ফজলে রাব্বি

একসময় কোরবানির ঈদের দিন বিকেলের মধ্যেই দেশের বিভিন্ন জেলা শহর, হাট-বাজার ও মহল্লায় কাঁচা চামড়ার নগদ বেচাকেনা শেষ হয়ে যেত। মসজিদ, মাদরাসা, এতিমখানা কিংবা মৌসুমি ব্যবসায়ীরা জানতেন—চামড়া হাতে মানেই নগদ টাকা। দাম নিয়ে কিছু দর-কষাকষি থাকলেও বাজারে ক্রেতা থাকত, নগদ অর্থ থাকত, এবং দ্রুত চামড়া সংগ্রহ করে আড়তে পাঠানোর একটি প্রতিষ্ঠিত চেইন সক্রিয় থাকত। ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে ২০১৫-১৬ সাল পর্যন্ত কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে দেশে কাঁচা চামড়াভিত্তিক একটি শক্তিশালী মৌসুমি নগদ অর্থনীতি গড়ে উঠেছিল।
২০২৬ সালের বাস্তবতা ভিন্ন। এখন কোরবানির চামড়া অনেকের কাছে ‘দ্রুত নগদ আয়ের পণ্য” নয়; বরং ‘উচ্চ ঝুঁকির মৌসুমি পণ্য’। অর্থাৎ এমন একটি পণ্য, যা সংগ্রহ করতে খরচ আছে, সংরক্ষণে ঝুঁকি আছে, কিন্তু বিক্রির নিশ্চয়তা নেই। গত এক দশকে বাংলাদেশের কাঁচা চামড়ার বাজারে এটাই সবচেয়ে বড় পরিবর্তন।
বাংলাদেশে প্রতি বছর কোরবানির ঈদে প্রায় ৯০ লাখ থেকে ১ কোটি পশু কোরবানি হয় বলে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন বছরের তথ্য ও শিল্পসংশ্লিষ্টদের হিসাব থেকে ধারণা পাওয়া যায়। এর বড় অংশের চামড়া আসে মাত্র ৪৮-৭২ ঘণ্টার মধ্যে।
দীর্ঘদিন ধরে এই মৌসুমকে কেন্দ্র করে একটি শক্তিশালী নগদ অর্থনীতি তৈরি হয়েছিল।

এই চেইনে ছিলো মসজিদ-মাদরাসা-এতিমখানা, মৌসুমি সংগ্রহকারী, স্থানীয় আড়ৎ, বড় আড়ৎ, ট্যানারি, রপ্তানিকারক কিংবা ফিনিশড পণ্য প্রস্তুতকারক। এই চক্রে ঈদের কয়েক দিনের মধ্যে শত শত কোটি টাকার নগদ লেনদেন হতো। ছোট ব্যবসায়ীরা দাদন নিয়ে চামড়া কিনতেন, আড়তদার দ্রুত নগদে পরিশোধ করতেন, আর ট্যানারিগুলো মৌসুমি সংগ্রহ নিশ্চিত করতে আগাম অর্থ দিত। চামড়া তখন শুধু ধর্মীয় অনুষঙ্গ ছিল না; এটি ছিল গ্রামীণ ও শহুরে নিম্ন-মধ্যবিত্ত অর্থনীতির একটি মৌসুমি নগদ প্রবাহ।
কীভাবে ভেঙে পড়ল এই অর্থনীতি
বিশ্লেষকদের মতে, ২০১৬-১৭ সালের পর থেকে সাভারে ট্যানারি স্থানান্তর, আধা-প্রক্রিয়াজাত চামড়া রপ্তানিসহ কয়েকটি কাঠামোগত পরিবর্তন একসঙ্গে আঘাত হানে।
হাজারীবাগ থেকে সাভারে ট্যানারি স্থানান্তর
সরকার পরিবেশগত কারণে ট্যানারি শিল্প হাজারীবাগ থেকে সাভারে স্থানান্তর করে। কিন্তু সাভার চামড়া শিল্পনগরীর কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার পুরো সক্ষমতায় কার্যকর না হওয়ায় আন্তর্জাতিক মান নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
ফলে বাংলাদেশের অধিকাংশ ট্যানারি “লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ” সনদ পায়নি। আন্তর্জাতিক বড় ব্র্যান্ডগুলো পরিবেশগত মান পূরণ ছাড়া চামড়া কিনতে অনাগ্রহী হয়ে পড়ে। এতে সবচেয়ে বড় আঘাত আসে রপ্তানিতে।
ফিনিশড লেদার নয়, কম দামের আধা-প্রক্রিয়াজাত রপ্তানি
বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে মূলত ‘ওয়েট ব্লু’ বা ‘ক্রাস্ট লেদার’ রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল। অর্থাৎ কাঁচা চামড়ার প্রাথমিক প্রক্রিয়াজাতকরণ পর্যন্তই মূল্য সংযোজন হয়েছে। অন্যদিকে ইতালি, ভিয়েতনাম বা চীনের মতো দেশ একই চামড়া থেকে বিলাসবহুল ব্যাগ, উচ্চমূল্যের জুতা, চামড়ার গাড়ির আসন ও ফ্যাশন সামগ্রী তৈরি করছে। ফলে মূল্য সংযোজনের বড় অংশ বাংলাদেশ হারাচ্ছে।
একটি আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের ব্যাগের খুচরা মূল্য ১,৫০০ থেকে ৩,০০০ ডলার হওয়া অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু সেই পণ্যের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত গরুর চামড়া বাংলাদেশের মৌসুমি বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৮০০ থেকে ১৫ শ টাকায়।
অর্থনীতিবিদদের ভাষায়, বাংলাদেশ এখনো ‘কাঁচামাল নির্ভর রপ্তানির ফাঁদে’ আটকে আছে।
ব্যাংক ঋণ সংকট
গত এক দশকে চামড়া খাতে খেলাপি ঋণ বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও শিল্পসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, একসময় ঈদকেন্দ্রিক চামড়া কেনাবেচায় ব্যাংক ঋণের প্রবাহ ৪০০-৪৫০ কোটি টাকার বেশি ছিল। এখন অনেক ব্যাংক এই খাতে ঋণ দিতেই অনাগ্রহী।
ফলে কী হচ্ছে? ট্যানারির হাতে নগদ পর্যাপ্ত থাকছে না। আড়তদার ঝুঁকি নিতে চাচ্ছেন না, মৌসুমি ব্যবসায়ী তাৎক্ষণিক ক্রেতা পাওয়া নিয়ে ঝুকিতে থাকে। ফলে, চামড়া দ্রুত কম দামে বিক্রি হয়ে যায়। এমন পরিস্থিতিতে বাজারে “বাধ্যতামূলক বিক্রি” তৈরি হচ্ছে। অর্থাৎ নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে থাকা পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য হন সংগ্রাহকরা।
বারবার সিন্ডিকেট অভিযোগ
প্রতি বছরই মৌসুমি ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেন, ঈদের প্রথম ২৪ ঘণ্টায় বাজার ইচ্ছাকৃতভাবে ধীর রাখা হয়। খাতসংশ্লিষ্টদের বলছেন, এর পেছনে কয়েকটি বাস্তব কারণ আছে। ট্যানারির সীমিত নগদ প্রবাহ, আগের বকেয়া, কম রপ্তানি আদেশ, সীমিত সংরক্ষণ সক্ষমতা এবং কিছু ক্ষেত্রে সমন্বিত কম দর এসবই এখনকার চামড়ার বাজারের বাস্তবতা। যদিও ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে সিন্ডিকেটের অভিযোগ অস্বীকার করে, তবু মাঠপর্যায়ে একই ধরনের দরপতন ও সমন্বিত ক্রয় আচরণ নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাজারে স্বচ্ছ ডিজিটাল নিলামব্যবস্থা না থাকায় প্রকৃত দর নির্ধারণ ও তা বাস্তবায়ন কঠিন।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত কারা
এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে তিন পক্ষের ওপর:
মৌসুমি ব্যবসায়ী: তারা দাদন নিয়ে চামড়া কেনেন। দাম না পেলে ঋণের ফাঁদে পড়েন।
মসজিদ, মাদ্রাসা ও এতিমখানা: একসময় ঈদের চামড়ার আয় তাদের বড় অর্থনৈতিক সহায়তা ছিল। এখন অনেক জায়গায় প্রত্যাশিত অর্থ পাওয়া যায় না।
ক্ষুদ্র আড়তদার: বড় ট্যানারি ও রপ্তানিকারকদের সঙ্গে সরাসরি দর-কষাকষির সক্ষমতা কমে গেছে।
বদলে গেছে বৈশ্বিক বাজার
বিশ্ববাজারেও গত এক দশকে বড় পরিবর্তন এসেছে। কৃত্রিম ও বিকল্প চামড়ার চল বেড়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, কৃত্রিম ও বিকল্প চামড়ার বাজার দ্রুত বাড়ছে।
