের গাদাগাদি করে রাখা হয়, খাবারের মান নিম্ন এবং চিকিৎসা সুবিধা অপ্রতুল।
অতিরিক্ত বন্দী, চিকিৎসকের সংকট ও অব্যবস্থাপনার এই চিত্র কবে বদলাবে, সেই প্রশ্নই সবচেয়ে বড় হয়ে উঠেছে।

কারা অধিদপ্তরের সহকারী কারা মহাপরিদর্শক (উন্নয়ন) মো. জান্নাত-উল ফরহাদ বলেন, “দেশের কারাগারগুলোতে ধারণক্ষমতার তুলনায় বন্দী বেশি হওয়ায় স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। এ অবস্থায় কারা হাসপাতালগুলোর অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সংযোজন এবং চিকিৎসাসেবা শক্তিশালী করতে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। কারা হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো এবং বন্দীদের মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে কাজ করা হচ্ছে।”
চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর সংকট নিরসনে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে জানিয়ে এই কারা কর্মকর্তা বলেন, “কারাগারে চিকিৎসাসেবা উন্নত করতে অ্যাম্বুলেন্স সংখ্যা বৃদ্ধি, হাসপাতালের সুযোগ-সুবিধা সম্প্রসারণ এবং আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার আওতায় আনার কাজ চলছে।”
এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে কারা হাসপাতালগুলোর বর্তমান সংকট অনেকটাই কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।