ড. মো. ফজলুল করিম

বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা এখন আর কেবল শিক্ষানীতির প্রশ্ন নয়; এটি ক্রমশ আঞ্চলিক আকাঙ্ক্ষা, রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি এবং উন্নয়নের প্রতীকী ভাষার অংশ হয়ে উঠেছে। কোনো জেলায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি আজ প্রায় সর্বজনগ্রাহ্য। নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘোষণা স্থানীয় জনগণের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই আশাবাদ সৃষ্টি করে। কারণ, এটি উন্নয়ন, মর্যাদা ও সুযোগের প্রতিশ্রুতি বহন করে। কিন্তু রাষ্ট্রের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা কি মূলত ভৌগোলিক বিস্তারের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা উচিত, নাকি জাতীয় প্রয়োজন, অর্থনৈতিক কৌশল এবং জ্ঞান উৎপাদনের লক্ষ্যের ভিত্তিতে? বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা নিয়ে বর্তমান আলোচনায় এই প্রশ্নটি এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
স্বাধীনতার পর থেকে উচ্চশিক্ষার বিস্তার বাংলাদেশের অন্যতম সাফল্য। কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আজ আমরা শতাধিক সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের দেশে পরিণত হয়েছি। উচ্চশিক্ষায় প্রবেশাধিকার বেড়েছে, নারী শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পেয়েছে, এবং মফস্বল অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা অনেক বেশি সহজলভ্য হয়েছে। কিন্তু উচ্চশিক্ষার ইতিহাস আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়: প্রবেশাধিকারের সম্প্রসারণ এবং জ্ঞানগত উৎকর্ষ এক জিনিস নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বৃদ্ধি মানেই উচ্চশিক্ষার গুণগত মানোন্নয়ন নয়। বরং একটি পর্যায়ে এসে প্রশ্ন করতে হয়, এই প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা জ্ঞান সৃষ্টি করছে, কতটা গবেষণা করছে, কতটা উদ্ভাবন ঘটাচ্ছে এবং জাতীয় উন্নয়নে কতটা অবদান রাখছে।
বাংলাদেশের বাস্তবতা আরও গভীরভাবে বিবেচনার দাবি রাখে। প্রায় ১৮ কোটির এই দেশে প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে। এই বিশাল জনসংখ্যা একদিকে যেমন সম্ভাবনা, অন্যদিকে তেমনি একটি নীতিগত চ্যালেঞ্জ। উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্য কেবল ডিগ্রিধারী তৈরি করা নয়; বরং এমন মানবসম্পদ তৈরি করা, যারা অর্থনীতির উৎপাদনশীল খাতগুলোকে শক্তিশালী করবে। কিন্তু আমরা যদি বিশ্ববিদ্যালয় সম্প্রসারণকে শ্রমবাজারের বাস্তবতা, শিল্পনীতির অগ্রাধিকার এবং ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের সঙ্গে সংযুক্ত না করি, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কর্মসংস্থানের সোপান না হয়ে শিক্ষিত বেকারত্বের নতুন উৎসে পরিণত হতে পারে। ইতোমধ্যে বহু ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে যে, স্নাতকের সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু সেই অনুপাতে দক্ষ কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না। এর অর্থ হলো–উচ্চশিক্ষা এবং অর্থনীতির মধ্যে একটি কাঠামোগত বিচ্ছিন্নতা তৈরি হচ্ছে।
বিশ্বের সফল অর্থনীতিগুলোর অভিজ্ঞতা এখানে শিক্ষণীয়। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, জার্মানি কিংবা সাম্প্রতিক সময়ে চীন বিশ্ববিদ্যালয়কে কখনোই কেবল আঞ্চলিক ভারসাম্যের উপকরণ হিসেবে দেখেনি। তারা বিশ্ববিদ্যালয়কে জাতীয় উন্নয়ন কৌশলের অংশ হিসেবে বিবেচনা করেছে। কোথাও উন্নত উৎপাদনশিল্পের জন্য প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, কোথাও কৃষি আধুনিকায়নের জন্য কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, কোথাও চিকিৎসা গবেষণার জন্য মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, আবার কোথাও তথ্যপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা বায়োটেকনোলজির জন্য বিশেষায়িত গবেষণা কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছে। অর্থাৎ, বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আগে তারা প্রশ্ন করেছে—দেশের প্রয়োজন কী? অর্থনীতির ভবিষ্যৎ কোন খাতে? আগামী প্রজন্মের জন্য কী ধরনের দক্ষতা প্রয়োজন? বিশ্ববিদ্যালয় সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর হিসেবে গড়ে উঠেছে।