এর পেছনে প্রাণীকল্যাণ নিয়ে উদ্বেগ, পরিবেশগত চাপ, কার্বন নিঃসরণ ইস্যু, দ্রুত বদলে যাওয়া ফ্যাশন বাজারের মতো উপাদানগুলো কাজ করছে। ফলে প্রচলিত চামড়ার বাজারে প্রতিযোগিতা বেড়েছে।
বাংলাদেশ কোথায় পিছিয়ে
বিশ্বব্যাংক, জাতিসংঘ শিল্প উন্নয়ন সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রধান শিল্প ও বাণিজ্য খাতে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য দুর্বলতা রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো দুর্বল পরিবেশগত মান ও অসন্তোষজনক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, যা আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে। একই সাথে, ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সনদ ও সরবরাহ ব্যবস্থার স্বচ্ছতা সীমিত বা দুর্বল হওয়ায় বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ কিছুটা পিছিয়ে পড়ছে। পণ্যের গুণগত মান বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় নকশা ও গবেষণা যেমন কম, তেমনি নিজস্ব কোনো শক্তিশালী ব্র্যান্ড প্রায় অনুপস্থিত বললেই চলে। এর ফলে উচ্চমূল্যের চামড়াজাত পণ্যের উৎপাদন ও রপ্তানিও বেশ সীমিত আকারেই রয়ে গেছে। সর্বোপরি, সামগ্রিক অর্থনৈতিক টেকসইতা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক পুনর্গঠন প্রক্রিয়াটিও এখনও অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে।
ভবিষ্যত কী?
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদ্যমান নানাবিধ চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও বাংলাদেশের চামড়া ও বাণিজ্য খাতে এখনো এক বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। এর অন্যতম প্রধান কারণ হলো দেশে স্থানীয় কাঁচামালের একটি বড় ভিত্তি রয়েছে, যার সাথে যুক্ত হয়েছে তুলনামূলক কম শ্রম ব্যয় এবং জুতা উৎপাদনে দেশের শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা। এছাড়া, ইউরোপীয় বাজারে পাওয়া কিছু শুল্ক সুবিধাও বৈশ্বিক বাণিজ্য প্রসারে বড় সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমানের মতে, ইউরোপীয় বাজারে আমরা যে শুল্ক সুবিধা (জিএসপি) পাচ্ছি, তা ২০২৬ সালে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের পর রূপান্তরকালীন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে; তাই এই সুবিধা ধরে রাখতে পরিবেশগত মানদণ্ড নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক।
তবে এই সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগিয়ে বিশ্ববাজারে সফল হতে হলে বিশেষজ্ঞদের মতে তিনটি জরুরি পরিবর্তন আনা আবশ্যক:

প্রথমত, কিছুদিন আগে এপেক্স ফুটওয়্যার লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ নাসিম মনজুর বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ( বিআইডিএস) আয়োজিতে এক সম্মেলন বলেন, বৈশ্বিক বাজারে টিকে থাকতে হলে বাংলাদেশকে কম মূল্যের পণ্য উৎপাদনের মানসিকতা থেকে বের হতে হবে এবং আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত নিজস্ব ডিজাইন বা নকশার উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডিং। অর্থাৎ শুধু কাঁচা চামড়া রপ্তানির বৃত্ত থেকে বেরিয়ে এসে ব্র্যান্ডভিত্তিক উচ্চমূল্যের চামড়াজাত পণ্য তৈরিতে মনোযোগী হতে হবে।
