মেরিনা মিতু

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়ের পর রাজনীতির মাঠে এখনো বড় কোনো চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েনি বিএনপি। তবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নতুন রাজনৈতিক পরীক্ষার মুখে পড়তে পারে ক্ষমতাসীন দলটি। দীর্ঘদিন পর দলীয় প্রতীক ছাড়া হতে যাওয়া স্থানীয় সরকার নির্বাচন একদিকে যেমন দলটির জন্য সুযোগ তৈরি করেছে, অন্যদিকে তৈরি করেছে নতুন চ্যালেঞ্জও। প্রশ্ন আসছে, দলীয় প্রতীক না থাকা বিএনপির জন্য লাভ নাকি ক্ষতি?
সংসদ নির্বাচনের পর দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন বড় কোনো কর্মসূচির চাপ নেই। সরকার পরিচালনা, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন এবং প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের ব্যস্ততার মধ্যেই ক্ষমতাসীন বিএনপির সামনে নতুন এই পরীক্ষা–স্থানীয় সরকার নির্বাচন।
দীর্ঘদিন পর এমন এক নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে, যেখানে থাকছে না দলীয় প্রতীক। ফলে ভোটের মাঠে দলীয় পরিচয়ের পাশাপাশি প্রার্থীর ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা, সামাজিক প্রভাব ও জনপ্রিয়তাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। স্থানীয় সরকার ভোটকে শুধু জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের প্রক্রিয়া হিসেবে নয়, বরং তৃণমূলে নিজেদের সাংগঠনিক শক্তি যাচাইয়ের সুযোগ হিসেবেও দেখছে বিএনপি।
দলটির একাধিক নীতিনির্ধারক ও সাংগঠনিক নেতারা জানিয়েছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যে ভেতরে প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। সম্ভাব্য প্রার্থীদের বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। সাংগঠনিকভাবে দুর্বল ইউনিটগুলো চিহ্নিত করে পুনর্গঠনের কাজও এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
বর্ষার পর ভোটের প্রস্তুতি
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর বা অক্টোবর থেকে পর্যায়ক্রমে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি), পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ এবং সিটি করপোরেশন নির্বাচন শুরু হতে পারে। আগামী এক বছরের মধ্যে পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়া শেষ করতে চায় বিএনপি সরকার।
নির্বাচনের সম্ভাব্য সময়সূচি সামনে আসার পর থেকেই বিভিন্ন এলাকায় সম্ভাব্য প্রার্থীদের তৎপরতা বেড়েছে। কোথাও কোথাও ব্যানার-ফেস্টুনে ছেয়ে গেছে সড়ক। সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে উপস্থিতি বাড়াচ্ছেন স্থানীয় নেতারা। ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগও বাড়িয়ে দিয়েছেন তারা।
তবে একই এলাকায় একাধিক মনোনয়নপ্রত্যাশীর সক্রিয়তা কীভাবে সামলানো হবে, তা নিয়েও দলের মধ্যে আলোচনা রয়েছে।
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও সংসদ সদস্য খায়রুল কবির খোকন চরচাকে বলেন, “জাতীয় নির্বাচনে দলীয় প্রতীক ছিল বলে শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন তুলনামূলক সহজ ছিল। কিন্তু স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রতীক না থাকলে সমীকরণ ভিন্ন হবে। অনেকেই ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার ওপর ভর করে নির্বাচনে নামতে চাইবেন।”
প্রতীক না থাকলে লাভ কোথায়?
