মেরিনা মিতু

বগুড়ার দুটি নতুন ইউনিয়নের নাম পরিবর্তনের নির্দেশ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কার্যত একটি বিতর্কের ইতি টানার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু এই সিদ্ধান্তের পর নতুন একটি প্রশ্ন সামনে এসেছে–একজন প্রতিমন্ত্রীর সিদ্ধান্তে যদি এমন বিতর্ক তৈরি হয় এবং তা সংশোধনের জন্য শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ প্রয়োজন হয়, তাহলে সরকারের অন্য স্তরগুলোর ভূমিকা কোথায়?
গত এক সপ্তাহে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমকে ঘিরে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, সেটি শুধু দুটি ইউনিয়নের নামকরণ নিয়ে নয়। বরং এটি প্রশাসনিক জবাবদিহি, রাজনৈতিক প্রভাব, ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ এবং সরকারের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা নিয়ে নতুন আলোচনা সৃষ্টি করেছে। এই আলোচনায় দল হিসেবে ক্ষমতাসীন বিএনপির মধ্যে অস্বস্তিও চলছে।
কী নিয়ে বিতর্ক?
গত ১১ জুন বগুড়ার শিবগঞ্জ ও নবগঠিত মোকামতলা উপজেলায় চারটি নতুন ইউনিয়ন গঠনের প্রজ্ঞাপন জারি হয়। নতুন ইউনিয়নগুলোর নাম রাখা হয় ‘মীরবাড়ী’, ‘সীমান্ত’, ‘দিগন্ত’ ও ‘স্বর্ণগ্রাম’। পরে অভিযোগ ওঠে ‘মীরবাড়ী’ নামটি প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের পৈতৃক বাড়ির নাম এবং ‘সীমান্ত’ ও ‘দিগন্ত’ তার দুই ছেলের নামের সঙ্গে মিলে যায়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা শুরু হলে বিষয়টি জাতীয় সংসদেও ওঠে। সংসদে প্রতিমন্ত্রী দাবি করেন, নামগুলো স্থানীয় গণশুনানি ও প্রশাসনিক যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হয়েছে। তার ভাষায়, ছেলেদের নামের সঙ্গে মিল হওয়া ছিল ‘কাকতালীয়’ বা ‘মিরাকল’।
কিন্তু এই ব্যাখ্যা বিতর্ক থামাতে পারেনি। বরং প্রশ্ন উঠেছে, প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সত্যিই স্বাধীনভাবে কাজ করেছে, নাকি রাজনৈতিক প্রভাব ছিল?
মীর শাহে আলমকে ঘিরে বিতর্ক এখানেই থেমে নেই।
ইউনিয়নের নাম নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই নিজ এলাকায় স্কুলের নাম প্রতিমন্ত্রীর নামে করতে স্কুল কমিটির প্রস্তাব এবং তার বিরুদ্ধে ‘অপপ্রচার ও মানহানিকর’ তথ্য ছড়ানোর অভিযোগে করা এক মামলায় দৈনিক অগ্রযাত্রা প্রতিদিন-এর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মো. রেজানুর ইসলামকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। প্রতিমন্ত্রীর ব্যক্তিগত, সামাজিক ও রাজনৈতিক সুনাম ক্ষুণ্নের অভিযোগ এনে স্থানীয় আদালতে মামলাটি করা হয়।
তবে সাংবাদিক গ্রেপ্তারের ঘটনায় দুঃখপ্রকাশ করেছেন প্রতিমন্ত্রী শাহে আলম। গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে তিনি জানান, এই মামলার বিষয়ে তিনি জানতেন না।
বিবৃতিতে তিনি বলেন, বিষয়টির শান্তিপূর্ণ সমাধান হওয়া উচিত এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মধ্যে আলোচনা ও আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দ্রুত সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব। একই সঙ্গে তিনি আশা প্রকাশ করেন, গ্রেপ্তার সাংবাদিকও দ্রুত মুক্তি পাবেন।
দলীয় সূত্রগুলো বলছে, মীর শাহে আলমকে ঘিরে অস্বস্তি শুধু সাম্প্রতিক বিতর্কের কারণে নয়; এর সূত্রপাত হয়েছিল নির্বাচনকে ঘিরেও। বগুড়া-২ আসনটি মিত্রদল নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্নার জন্য ছেড়ে দেওয়া হবে–এমন সম্ভাবনা থাকলেও পরে আসনটিতে শাহে আলমকে মনোনয়ন দেওয়া হয়।
