নিক্কেই এশিয়ার নিবন্ধ
চরচা ডেস্ক

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর মুসলিম প্রধান দেশগুলোতে যে তীব্র আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে, তার ঢেউ লেগেছে বাংলাদেশেও। প্রায় ১৮ কোটি জনসংখ্যার এই দেশে ৯০ শতাংশই মুসলিম। এ কারণে ইরানের সঙ্গে সংহতি জানিয়ে মিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে পাকিস্তান ও ইন্দোনেশিয়াতেও।
তবে ইরানের পাল্টা হামলা মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় দেশগুলোতে ছড়িয়ে পড়ায় এবং জ্বালানি সরবরাহের পথ বিঘ্নিত হওয়ায় বাংলাদেশের ভঙ্গুর অর্থনীতি একটি বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। বিশেষ করে কাতারের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর দেশটি রপ্তানিতে ‘ফোর্স মেজার’ (অনিবার্য পরিস্থিতি) ঘোষণা করেছে এবং সরবরাহ স্থগিত করেছে।
যেহেতু বাংলাদেশ এক-তৃতীয়াংশ গ্যাস আমদানিতে কাতারের ওপর নির্ভরশীল, তাই জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পেট্রোবাংলাকে স্পট মার্কেট থেকে জরুরি ভিত্তিতে দুই ট্যাঙ্কার পরিমাণ গ্যাস সংগ্রহের নির্দেশ দিয়েছে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্য সংকট দীর্ঘায়িত হলে এক কঠিন ভারসাম্য রক্ষার পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হবে বাংলাদেশকে।
তারেক রহমানের সামনে প্রথম বড় পরীক্ষা
ক্ষমতা গ্রহণের মাত্র এক মাস পার করা নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এখন এক বিশাল অগ্নিপরীক্ষার মুখে। গত ১২ ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচনে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ৩০০টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ২০৯টি আসন; অর্থাৎ, প্রায় ৭০ শতাংশ আসন পেয়ে নিরঙ্কুশ জয় লাভ করে।
নির্বাচনটি ছিল ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনার কর্তৃত্ববাদী শাসনের পতনের পরবর্তী এক ঐতিহাসিক পরিবর্তনের অংশ। জেনারেশন জেড (জেন জি) বা তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্বে শুরু হওয়া সেই গণবিক্ষোভে প্রায় ১৪০০ মানুষ প্রাণ হারান এবং হাসিনার ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটে। এরপর নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তী সরকার দেশটিকে নির্বাচনের পথে পরিচালিত করে।
এক নতুন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
দমন-পীড়নের দায়ে শেখ হাসিনার দল আওয়ামী লীগকে নির্বাচনী কার্যক্রম থেকে নিষিদ্ধ করা হয়। ফলে ভোটটি মূলত দুই পক্ষের লড়াইয়ে পরিণত হয়: একদিকে দীর্ঘদিনের প্রভাবশালী দল বিএনপি, অন্যদিকে ছাত্র-নেতৃত্বাধীন ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি’ (এনসিপি) এবং জামায়াতে ইসলামীর জোট। উল্লেখ্য, হাসিনার আমলে জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল করা হয়েছিল।
নির্বাচনে ৫৯% ভোটার উপস্থিতি দেখা গেছে, যা ২০২৪ সালের জানুয়ারির নির্বাচনের (৪২%) তুলনায় অনেক বেশি। জাপানের পর্যবেক্ষক দলের প্রধান এবং সাবেক রাষ্ট্রদূত মাসাতো ওয়াতানাবে নিক্কেই এশিয়াকে বলেন, ভোটকেন্দ্রগুলো বেশ ভিড় ছিল এবং বিএনপি ও জামায়াতের সমর্থকরা একে অপরের ওপর কড়া নজর রেখেছিল, যাতে কোনো জালিয়াতি না হয়। অনেক পর্যবেক্ষকের মতে, এটি একটি প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনের প্রত্যাবর্তনের লক্ষণ।
বংশানুক্রমিক রাজনীতির পুনরাবৃত্তি?
বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ইতিহাস বেশ অমীমাংসিত। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সামরিক শাসনের অবসান ঘটিয়ে ১৯৯১ সালে সংসদীয় গণতন্ত্রে ফেরা হয়। কেন্দ্রে ছিলেন দুই নারী: শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা শেখ হাসিনা এবং জিয়াউর রহমানের স্ত্রী খালেদা জিয়া। ২০০৯ সালে হাসিনা দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসার পর তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করেন, যা দীর্ঘ ১৫ বছর তার ক্ষমতাকে নিষ্কণ্টক করেছিল।

২০২৪-এর বিপ্লবের পর ভোটাররা হাসিনাকে প্রত্যাখ্যান করলেও শেষ পর্যন্ত বিএনপির মতো আরেকটি রাজনৈতিক বংশানুক্রমিক দলকেই বেছে নিয়েছে। সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমান ১৯৮৮ সালে বিএনপিতে যোগ দেন। ২০০৬ সালে বিএনপি ক্ষমতা হারানোর পর তিনি দুর্নীতির অভিযোগে গ্রেপ্তার হন এবং পরে লন্ডনে নির্বাসিত জীবন কাটান। ২০২৪-এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আদালত তার বিরুদ্ধে সকল সাজা বাতিল করলে তিনি ১৭ বছর পর দেশে ফেরেন এবং দলের নেতৃত্ব দেন। বিশ্লেষকদের মতে, মানুষ অভিজ্ঞ বিকল্প হিসেবেই বিএনপিকে পুনরায় বেছে নিয়েছে।
‘জুলাই চার্টার’ ও আগামীর চ্যালেঞ্জ
তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের সামনে এখন সবচেয়ে বড় কাজ হলো ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের তৈরি করা ‘জুলাই চার্টার’ বা সংস্কার রূপরেখা বাস্তবায়ন করা। এই সনদে প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদের সীমা নির্ধারণ এবং একটি উচ্চকক্ষ গঠনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের কথা বলা হয়েছে। নির্বাচনের পাশাপাশি অনুষ্ঠিত এক গণভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনতা এই সংস্কারের পক্ষে মত দিয়েছেন।
তবে এই সংস্কার বাস্তবায়নে সাংবিধানিক জটিলতা দেখা দিচ্ছে। বিশেষ করে প্রস্তাবিত উচ্চকক্ষের সদস্য নির্বাচনের পদ্ধতি নিয়ে বিরোধ তৈরি হয়েছে। জুলাই চার্টারে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে আসন বণ্টনের কথা বলা হলেও বিএনপি চাচ্ছে সংসদীয় আসনের ভিত্তিতে আসন বণ্টন করতে। হিসাব অনুযায়ী, ভোটের অনুপাতে বিএনপি উচ্চকক্ষে ৫০টি আসন পেতে পারে, কিন্তু আসন সংখ্যার ভিত্তিতে তারা ৭০টি আসন পেতে সক্ষম। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদের সময়সীমা তারেক রহমানের দীর্ঘমেয়াদী ক্ষমতার পথে বাধা হতে পারে কি না, সেটিও দেখার বিষয়।
আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ
আরেকটি অমীমাংসিত প্রশ্ন হলো, আওয়ামী লীগকে আবার রাজনীতিতে ফিরতে দেওয়া হবে কি না। ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশের ৩০% ভোটার আওয়ামী লীগ এবং ৩০% ভোটার বিএনপি সমর্থক। তবে তরুণ প্রজন্ম, যারা হাসিনাকে হটিয়েছে, তারা আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তনের তীব্র বিরোধী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক লাইলুফার ইয়াসমিনের মতে, আওয়ামী লীগের ফিরে আসা তরুণ প্রজন্মের জন্য বড় মূল্য দেওয়ার মতো হবে এবং তারা এটি যেকোনো মূল্যে প্রতিহত করবে।
শ্রীলঙ্কা এবং নেপালের পর বাংলাদেশেও এই অভ্যুত্থান দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বাংলাদেশ কি শেষ পর্যন্ত তার দুই প্রধান দল ও বংশানুক্রমিক রাজনীতির বোঝা ঝেড়ে ফেলতে পারবে, নাকি পুরনো পথেই হাঁটবে?