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ক্ষমতায় বসা অন্তর্বর্তী সরকার যেসব সংস্কার কমিশন করেছিল, তার মধ্যে নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন ও স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশন দলীয় প্রতীক বাদ দেওয়ার সুপারিশ করেছিল। পরে ২০২৫ সালে সংশ্লিষ্ট আইনগুলো সংশোধন করে অধ্যাদেশ জারি করে অন্তর্বর্তী সরকার।
সেই অধ্যাদেশগুলো ত্রয়োদশ সংসদের অনুমোদনও পেয়েছে। সুতরাং যদি আইনে এ-সংক্রান্ত আর কোনো সংশোধন না হয়, তবে দলীয় প্রতীক ছাড়াই হবে স্থানীয় সরকারের ভোট।

গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তবর্তী সরকার স্থানীয় সরকারগুলো ভেঙে দেয়। ওই সরকার পরে স্থানীয় সরকার নির্বাচন করেনি। দুই বছরের বেশি সময় ধরে স্থানীয় সরকারের কোনো নির্বাচন হয় না।
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সামনে এখন একগুচ্ছ স্থানীয় নির্বাচন, যেগুলোর মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। সিটি ও জেলা পরিষদে বিএনপি দলীয় নেতাদের প্রশাসক হিসেবে বসিয়েছে।
স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সবশেষ সিটি করপোরেশন নির্বাচন হয় ২০২৪ সালের মার্চে। ২০২১ সালের শুরুতে ধাপে ধাপে পৌরসভা, ২০২১ সালের এপ্রিলে শুরু হয় ধাপে ধাপে ইউপি, ২০২২ সালের অক্টোবরে এক দিনে জেলা পরিষদ এবং ২০২৪ সালে ধাপে ধাপে উপজেলা পরিষদের ভোট হয়।
তবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক না থাকার সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছে বিএনপি।
দলটির নেতাদের যুক্তি, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান মূলত নাগরিক সেবা ও উন্নয়ন কার্যক্রমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। সেখানে দলীয় বিভাজনের চেয়ে ব্যক্তির যোগ্যতা ও গ্রহণযোগ্যতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হওয়া উচিত।
তবে দলীয় প্রতীকে ভোট না হলেও দলগুলোর প্রার্থী ঘোষণা নিয়ে ‘উদ্বেগ’ প্রকাশ করেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন। গত মে মাসে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, “গণমাধ্যমে দেখছি, বিভিন্ন দল থেকে অলরেডি মনোনয়নের ঘোষণা দিচ্ছে। এটা আমার জন্য চিন্তার, আমার কপালে ভাঁজ পড়েছে।”
বিএনপির একাধিক নেতা মনে করেন, দলীয় প্রতীকের কারণে অতীতে স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক মেরুকরণ বেড়েছিল। অনেক ক্ষেত্রে পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্কও রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তাদের মতে, এবার ব্যক্তি-ইমেজ, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা এবং স্থানীয় উন্নয়নে ভূমিকার বিষয়গুলো দলের শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে বেশি গুরুত্ব পাবে।
দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী চরচাকে বলেন, “দলীয় প্রতীক স্থানীয় সমাজে বিভাজন তৈরি করেছিল। এখন সেই ব্যবস্থা তুলে দেওয়ার ফলে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশা করছি।”
রাজনীতি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রতীক না থাকলেও বাস্তবে রাজনৈতিক দলের প্রভাব পুরোপুরি কমবে না। ভোটাররা জানবেন কোন প্রার্থী কোন রাজনৈতিক দল বা ধারার প্রতিনিধিত্ব করছেন। ফলে প্রতীকহীন নির্বাচন হলেও দলীয় সমর্থন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়েই থাকবে।
জনপ্রিয়তা বনাম আনুগত্য
বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কয়েকজন নেতা জানিয়েছেন, সম্ভাব্য প্রার্থী বাছাইয়ে এবার দুটি বিষয় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেতে পারে–জনপ্রিয়তা এবং ভাবমূর্তি।
দলটির শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা মনে করছেন, সংসদ নির্বাচনের মতো স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও সরকারের কার্যক্রমের মূল্যায়ন করবেন ভোটাররা। ফলে বিতর্কিত কিংবা জনঅসন্তোষ রয়েছে, এমন কাউকে সমর্থন দিলে তা উল্টো প্রভাব ফেলতে পারে।
এ কারণে ‘ক্লিন ইমেজ’-এর নেতাদের অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়ে দলের ভেতরে আলোচনা চলছে।