দ্বিতীয়ত, কারখানার বর্জ্য শোধনাগার বা ইটিপি ও আন্তর্জাতিক পরিবেশগত মানদণ্ডগুলো পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে হবে। অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান চরচাকে বলেন, ”কাঁচা চামড়া থেকে ব্র্যান্ডভিত্তিক উচ্চমূল্যের পণ্যে রূপান্তর এবং ইটিপির শতভাগ বাস্তবায়ন ছাড়া এই বিশাল বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের সক্ষমতা ধরে রাখা কঠিন হবে।”
তৃতীয়ত, পুরো সরবরাহ শৃঙ্খলে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে বাজারে ডিজিটাল অনুসরণ ব্যবস্থা বা ট্র্যাকিং সিস্টেম চালু করা অত্যন্ত জরুরি। এই প্রযুক্তিগত রূপান্তরের গুরুত্ব তুলে ধরে সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর আরও উল্লেখ করেন, জুতা ও চামড়াজাত পণ্যে উচ্চ মূল্য সংযোজন করতে হলে বাজারে স্বচ্ছতা এবং ডিজিটাল ট্র্যাকিং অপরিহার্য। কারণ বর্তমান যুগের সচেতন আন্তর্জাতিক ক্রেতারা জানতে চান যে, চামড়াটি কোথা থেকে এসেছে এবং তা পরিবেশবান্ধব উপায়ে প্রক্রিয়াজাত হয়েছে কি না।অন্যথায় কোরবানির ঈদের চামড়া প্রতিবছর একইভাবে কম দামে বিক্রি হবে, আর বাংলাদেশের চামড়া শিল্প আন্তর্জাতিক বাজারে নিম্নমূল্যের কাঁচামাল সরবরাহকারী হিসেবেই আটকে থাকবে।
গত এক দশকের বাস্তবতা দেখিয়েছে—সমস্যা শুধু মৌসুমি নয়; এটি একটি অসম্পূর্ণ শিল্প রূপান্তরের সংকট। সংকটের মূলে গিয়েই চামড়া শিল্পকে রক্ষা করতে হবে।

একসময় কোরবানির ঈদের দিন বিকেলের মধ্যেই দেশের বিভিন্ন জেলা শহর, হাট-বাজার ও মহল্লায় কাঁচা চামড়ার নগদ বেচাকেনা শেষ হয়ে যেত। মসজিদ, মাদরাসা, এতিমখানা কিংবা মৌসুমি ব্যবসায়ীরা জানতেন—চামড়া হাতে মানেই নগদ টাকা। দাম নিয়ে কিছু দর-কষাকষি থাকলেও বাজারে ক্রেতা থাকত, নগদ অর্থ থাকত, এবং দ্রুত চামড়া সংগ্রহ করে আড়তে পাঠানোর একটি প্রতিষ্ঠিত চেইন সক্রিয় থাকত। ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে ২০১৫-১৬ সাল পর্যন্ত কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে দেশে কাঁচা চামড়াভিত্তিক একটি শক্তিশালী মৌসুমি নগদ অর্থনীতি গড়ে উঠেছিল।
২০২৬ সালের বাস্তবতা ভিন্ন। এখন কোরবানির চামড়া অনেকের কাছে ‘দ্রুত নগদ আয়ের পণ্য” নয়; বরং ‘উচ্চ ঝুঁকির মৌসুমি পণ্য’। অর্থাৎ এমন একটি পণ্য, যা সংগ্রহ করতে খরচ আছে, সংরক্ষণে ঝুঁকি আছে, কিন্তু বিক্রির নিশ্চয়তা নেই। গত এক দশকে বাংলাদেশের কাঁচা চামড়ার বাজারে এটাই সবচেয়ে বড় পরিবর্তন।
বাংলাদেশে প্রতি বছর কোরবানির ঈদে প্রায় ৯০ লাখ থেকে ১ কোটি পশু কোরবানি হয় বলে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন বছরের তথ্য ও শিল্পসংশ্লিষ্টদের হিসাব থেকে ধারণা পাওয়া যায়। এর বড় অংশের চামড়া আসে মাত্র ৪৮-৭২ ঘণ্টার মধ্যে।
দীর্ঘদিন ধরে এই মৌসুমকে কেন্দ্র করে একটি শক্তিশালী নগদ অর্থনীতি তৈরি হয়েছিল।

