Advertisement Banner

মুক্তির যাত্রা অব্যাহত রাখতে দরকার শিক্ষা সংস্কার

মো. ফজলুল করিম
মো. ফজলুল করিম
মুক্তির যাত্রা অব্যাহত রাখতে দরকার শিক্ষা সংস্কার
নতুন বই পাওয়ার উল্লাসে শিক্ষার্থীরা। ছবি: চরচা

২০২৬ সালের স্বাধীনতা দিবস একটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। এ বছর একটি অবাধ নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরেছে। বাকস্বাধীনতা, বিচার বিভাগ ও আইনের শাসন নিয়ে দেশের মানুষ নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে। সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় বিচারহীনতার যুগের অবসান হবে—এই প্রত্যাশাও বেড়েছে। বৈষম্যহীন একটি সমাজ গড়ার আকাঙ্ক্ষা এই নির্বাচনের মাধ্যমে আরও দৃঢ় হয়েছে। তাই ২০২৬ সালকে বলা যায়–মুক্তির স্বাদ নতুন করে পাওয়ার বছর।

এই মুক্তির আকাঙ্ক্ষা থেকেই আমাদের রাষ্ট্রীয় যাত্রার সূচনা। কিন্তু পাকিস্তান থেকে মুক্ত হয়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম হলেও আমাদের মুক্তির সংগ্রাম এখনো শেষ হয়নি। আমরা গণতান্ত্রিক পথে বারবার হোঁচট খেয়েছি। বাকস্বাধীনতা নিয়ে আমাদের অস্বস্তি কাটেনি। বিচারহীনতা, আইনের শাসনের অভাব এবং এসব ক্ষেত্রে বৈষম্য আমাদের প্রতিনিয়ত মনে করিয়ে দেয়—রাষ্ট্র হিসেবে স্বাধীন হলেও আমরা নিজেদের ভেতরের বৈপরীত্য এখনো কাটিয়ে উঠতে পারিনি।

স্বাধীন বাংলাদেশের একটি বড় শক্তি হলো–আমাদের বিশাল জনসংখ্যা। অনেকে এটিকে চাপ হিসেবে দেখলেও আমার কাছে এটি আশীর্বাদ। এই জনসংখ্যাকে জনসম্পদে রূপান্তর করতে পারলে দেশ এগিয়ে যাবে প্রবল গতিতে—আমাদের আর থামিয়ে রাখা যাবে না।

জনসংখ্যাকে জনসম্পদে রূপান্তর করতে হলে প্রয়োজন স্পষ্ট পরিকল্পনা। আর এই পরিকল্পনার কেন্দ্রে থাকতে হবে শিক্ষা। গত ইন্টেরিম সময়ে আমরা আশা করেছিলাম, তরুণদের প্রত্যাশার সাথে সামঞ্জস্য রেখে একটি যুগোপযোগী শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। কিন্তু শিক্ষা সংস্কারের মাধ্যমে শিক্ষাকে আরও বাজারমুখী করার ক্ষেত্রে তেমন কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। তবে সময় এখনো শেষ হয়ে যায়নি। বর্তমান সরকারের সামনে শিক্ষাকে ঢেলে সাজানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ এসেছে। এই স্বাধীনতা দিবসে আমাদের প্রত্যাশা—গতানুগতিক শিক্ষা থেকে বের হয়ে কার্যকর, বাস্তবমুখী শিক্ষাব্যবস্থার দিকে সরকার মনোযোগী হবে।

‘বৈষম্য’ শব্দটি স্বাধীনতার সঙ্গে একেবারেই বেমানান। অথচ আমাদের দেশে শিক্ষার্থীরা শিক্ষালাভের ক্ষেত্রেই স্তরে স্তরে বৈষম্যের শিকার হয়। গ্রামীণ ও শহুরে শিক্ষার মধ্যে রয়েছে ব্যাপক পার্থক্য। ফলে আমাদের উচ্চারণ আলাদা, ইংরেজি দক্ষতা আলাদা, মানসিকতা আলাদা—এমনকি চেতনাবোধও ভিন্ন। স্বাধীনতার যে অর্থ–শৃঙ্খল ভেঙে মুক্তির মিছিলে যোগ দেওয়ার সাহস—সেটিও সবার মধ্যে সমানভাবে বিকশিত হয় না। আমরা অনেকেই স্বপ্ন দেখতে ভয় পাই, নিজেদের সংকুচিত রাখি। দেয়ালে পিঠ না ঠেকা পর্যন্ত নিজেদের শক্তি বিশ্বাস করতে পারি না। এর ওপর বহুধারার শিক্ষাব্যবস্থা এই বৈষম্যকে আরও প্রকট করেছে। ফলে আমাদের দেশপ্রেমও একরকম নয়।