একজন স্থায়ী কমিটির সদস্য চরচাকে বলেন, “জনগণের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতা নেই, অথচ শুধু দলীয় পরিচয়ের কারণে কাউকে সামনে আনা হবে–এমন চিন্তা এখন নেই। জয়ের সম্ভাবনা এবং জনসমর্থনই মূল বিবেচনা।”
দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু চরচাকে বলেন, “সরকারের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক উদ্যোগ ও নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নের ফলে সাধারণ মানুষের সমর্থন অব্যাহত থাকবে।”
তৃণমূলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া
দলীয় প্রতীক ছাড়া স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন বিএনপির অনেক তৃণমূল নেতা। তাদের মতে, এতে স্থানীয়ভাবে জনপ্রিয় ও গ্রহণযোগ্যদের নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ বাড়বে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে দলীয় রাজনীতির বাইরে থেকেও সমাজে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের অংশগ্রহণের পথ উন্মুক্ত হবে।
তবে তৃণমূলের অনেক নেতার মধ্যে শঙ্কাও রয়েছে। তাদের আশঙ্কা, দলীয় প্রতীক না থাকায় একই এলাকায় বিএনপির একাধিক নেতা নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন। এতে ভোট বিভক্ত হওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে অভ্যন্তরীণ বিরোধও বাড়তে পারে।
রাজশাহীর এক উপজেলার বিএনপি নেতা বলেন, “প্রতীক থাকলে শেষ পর্যন্ত দলীয় সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়ার চাপ থাকে। এখন অনেকেই মনে করতে পারেন, ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা থাকলে স্বতন্ত্রভাবেও জেতা সম্ভব।”
চট্টগ্রাম জেলার একটি পৌরসভার বিএনপি নেতা বলেন, “প্রতীক না থাকলে ভোটারদের কাছে প্রার্থীর ব্যক্তিগত পরিচিতি বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। যারা পাঁচ-দশ বছর ধরে এলাকায় মানুষের সঙ্গে ছিলেন, তাদের জন্য এটি ইতিবাচক।”
অন্যদিকে কয়েকজন নেতা মনে করেন, কেন্দ্র থেকে দ্রুত সমন্বয় না করা গেলে কিছু এলাকায় ভোটের প্রতিযোগিতা দলীয় কোন্দলে রূপ নিতে পারে। বিশেষ করে যেখানে একাধিক শক্তিশালী নেতা রয়েছেন, সেখানে সমঝোতার প্রক্রিয়া সহজ হবে না।
বগুড়ার এক উপজেলা বিএনপি নেতা বলেন, জাতীয় নির্বাচনের সময় দলের সিদ্ধান্তই ছিল চূড়ান্ত। কিন্তু স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বাস্তবতা ভিন্ন। এখানে ব্যক্তিগত পরিচিতি, সামাজিক সম্পর্ক ও দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড বড় ভূমিকা রাখে। ফলে অনেকেই নিজেকে প্রার্থী হিসেবে ভাবছেন।
কুমিল্লার পৌর বিএনপির এক নেতা বলেন, দলীয় প্রতীক না থাকাটা স্থানীয়ভাবে জনপ্রিয় নেতাদের জন্য সুবিধা তৈরি করেছে। যারা দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় কাজ করেছেন, কিন্তু কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে খুব পরিচিত নন, তারাও এখন নিজেদের সম্ভাবনা দেখছেন।
তবে সব জায়গায় চিত্র এক নয়। খুলনার এক বিএনপি নেতা মনে করেন, প্রতীক না থাকার কারণে দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষা কঠিন হয়ে উঠতে পারে। তার ভাষায়, “একই পদে তিন-চারজন শক্তিশালী নেতা থাকলে শেষ পর্যন্ত সবাইকে বসিয়ে সমাধান করা সহজ হবে না।”
চট্টগ্রামের একজন জেলা পর্যায়ের নেতা বলেন, “ভোটাররা প্রতীক না দেখলেও জানবেন কে, কোন দলের রাজনীতি করেন। ফলে নির্বাচনে দলীয় পরিচয়ের প্রভাব পুরোপুরি কমে যাবে–এমনটা মনে করার সুযোগ নেই। তবে প্রার্থীর ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।”
রংপুর অঞ্চলের একজন নেতা বলেন, “গত কয়েক বছরে যারা দলের কঠিন সময়ে মাঠে ছিলেন, তাদের অনেকেই এবার স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সুযোগ প্রত্যাশা করছেন। ফলে প্রার্থী বাছাইয়ের সময় দলকে রাজনৈতিক অবদান ও জনপ্রিয়তার মধ্যে ভারসাম্য খুঁজতে হবে।”
বিএনপির কয়েকজন তৃণমূল নেতা জানান, কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কাউকে সমর্থন না দিলেও সম্ভাব্য প্রার্থীদের বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়া শুরু হয়েছে। বিভিন্ন সাংগঠনিক স্তরের নেতার কাছ থেকেও মতামত সংগ্রহ করা হচ্ছে।