আসন বণ্টন নিয়ে সেই সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের সময়ও বিএনপির ভেতরে প্রশ্ন ও অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল। বিশেষ করে জোটের প্রতি দেওয়া প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসার ঘটনায় কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতাও নাখোশ ছিলেন। তাদের মতে, শাহে আলমকে ঘিরে বর্তমান বিতর্ক নতুন হলেও তাকে নিয়ে দলীয় অস্বস্তির ইতিহাস নতুন নয়।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে চরচাকে বলেন, “মান্না ভাইকে বগুড়ার আসনটি দেওয়া হবে–প্রাথমিকভাবে এমনটাই আলোচনা ছিল। কিন্তু হাইকমান্ডের বাইরে গিয়ে তো কিছু করা সম্ভব না। তবে সেসময় অনেক সিনিয়র নেতাও আপত্তি জানিয়েছিলেন।”
প্রধানমন্ত্রীকেই কেন হস্তক্ষেপ করতে হয়–এমন প্রশ্নের জবাবে দেশের উত্তরাঞ্চলের একজন সংসদ সদস্য চরচাকে বলেন, “এই প্রশ্নটি ইতিমধ্যে দলের মধ্যেও এসেছে। এই আলাপ আমরা করেছি ফ্যাসিবাদী আমলে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী আগের রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা থেকে বের হয়ে নতুন রাজনৈতিক শিষ্টাচারের সাথে দেশের জনগণকে পরিচয় করাচ্ছে। সেখানে দু-একটি ঘটনায় সরকার এবং দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয়, বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখা উচিত।”
এ বিষয়ে জানতে প্রতিমন্ত্রী শাহে আলমের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা হয়। তবে তিনি সাড়া দেননি।

বিব্রত দল ও সরকার
প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমকে ঘিরে সৃষ্ট বিতর্কে ক্ষমতাসীন বিএনপির ভেতরে অস্বস্তি ও হতাশা দেখা দিয়েছে। দলটির একাধিক মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সংসদ সদস্য এবং স্থায়ী কমিটির সদস্য মনে করছেন, ইউনিয়নের নামকরণ নিয়ে ওঠা প্রশ্ন সরকারের জন্য অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক তৈরি করেছে এবং বিরোধীদের সমালোচনার সুযোগ করে দিয়েছে।
দলীয় সূত্রগুলো বলছে, শাহে আলমের দেওয়া ব্যাখ্যায় শুধু সাধারণ মানুষ নয়, সরকারের অনেক দায়িত্বশীল ব্যক্তিও সন্তুষ্ট নন। তাদের মতে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যখন সরকারকে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক ভাবমূর্তিতে উপস্থাপনের চেষ্টা করছেন, তখন এ ধরনের বিতর্ক সেই প্রচেষ্টাকে প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে।
কয়েকজন সংসদ সদস্য অভিযোগ করেছেন, বিষয়টি নিয়ে তাদেরও দলীয় নেতা-কর্মী ও সাধারণ মানুষের প্রশ্নের মুখে পড়তে হচ্ছে।
এ বিষয়ে চরচা সরকারের চারজন মন্ত্রী, দুজন প্রতিমন্ত্রী ও একজন উপদেষ্টার সঙ্গে কথা বলে। তবে তারা কেউই এই বিষয়ে নিজেদের নাম প্রকাশ করতে চাননি।
একজন মন্ত্রী চরচাকে বলেছেন, “এটি এমন এক প্রতিমন্ত্রীর বিষয়, যার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী যেখানে নিজের মায়ের নামে কোনো নামকরণ বা প্রতিফলক করতে চান না...কারণ তিনি রাজনীতিতে নতুন কিছু সম্ভাবনা এবং শিক্ষণীয় বিষয় সামনে আনতে চাচ্ছেন, সেখানে একজন প্রতিমন্ত্রীর আরও সচেতন হওয়া উচিত ছিল।”
চট্টগ্রাম বিভাগের একজন মন্ত্রী চরচাকে বলেন, “তিনি (শাহে আলম) তো প্রধামন্ত্রীর নির্দেশনা অমান্য করেছেন এক কথায়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ সভায় আমাদের বারবার এই নির্দেশনা দিয়েছেন, যেন দলের কেউ এমন কোনো কাজে লিপ্ত না হন, যা সরকার বা দলের ওপর জনগণের আস্থা ক্ষুণ্ণ করতে পারে। যেকোনো সভায় এই বিষয়টিকে আমাদের দলীয় প্রধান সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে এসেছেন। এটাকে হালকাভাবে নেওয়া ঠিক হয়নি।”