পরীক্ষা চলাকালীন শিক্ষার্থীরা। ছবি: চরচা
পরীক্ষা চলাকালীন শিক্ষার্থীরা। ছবি: চরচা

এভাবে একটি জাতি একক সত্তার জাতি হিসেবে গড়ে উঠতে পারে না। ফলে আমরা চরম ডান বা বামপন্থায় বিভক্ত হয়ে পড়ি, কিন্তু ‘বাংলাদেশপন্থী’ হয়ে উঠতে পারি না। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’—এই মৌলিক সত্যটি আমরা প্রায়ই ভুলে যাই।

বর্তমান সরকারের স্লোগান ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ বাস্তবে রূপ দিতে হলে শিক্ষাব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তন আনতে হবে। একমুখী শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষার ওপর জোর দিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা না বাড়িয়ে বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিশ্বমানের করে গড়ে তুলতে হবে। যেখানে উচ্চতর ডিগ্রির প্রয়োজন নেই, সেখানে অপ্রয়োজনীয় ডিগ্রি অর্জনের প্রবণতা কমাতে হবে। তবে যেখানে গবেষণা অপরিহার্য, সেখানে সর্বোচ্চ গুরুত্ব ও বরাদ্দ দিতে হবে।

গবেষণার জন্য আন্তর্জাতিক মানের অন্তত পাঁচটি কেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে, যেখানে প্রয়োজনভিত্তিক গবেষণা পরিচালিত হবে এবং গবেষকদের উচ্চমানের বেতন নিশ্চিত করা হবে। এতে ‘ব্রেইন ড্রেইন’ কমে ‘ব্রেইন গেইন’ বাড়বে। বিদেশ থেকে উচ্চশিক্ষা নেওয়া গবেষকরা দেশে ফিরে আসতে উৎসাহিত হবেন। তাদের মাধ্যমে গড়ে উঠবে শক্তিশালী পাবলিক-প্রাইভেট অংশীদারত্ব। শুধু সরকার নয়, বড় বড় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও জ্ঞানভিত্তিক উন্নয়নে অংশীদার হবে।

স্বাধীনতার অর্থ যদি হয় পরাধীনতা থেকে মুক্তি, তবে বাংলাদেশকে অবশ্যই শিক্ষাক্ষেত্রে পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙতে হবে। সবক্ষেত্রে বিদেশ নির্ভরতা কমিয়ে নিজেদের পণ্য ও জ্ঞানকে উচ্চমূল্যসম্পন্ন করে তুলতে হবে। এতে একদিকে জনসংখ্যা জনসম্পদে রূপান্তরিত হবে, অন্যদিকে আয় বৃদ্ধি পেয়ে সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য কমবে।

এটি করতে পারলে আমাদের গল্প হবে–নিজেদের মেরুদণ্ডে দাঁড়ানো একটি জাতির গল্প। আমাদের প্রতিরক্ষা হবে জ্ঞাননির্ভর, শিল্প হবে বিশ্বমানের। কিন্তু যদি আমরা আবারও একই ভুলের পুনরাবৃত্তি করি, তবে স্বাধীনতার অর্থ কেবল একটি দিনেই সীমাবদ্ধ হয়ে যাবে। তাই এই স্বাধীনতা দিবসে আমাদের শপথ হোক–মুক্তির স্লোগান শুরু হোক শিক্ষা সংস্কারের মাধ্যমে।

লেখক: অধ্যাপক, বিজিই বিভাগ, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

সম্পর্কিত