তাদের মতে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুধু জনপ্রতিনিধি বাছাইয়ের বিষয় নয়; এটি জাতীয় নির্বাচনের পর মাঠপর্যায়ে বিএনপির সাংগঠনিক অবস্থান কতটা শক্তিশালী, সেটিও যাচাইয়ের একটি সুযোগ। ফলে অনেক এলাকায় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নতুন নেতৃত্বের উত্থান যেমন ঘটতে পারে, তেমনি পুরনো দ্বন্দ্বও সামনে চলে আসতে পারে।
বিএনপির একজন সাংগঠনিক সম্পাদক বলেন, “প্রতীক না থাকায় কাউকে নির্বাচন থেকে বিরত রাখা আগের তুলনায় কঠিন হবে। তাই এখন থেকেই সমন্বয়ের কাজ শুরু হয়েছে।”
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান চরচাকে বলেন, দলের নিবেদিতপ্রাণ ও পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির নেতাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করলে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলেছেন তিনি।
দলীয় সূত্র বলছে, বিভাগীয়, সাংগঠনিক এবং সহ-সাংগঠনিক সম্পাদকদের সম্ভাব্য প্রার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। লক্ষ্য হচ্ছে, নির্বাচনের আগেই সমঝোতার মাধ্যমে একক প্রার্থী নিশ্চিত করা।
আওয়ামী লীগ ও জামায়াত ফ্যাক্টর
স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে ঘিরে আরেকটি আলোচনার বিষয় হলো কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাবেক নেতা-কর্মীদের অংশগ্রহণের প্রশ্ন।
নি

র্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন, আইনগত যোগ্যতা থাকলে কোনো ব্যক্তিকে শুধু রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে নির্বাচনে অংশ নেওয়া থেকে বিরত রাখার সুযোগ নেই।
তবে এ বিষয়ে সরকারের রাজনৈতিক অবস্থান এখনো স্পষ্ট নয়।
একই সঙ্গে বিএনপির কৌশলবিদেরা জামায়াতের সম্ভাব্য অবস্থানও বিবেচনায় রাখছেন। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চল ও কিছু জেলা শহরে জামায়াতের সাংগঠনিক ক্ষমতা শক্তিশালী হওয়ায় বেশ কয়েকটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা কঠিন হতে পারে বলে মনে করছেন তারা।
মাঠে ফিরছে দল?
স্থানীয় সরকার নির্বাচন বিএনপির জন্য শুধু ভোটের লড়াই নয়, এটি দলকে আবার মাঠমুখী করারও একটি সুযোগ।
সংসদ নির্বাচনের পর অনেক নেতা এখন সরকার, সংসদ কিংবা প্রশাসনিক দায়িত্বে ব্যস্ত। ফলে দলীয় সাংগঠনিক কার্যক্রম আগের তুলনায় কিছুটা শিথিল হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. দিলারা চৌধুরী মনে করেন, “তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব কমিয়ে প্রতিটি পদে গ্রহণযোগ্য একক প্রার্থী নিশ্চিত করাই হবে বিএনপির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।”
তার ভাষ্য, “ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় স্থানীয় নির্বাচন পরিচালনা করা এবং দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখা–দুই কাজ একসঙ্গে করতে হবে বিএনপিকে। এখানেই তাদের সাংগঠনিক সক্ষমতার প্রকৃত মূল্যায়ন হবে।”
সামনে যে পরীক্ষা
সংসদ নির্বাচনে পাওয়া জনসমর্থন স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও ধরে রাখতে চায় বিএনপি। কিন্তু স্থানীয় নির্বাচনের বাস্তবতা ভিন্ন। এখানে জাতীয় ইস্যুর পাশাপাশি কাজ করে ব্যক্তি-সম্পর্ক, সামাজিক প্রভাব, আঞ্চলিক সমীকরণ এবং স্থানীয় নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা।
ফলে দলীয় প্রতীকহীন এই নির্বাচনে বিএনপির সাফল্য অনেকটাই নির্ভর করবে তিনটি বিষয়ের ওপর–যোগ্য ও জনপ্রিয় প্রার্থী বাছাই, বিদ্রোহী প্রার্থী নিয়ন্ত্রণ এবং তৃণমূলের দ্বন্দ্ব সামাল দেওয়া।
ক্ষমতায় আসার পর এটি হতে যাচ্ছে দলটির প্রথম বড় মাঠপর্যায়ের রাজনৈতিক পরীক্ষা। সেই পরীক্ষায় বিএনপি কতটা সফল হয়, তার ওপরই অনেকাংশে নির্ভর করবে আগামী দিনের স্থানীয় রাজনৈতিক সমীকরণ।

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়ের পর রাজনীতির মাঠে এখনো বড় কোনো চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েনি বিএনপি। তবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নতুন রাজনৈতিক পরীক্ষার মুখে পড়তে পারে ক্ষমতাসীন দলটি। দীর্ঘদিন পর দলীয় প্রতীক ছাড়া হতে যাওয়া স্থানীয় সরকার নির্বাচন একদিকে যেমন দলটির জন্য সুযোগ তৈরি করেছে, অন্যদিকে তৈরি করেছে নতুন চ্যালেঞ্জও। প্রশ্ন আসছে, দলীয় প্রতীক না থাকা বিএনপির জন্য লাভ নাকি ক্ষতি?