সরকারের একজন প্রতিমন্ত্রী চরচাকে বলেন, “ওনাকে নিয়ে তো বিতর্ক পিছুই ছুটছে না। পত্র-পত্রিকায় দেখলাম খবর আসলো যে, ওনার এলাকা সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ পেয়েছে...ওনার এক সন্তান আবার সেই কাজের ঠিকাদারিও পেয়েছে। মানুষ তো এর জন্য সরকার আর দলকে দোষারোপ করছে, নেতিবাচক সমালোচনা করছে। তিনি কোন পাওয়ারে এসব কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন, সেটি দেখার বিষয়। প্রধানমন্ত্রী কী ব্যবস্থা নেন, তাও দেখার বিষয়।”
তাদের প্রত্যেকের মতে, বিষয়টি সরকারের সমালোচনা করার বড় সুযোগ করে দিয়েছে বিরোধীদের। প্রতিমন্ত্রীকে ঘিরে এই বিতর্ক উপেক্ষা করা এখন সরকারের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং এটি মন্ত্রিসভার ভেতরেও উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়েও বিষয়টি আলোচনা হয়েছে বলে দলীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে। দলটির নেতারা মনে করছেন, দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের পর ক্ষমতায় এসে সরকার ও দলের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়–এমন কোনো কর্মকাণ্ড মেনে নেওয়া যায় না। তাই এখন সবার নজর প্রধানমন্ত্রীর দিকে, তিনি এ বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নেন।
বিএনপির একজন স্থায়ী কমিটির সদস্য চরচাকে বলেন, “তিনি (শাহে আলম) এমন একটি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী, যেখানকার মন্ত্রী দলের মহাসচিব। তাই এই সমালোচনা আর প্রশ্নের তীর স্বাভাবিকভাবে সরকারকে ছাড়িয়ে দলের দিকেও আসছে। নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রধানমন্ত্রী প্রাথমিকভাবে উপর্যুক্ত কাজটিই করেছেন। এর বাইরে কী পদক্ষেপ নেন, সেটি দেখার অপেক্ষা।”
সংসদ সদস্য ও দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় চরচাকে বলেন, “প্রধানমন্ত্রী খুব দুর্দান্তভাবে বিষয়টি হ্যান্ডেল করেছেন। এই এক ঘটনায় এটি আরও অনেকের জন্য শিক্ষণীয়।”
এ বিষয়ে দলের মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর চরচাকে বলেন, “এ বিষয়ে আমার তেমন বক্তব্য নেই। যাকে নিয়ে ঘটনা, তিনি ইতিমধ্যে ব্যাখা দিয়েছেন। আর প্রধানমন্ত্রীর যা দায়িত্ব, তিনি তা করছেন।”
বিগত আওয়ামী লীগ আমলেও দেখা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ ছাড়া অনেক কাজই কার্যত হতো না। ক্রিকেট থেকে শুরু করে প্রশাসনিক অনেক সিদ্ধান্তই সরকারপ্রধানের ওপর নির্ভরশীল ছিল। তখনো একই কথা শোনা গেছে, সব যদি প্রধানমন্ত্রীকে করতে হয়, তাহলে অন্যদের কাজ কী।
প্রতিমন্ত্রী শাহে আলমকে নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কী সিদ্ধান্ত নেন, তার দিকে দলের অনেকেই তাকিয়ে আছেন। কারণ, গণঅভ্যুত্থানের পর গঠিত বিএনপি সরকার এমন অনেক কিছুই করছে, যা আগে হয়নি। সেখানে এ সম্পর্কিত সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে দল ও সরকারের বিব্রত অবস্থা কতটা কাটে, সেটার দিকে নজর অনেকের।

বগুড়ার দুটি নতুন ইউনিয়নের নাম পরিবর্তনের নির্দেশ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কার্যত একটি বিতর্কের ইতি টানার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু এই সিদ্ধান্তের পর নতুন একটি প্রশ্ন সামনে এসেছে–একজন প্রতিমন্ত্রীর সিদ্ধান্তে যদি এমন বিতর্ক তৈরি হয় এবং তা সংশোধনের জন্য শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ প্রয়োজন হয়, তাহলে সরকারের অন্য স্তরগুলোর ভূমিকা কোথায়?
