আল হেলাল শুভ

স্থানীয় সরকার নির্বাচন দ্রুত সময়ের মধ্যে চায় জামায়াতে ইসলামী। সরকার এই নির্বাচন নিয়ে ‘লুকোচুরি’ খেলছে বলেও মনে করছে দলটি। এদিকে প্রার্থী গুছিয়ে এনেছে জাতীয় সংসদের প্রধান বিরোধী দলটি।
জামায়াত জানিয়েছে, নির্বাচনে নারী প্রার্থীদের অংশগ্রহণ থাকবে। তবে ১৩ সিটি করপোরেশনের মধ্যে কোনোটাতেই এখন পর্যন্ত কোনো নারী প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেনি তারা।
দ্রুত স্থানীয় নির্বাচন চায় দল
গত শুক্রবার রাজধানীর মগবাজারে আল ফালাহ মিলনায়তনে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরার বৈঠক হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন জামায়াত আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান। বৈঠক থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন দ্রুত করার দাবি জানিয়েছে জামায়াত।
দলটির নেতারা মনে করেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন সরকার নিজের মর্জিমতো করতে চায়। এ জন্য দলের মজলিসে শুরায় আলোচনা করে সরকারের কাছে দলটি দাবি করেছে, স্থানীয় পর্যায়ের সকল স্তরে দ্রুত নির্বাচন দিতে হবে; সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ পাওয়া সরকার দলীয় নেতাদের অতি দ্রুত অপসারণ করতে হবে।
কেন দ্রুত নির্বাচন চান–জানতে চাইলে দলের কেন্দ্রীয় নেতা সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন চরচাকে বলেন, ‘‘আমরা দ্রুত নির্বাচনের কথা এ জন্য বলেছি যে, স্থানীয় সরকারের সব জায়গায় তো সরকার প্রশাসক বসিয়েছে, দলীয় লোক বসিয়েছে। এবং তাদেরকে দিয়ে নির্বাচন করাবে। এখানে দুটি সমস্যা। একটি হলো অনির্বাচিত লোক, আরেকটি হলো তারা তো নির্বাচনে সরকারের টাকা ব্যবহার করতে পারে।”
সাইফুল আলম খান বলেন, ‘‘এটাই তো স্বাভাবিক যে, নির্বাচনের মাধ্যমেই পৌরসভা, সিটি করপোরেশনে (নির্বাচিত) মেয়র থাকবে। কিন্তু এই যে প্রশাসক বসিয়ে দলীয়করণ, এটাতে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, এটার অবসান হওয়া দরকার।”
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রস্তুতি নিয়ে জানতে চাইলে দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের চরকাকে বলেন, “নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা না হলে আসলে নির্বাচন জমে না। সরকার বলছে, নির্বাচনের সম্ভাব্য সময় হচ্ছে, সেপ্টেম্বর কিংবা অক্টোবর। কবে হবে, এটা বলছে না। একটি লুকোচুরি খেলা মনে হচ্ছে।”
জামায়াত নেতারা জানিয়েছেন, ইতিমধ্যে দেশের ১৩টি সিটি করপোরেশনের মধ্যে দুই-একটা বাদে প্রায় সবগুলোতে মেয়রপ্রার্থী প্রাথমিকভাবে চূড়ান্ত করা হয়েছে। তবে এদের মধ্যে কোনো নারী প্রার্থী নেই।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়ে জানতে চাইলে এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, “আমাদের প্রার্থীদের মাঠপর্যায়ে প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য বলা হয়েছে। প্রার্থী ঠিক করা, ঘোষণা দেওয়ার কাজ চলছে। এ ছাড়া প্রার্থী হিসেবে যাদের নাম ঘোষণা করা হয়েছে, তাদের নার্সিং করা হচ্ছে।”