সংসদ নির্বাচনের পর দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন বড় কোনো কর্মসূচির চাপ নেই। সরকার পরিচালনা, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন এবং প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের ব্যস্ততার মধ্যেই ক্ষমতাসীন বিএনপির সামনে নতুন এই পরীক্ষা–স্থানীয় সরকার নির্বাচন।
দীর্ঘদিন পর এমন এক নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে, যেখানে থাকছে না দলীয় প্রতীক। ফলে ভোটের মাঠে দলীয় পরিচয়ের পাশাপাশি প্রার্থীর ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা, সামাজিক প্রভাব ও জনপ্রিয়তাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। স্থানীয় সরকার ভোটকে শুধু জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের প্রক্রিয়া হিসেবে নয়, বরং তৃণমূলে নিজেদের সাংগঠনিক শক্তি যাচাইয়ের সুযোগ হিসেবেও দেখছে বিএনপি।
দলটির একাধিক নীতিনির্ধারক ও সাংগঠনিক নেতারা জানিয়েছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যে ভেতরে প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। সম্ভাব্য প্রার্থীদের বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। সাংগঠনিকভাবে দুর্বল ইউনিটগুলো চিহ্নিত করে পুনর্গঠনের কাজও এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
বর্ষার পর ভোটের প্রস্তুতি
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর বা অক্টোবর থেকে পর্যায়ক্রমে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি), পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ এবং সিটি করপোরেশন নির্বাচন শুরু হতে পারে। আগামী এক বছরের মধ্যে পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়া শেষ করতে চায় বিএনপি সরকার।
নির্বাচনের সম্ভাব্য সময়সূচি সামনে আসার পর থেকেই বিভিন্ন এলাকায় সম্ভাব্য প্রার্থীদের তৎপরতা বেড়েছে। কোথাও কোথাও ব্যানার-ফেস্টুনে ছেয়ে গেছে সড়ক। সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে উপস্থিতি বাড়াচ্ছেন স্থানীয় নেতারা। ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগও বাড়িয়ে দিয়েছেন তারা।
তবে একই এলাকায় একাধিক মনোনয়নপ্রত্যাশীর সক্রিয়তা কীভাবে সামলানো হবে, তা নিয়েও দলের মধ্যে আলোচনা রয়েছে।
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও সংসদ সদস্য খায়রুল কবির খোকন চরচাকে বলেন, “জাতীয় নির্বাচনে দলীয় প্রতীক ছিল বলে শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন তুলনামূলক সহজ ছিল। কিন্তু স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রতীক না থাকলে সমীকরণ ভিন্ন হবে। অনেকেই ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার ওপর ভর করে নির্বাচনে নামতে চাইবেন।”
প্রতীক না থাকলে লাভ কোথায়?