গত এক সপ্তাহে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমকে ঘিরে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, সেটি শুধু দুটি ইউনিয়নের নামকরণ নিয়ে নয়। বরং এটি প্রশাসনিক জবাবদিহি, রাজনৈতিক প্রভাব, ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ এবং সরকারের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা নিয়ে নতুন আলোচনা সৃষ্টি করেছে। এই আলোচনায় দল হিসেবে ক্ষমতাসীন বিএনপির মধ্যে অস্বস্তিও চলছে।
কী নিয়ে বিতর্ক?
গত ১১ জুন বগুড়ার শিবগঞ্জ ও নবগঠিত মোকামতলা উপজেলায় চারটি নতুন ইউনিয়ন গঠনের প্রজ্ঞাপন জারি হয়। নতুন ইউনিয়নগুলোর নাম রাখা হয় ‘মীরবাড়ী’, ‘সীমান্ত’, ‘দিগন্ত’ ও ‘স্বর্ণগ্রাম’। পরে অভিযোগ ওঠে ‘মীরবাড়ী’ নামটি প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের পৈতৃক বাড়ির নাম এবং ‘সীমান্ত’ ও ‘দিগন্ত’ তার দুই ছেলের নামের সঙ্গে মিলে যায়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা শুরু হলে বিষয়টি জাতীয় সংসদেও ওঠে। সংসদে প্রতিমন্ত্রী দাবি করেন, নামগুলো স্থানীয় গণশুনানি ও প্রশাসনিক যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হয়েছে। তার ভাষায়, ছেলেদের নামের সঙ্গে মিল হওয়া ছিল ‘কাকতালীয়’ বা ‘মিরাকল’।
কিন্তু এই ব্যাখ্যা বিতর্ক থামাতে পারেনি। বরং প্রশ্ন উঠেছে, প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সত্যিই স্বাধীনভাবে কাজ করেছে, নাকি রাজনৈতিক প্রভাব ছিল?
মীর শাহে আলমকে ঘিরে বিতর্ক এখানেই থেমে নেই।
ইউনিয়নের নাম নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই নিজ এলাকায় স্কুলের নাম প্রতিমন্ত্রীর নামে করতে স্কুল কমিটির প্রস্তাব এবং তার বিরুদ্ধে ‘অপপ্রচার ও মানহানিকর’ তথ্য ছড়ানোর অভিযোগে করা এক মামলায় দৈনিক অগ্রযাত্রা প্রতিদিন-এর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মো. রেজানুর ইসলামকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। প্রতিমন্ত্রীর ব্যক্তিগত, সামাজিক ও রাজনৈতিক সুনাম ক্ষুণ্নের অভিযোগ এনে স্থানীয় আদালতে মামলাটি করা হয়।
তবে সাংবাদিক গ্রেপ্তারের ঘটনায় দুঃখপ্রকাশ করেছেন প্রতিমন্ত্রী শাহে আলম। গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে তিনি জানান, এই মামলার বিষয়ে তিনি জানতেন না।
বিবৃতিতে তিনি বলেন, বিষয়টির শান্তিপূর্ণ সমাধান হওয়া উচিত এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মধ্যে আলোচনা ও আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দ্রুত সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব। একই সঙ্গে তিনি আশা প্রকাশ করেন, গ্রেপ্তার সাংবাদিকও দ্রুত মুক্তি পাবেন।
দলীয় সূত্রগুলো বলছে, মীর শাহে আলমকে ঘিরে অস্বস্তি শুধু সাম্প্রতিক বিতর্কের কারণে নয়; এর সূত্রপাত হয়েছিল নির্বাচনকে ঘিরেও। বগুড়া-২ আসনটি মিত্রদল নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্নার জন্য ছেড়ে দেওয়া হবে–এমন সম্ভাবনা থাকলেও পরে আসনটিতে শাহে আলমকে মনোনয়ন দেওয়া হয়।