জামায়াতের নেতারা জানিয়েছেন, স্থানীয় জামায়াত, মহিলা সংগঠন, শ্রমিক সংগঠন, অন্য পেশাজীবী সংগঠন, ওয়ার্ড বা ইউনিয়ন সংগঠন থেকে লিখিত পরামর্শ নেওয়া হয় মেয়রপ্রার্থী নির্ধারণে। তাদের প্রস্তাব কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটির নির্বাহী পরিষদের বৈঠকে উপস্থাপন করা হয়।
দলীয় সূত্র বলছে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে জামায়াতের মেয়রপ্রার্থী করা হচ্ছে দলের মহানগর উত্তর শাখার আমির সেলিম উদ্দিনকে। আর ঢাকা দক্ষিণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি মো. আবু সাদিক (সাদিক কায়েম) প্রার্থী হতে যাচ্ছেন। তবে বিষয়টি এখনো নিশ্চিত করা হয়নি। নির্বাচনে আগমুহূর্তে তাকে প্রার্থী করে মাঠে নামাতে চায় জামায়াত।
দলীয় একাধিক সূত্র জানিয়েছে, প্রাথমিকভাবে চূড়ান্ত হওয়া অন্য প্রার্থীরা হলেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে নগর জামায়াতের সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক কাউন্সিলর মুহাম্মদ শামসুজ্জামান হেলালী, গাজীপুরে তোকাত গাজী উসমান পাশা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক সহকারী অধ্যাপক হাফিজুর রহমান, বরিশালে দলের কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুয়াযযম হোসাইন হেলাল, রংপুরে মহানগর শাখার আমির এ টি এম আজম খান, খুলনায় কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও খুলনা মহানগরীর আমির মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান এবং নারায়ণগঞ্জে মহানগর শাখার আমির মোহাম্মদ আবদুল জব্বার।
রাজশাহী, সিলেট, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা ও নবগঠিত বগুড়া সিটি করপোরেশনের মেয়রপ্রার্থী পদে বেশ কয়েকজন আলোচনায় আছেন। তাদের বিষয়ে আরও পর্যবেক্ষণ করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে মজলিসে শুরার একাধিক সদস্য জানিয়েছেন।
কেন দ্রুত নির্বাচন চান–জানতে চাইলে সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন চরচাকে জানান, স্থানীয় নির্বাচন স্থানীয়ভাবে যার যার এলাকা থেকে সমর্থনের ভিত্তিতেই হবে। তিনি বলেন, “কিছু মেয়রপ্রার্থী তো ঘোষণা হয়ে গেছে। মেয়রপ্রার্থী দুই-একটা বাদ আছে, সেগুলোও হয়ে যাবে।”
গত সংসদ নির্বাচনে জামায়াতের পরাজিত এক প্রার্থী চরচাকে বলেন, “নারায়ণগঞ্জে দলের আমির গিয়ে আব্দুল জব্বারকে প্রার্থী ঘোষণা করেছেন। এ ছাড়া ঢাকা উত্তরে প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে। তবে ঢাকা দক্ষিণে এখনো অফিশিয়াল ঘোষণা দেয়া হয়নি।”
কেমন থাকবে নারীর অংশগ্রহণ
জামায়াত নেতারা বলছেন, স্থানীয় নির্বাচনে মেয়র পদে দলের কোনো নারী প্রার্থী নেই। তবে কাউন্সিলরসহ অন্য পদে নারীদের অংশগ্রহণ থাকবে।
এ বিষয়ে দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, “আমাদের দলের স্থানীয় নির্বাচনে নারী অংশগ্রহণ আগেও ছিল। এবারও উপজেলা পর্যায়ে নারীরা অংশ নেবেন। বিপুলসংখ্যক নারীর আগ্রহ আমরা দেখতে পাচ্ছি।”
এই নেতা বলেন, “স্থানীয় নির্বাচনের জন্য নারীরা কাজ করছে। উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদে (প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য) প্রস্তুতি নিচ্ছে নারীরা।”