বাংলাদেশে অনেক ক্ষেত্রে আমরা উল্টো পথে হাঁটছি। একটি অঞ্চলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর তার একাডেমিক মিশন নির্ধারণের চেষ্টা করা হয়। ফলে প্রায় সব নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ে একই ধরনের বিভাগ খোলা হয়—ব্যবসায় প্রশাসন, কম্পিউটার বিজ্ঞান, ইংরেজি, সামাজিক বিজ্ঞান। কিন্তু খুব কম ক্ষেত্রেই দেখা যায় যে, কোনো বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি নির্দিষ্ট জাতীয় বা আঞ্চলিক প্রয়োজনের সঙ্গে সুস্পষ্টভাবে যুক্ত করা হয়েছে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়লেও জ্ঞান ব্যবস্থার বৈচিত্র্য এবং বিশেষায়ন বাড়ে না।
একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা তুলনামূলকভাবে সহজ। কিন্তু একটি কার্যকর বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলা অত্যন্ত কঠিন। এর জন্য প্রয়োজন দক্ষ শিক্ষক, আধুনিক গবেষণাগার, গবেষণা তহবিল, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, শক্তিশালী স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি কর্মসূচি এবং দীর্ঘমেয়াদি একাডেমিক পরিকল্পনা। রাষ্ট্রের সম্পদ সীমিত। যখন সীমিত সম্পদ অসংখ্য প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া হয়, তখন প্রায়শই এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়, যেখানে অনেক বিশ্ববিদ্যালয় টিকে থাকে, কিন্তু খুব কম বিশ্ববিদ্যালয় উৎকর্ষ অর্জন করতে পারে। ফলাফল হয় গড়পড়তা মানের অসংখ্য প্রতিষ্ঠান, যার খুব কমসংখ্যকই আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিযোগিতামূলক জ্ঞানকেন্দ্র।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা নীতির মৌলিক পুনর্বিবেচনা প্রয়োজন। প্রতিটি জেলায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত নয়। বরং আমাদের উচিত এটা নিশ্চিত করা যে, দেশের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রয়োজনের জন্য উপযুক্ত উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। একটি উপকূলীয় অঞ্চলের প্রয়োজন হয়তো সামুদ্রিক বিজ্ঞান ও জলবায়ু গবেষণা। একটি কৃষিনির্ভর অঞ্চলের প্রয়োজন হতে পারে কৃষি উদ্ভাবন ও খাদ্য প্রযুক্তি। একটি শিল্পাঞ্চলের প্রয়োজন হতে পারে উন্নত প্রকৌশল, অটোমেশন বা উৎপাদন প্রযুক্তি। একই মডেলের বিশ্ববিদ্যালয় সর্বত্র প্রতিষ্ঠা করা কোনো জাতীয় কৌশল নয়।

আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, উচ্চশিক্ষা মানেই বিশ্ববিদ্যালয়—এই ধারণা থেকেও বেরিয়ে আসা প্রয়োজন। বিশ্বের বহু দেশে প্রযুক্তি ইনস্টিটিউট, পলিটেকনিক, অ্যাপ্লাইড সায়েন্স বিশ্ববিদ্যালয়, কমিউনিটি কলেজ এবং পেশাভিত্তিক উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয় উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশের বিশাল জনসংখ্যা এবং কর্মসংস্থানের চাহিদা বিবেচনায় দক্ষতাভিত্তিক ও প্রযুক্তিনির্ভর উচ্চশিক্ষা সম্প্রসারণ অনেক ক্ষেত্রে নতুন সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার চেয়ে অধিক কার্যকর হতে পারে। আগামী দুই দশকে দেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ সম্ভবত আরও বেশি ডিগ্রিধারী তৈরি করা নয়; বরং এমন মানবসম্পদ তৈরি করা, যারা শিল্প, প্রযুক্তি, কৃষি, স্বাস্থ্যসেবা এবং উদ্ভাবন খাতে বাস্তব অবদান রাখতে সক্ষম।