এই চেইনে ছিলো মসজিদ-মাদরাসা-এতিমখানা, মৌসুমি সংগ্রহকারী, স্থানীয় আড়ৎ, বড় আড়ৎ, ট্যানারি, রপ্তানিকারক কিংবা ফিনিশড পণ্য প্রস্তুতকারক। এই চক্রে ঈদের কয়েক দিনের মধ্যে শত শত কোটি টাকার নগদ লেনদেন হতো। ছোট ব্যবসায়ীরা দাদন নিয়ে চামড়া কিনতেন, আড়তদার দ্রুত নগদে পরিশোধ করতেন, আর ট্যানারিগুলো মৌসুমি সংগ্রহ নিশ্চিত করতে আগাম অর্থ দিত। চামড়া তখন শুধু ধর্মীয় অনুষঙ্গ ছিল না; এটি ছিল গ্রামীণ ও শহুরে নিম্ন-মধ্যবিত্ত অর্থনীতির একটি মৌসুমি নগদ প্রবাহ।
কীভাবে ভেঙে পড়ল এই অর্থনীতি
বিশ্লেষকদের মতে, ২০১৬-১৭ সালের পর থেকে সাভারে ট্যানারি স্থানান্তর, আধা-প্রক্রিয়াজাত চামড়া রপ্তানিসহ কয়েকটি কাঠামোগত পরিবর্তন একসঙ্গে আঘাত হানে।
হাজারীবাগ থেকে সাভারে ট্যানারি স্থানান্তর
সরকার পরিবেশগত কারণে ট্যানারি শিল্প হাজারীবাগ থেকে সাভারে স্থানান্তর করে। কিন্তু সাভার চামড়া শিল্পনগরীর কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার পুরো সক্ষমতায় কার্যকর না হওয়ায় আন্তর্জাতিক মান নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
ফলে বাংলাদেশের অধিকাংশ ট্যানারি “লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ” সনদ পায়নি। আন্তর্জাতিক বড় ব্র্যান্ডগুলো পরিবেশগত মান পূরণ ছাড়া চামড়া কিনতে অনাগ্রহী হয়ে পড়ে। এতে সবচেয়ে বড় আঘাত আসে রপ্তানিতে।
ফিনিশড লেদার নয়, কম দামের আধা-প্রক্রিয়াজাত রপ্তানি
বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে মূলত ‘ওয়েট ব্লু’ বা ‘ক্রাস্ট লেদার’ রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল। অর্থাৎ কাঁচা চামড়ার প্রাথমিক প্রক্রিয়াজাতকরণ পর্যন্তই মূল্য সংযোজন হয়েছে। অন্যদিকে ইতালি, ভিয়েতনাম বা চীনের মতো দেশ একই চামড়া থেকে বিলাসবহুল ব্যাগ, উচ্চমূল্যের জুতা, চামড়ার গাড়ির আসন ও ফ্যাশন সামগ্রী তৈরি করছে। ফলে মূল্য সংযোজনের বড় অংশ বাংলাদেশ হারাচ্ছে।
একটি আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের ব্যাগের খুচরা মূল্য ১,৫০০ থেকে ৩,০০০ ডলার হওয়া অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু সেই পণ্যের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত গরুর চামড়া বাংলাদেশের মৌসুমি বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৮০০ থেকে ১৫ শ টাকায়।
অর্থনীতিবিদদের ভাষায়, বাংলাদেশ এখনো ‘কাঁচামাল নির্ভর রপ্তানির ফাঁদে’ আটকে আছে।
ব্যাংক ঋণ সংকট
গত এক দশকে চামড়া খাতে খেলাপি ঋণ বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও শিল্পসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, একসময় ঈদকেন্দ্রিক চামড়া কেনাবেচায় ব্যাংক ঋণের প্রবাহ ৪০০-৪৫০ কোটি টাকার বেশি ছিল। এখন অনেক ব্যাংক এই খাতে ঋণ দিতেই অনাগ্রহী।
ফলে কী হচ্ছে? ট্যানারির হাতে নগদ পর্যাপ্ত থাকছে না। আড়তদার ঝুঁকি নিতে চাচ্ছেন না, মৌসুমি ব্যবসায়ী তাৎক্ষণিক ক্রেতা পাওয়া নিয়ে ঝুকিতে থাকে। ফলে, চামড়া দ্রুত কম দামে বিক্রি হয়ে যায়। এমন পরিস্থিতিতে বাজারে “বাধ্যতামূলক বিক্রি” তৈরি হচ্ছে। অর্থাৎ নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে থাকা পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য হন সংগ্রাহকরা।
