আরমান ভূঁইয়া

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে দেশে আবারও ‘টার্গেট কিলিং’-এর আশঙ্কা বাড়ছে। সাম্প্রতিক কয়েকটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড, বিশেষ করে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও জুলাই আন্দোলনের সক্রিয় যোদ্ধা শরিফ ওসমান হাদি হত্যার পর উদ্বেগ বেড়েছে।
নির্বাচনকালীন সহিংসতা, নাশকতা ও টার্গেট কিলিং ঠেকাতে সরকার তরফে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বললেও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের অনেকেই বলছেন, বর্তমান প্রস্তুতি সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য যথেষ্ট নয়।
ওসমান হাদি হত্যার পর সরকার গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের গানম্যান দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। একই সঙ্গে নির্বাচনকালীন সহিংসতা রোধে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও ভোটের প্রার্থীদের আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স পাওয়ার এবং রিটেইনার (গানম্যান) নিয়োগের সুযোগ দিতে নীতিমালা করে সরকার।
নিরাপত্তা ঝুঁকিতে থাকা অর্ধশতাধিক নির্বাচনী প্রার্থী ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে গানম্যান দেওয়া হয়েছে। রাজনৈতিক দলের শীর্ষস্থানীয় নেতা, নির্বাচনপ্রার্থী ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিরাপত্তাও বাড়ানো হয়েছে। সরকারের বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার ঝুঁকি মূল্যায়নের তালিকার ভিত্তিতেই এসব নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
শঙ্কা কেন
২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জুলাই আন্দোলনের যোদ্ধাসহ বিভিন্ন দলের রাজনৈতিক নেতারা নানা ধরনের হুমকির মুখে পড়েন। দেশে আত্মগোপনে থাকা বা বিদেশে অবস্থানরত কয়েকজন ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ আছে, ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগ সভাপতি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার দলের নেতাকর্মীদের উসকানি দিচ্ছিলেন। ওসমান হাদির ক্ষেত্রেও কয়েক মাস ধরে বিদেশি নম্বর থেকে হত্যার হুমকি দেওয়া হচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত গত ১২ ডিসেম্বর তাকে গুলি করা হয়। দেশে ও বিদেশে উন্নত চিকিৎসা দেওয়া হলেও তাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।

অন্যদিকে এ বছরের শুরুতেই ঢাকাসহ দেশের তিনটি জেলায় বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের তিন নেতাকে পরিকল্পিতভাবে গুলি করে হত্যা করেছে দুর্বত্তরা। যদিও এসব ঘটনায় নির্বাচন-সংক্রান্ত কোনো বিষয় নেই বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। পুলিশ বলছে, রাজনৈতিক বিরোধ, চাঁদাবাজি এবং স্থানীয় দ্বন্দ্বের কারণে এসব হত্যাকাণ্ড হয়েছে।
শঙ্কার কথা তুলে ধরে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, “বছরের শুরুতেই ঢাকাসহ তিন জেলায় বিএনপির তিনজন নেতা পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়ার ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এসব হত্যাকাণ্ডের সবকটিই নির্বাচনকেন্দ্রিক না হলেও হাদি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে নির্বাচনের যোগসূত্র থাকার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে কোনো ঘটনা না বুঝে সেটিকে রাজনৈতিক সহিংসতা বা নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্র হিসেবে চিহ্নিত করা বিপজ্জনক। আগে এসব হত্যাকাণ্ডের প্রকৃতি, প্যাটার্ন ও সম্ভাব্য যোগসূত্র গভীরভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন।”
গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনায় কারা পেলেন গানম্যান