নারী প্রার্থী বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে কেন্দ্রীয় নেতা সাইফুল আলম খান মিলন চরচাকে বলেন, “মেয়র পদের নিচের দিকের পদে নারী প্রার্থী দেওয়া হবেই। নারীদের পজিশন সেখানে আছে; সবগুলোতেই দেওয়া হবে।”
কয়েকটি সিটিতে নাম ঘোষণা না হলেও এক ধরনের নিশ্চয়তা দিয়ে সম্ভাব্য প্রার্থীদের কাজ করতে বলেছে জামায়াত। দলের এক নেতা চরচাকে বলেন, “দল যাকে মনোনয়ন দিয়েছে, তার পক্ষে ইতিমধ্যে কাজ শুরু হয়ে গিয়েছে।”
প্রচারে এগিয়ে ঢাকা উত্তর, পিছিয়ে দক্ষিণে
জামায়াত নেতারা জানিয়েছে, যেহেতু ঢাকা উত্তরে ইতিমধ্যে দলের প্রার্থী সেলিম উদ্দিন চূড়ান্ত, সেহেতু তিনি প্রচারে এগিয়ে রয়েছেন। আর দক্ষিণে এখনো কিছু চূড়ান্ত হয়নি, তাই প্রচারও কম।
ঢাকা উত্তর সিটিতে মেয়রপ্রার্থী হিসেবে শুরুতে তিনজন থাকলেও মহানগর উত্তরের আমির সেলিম উদ্দিন প্রচার শুরু করেছেন। ঈদুল আজহায় নগরবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়ে তার নামে সাঁটানো পোস্টারে ছেয়ে আছে উত্তরের অলিগলি। ‘প্রচারণার জন্য’ সেবামূলক অ্যাপ উদ্বোধন করা হয়েছে। তবে এমনটা ঢাকা দক্ষিণের ক্ষেত্রে দেখা যায়নি।
জামায়াত নেতারা বলছেন, ঢাকা উত্তরে দলের প্রভাব রয়েছে বেশি। বিশেষ করে মিরপুর ও উত্তরায় দলীয় অবস্থান ভালো। এমন পরিস্থিতিতে উত্তরে বেশি জোর দেওয়া স্বাভাবিক। এ ছাড়া দক্ষিণে যাকে দলীয় প্রার্থী হিসেবে ভাবা হচ্ছে, তিনি এখনো নির্বাচনী মাঠেই নামেননি। ফলে স্বাভাবিকভাবেই মহানগর দক্ষিণ কিছুটা পিছিয়ে রয়েছে।
জামায়াতের মহানগরের নেতারা বলছেন, উত্তর সিটিতে জামায়াতের জনপ্রিয়তা রয়েছে। এরই ফল হচ্ছে সর্বশেষ সংসদ নির্বাচনে এই এলাকার চারটি আসনে দলটির প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছেন। শরিক দল থেকেও একটি আসনে জয় এসেছে।
উত্তরের এক নেতা জানিয়েছেন, চলতি বছরের মার্চে ‘নাগরিক সেবা অ্যাপ’ চালু করে দলের ঢাকা মহানগর উত্তর। অ্যাপটির লক্ষ্য, নগরবাসীর বিভিন্ন সমস্যা ও সেবা এক প্ল্যাটফর্মে আনা। ওই নেতা জানিয়েছেন, ওই সেবামূলক অ্যাপটি মূলত নামানো হয় দলের উত্তরের আমির সেলিম উদ্দিনের নির্দেশনায়। এর মধ্য দিয়ে নাগরিক সমস্যার অভিযোগ বা রিপোর্ট জমা দেওয়া, স্থানীয় বিভিন্ন সেবা ও তথ্য পাওয়া, ওয়ার্ডভিত্তিক যোগাযোগ ও সমন্বয়, নগর ব্যবস্থাপনা ও জনসেবামূলক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ, জরুরি সহায়তা ও নাগরিক পরামর্শ-সংক্রান্ত সুবিধা দেওয়া হচ্ছে।
জামায়াত নেতারা জানিয়েছেন, ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি সাদিক কায়েমকে দলের প্রার্থী করা হতে পারে। মহানগর দক্ষিণ জামায়াত ও অন্যান্য সহযোগী সংগঠন থেকে তার নাম প্রস্তাব করা হয়। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ছাত্রনেতা ও পরিচিত মুখ হিসেবে সাদিকের বিকল্প কাউকে উপযুক্ত ভাবছেন না তারা। তবে এখনই কৌশলগত কারণে তাকে মাঠে নামাতে চায় না জামায়াত।
কয়েক মাস আগে রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে দক্ষিণ জামায়াতের দায়িত্বশীলদের সম্মেলনে সাদিক কায়েমের নাম মেয়র পদে প্রথম প্রকাশ্যে উচ্চারিত হয়। পরে ছাত্রশিবির জানায়, সংগঠনে থাকাকালীন কারও দলীয় প্রার্থী হওয়ার সুযোগ নেই। তবে শিবির থেকে বিদায় নেওয়ার পর প্রার্থী হতে বাধা নেই। সাদিক কায়েমের বর্তমান ভিপি পদের মেয়াদ শেষ হবে আগামী ১৩ সেপ্টেম্বর।