আসন বণ্টন নিয়ে সেই সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের সময়ও বিএনপির ভেতরে প্রশ্ন ও অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল। বিশেষ করে জোটের প্রতি দেওয়া প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসার ঘটনায় কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতাও নাখোশ ছিলেন। তাদের মতে, শাহে আলমকে ঘিরে বর্তমান বিতর্ক নতুন হলেও তাকে নিয়ে দলীয় অস্বস্তির ইতিহাস নতুন নয়।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে চরচাকে বলেন, “মান্না ভাইকে বগুড়ার আসনটি দেওয়া হবে–প্রাথমিকভাবে এমনটাই আলোচনা ছিল। কিন্তু হাইকমান্ডের বাইরে গিয়ে তো কিছু করা সম্ভব না। তবে সেসময় অনেক সিনিয়র নেতাও আপত্তি জানিয়েছিলেন।”
প্রধানমন্ত্রীকেই কেন হস্তক্ষেপ করতে হয়–এমন প্রশ্নের জবাবে দেশের উত্তরাঞ্চলের একজন সংসদ সদস্য চরচাকে বলেন, “এই প্রশ্নটি ইতিমধ্যে দলের মধ্যেও এসেছে। এই আলাপ আমরা করেছি ফ্যাসিবাদী আমলে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী আগের রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা থেকে বের হয়ে নতুন রাজনৈতিক শিষ্টাচারের সাথে দেশের জনগণকে পরিচয় করাচ্ছে। সেখানে দু-একটি ঘটনায় সরকার এবং দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয়, বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখা উচিত।”
এ বিষয়ে জানতে প্রতিমন্ত্রী শাহে আলমের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা হয়। তবে তিনি সাড়া দেননি।

বিব্রত দল ও সরকার
প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমকে ঘিরে সৃষ্ট বিতর্কে ক্ষমতাসীন বিএনপির ভেতরে অস্বস্তি ও হতাশা দেখা দিয়েছে। দলটির একাধিক মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সংসদ সদস্য এবং স্থায়ী কমিটির সদস্য মনে করছেন, ইউনিয়নের নামকরণ নিয়ে ওঠা প্রশ্ন সরকারের জন্য অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক তৈরি করেছে এবং বিরোধীদের সমালোচনার সুযোগ করে দিয়েছে।
দলীয় সূত্রগুলো বলছে, শাহে আলমের দেওয়া ব্যাখ্যায় শুধু সাধারণ মানুষ নয়, সরকারের অনেক দায়িত্বশীল ব্যক্তিও সন্তুষ্ট নন। তাদের মতে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যখন সরকারকে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক ভাবমূর্তিতে উপস্থাপনের চেষ্টা করছেন, তখন এ ধরনের বিতর্ক সেই প্রচেষ্টাকে প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে।
কয়েকজন সংসদ সদস্য অভিযোগ করেছেন, বিষয়টি নিয়ে তাদেরও দলীয় নেতা-কর্মী ও সাধারণ মানুষের প্রশ্নের মুখে পড়তে হচ্ছে।
এ বিষয়ে চরচা সরকারের চারজন মন্ত্রী, দুজন প্রতিমন্ত্রী ও একজন উপদেষ্টার সঙ্গে কথা বলে। তবে তারা কেউই এই বিষয়ে নিজেদের নাম প্রকাশ করতে চাননি।
একজন মন্ত্রী চরচাকে বলেছেন, “এটি এমন এক প্রতিমন্ত্রীর বিষয়, যার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী যেখানে নিজের মায়ের নামে কোনো নামকরণ বা প্রতিফলক করতে চান না...কারণ তিনি রাজনীতিতে নতুন কিছু সম্ভাবনা এবং শিক্ষণীয় বিষয় সামনে আনতে চাচ্ছেন, সেখানে একজন প্রতিমন্ত্রীর আরও সচেতন হওয়া উচিত ছিল।”
চট্টগ্রাম বিভাগের একজন মন্ত্রী চরচাকে বলেন, “তিনি (শাহে আলম) তো প্রধামন্ত্রীর নির্দেশনা অমান্য করেছেন এক কথায়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ সভায় আমাদের বারবার এই নির্দেশনা দিয়েছেন, যেন দলের কেউ এমন কোনো কাজে লিপ্ত না হন, যা সরকার বা দলের ওপর জনগণের আস্থা ক্ষুণ্ণ করতে পারে। যেকোনো সভায় এই বিষয়টিকে আমাদের দলীয় প্রধান সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে এসেছেন। এটাকে হালকাভাবে নেওয়া ঠিক হয়নি।”