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ক্ষমতায় বসা অন্তর্বর্তী সরকার যেসব সংস্কার কমিশন করেছিল, তার মধ্যে নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন ও স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশন দলীয় প্রতীক বাদ দেওয়ার সুপারিশ করেছিল। পরে ২০২৫ সালে সংশ্লিষ্ট আইনগুলো সংশোধন করে অধ্যাদেশ জারি করে অন্তর্বর্তী সরকার।
সেই অধ্যাদেশগুলো ত্রয়োদশ সংসদের অনুমোদনও পেয়েছে। সুতরাং যদি আইনে এ-সংক্রান্ত আর কোনো সংশোধন না হয়, তবে দলীয় প্রতীক ছাড়াই হবে স্থানীয় সরকারের ভোট।

গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তবর্তী সরকার স্থানীয় সরকারগুলো ভেঙে দেয়। ওই সরকার পরে স্থানীয় সরকার নির্বাচন করেনি। দুই বছরের বেশি সময় ধরে স্থানীয় সরকারের কোনো নির্বাচন হয় না।
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সামনে এখন একগুচ্ছ স্থানীয় নির্বাচন, যেগুলোর মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। সিটি ও জেলা পরিষদে বিএনপি দলীয় নেতাদের প্রশাসক হিসেবে বসিয়েছে।
স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সবশেষ সিটি করপোরেশন নির্বাচন হয় ২০২৪ সালের মার্চে। ২০২১ সালের শুরুতে ধাপে ধাপে পৌরসভা, ২০২১ সালের এপ্রিলে শুরু হয় ধাপে ধাপে ইউপি, ২০২২ সালের অক্টোবরে এক দিনে জেলা পরিষদ এবং ২০২৪ সালে ধাপে ধাপে উপজেলা পরিষদের ভোট হয়।
তবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক না থাকার সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছে বিএনপি।
দলটির নেতাদের যুক্তি, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান মূলত নাগরিক সেবা ও উন্নয়ন কার্যক্রমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। সেখানে দলীয় বিভাজনের চেয়ে ব্যক্তির যোগ্যতা ও গ্রহণযোগ্যতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হওয়া উচিত।
তবে দলীয় প্রতীকে ভোট না হলেও দলগুলোর প্রার্থী ঘোষণা নিয়ে ‘উদ্বেগ’ প্রকাশ করেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন। গত মে মাসে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, “গণমাধ্যমে দেখছি, বিভিন্ন দল থেকে অলরেডি মনোনয়নের ঘোষণা দিচ্ছে। এটা আমার জন্য চিন্তার, আমার কপালে ভাঁজ পড়েছে।”
বিএনপির একাধিক নেতা মনে করেন, দলীয় প্রতীকের কারণে অতীতে স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক মেরুকরণ বেড়েছিল। অনেক ক্ষেত্রে পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্কও রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তাদের মতে, এবার ব্যক্তি-ইমেজ, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা এবং স্থানীয় উন্নয়নে ভূমিকার বিষয়গুলো দলের শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে বেশি গুরুত্ব পাবে।
দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী চরচাকে বলেন, “দলীয় প্রতীক স্থানীয় সমাজে বিভাজন তৈরি করেছিল। এখন সেই ব্যবস্থা তুলে দেওয়ার ফলে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশা করছি।”
রাজনীতি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রতীক না থাকলেও বাস্তবে রাজনৈতিক দলের প্রভাব পুরোপুরি কমবে না। ভোটাররা জানবেন কোন প্রার্থী কোন রাজনৈতিক দল বা ধারার প্রতিনিধিত্ব করছেন। ফলে প্রতীকহীন নির্বাচন হলেও দলীয় সমর্থন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়েই থাকবে।
জনপ্রিয়তা বনাম আনুগত্য
বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কয়েকজন নেতা জানিয়েছেন, সম্ভাব্য প্রার্থী বাছাইয়ে এবার দুটি বিষয় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেতে পারে–জনপ্রিয়তা এবং ভাবমূর্তি।
দলটির শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা মনে করছেন, সংসদ নির্বাচনের মতো স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও সরকারের কার্যক্রমের মূল্যায়ন করবেন ভোটাররা। ফলে বিতর্কিত কিংবা জনঅসন্তোষ রয়েছে, এমন কাউকে সমর্থন দিলে তা উল্টো প্রভাব ফেলতে পারে।