বাংলাদেশ এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। আমরা যদি উচ্চশিক্ষাকে কেবল সম্প্রসারণের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখি, তাহলে হয়তো আরও অনেক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে। কিন্তু যদি আমরা উচ্চশিক্ষাকে জাতীয় উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, উৎপাদনশীলতা এবং জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির ভিত্তি হিসেবে দেখতে চাই, তাহলে আমাদের ভিন্ন প্রশ্ন করতে হবে। কোন খাতে ভবিষ্যতের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে? কোন জ্ঞানক্ষেত্রে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা অর্জন করতে পারে? কোন ধরনের মানবসম্পদ আগামী ২০ বা ৩০ বছরের অর্থনীতির জন্য প্রয়োজন হবে? উচ্চশিক্ষা নীতির কেন্দ্রবিন্দুতে এই প্রশ্নগুলোকে স্থান না দিলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়বে, কিন্তু জাতীয় সক্ষমতা একই হারে বাড়বে না।
বাংলাদেশের জন্য তাই এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো উচ্চশিক্ষার একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় রূপরেখা প্রণয়ন করা, যেখানে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক বা আঞ্চলিক বিবেচনার পরিবর্তে জাতীয় প্রয়োজন, অর্থনৈতিক কৌশল এবং জ্ঞান উৎপাদনের সক্ষমতার ভিত্তিতে নেওয়া হবে। কারণ, একটি দেশের অগ্রগতি শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত হয় তার কতগুলো বিশ্ববিদ্যালয় আছে তার দ্বারা নয়, বরং সেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কতটা জ্ঞান সৃষ্টি করছে, কতটা কর্মসংস্থানমুখী মানবসম্পদ গড়ে তুলছে এবং কতটা কার্যকরভাবে জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণে অবদান রাখছে, তার দ্বারা। প্রশ্নটি তাই জেলায় জেলায় বিশ্ববিদ্যালয়ের নয়; প্রশ্নটি প্রয়োজনভিত্তিক, মিশনভিত্তিক এবং ভবিষ্যতমুখী উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার।
লেখক: অধ্যাপক, বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইন্জিনিয়ারিং বিভাগ, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা এখন আর কেবল শিক্ষানীতির প্রশ্ন নয়; এটি ক্রমশ আঞ্চলিক আকাঙ্ক্ষা, রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি এবং উন্নয়নের প্রতীকী ভাষার অংশ হয়ে উঠেছে। কোনো জেলায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি আজ প্রায় সর্বজনগ্রাহ্য। নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘোষণা স্থানীয় জনগণের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই আশাবাদ সৃষ্টি করে। কারণ, এটি উন্নয়ন, মর্যাদা ও সুযোগের প্রতিশ্রুতি বহন করে। কিন্তু রাষ্ট্রের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা কি মূলত ভৌগোলিক বিস্তারের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা উচিত, নাকি জাতীয় প্রয়োজন, অর্থনৈতিক কৌশল এবং জ্ঞান উৎপাদনের লক্ষ্যের ভিত্তিতে? বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা নিয়ে বর্তমান আলোচনায় এই প্রশ্নটি এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
স্বাধীনতার পর থেকে উচ্চশিক্ষার বিস্তার বাংলাদেশের অন্যতম সাফল্য। কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আজ আমরা শতাধিক সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের দেশে পরিণত হয়েছি। উচ্চশিক্ষায় প্রবেশাধিকার বেড়েছে, নারী শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পেয়েছে, এবং মফস্বল অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা অনেক বেশি সহজলভ্য হয়েছে। কিন্তু উচ্চশিক্ষার ইতিহাস আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়: প্রবেশাধিকারের সম্প্রসারণ এবং জ্ঞানগত উৎকর্ষ এক জিনিস নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বৃদ্ধি মানেই উচ্চশিক্ষার গুণগত মানোন্নয়ন নয়। বরং একটি পর্যায়ে এসে প্রশ্ন করতে হয়, এই প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা জ্ঞান সৃষ্টি করছে, কতটা গবেষণা করছে, কতটা উদ্ভাবন ঘটাচ্ছে এবং জাতীয় উন্নয়নে কতটা অবদান রাখছে।
