জম্বিদের দুনিয়া বদলে দিয়েছিল যে সিনেমা

জম্বিদের দুনিয়া বদলে দিয়েছিল যে সিনেমা
‘ট্রেন টু বুসান’ সিনেমাটি ১ কোটি ১৫ লাখেরও বেশি মানুষ হলে গিয়ে দেখেছিল।

সিনেমার দুনিয়ায় একটি সুনির্দিষ্ট জনরা হলো ‘জম্বি সিনেমা’। জম্বির একটি উপযুক্ত বাংলা অর্থ হতে পারে—জিন্দা লাশ। অনেকগুলো মরদেহ ছুটে বেড়াচ্ছে জীবিতদের চিবিয়ে খেতে। ভাবতেও কেমন জানি লাগে!

অনেকের ভালো লাগে এই জম্বি সিনেমা। অনেকের আবার ভালো লাগেও না। আবার যাদের ভালো লাগে না, তাদের অনেকেও কিন্তু ভীষণ ভয়, উত্তেজনা ও আনন্দ নিয়ে দেখে ফেলেছিল দক্ষিণ কোরিয়ার সিনেমা ‘ট্রেন টু বুসান’। না দেখা থাকলে দেখে ফেলতে পারেন। কারণ এটি প্রচলিত জম্বি সিনেমাগুলোর মতো নয়। রোমহষর্ক ভয় ও অস্বস্তি শেষে এই সিনেমা মানবতার কথা বলে। বলে ভালোবাসার কথা।

২০১৬ সালে দক্ষিণ কোরিয়ায় সবচেয়ে বেশি দর্শক যে সিনেমাটি দেখেছিল সেটি ইয়োন সাং-হো পরিচালিত এই ‘ট্রেন টু বুসান’। ১ কোটি ১৫ লাখেরও বেশি মানুষ সিনেমাটি হলে গিয়ে দেখেছিল। এটি এখনো দক্ষিণ কোরিয়ার সর্বকালের সর্বাধিক দর্শকসংখ্যা অর্জনকারী চলচ্চিত্রের তালিকায় ১১তম স্থানে অবস্থানে রয়েছে। সিনেমাটির প্রিমিয়ার হয়েছিল ২০১৬ সালের কান চলচ্চিত্র উৎসবে।

স্প্যানিশ সিনেমা ‘হরর এক্সপ্রেস’-এর মূল পোস্টার।
স্প্যানিশ সিনেমা ‘হরর এক্সপ্রেস’-এর মূল পোস্টার।

একজন বাবা তার কন্যাকে নিয়ে অন্যান্য যাত্রীর সঙ্গে বুসান যাচ্ছে। বাবার ভূমিকায় অভিনয় করেছেন গং-ইউ। বুসানে থাকে মেয়ের মা এবং তার প্রাক্তন স্ত্রী। জন্মদিন উপলক্ষে মেয়েকে মায়ের সঙ্গে দেখা করিয়ে দিতেই এই ট্রেনযাত্রা। যাত্রীবাহী ট্রেনটি হঠাৎ জম্বিদের আক্রমণের শিকার হয়। এরপরই গল্প ঢুকে যায় এক ভয়াবহ গলিতে।

ধারণা করা হয়, ট্রেনে জম্বিদের হামলা নিয়ে করা প্রথম চলচ্চিত্র ‘হরর এক্সপ্রেস’। স্প্যানিশ সিনেমাটি ১৯৭২ সালে মুক্তি  । মূল নাম ছিল ‘প্যানিকো এন এল ট্রান্সসাইবেরিয়ান’ অর্থাৎ ‘প্যানিক অন দ্য ট্রান্সসাইবেরিয়ান’। তারপর অনেক জম্বি সিনেমা হয়েছে। কিন্তু ট্রেনকে ব্যবহার করে সফল কিছু হয়নি। সত্তর দশকের ঐতিহ্যকে গ্রহণ করে জম্বি সিনেমা-ঘরানাকে আমূল বদলে দিয়েছিলেন পরিচালক ইয়োন সাং-হো।  

‘ট্রেন টু বুসান’-এ জম্বিদের ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। সাধারণত দেখা যায় মানুষ জম্বিদের হামলা থেকে বাঁচতে প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যায়। কিন্তু এই সিনেমায় পরিস্থিতি ভিন্ন। আমরা দেখি, মানুষের জন্য জম্বিদের চেয়ে বিপজ্জনক হয়ে ওঠে মানুষই! জম্বিদের হাত থেকে বাঁচতে মানুষই মানুষকে হত্যা করতে দ্বিধা করে না। সঙ্কট কীভাবে ভদ্রতার লেবাস ছিঁড়ে শ্রেণিবৈষম্য, লোভ, আত্মকেন্দ্রিকতাকে বের করে আনে, তা এই সিনেমায় প্রকটভাবে ফুটে উঠেছে। অবশ্য সবশেষে মানুষেরই জয় হয়।

ট্রেন টু বুসান সিনেমার পোস্টার।
ট্রেন টু বুসান সিনেমার পোস্টার।

মানুষের লড়াই, আত্মোৎসর্গ ও ভালোবাসা সিনেমাটিকে পুরোপুরি জম্বিনির্ভর হতে দেয়নি। সম্ভবত এ জন্যই ব্রিটিশ চলচ্চিত্র নির্মাতা এডগার রাইট বলেছেন, ‘ট্রেন টু বুসান’ তার দেখা সেরা জম্বি-সিনেমা। নতুন গল্প তো আছেই। একে সোনায় সোহাগা করেছে দুর্দান্ত এডিটিং, শ্যুটিং ও ভিজ্যুয়াল ইফেক্টস।

এই সিনেমার বাজেট ছিল ৮ দশমিক ৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। কিন্তু তা আয় করেছিল প্রায় ১০০ মিলিয়ন ডলার। বলা হয়ে থাকে, দক্ষিণ কোরিয়ার ইতিহাসে আর কোনো সিনেমা বিদেশের মাটিতে এতটা আলোড়ন ফেলতে পারেনি।

‘ট্রেন টু বুসান’ বাঁধভাঙা সফলতা পাওয়ার পরও পরিচালক ইয়োন সাং-হো এই সিনেমার সিক্যুয়েল করতে চাননি। পরে অবশ্য মত পাল্টান। ২০২০ সালে মুক্তি পায় তার ‘ট্রেন টু বুসান প্রেজেন্টস পেনিনসুলা’ নামের সিনেমা। তিনি অবশ্য বলেছেন, এটি ঠিক ‘ট্রেন টু বুসান’-এর সিক্যুয়েল নয়।

দেখুন, দেখে আপনিই নাহয় ঠিক করুন ‘ট্রেন টু বুসান’ কেমন।

ইয়োন সাং-হো। ছবি: আইএমডিবি
ইয়োন সাং-হো। ছবি: আইএমডিবি

দাঁড়ান! দাঁড়ান! আরেকটি কথা বলা হয়নি, ‘ট্রেন টু বুসান’ কিন্তু পরিচালক ইয়োন সাং-হো পরিচালিত প্রথম সিনেমা। এর আগে তিনি জম্বি নিয়েই একটি অ্যানিমেটেড শর্টফিল্ম তৈরি করেছিলেন। ‘সিউল স্টেশন’ নামের ওই শর্টফিল্মটিকে বলা হয় ‘ট্রেন টু বুসান’-এর প্রিক্যুয়েল।       

তথ্যসূত্র: ক্রিপি ক্যাটালগ ও মিডিয়াম

সম্পর্কিত