এ কারণে ‘ক্লিন ইমেজ’-এর নেতাদের অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়ে দলের ভেতরে আলোচনা চলছে।
একজন স্থায়ী কমিটির সদস্য চরচাকে বলেন, “জনগণের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতা নেই, অথচ শুধু দলীয় পরিচয়ের কারণে কাউকে সামনে আনা হবে–এমন চিন্তা এখন নেই। জয়ের সম্ভাবনা এবং জনসমর্থনই মূল বিবেচনা।”
দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু চরচাকে বলেন, “সরকারের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক উদ্যোগ ও নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নের ফলে সাধারণ মানুষের সমর্থন অব্যাহত থাকবে।”
তৃণমূলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া
দলীয় প্রতীক ছাড়া স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন বিএনপির অনেক তৃণমূল নেতা। তাদের মতে, এতে স্থানীয়ভাবে জনপ্রিয় ও গ্রহণযোগ্যদের নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ বাড়বে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে দলীয় রাজনীতির বাইরে থেকেও সমাজে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের অংশগ্রহণের পথ উন্মুক্ত হবে।
তবে তৃণমূলের অনেক নেতার মধ্যে শঙ্কাও রয়েছে। তাদের আশঙ্কা, দলীয় প্রতীক না থাকায় একই এলাকায় বিএনপির একাধিক নেতা নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন। এতে ভোট বিভক্ত হওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে অভ্যন্তরীণ বিরোধও বাড়তে পারে।
রাজশাহীর এক উপজেলার বিএনপি নেতা বলেন, “প্রতীক থাকলে শেষ পর্যন্ত দলীয় সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়ার চাপ থাকে। এখন অনেকেই মনে করতে পারেন, ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা থাকলে স্বতন্ত্রভাবেও জেতা সম্ভব।”
চট্টগ্রাম জেলার একটি পৌরসভার বিএনপি নেতা বলেন, “প্রতীক না থাকলে ভোটারদের কাছে প্রার্থীর ব্যক্তিগত পরিচিতি বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। যারা পাঁচ-দশ বছর ধরে এলাকায় মানুষের সঙ্গে ছিলেন, তাদের জন্য এটি ইতিবাচক।”
অন্যদিকে কয়েকজন নেতা মনে করেন, কেন্দ্র থেকে দ্রুত সমন্বয় না করা গেলে কিছু এলাকায় ভোটের প্রতিযোগিতা দলীয় কোন্দলে রূপ নিতে পারে। বিশেষ করে যেখানে একাধিক শক্তিশালী নেতা রয়েছেন, সেখানে সমঝোতার প্রক্রিয়া সহজ হবে না।
বগুড়ার এক উপজেলা বিএনপি নেতা বলেন, জাতীয় নির্বাচনের সময় দলের সিদ্ধান্তই ছিল চূড়ান্ত। কিন্তু স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বাস্তবতা ভিন্ন। এখানে ব্যক্তিগত পরিচিতি, সামাজিক সম্পর্ক ও দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড বড় ভূমিকা রাখে। ফলে অনেকেই নিজেকে প্রার্থী হিসেবে ভাবছেন।
কুমিল্লার পৌর বিএনপির এক নেতা বলেন, দলীয় প্রতীক না থাকাটা স্থানীয়ভাবে জনপ্রিয় নেতাদের জন্য সুবিধা তৈরি করেছে। যারা দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় কাজ করেছেন, কিন্তু কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে খুব পরিচিত নন, তারাও এখন নিজেদের সম্ভাবনা দেখছেন।
তবে সব জায়গায় চিত্র এক নয়। খুলনার এক বিএনপি নেতা মনে করেন, প্রতীক না থাকার কারণে দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষা কঠিন হয়ে উঠতে পারে। তার ভাষায়, “একই পদে তিন-চারজন শক্তিশালী নেতা থাকলে শেষ পর্যন্ত সবাইকে বসিয়ে সমাধান করা সহজ হবে না।”
চট্টগ্রামের একজন জেলা পর্যায়ের নেতা বলেন, “ভোটাররা প্রতীক না দেখলেও জানবেন কে, কোন দলের রাজনীতি করেন। ফলে নির্বাচনে দলীয় পরিচয়ের প্রভাব পুরোপুরি কমে যাবে–এমনটা মনে করার সুযোগ নেই। তবে প্রার্থীর ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।”
রংপুর অঞ্চলের একজন নেতা বলেন, “গত কয়েক বছরে যারা দলের কঠিন সময়ে মাঠে ছিলেন, তাদের অনেকেই এবার স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সুযোগ প্রত্যাশা করছেন। ফলে প্রার্থী বাছাইয়ের সময় দলকে রাজনৈতিক অবদান ও জনপ্রিয়তার মধ্যে ভারসাম্য খুঁজতে হবে।”