বাংলাদেশের বাস্তবতা আরও গভীরভাবে বিবেচনার দাবি রাখে। প্রায় ১৮ কোটির এই দেশে প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে। এই বিশাল জনসংখ্যা একদিকে যেমন সম্ভাবনা, অন্যদিকে তেমনি একটি নীতিগত চ্যালেঞ্জ। উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্য কেবল ডিগ্রিধারী তৈরি করা নয়; বরং এমন মানবসম্পদ তৈরি করা, যারা অর্থনীতির উৎপাদনশীল খাতগুলোকে শক্তিশালী করবে। কিন্তু আমরা যদি বিশ্ববিদ্যালয় সম্প্রসারণকে শ্রমবাজারের বাস্তবতা, শিল্পনীতির অগ্রাধিকার এবং ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের সঙ্গে সংযুক্ত না করি, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কর্মসংস্থানের সোপান না হয়ে শিক্ষিত বেকারত্বের নতুন উৎসে পরিণত হতে পারে। ইতোমধ্যে বহু ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে যে, স্নাতকের সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু সেই অনুপাতে দক্ষ কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না। এর অর্থ হলো–উচ্চশিক্ষা এবং অর্থনীতির মধ্যে একটি কাঠামোগত বিচ্ছিন্নতা তৈরি হচ্ছে।
বিশ্বের সফল অর্থনীতিগুলোর অভিজ্ঞতা এখানে শিক্ষণীয়। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, জার্মানি কিংবা সাম্প্রতিক সময়ে চীন বিশ্ববিদ্যালয়কে কখনোই কেবল আঞ্চলিক ভারসাম্যের উপকরণ হিসেবে দেখেনি। তারা বিশ্ববিদ্যালয়কে জাতীয় উন্নয়ন কৌশলের অংশ হিসেবে বিবেচনা করেছে। কোথাও উন্নত উৎপাদনশিল্পের জন্য প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, কোথাও কৃষি আধুনিকায়নের জন্য কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, কোথাও চিকিৎসা গবেষণার জন্য মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, আবার কোথাও তথ্যপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা বায়োটেকনোলজির জন্য বিশেষায়িত গবেষণা কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছে। অর্থাৎ, বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আগে তারা প্রশ্ন করেছে—দেশের প্রয়োজন কী? অর্থনীতির ভবিষ্যৎ কোন খাতে? আগামী প্রজন্মের জন্য কী ধরনের দক্ষতা প্রয়োজন? বিশ্ববিদ্যালয় সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর হিসেবে গড়ে উঠেছে।
বাংলাদেশে অনেক ক্ষেত্রে আমরা উল্টো পথে হাঁটছি। একটি অঞ্চলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর তার একাডেমিক মিশন নির্ধারণের চেষ্টা করা হয়। ফলে প্রায় সব নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ে একই ধরনের বিভাগ খোলা হয়—ব্যবসায় প্রশাসন, কম্পিউটার বিজ্ঞান, ইংরেজি, সামাজিক বিজ্ঞান। কিন্তু খুব কম ক্ষেত্রেই দেখা যায় যে, কোনো বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি নির্দিষ্ট জাতীয় বা আঞ্চলিক প্রয়োজনের সঙ্গে সুস্পষ্টভাবে যুক্ত করা হয়েছে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়লেও জ্ঞান ব্যবস্থার বৈচিত্র্য এবং বিশেষায়ন বাড়ে না।
একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা তুলনামূলকভাবে সহজ। কিন্তু একটি কার্যকর বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলা অত্যন্ত কঠিন। এর জন্য প্রয়োজন দক্ষ শিক্ষক, আধুনিক গবেষণাগার, গবেষণা তহবিল, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, শক্তিশালী স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি কর্মসূচি এবং দীর্ঘমেয়াদি একাডেমিক পরিকল্পনা। রাষ্ট্রের সম্পদ সীমিত। যখন সীমিত সম্পদ অসংখ্য প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া হয়, তখন প্রায়শই এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়, যেখানে অনেক বিশ্ববিদ্যালয় টিকে থাকে, কিন্তু খুব কম বিশ্ববিদ্যালয় উৎকর্ষ অর্জন করতে পারে। ফলাফল হয় গড়পড়তা মানের অসংখ্য প্রতিষ্ঠান, যার খুব কমসংখ্যকই আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিযোগিতামূলক জ্ঞানকেন্দ্র।