ফলাফল যাই হোক, একটি সত্য এখন স্পষ্ট, নির্বাচনের মাধ্যমে পছন্দের ক্ষমতা শেষ পর্যন্ত জনগণের হাতে ফিরে এসেছে। তবে পুরনো রাজনীতি আর কতদিন টিকবে-সেটা সময়ই বলে দেবে।
(লেখাটি নিক্কেই এশিয়ার একটি নিবন্ধ থেকে নেওয়া। লিখেছেন তরু তাকাহাশি।)

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর মুসলিম প্রধান দেশগুলোতে যে তীব্র আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে, তার ঢেউ লেগেছে বাংলাদেশেও। প্রায় ১৮ কোটি জনসংখ্যার এই দেশে ৯০ শতাংশই মুসলিম। এ কারণে ইরানের সঙ্গে সংহতি জানিয়ে মিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে পাকিস্তান ও ইন্দোনেশিয়াতেও।
তবে ইরানের পাল্টা হামলা মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় দেশগুলোতে ছড়িয়ে পড়ায় এবং জ্বালানি সরবরাহের পথ বিঘ্নিত হওয়ায় বাংলাদেশের ভঙ্গুর অর্থনীতি একটি বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। বিশেষ করে কাতারের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর দেশটি রপ্তানিতে ‘ফোর্স মেজার’ (অনিবার্য পরিস্থিতি) ঘোষণা করেছে এবং সরবরাহ স্থগিত করেছে।
যেহেতু বাংলাদেশ এক-তৃতীয়াংশ গ্যাস আমদানিতে কাতারের ওপর নির্ভরশীল, তাই জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পেট্রোবাংলাকে স্পট মার্কেট থেকে জরুরি ভিত্তিতে দুই ট্যাঙ্কার পরিমাণ গ্যাস সংগ্রহের নির্দেশ দিয়েছে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্য সংকট দীর্ঘায়িত হলে এক কঠিন ভারসাম্য রক্ষার পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হবে বাংলাদেশকে।
তারেক রহমানের সামনে প্রথম বড় পরীক্ষা
ক্ষমতা গ্রহণের মাত্র এক মাস পার করা নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এখন এক বিশাল অগ্নিপরীক্ষার মুখে। গত ১২ ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচনে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ৩০০টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ২০৯টি আসন; অর্থাৎ, প্রায় ৭০ শতাংশ আসন পেয়ে নিরঙ্কুশ জয় লাভ করে।
নির্বাচনটি ছিল ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনার কর্তৃত্ববাদী শাসনের পতনের পরবর্তী এক ঐতিহাসিক পরিবর্তনের অংশ। জেনারেশন জেড (জেন জি) বা তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্বে শুরু হওয়া সেই গণবিক্ষোভে প্রায় ১৪০০ মানুষ প্রাণ হারান এবং হাসিনার ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটে। এরপর নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তী সরকার দেশটিকে নির্বাচনের পথে পরিচালিত করে।
এক নতুন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
দমন-পীড়নের দায়ে শেখ হাসিনার দল আওয়ামী লীগকে নির্বাচনী কার্যক্রম থেকে নিষিদ্ধ করা হয়। ফলে ভোটটি মূলত দুই পক্ষের লড়াইয়ে পরিণত হয়: একদিকে দীর্ঘদিনের প্রভাবশালী দল বিএনপি, অন্যদিকে ছাত্র-নেতৃত্বাধীন ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি’ (এনসিপি) এবং জামায়াতে ইসলামীর জোট। উল্লেখ্য, হাসিনার আমলে জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল করা হয়েছিল।
নির্বাচনে ৫৯% ভোটার উপস্থিতি দেখা গেছে, যা ২০২৪ সালের জানুয়ারির নির্বাচনের (৪২%) তুলনায় অনেক বেশি। জাপানের পর্যবেক্ষক দলের প্রধান এবং সাবেক রাষ্ট্রদূত মাসাতো ওয়াতানাবে নিক্কেই এশিয়াকে বলেন, ভোটকেন্দ্রগুলো বেশ ভিড় ছিল এবং বিএনপি ও জামায়াতের সমর্থকরা একে অপরের ওপর কড়া নজর রেখেছিল, যাতে কোনো জালিয়াতি না হয়। অনেক পর্যবেক্ষকের মতে, এটি একটি প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনের প্রত্যাবর্তনের লক্ষণ।
বংশানুক্রমিক রাজনীতির পুনরাবৃত্তি?
বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ইতিহাস বেশ অমীমাংসিত। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সামরিক শাসনের অবসান ঘটিয়ে ১৯৯১ সালে সংসদীয় গণতন্ত্রে ফেরা হয়। কেন্দ্রে ছিলেন দুই নারী: শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা শেখ হাসিনা এবং জিয়াউর রহমানের স্ত্রী খালেদা জিয়া। ২০০৯ সালে হাসিনা দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসার পর তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করেন, যা দীর্ঘ ১৫ বছর তার ক্ষমতাকে নিষ্কণ্টক করেছিল।

২০২৪-এর বিপ্লবের পর ভোটাররা হাসিনাকে প্রত্যাখ্যান করলেও শেষ পর্যন্ত বিএনপির মতো আরেকটি রাজনৈতিক বংশানুক্রমিক দলকেই বেছে নিয়েছে। সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমান ১৯৮৮ সালে বিএনপিতে যোগ দেন। ২০০৬ সালে বিএনপি ক্ষমতা হারানোর পর তিনি দুর্নীতির অভিযোগে গ্রেপ্তার হন এবং পরে লন্ডনে নির্বাসিত জীবন কাটান। ২০২৪-এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আদালত তার বিরুদ্ধে সকল সাজা বাতিল করলে তিনি ১৭ বছর পর দেশে ফেরেন এবং দলের নেতৃত্ব দেন। বিশ্লেষকদের মতে, মানুষ অভিজ্ঞ বিকল্প হিসেবেই বিএনপিকে পুনরায় বেছে নিয়েছে।
‘জুলাই চার্টার’ ও আগামীর চ্যালেঞ্জ
তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের সামনে এখন সবচেয়ে বড় কাজ হলো ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের তৈরি করা ‘জুলাই চার্টার’ বা সংস্কার রূপরেখা বাস্তবায়ন করা। এই সনদে প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদের সীমা নির্ধারণ এবং একটি উচ্চকক্ষ গঠনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের কথা বলা হয়েছে। নির্বাচনের পাশাপাশি অনুষ্ঠিত এক গণভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনতা এই সংস্কারের পক্ষে মত দিয়েছেন।
তবে এই সংস্কার বাস্তবায়নে সাংবিধানিক জটিলতা দেখা দিচ্ছে। বিশেষ করে প্রস্তাবিত উচ্চকক্ষের সদস্য নির্বাচনের পদ্ধতি নিয়ে বিরোধ তৈরি হয়েছে। জুলাই চার্টারে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে আসন বণ্টনের কথা বলা হলেও বিএনপি চাচ্ছে সংসদীয় আসনের ভিত্তিতে আসন বণ্টন করতে। হিসাব অনুযায়ী, ভোটের অনুপাতে বিএনপি উচ্চকক্ষে ৫০টি আসন পেতে পারে, কিন্তু আসন সংখ্যার ভিত্তিতে তারা ৭০টি আসন পেতে সক্ষম। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদের সময়সীমা তারেক রহমানের দীর্ঘমেয়াদী ক্ষমতার পথে বাধা হতে পারে কি না, সেটিও দেখার বিষয়।
আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ
আরেকটি অমীমাংসিত প্রশ্ন হলো, আওয়ামী লীগকে আবার রাজনীতিতে ফিরতে দেওয়া হবে কি না। ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশের ৩০% ভোটার আওয়ামী লীগ এবং ৩০% ভোটার বিএনপি সমর্থক। তবে তরুণ প্রজন্ম, যারা হাসিনাকে হটিয়েছে, তারা আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তনের তীব্র বিরোধী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক লাইলুফার ইয়াসমিনের মতে, আওয়ামী লীগের ফিরে আসা তরুণ প্রজন্মের জন্য বড় মূল্য দেওয়ার মতো হবে এবং তারা এটি যেকোনো মূল্যে প্রতিহত করবে।
শ্রীলঙ্কা এবং নেপালের পর বাংলাদেশেও এই অভ্যুত্থান দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বাংলাদেশ কি শেষ পর্যন্ত তার দুই প্রধান দল ও বংশানুক্রমিক রাজনীতির বোঝা ঝেড়ে ফেলতে পারবে, নাকি পুরনো পথেই হাঁটবে?
ফলাফল যাই হোক, একটি সত্য এখন স্পষ্ট, নির্বাচনের মাধ্যমে পছন্দের ক্ষমতা শেষ পর্যন্ত জনগণের হাতে ফিরে এসেছে। তবে পুরনো রাজনীতি আর কতদিন টিকবে-সেটা সময়ই বলে দেবে।
(লেখাটি নিক্কেই এশিয়ার একটি নিবন্ধ থেকে নেওয়া। লিখেছেন তরু তাকাহাশি।)