বারবার সিন্ডিকেট অভিযোগ
প্রতি বছরই মৌসুমি ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেন, ঈদের প্রথম ২৪ ঘণ্টায় বাজার ইচ্ছাকৃতভাবে ধীর রাখা হয়। খাতসংশ্লিষ্টদের বলছেন, এর পেছনে কয়েকটি বাস্তব কারণ আছে। ট্যানারির সীমিত নগদ প্রবাহ, আগের বকেয়া, কম রপ্তানি আদেশ, সীমিত সংরক্ষণ সক্ষমতা এবং কিছু ক্ষেত্রে সমন্বিত কম দর এসবই এখনকার চামড়ার বাজারের বাস্তবতা। যদিও ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে সিন্ডিকেটের অভিযোগ অস্বীকার করে, তবু মাঠপর্যায়ে একই ধরনের দরপতন ও সমন্বিত ক্রয় আচরণ নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাজারে স্বচ্ছ ডিজিটাল নিলামব্যবস্থা না থাকায় প্রকৃত দর নির্ধারণ ও তা বাস্তবায়ন কঠিন।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত কারা
এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে তিন পক্ষের ওপর:
মৌসুমি ব্যবসায়ী: তারা দাদন নিয়ে চামড়া কেনেন। দাম না পেলে ঋণের ফাঁদে পড়েন।
মসজিদ, মাদ্রাসা ও এতিমখানা: একসময় ঈদের চামড়ার আয় তাদের বড় অর্থনৈতিক সহায়তা ছিল। এখন অনেক জায়গায় প্রত্যাশিত অর্থ পাওয়া যায় না।
ক্ষুদ্র আড়তদার: বড় ট্যানারি ও রপ্তানিকারকদের সঙ্গে সরাসরি দর-কষাকষির সক্ষমতা কমে গেছে।
বদলে গেছে বৈশ্বিক বাজার
বিশ্ববাজারেও গত এক দশকে বড় পরিবর্তন এসেছে। কৃত্রিম ও বিকল্প চামড়ার চল বেড়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, কৃত্রিম ও বিকল্প চামড়ার বাজার দ্রুত বাড়ছে।
এর পেছনে প্রাণীকল্যাণ নিয়ে উদ্বেগ, পরিবেশগত চাপ, কার্বন নিঃসরণ ইস্যু, দ্রুত বদলে যাওয়া ফ্যাশন বাজারের মতো উপাদানগুলো কাজ করছে। ফলে প্রচলিত চামড়ার বাজারে প্রতিযোগিতা বেড়েছে।
বাংলাদেশ কোথায় পিছিয়ে
বিশ্বব্যাংক, জাতিসংঘ শিল্প উন্নয়ন সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রধান শিল্প ও বাণিজ্য খাতে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য দুর্বলতা রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো দুর্বল পরিবেশগত মান ও অসন্তোষজনক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, যা আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে। একই সাথে, ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সনদ ও সরবরাহ ব্যবস্থার স্বচ্ছতা সীমিত বা দুর্বল হওয়ায় বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ কিছুটা পিছিয়ে পড়ছে। পণ্যের গুণগত মান বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় নকশা ও গবেষণা যেমন কম, তেমনি নিজস্ব কোনো শক্তিশালী ব্র্যান্ড প্রায় অনুপস্থিত বললেই চলে। এর ফলে উচ্চমূল্যের চামড়াজাত পণ্যের উৎপাদন ও রপ্তানিও বেশ সীমিত আকারেই রয়ে গেছে। সর্বোপরি, সামগ্রিক অর্থনৈতিক টেকসইতা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক পুনর্গঠন প্রক্রিয়াটিও এখনও অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে।
ভবিষ্যত কী?