সরকারের একজন প্রতিমন্ত্রী চরচাকে বলেন, “ওনাকে নিয়ে তো বিতর্ক পিছুই ছুটছে না। পত্র-পত্রিকায় দেখলাম খবর আসলো যে, ওনার এলাকা সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ পেয়েছে...ওনার এক সন্তান আবার সেই কাজের ঠিকাদারিও পেয়েছে। মানুষ তো এর জন্য সরকার আর দলকে দোষারোপ করছে, নেতিবাচক সমালোচনা করছে। তিনি কোন পাওয়ারে এসব কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন, সেটি দেখার বিষয়। প্রধানমন্ত্রী কী ব্যবস্থা নেন, তাও দেখার বিষয়।”
তাদের প্রত্যেকের মতে, বিষয়টি সরকারের সমালোচনা করার বড় সুযোগ করে দিয়েছে বিরোধীদের। প্রতিমন্ত্রীকে ঘিরে এই বিতর্ক উপেক্ষা করা এখন সরকারের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং এটি মন্ত্রিসভার ভেতরেও উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়েও বিষয়টি আলোচনা হয়েছে বলে দলীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে। দলটির নেতারা মনে করছেন, দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের পর ক্ষমতায় এসে সরকার ও দলের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়–এমন কোনো কর্মকাণ্ড মেনে নেওয়া যায় না। তাই এখন সবার নজর প্রধানমন্ত্রীর দিকে, তিনি এ বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নেন।
বিএনপির একজন স্থায়ী কমিটির সদস্য চরচাকে বলেন, “তিনি (শাহে আলম) এমন একটি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী, যেখানকার মন্ত্রী দলের মহাসচিব। তাই এই সমালোচনা আর প্রশ্নের তীর স্বাভাবিকভাবে সরকারকে ছাড়িয়ে দলের দিকেও আসছে। নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রধানমন্ত্রী প্রাথমিকভাবে উপর্যুক্ত কাজটিই করেছেন। এর বাইরে কী পদক্ষেপ নেন, সেটি দেখার অপেক্ষা।”
সংসদ সদস্য ও দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় চরচাকে বলেন, “প্রধানমন্ত্রী খুব দুর্দান্তভাবে বিষয়টি হ্যান্ডেল করেছেন। এই এক ঘটনায় এটি আরও অনেকের জন্য শিক্ষণীয়।”
এ বিষয়ে দলের মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর চরচাকে বলেন, “এ বিষয়ে আমার তেমন বক্তব্য নেই। যাকে নিয়ে ঘটনা, তিনি ইতিমধ্যে ব্যাখা দিয়েছেন। আর প্রধানমন্ত্রীর যা দায়িত্ব, তিনি তা করছেন।”
বিগত আওয়ামী লীগ আমলেও দেখা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ ছাড়া অনেক কাজই কার্যত হতো না। ক্রিকেট থেকে শুরু করে প্রশাসনিক অনেক সিদ্ধান্তই সরকারপ্রধানের ওপর নির্ভরশীল ছিল। তখনো একই কথা শোনা গেছে, সব যদি প্রধানমন্ত্রীকে করতে হয়, তাহলে অন্যদের কাজ কী।
প্রতিমন্ত্রী শাহে আলমকে নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কী সিদ্ধান্ত নেন, তার দিকে দলের অনেকেই তাকিয়ে আছেন। কারণ, গণঅভ্যুত্থানের পর গঠিত বিএনপি সরকার এমন অনেক কিছুই করছে, যা আগে হয়নি। সেখানে এ সম্পর্কিত সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে দল ও সরকারের বিব্রত অবস্থা কতটা কাটে, সেটার দিকে নজর অনেকের।