স্থানীয় সরকার নির্বাচন দ্রুত সময়ের মধ্যে চায় জামায়াতে ইসলামী। সরকার এই নির্বাচন নিয়ে ‘লুকোচুরি’ খেলছে বলেও মনে করছে দলটি। এদিকে প্রার্থী গুছিয়ে এনেছে জাতীয় সংসদের প্রধান বিরোধী দলটি।
জামায়াত জানিয়েছে, নির্বাচনে নারী প্রার্থীদের অংশগ্রহণ থাকবে। তবে ১৩ সিটি করপোরেশনের মধ্যে কোনোটাতেই এখন পর্যন্ত কোনো নারী প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেনি তারা।
দ্রুত স্থানীয় নির্বাচন চায় দল
গত শুক্রবার রাজধানীর মগবাজারে আল ফালাহ মিলনায়তনে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরার বৈঠক হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন জামায়াত আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান। বৈঠক থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন দ্রুত করার দাবি জানিয়েছে জামায়াত।
দলটির নেতারা মনে করেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন সরকার নিজের মর্জিমতো করতে চায়। এ জন্য দলের মজলিসে শুরায় আলোচনা করে সরকারের কাছে দলটি দাবি করেছে, স্থানীয় পর্যায়ের সকল স্তরে দ্রুত নির্বাচন দিতে হবে; সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ পাওয়া সরকার দলীয় নেতাদের অতি দ্রুত অপসারণ করতে হবে।
কেন দ্রুত নির্বাচন চান–জানতে চাইলে দলের কেন্দ্রীয় নেতা সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন চরচাকে বলেন, ‘‘আমরা দ্রুত নির্বাচনের কথা এ জন্য বলেছি যে, স্থানীয় সরকারের সব জায়গায় তো সরকার প্রশাসক বসিয়েছে, দলীয় লোক বসিয়েছে। এবং তাদেরকে দিয়ে নির্বাচন করাবে। এখানে দুটি সমস্যা। একটি হলো অনির্বাচিত লোক, আরেকটি হলো তারা তো নির্বাচনে সরকারের টাকা ব্যবহার করতে পারে।”
সাইফুল আলম খান বলেন, ‘‘এটাই তো স্বাভাবিক যে, নির্বাচনের মাধ্যমেই পৌরসভা, সিটি করপোরেশনে (নির্বাচিত) মেয়র থাকবে। কিন্তু এই যে প্রশাসক বসিয়ে দলীয়করণ, এটাতে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, এটার অবসান হওয়া দরকার।”
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রস্তুতি নিয়ে জানতে চাইলে দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের চরকাকে বলেন, “নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা না হলে আসলে নির্বাচন জমে না। সরকার বলছে, নির্বাচনের সম্ভাব্য সময় হচ্ছে, সেপ্টেম্বর কিংবা অক্টোবর। কবে হবে, এটা বলছে না। একটি লুকোচুরি খেলা মনে হচ্ছে।”
জামায়াত নেতারা জানিয়েছেন, ইতিমধ্যে দেশের ১৩টি সিটি করপোরেশনের মধ্যে দুই-একটা বাদে প্রায় সবগুলোতে মেয়রপ্রার্থী প্রাথমিকভাবে চূড়ান্ত করা হয়েছে। তবে এদের মধ্যে কোনো নারী প্রার্থী নেই।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়ে জানতে চাইলে এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, “আমাদের প্রার্থীদের মাঠপর্যায়ে প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য বলা হয়েছে। প্রার্থী ঠিক করা, ঘোষণা দেওয়ার কাজ চলছে। এ ছাড়া প্রার্থী হিসেবে যাদের নাম ঘোষণা করা হয়েছে, তাদের নার্সিং করা হচ্ছে।”