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদ্যমান নানাবিধ চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও বাংলাদেশের চামড়া ও বাণিজ্য খাতে এখনো এক বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। এর অন্যতম প্রধান কারণ হলো দেশে স্থানীয় কাঁচামালের একটি বড় ভিত্তি রয়েছে, যার সাথে যুক্ত হয়েছে তুলনামূলক কম শ্রম ব্যয় এবং জুতা উৎপাদনে দেশের শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা। এছাড়া, ইউরোপীয় বাজারে পাওয়া কিছু শুল্ক সুবিধাও বৈশ্বিক বাণিজ্য প্রসারে বড় সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমানের মতে, ইউরোপীয় বাজারে আমরা যে শুল্ক সুবিধা (জিএসপি) পাচ্ছি, তা ২০২৬ সালে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের পর রূপান্তরকালীন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে; তাই এই সুবিধা ধরে রাখতে পরিবেশগত মানদণ্ড নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক।
তবে এই সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগিয়ে বিশ্ববাজারে সফল হতে হলে বিশেষজ্ঞদের মতে তিনটি জরুরি পরিবর্তন আনা আবশ্যক:

প্রথমত, কিছুদিন আগে এপেক্স ফুটওয়্যার লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ নাসিম মনজুর বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ( বিআইডিএস) আয়োজিতে এক সম্মেলন বলেন, বৈশ্বিক বাজারে টিকে থাকতে হলে বাংলাদেশকে কম মূল্যের পণ্য উৎপাদনের মানসিকতা থেকে বের হতে হবে এবং আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত নিজস্ব ডিজাইন বা নকশার উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডিং। অর্থাৎ শুধু কাঁচা চামড়া রপ্তানির বৃত্ত থেকে বেরিয়ে এসে ব্র্যান্ডভিত্তিক উচ্চমূল্যের চামড়াজাত পণ্য তৈরিতে মনোযোগী হতে হবে।
দ্বিতীয়ত, কারখানার বর্জ্য শোধনাগার বা ইটিপি ও আন্তর্জাতিক পরিবেশগত মানদণ্ডগুলো পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে হবে। অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান চরচাকে বলেন, ”কাঁচা চামড়া থেকে ব্র্যান্ডভিত্তিক উচ্চমূল্যের পণ্যে রূপান্তর এবং ইটিপির শতভাগ বাস্তবায়ন ছাড়া এই বিশাল বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের সক্ষমতা ধরে রাখা কঠিন হবে।”
তৃতীয়ত, পুরো সরবরাহ শৃঙ্খলে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে বাজারে ডিজিটাল অনুসরণ ব্যবস্থা বা ট্র্যাকিং সিস্টেম চালু করা অত্যন্ত জরুরি। এই প্রযুক্তিগত রূপান্তরের গুরুত্ব তুলে ধরে সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর আরও উল্লেখ করেন, জুতা ও চামড়াজাত পণ্যে উচ্চ মূল্য সংযোজন করতে হলে বাজারে স্বচ্ছতা এবং ডিজিটাল ট্র্যাকিং অপরিহার্য। কারণ বর্তমান যুগের সচেতন আন্তর্জাতিক ক্রেতারা জানতে চান যে, চামড়াটি কোথা থেকে এসেছে এবং তা পরিবেশবান্ধব উপায়ে প্রক্রিয়াজাত হয়েছে কি না।অন্যথায় কোরবানির ঈদের চামড়া প্রতিবছর একইভাবে কম দামে বিক্রি হবে, আর বাংলাদেশের চামড়া শিল্প আন্তর্জাতিক বাজারে নিম্নমূল্যের কাঁচামাল সরবরাহকারী হিসেবেই আটকে থাকবে।
গত এক দশকের বাস্তবতা দেখিয়েছে—সমস্যা শুধু মৌসুমি নয়; এটি একটি অসম্পূর্ণ শিল্প রূপান্তরের সংকট। সংকটের মূলে গিয়েই চামড়া শিল্পকে রক্ষা করতে হবে।