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, যাদের গানম্যান দেওয়া হয়েছে, বা যাদের নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে, তাদের মধ্যে রয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন, দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সমন্বয়ক হাসনাত আবদুল্লাহ, উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সমন্বয়ক সারজিস আলম, মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, সাবেক সিনিয়র যুগ্ম সদস্যসচিব তাসনিম জারা, গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান। এ ছাড়া জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান, মেহেরপুরের বিএনপি নেতা মাসুদ অরুণ, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) প্রধান আন্দালিব রহমান পার্থ, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি, ডেমরা-যাত্রাবাড়ী থেকে বিএনপির প্রার্থী তানভির আহমেদ রবিন, পাবনা-৩ আসনে বিএনপির প্রার্থী জাফির তুহিন, জাতীয় পার্টির (জেপি) চেয়ারম্যান ও সাবেক মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, এলডিপি সভাপতি অলি আহমদ, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সিনিয়র নায়েবে আমির সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীম, খাগড়াছড়ি বিএনপির সভাপতি আব্দুল ওয়াদুদ ভূঁইয়া ও ইসলামী আন্দোলনের মহাসচিব ইউনুস আহম্মেদ শেখসহ আরও অনেকে রয়েছেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০টি আসনে প্রায় আড়াই হাজার প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। সূত্র জানায়, সিংহভাগ প্রার্থীই নিরাপত্তার জন্য গানম্যান চেয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছেন। সংশ্লিষ্টরা বলছে, সবাইকে গানম্যান দেওয়া সম্ভব নয়। ফলে সার্বিক নিরাপত্তা বিবেচনা করে কয়েকজনকে গানম্যান দেওয়া হয়েছে এবং প্রতিটি সংসদীয় আসনে প্রার্থীদের জন্য বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।

পুলিশ কী বলছে
পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজি) বাহারুল আলম চরচাকে বলেন, “যারা বেশি নিরাপত্তা ঝুঁকিতে রয়েছেন, তাদের একজন করে অস্ত্রধারী রক্ষী দেওয়া হয়েছে। যাদের ঝুঁকি তুলনামূলক কম, তাদের চলাফেরা ও যোগাযোগ-সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পুলিশের পক্ষ থেকে সারা দেশে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে এবং গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে অগ্রাধিকার অনুযায়ী নিরাপত্তা ছক প্রণয়ন করা হয়েছে।”
পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) খন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, “সাম্প্রতিক সহিংস ঘটনাগুলোকে সরাসরি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ঘটছে–এভাবে দেখার সুযোগ নেই। অনেক সময় ব্যক্তিগত শত্রুতা বা অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব থেকেও হত্যাকাণ্ড ঘটে। পরিস্থিতি এখনো এমন নয় যে, এতে নির্বাচন প্রক্রিয়া ব্যাহত হবে। ঝুঁকির গুরুত্ব অনুযায়ী নিরাপত্তা দেওয়া হচ্ছে এবং স্পেশাল ব্রাঞ্চ ইতোমধ্যে ১৭ জন প্রার্থীকে গানম্যান দিয়েছে। তবে সবার ঝুঁকি একরকম নয়। তাই সবাইকে আলাদা নিরাপত্তা দেওয়া সম্ভব নয়।”
যা বলছেন গানম্যান পাওয়া ব্যক্তিরা
যারা নিরাপত্তার জন্য গানম্যান পেয়েছেন তাদের মধ্যে বিজেপিপ্রধান আন্দালিব রহমান পার্থ চরচাকে বলেন, “টার্গেট কিলিং নিয়ে কতটা নিরাপত্তা ঝুঁকি রয়েছে, সেটা নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা ভালো বলতে পারবেন। আমি প্রয়োজন বোধ করেছি, তাই নিরাপত্তার জন্য গানম্যান নিয়েছি।”
ঢাকা-৮ আসনে এনসিপির প্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, “দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এখনো অস্ত্রবাজি, পেশী শক্তি ও টাকার প্রভাব বিদ্যমান থাকায় টার্গেট কিলিংয়ের আশঙ্কা থেকেই যায়।”