বিএনপির কয়েকজন তৃণমূল নেতা জানান, কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কাউকে সমর্থন না দিলেও সম্ভাব্য প্রার্থীদের বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়া শুরু হয়েছে। বিভিন্ন সাংগঠনিক স্তরের নেতার কাছ থেকেও মতামত সংগ্রহ করা হচ্ছে।
তাদের মতে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুধু জনপ্রতিনিধি বাছাইয়ের বিষয় নয়; এটি জাতীয় নির্বাচনের পর মাঠপর্যায়ে বিএনপির সাংগঠনিক অবস্থান কতটা শক্তিশালী, সেটিও যাচাইয়ের একটি সুযোগ। ফলে অনেক এলাকায় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নতুন নেতৃত্বের উত্থান যেমন ঘটতে পারে, তেমনি পুরনো দ্বন্দ্বও সামনে চলে আসতে পারে।
বিএনপির একজন সাংগঠনিক সম্পাদক বলেন, “প্রতীক না থাকায় কাউকে নির্বাচন থেকে বিরত রাখা আগের তুলনায় কঠিন হবে। তাই এখন থেকেই সমন্বয়ের কাজ শুরু হয়েছে।”
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান চরচাকে বলেন, দলের নিবেদিতপ্রাণ ও পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির নেতাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করলে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলেছেন তিনি।
দলীয় সূত্র বলছে, বিভাগীয়, সাংগঠনিক এবং সহ-সাংগঠনিক সম্পাদকদের সম্ভাব্য প্রার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। লক্ষ্য হচ্ছে, নির্বাচনের আগেই সমঝোতার মাধ্যমে একক প্রার্থী নিশ্চিত করা।
আওয়ামী লীগ ও জামায়াত ফ্যাক্টর
স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে ঘিরে আরেকটি আলোচনার বিষয় হলো কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাবেক নেতা-কর্মীদের অংশগ্রহণের প্রশ্ন।
নি

র্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন, আইনগত যোগ্যতা থাকলে কোনো ব্যক্তিকে শুধু রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে নির্বাচনে অংশ নেওয়া থেকে বিরত রাখার সুযোগ নেই।
তবে এ বিষয়ে সরকারের রাজনৈতিক অবস্থান এখনো স্পষ্ট নয়।
একই সঙ্গে বিএনপির কৌশলবিদেরা জামায়াতের সম্ভাব্য অবস্থানও বিবেচনায় রাখছেন। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চল ও কিছু জেলা শহরে জামায়াতের সাংগঠনিক ক্ষমতা শক্তিশালী হওয়ায় বেশ কয়েকটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা কঠিন হতে পারে বলে মনে করছেন তারা।
মাঠে ফিরছে দল?
স্থানীয় সরকার নির্বাচন বিএনপির জন্য শুধু ভোটের লড়াই নয়, এটি দলকে আবার মাঠমুখী করারও একটি সুযোগ।
সংসদ নির্বাচনের পর অনেক নেতা এখন সরকার, সংসদ কিংবা প্রশাসনিক দায়িত্বে ব্যস্ত। ফলে দলীয় সাংগঠনিক কার্যক্রম আগের তুলনায় কিছুটা শিথিল হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. দিলারা চৌধুরী মনে করেন, “তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব কমিয়ে প্রতিটি পদে গ্রহণযোগ্য একক প্রার্থী নিশ্চিত করাই হবে বিএনপির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।”
তার ভাষ্য, “ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় স্থানীয় নির্বাচন পরিচালনা করা এবং দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখা–দুই কাজ একসঙ্গে করতে হবে বিএনপিকে। এখানেই তাদের সাংগঠনিক সক্ষমতার প্রকৃত মূল্যায়ন হবে।”
সামনে যে পরীক্ষা
সংসদ নির্বাচনে পাওয়া জনসমর্থন স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও ধরে রাখতে চায় বিএনপি। কিন্তু স্থানীয় নির্বাচনের বাস্তবতা ভিন্ন। এখানে জাতীয় ইস্যুর পাশাপাশি কাজ করে ব্যক্তি-সম্পর্ক, সামাজিক প্রভাব, আঞ্চলিক সমীকরণ এবং স্থানীয় নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা।
ফলে দলীয় প্রতীকহীন এই নির্বাচনে বিএনপির সাফল্য অনেকটাই নির্ভর করবে তিনটি বিষয়ের ওপর–যোগ্য ও জনপ্রিয় প্রার্থী বাছাই, বিদ্রোহী প্রার্থী নিয়ন্ত্রণ এবং তৃণমূলের দ্বন্দ্ব সামাল দেওয়া।
ক্ষমতায় আসার পর এটি হতে যাচ্ছে দলটির প্রথম বড় মাঠপর্যায়ের রাজনৈতিক পরীক্ষা। সেই পরীক্ষায় বিএনপি কতটা সফল হয়, তার ওপরই অনেকাংশে নির্ভর করবে আগামী দিনের স্থানীয় রাজনৈতিক সমীকরণ।