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা নীতির মৌলিক পুনর্বিবেচনা প্রয়োজন। প্রতিটি জেলায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত নয়। বরং আমাদের উচিত এটা নিশ্চিত করা যে, দেশের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রয়োজনের জন্য উপযুক্ত উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। একটি উপকূলীয় অঞ্চলের প্রয়োজন হয়তো সামুদ্রিক বিজ্ঞান ও জলবায়ু গবেষণা। একটি কৃষিনির্ভর অঞ্চলের প্রয়োজন হতে পারে কৃষি উদ্ভাবন ও খাদ্য প্রযুক্তি। একটি শিল্পাঞ্চলের প্রয়োজন হতে পারে উন্নত প্রকৌশল, অটোমেশন বা উৎপাদন প্রযুক্তি। একই মডেলের বিশ্ববিদ্যালয় সর্বত্র প্রতিষ্ঠা করা কোনো জাতীয় কৌশল নয়।

আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, উচ্চশিক্ষা মানেই বিশ্ববিদ্যালয়—এই ধারণা থেকেও বেরিয়ে আসা প্রয়োজন। বিশ্বের বহু দেশে প্রযুক্তি ইনস্টিটিউট, পলিটেকনিক, অ্যাপ্লাইড সায়েন্স বিশ্ববিদ্যালয়, কমিউনিটি কলেজ এবং পেশাভিত্তিক উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয় উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশের বিশাল জনসংখ্যা এবং কর্মসংস্থানের চাহিদা বিবেচনায় দক্ষতাভিত্তিক ও প্রযুক্তিনির্ভর উচ্চশিক্ষা সম্প্রসারণ অনেক ক্ষেত্রে নতুন সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার চেয়ে অধিক কার্যকর হতে পারে। আগামী দুই দশকে দেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ সম্ভবত আরও বেশি ডিগ্রিধারী তৈরি করা নয়; বরং এমন মানবসম্পদ তৈরি করা, যারা শিল্প, প্রযুক্তি, কৃষি, স্বাস্থ্যসেবা এবং উদ্ভাবন খাতে বাস্তব অবদান রাখতে সক্ষম।
বাংলাদেশ এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। আমরা যদি উচ্চশিক্ষাকে কেবল সম্প্রসারণের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখি, তাহলে হয়তো আরও অনেক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে। কিন্তু যদি আমরা উচ্চশিক্ষাকে জাতীয় উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, উৎপাদনশীলতা এবং জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির ভিত্তি হিসেবে দেখতে চাই, তাহলে আমাদের ভিন্ন প্রশ্ন করতে হবে। কোন খাতে ভবিষ্যতের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে? কোন জ্ঞানক্ষেত্রে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা অর্জন করতে পারে? কোন ধরনের মানবসম্পদ আগামী ২০ বা ৩০ বছরের অর্থনীতির জন্য প্রয়োজন হবে? উচ্চশিক্ষা নীতির কেন্দ্রবিন্দুতে এই প্রশ্নগুলোকে স্থান না দিলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়বে, কিন্তু জাতীয় সক্ষমতা একই হারে বাড়বে না।
বাংলাদেশের জন্য তাই এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো উচ্চশিক্ষার একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় রূপরেখা প্রণয়ন করা, যেখানে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক বা আঞ্চলিক বিবেচনার পরিবর্তে জাতীয় প্রয়োজন, অর্থনৈতিক কৌশল এবং জ্ঞান উৎপাদনের সক্ষমতার ভিত্তিতে নেওয়া হবে। কারণ, একটি দেশের অগ্রগতি শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত হয় তার কতগুলো বিশ্ববিদ্যালয় আছে তার দ্বারা নয়, বরং সেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কতটা জ্ঞান সৃষ্টি করছে, কতটা কর্মসংস্থানমুখী মানবসম্পদ গড়ে তুলছে এবং কতটা কার্যকরভাবে জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণে অবদান রাখছে, তার দ্বারা। প্রশ্নটি তাই জেলায় জেলায় বিশ্ববিদ্যালয়ের নয়; প্রশ্নটি প্রয়োজনভিত্তিক, মিশনভিত্তিক এবং ভবিষ্যতমুখী উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার।
লেখক: অধ্যাপক, বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইন্জিনিয়ারিং বিভাগ, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়