জামায়াতের নেতারা জানিয়েছেন, স্থানীয় জামায়াত, মহিলা সংগঠন, শ্রমিক সংগঠন, অন্য পেশাজীবী সংগঠন, ওয়ার্ড বা ইউনিয়ন সংগঠন থেকে লিখিত পরামর্শ নেওয়া হয় মেয়রপ্রার্থী নির্ধারণে। তাদের প্রস্তাব কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটির নির্বাহী পরিষদের বৈঠকে উপস্থাপন করা হয়।
দলীয় সূত্র বলছে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে জামায়াতের মেয়রপ্রার্থী করা হচ্ছে দলের মহানগর উত্তর শাখার আমির সেলিম উদ্দিনকে। আর ঢাকা দক্ষিণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি মো. আবু সাদিক (সাদিক কায়েম) প্রার্থী হতে যাচ্ছেন। তবে বিষয়টি এখনো নিশ্চিত করা হয়নি। নির্বাচনে আগমুহূর্তে তাকে প্রার্থী করে মাঠে নামাতে চায় জামায়াত।
দলীয় একাধিক সূত্র জানিয়েছে, প্রাথমিকভাবে চূড়ান্ত হওয়া অন্য প্রার্থীরা হলেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে নগর জামায়াতের সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক কাউন্সিলর মুহাম্মদ শামসুজ্জামান হেলালী, গাজীপুরে তোকাত গাজী উসমান পাশা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক সহকারী অধ্যাপক হাফিজুর রহমান, বরিশালে দলের কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুয়াযযম হোসাইন হেলাল, রংপুরে মহানগর শাখার আমির এ টি এম আজম খান, খুলনায় কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও খুলনা মহানগরীর আমির মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান এবং নারায়ণগঞ্জে মহানগর শাখার আমির মোহাম্মদ আবদুল জব্বার।
রাজশাহী, সিলেট, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা ও নবগঠিত বগুড়া সিটি করপোরেশনের মেয়রপ্রার্থী পদে বেশ কয়েকজন আলোচনায় আছেন। তাদের বিষয়ে আরও পর্যবেক্ষণ করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে মজলিসে শুরার একাধিক সদস্য জানিয়েছেন।
কেন দ্রুত নির্বাচন চান–জানতে চাইলে সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন চরচাকে জানান, স্থানীয় নির্বাচন স্থানীয়ভাবে যার যার এলাকা থেকে সমর্থনের ভিত্তিতেই হবে। তিনি বলেন, “কিছু মেয়রপ্রার্থী তো ঘোষণা হয়ে গেছে। মেয়রপ্রার্থী দুই-একটা বাদ আছে, সেগুলোও হয়ে যাবে।”
গত সংসদ নির্বাচনে জামায়াতের পরাজিত এক প্রার্থী চরচাকে বলেন, “নারায়ণগঞ্জে দলের আমির গিয়ে আব্দুল জব্বারকে প্রার্থী ঘোষণা করেছেন। এ ছাড়া ঢাকা উত্তরে প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে। তবে ঢাকা দক্ষিণে এখনো অফিশিয়াল ঘোষণা দেয়া হয়নি।”
কেমন থাকবে নারীর অংশগ্রহণ
জামায়াত নেতারা বলছেন, স্থানীয় নির্বাচনে মেয়র পদে দলের কোনো নারী প্রার্থী নেই। তবে কাউন্সিলরসহ অন্য পদে নারীদের অংশগ্রহণ থাকবে।
এ বিষয়ে দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, “আমাদের দলের স্থানীয় নির্বাচনে নারী অংশগ্রহণ আগেও ছিল। এবারও উপজেলা পর্যায়ে নারীরা অংশ নেবেন। বিপুলসংখ্যক নারীর আগ্রহ আমরা দেখতে পাচ্ছি।”
এই নেতা বলেন, “স্থানীয় নির্বাচনের জন্য নারীরা কাজ করছে। উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদে (প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য) প্রস্তুতি নিচ্ছে নারীরা।”
নারী প্রার্থী বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে কেন্দ্রীয় নেতা সাইফুল আলম খান মিলন চরচাকে বলেন, “মেয়র পদের নিচের দিকের পদে নারী প্রার্থী দেওয়া হবেই। নারীদের পজিশন সেখানে আছে; সবগুলোতেই দেওয়া হবে।”
কয়েকটি সিটিতে নাম ঘোষণা না হলেও এক ধরনের নিশ্চয়তা দিয়ে সম্ভাব্য প্রার্থীদের কাজ করতে বলেছে জামায়াত। দলের এক নেতা চরচাকে বলেন, “দল যাকে মনোনয়ন দিয়েছে, তার পক্ষে ইতিমধ্যে কাজ শুরু হয়ে গিয়েছে।”
প্রচারে এগিয়ে ঢাকা উত্তর, পিছিয়ে দক্ষিণে
জামায়াত নেতারা জানিয়েছে, যেহেতু ঢাকা উত্তরে ইতিমধ্যে দলের প্রার্থী সেলিম উদ্দিন চূড়ান্ত, সেহেতু তিনি প্রচারে এগিয়ে রয়েছেন। আর দক্ষিণে এখনো কিছু চূড়ান্ত হয়নি, তাই প্রচারও কম।
ঢাকা উত্তর সিটিতে মেয়রপ্রার্থী হিসেবে শুরুতে তিনজন থাকলেও মহানগর উত্তরের আমির সেলিম উদ্দিন প্রচার শুরু করেছেন। ঈদুল আজহায় নগরবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়ে তার নামে সাঁটানো পোস্টারে ছেয়ে আছে উত্তরের অলিগলি। ‘প্রচারণার জন্য’ সেবামূলক অ্যাপ উদ্বোধন করা হয়েছে। তবে এমনটা ঢাকা দক্ষিণের ক্ষেত্রে দেখা যায়নি।
জামায়াত নেতারা বলছেন, ঢাকা উত্তরে দলের প্রভাব রয়েছে বেশি। বিশেষ করে মিরপুর ও উত্তরায় দলীয় অবস্থান ভালো। এমন পরিস্থিতিতে উত্তরে বেশি জোর দেওয়া স্বাভাবিক। এ ছাড়া দক্ষিণে যাকে দলীয় প্রার্থী হিসেবে ভাবা হচ্ছে, তিনি এখনো নির্বাচনী মাঠেই নামেননি। ফলে স্বাভাবিকভাবেই মহানগর দক্ষিণ কিছুটা পিছিয়ে রয়েছে।
জামায়াতের মহানগরের নেতারা বলছেন, উত্তর সিটিতে জামায়াতের জনপ্রিয়তা রয়েছে। এরই ফল হচ্ছে সর্বশেষ সংসদ নির্বাচনে এই এলাকার চারটি আসনে দলটির প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছেন। শরিক দল থেকেও একটি আসনে জয় এসেছে।
উত্তরের এক নেতা জানিয়েছেন, চলতি বছরের মার্চে ‘নাগরিক সেবা অ্যাপ’ চালু করে দলের ঢাকা মহানগর উত্তর। অ্যাপটির লক্ষ্য, নগরবাসীর বিভিন্ন সমস্যা ও সেবা এক প্ল্যাটফর্মে আনা। ওই নেতা জানিয়েছেন, ওই সেবামূলক অ্যাপটি মূলত নামানো হয় দলের উত্তরের আমির সেলিম উদ্দিনের নির্দেশনায়। এর মধ্য দিয়ে নাগরিক সমস্যার অভিযোগ বা রিপোর্ট জমা দেওয়া, স্থানীয় বিভিন্ন সেবা ও তথ্য পাওয়া, ওয়ার্ডভিত্তিক যোগাযোগ ও সমন্বয়, নগর ব্যবস্থাপনা ও জনসেবামূলক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ, জরুরি সহায়তা ও নাগরিক পরামর্শ-সংক্রান্ত সুবিধা দেওয়া হচ্ছে।
জামায়াত নেতারা জানিয়েছেন, ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি সাদিক কায়েমকে দলের প্রার্থী করা হতে পারে। মহানগর দক্ষিণ জামায়াত ও অন্যান্য সহযোগী সংগঠন থেকে তার নাম প্রস্তাব করা হয়। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ছাত্রনেতা ও পরিচিত মুখ হিসেবে সাদিকের বিকল্প কাউকে উপযুক্ত ভাবছেন না তারা। তবে এখনই কৌশলগত কারণে তাকে মাঠে নামাতে চায় না জামায়াত।
কয়েক মাস আগে রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে দক্ষিণ জামায়াতের দায়িত্বশীলদের সম্মেলনে সাদিক কায়েমের নাম মেয়র পদে প্রথম প্রকাশ্যে উচ্চারিত হয়। পরে ছাত্রশিবির জানায়, সংগঠনে থাকাকালীন কারও দলীয় প্রার্থী হওয়ার সুযোগ নেই। তবে শিবির থেকে বিদায় নেওয়ার পর প্রার্থী হতে বাধা নেই। সাদিক কায়েমের বর্তমান ভিপি পদের মেয়াদ শেষ হবে আগামী ১৩ সেপ্টেম্বর।