এনসিপির এই নেতা বলেন, “যখন কোনো পক্ষ গণতান্ত্রিকভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে ব্যর্থ হয়, তখনই তারা ভীতি সৃষ্টির জন্য টার্গেট কিলিংয়ের পথ বেছে নেয়। বিশেষ করে যাদের জনগণের মধ্যে জনপ্রিয়তা নেই, তারা চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস ও দখলদারিত্বের মাধ্যমে আধিপত্য কায়েম করে। এই আধিপত্যকে কেউ চ্যালেঞ্জ করলে বা বিদেশি ও অভ্যন্তরীণ শক্তির স্বার্থের বিরুদ্ধে দাঁড়ালে তাকে টার্গেট কিলিংয়ের শিকার হতে হয়।”
গানম্যান প্রসঙ্গে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, “গানম্যান দিয়ে প্রকৃত নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। নিরাপত্তা আসে জনগণের মধ্যে থাকার মাধ্যমে। অস্ত্রধারী নিরাপত্তা থাকা সত্ত্বেও অনেকেই হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন।”
তার মতে, কোনো অস্ত্র বা গানম্যান নয়, বরং জনগণের শক্তি ও আল্লাহর ইচ্ছাই মানুষের প্রকৃত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে।
যা বলছেন বিশ্লেষকরা
পুলিশের সাবেক মহপিরিদর্শক (আইজিপি) নূরুল হুদা চরচাকে বলেন, “টার্গেট কিলিংয়ের আশঙ্কা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো আরও সক্রিয় হলে এবং আগাম তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হলে এসব ঘটনা কমানো সম্ভব।”
তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মতো বড় ঘটনার পর কোনো দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থা রাতারাতি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে পারে না। পুরো চিত্র বিবেচনায় নিয়ে বাস্তবসম্মত প্রত্যাশা রাখতে হবে।
নির্বাচন সামনে রেখে গোয়েন্দা তৎপরতা, নজরদারি ও প্রতিরোধমূলক উদ্যোগ আরও জোরদারের ওপর তিনি গুরুত্ব দেন।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) ড. নাঈম আশফাক চৌধুরী বলেন, “অন্তত তিন মাস আগে থেকেই সম্ভাব্য টার্গেট কিলিং ও নাশকতার আশঙ্কার কথা বলা হচ্ছিল। হাদির হত্যাকাণ্ড প্রমাণ করে, পর্যাপ্ত সতর্কতা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।”
নাঈম আশফাক বলেন, “সব হত্যাকাণ্ড নির্বাচনকেন্দ্রিক না হলেও (এতে) নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চাওয়া গোষ্ঠীর ভূমিকা থাকতে পারে। শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর নির্ভর করলে চলবে না। জুলাই বিপ্লবের পর পুলিশ অনেকটা ঘুরে দাঁড়ালেও এখনো পুরোপুরি সক্ষম হয়নি। তাই বহুমুখী উদ্যোগ, সমন্বিত হুমকি মূল্যায়ন এবং রাজনৈতিক দল, সামাজিক ও ধর্মীয় নেতাদের সম্পৃক্ত করা জরুরি।”
বিশেষজ্ঞদের অভিমত, নির্বাচন ঘিরে টার্গেট কিলিংয়ের আশঙ্কা বাস্তব। শুধু নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে নিরাপত্তা দিয়ে নয়; বরং সার্বিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমন্বিত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারলেই এই আতঙ্ক কাটানো সম্ভব হবে। অন্যথায় নির্বাচন যত এগিয়ে আসবে, ঝুঁকিও তত বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, “নির্বাচন ঘিরে যে টার্গেট কিলিংয়ের যে ঘটনাগুলো লক্ষ্য করছি সেটা শঙ্কা তৈরি করছে। যাদের নিরাপত্তা ঝুঁকি আছে, সরকারের পক্ষ থেকে গানম্যান দেওয়া হয়েছে। এটা একদিক থেকে স্বস্তি বা সতর্কতা তৈরি করবে। বাংলাদেশে আমরা সবার প্রতি গণতান্ত্রিক বিশ্বাস রাখতে চাই। কিন্তু অতীতে কিছু কিছু ঘটনায় যে দিকটিতে অধিক জোর দেওয়া প্রয়োজন। সেটা হচ্ছে, এমন একটি পরিবেশ নিশ্চিত করা দরকার, যেখানে কর্মী, প্রার্থী, ভোটার তথা জনগণ সবাই নিরাপদ থাকবে। সবাই তার মতামত চর্চা করবে। যেটা করতে গিয়ে কেউ আক্রান্ত হবেন না।”
গানম্যান দেওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “নির্বাচনে যে তিন স্তরের স্টেকহোল্ডার, অর্থাৎ-কর্মী, ভোটার ও প্রার্থী, তাদের প্রত্যেকের নিরাপত্তা বিবেচনা করে গানম্যান দেওয়া সম্ভব নয়। মনে রাখতে হবে, এই সময়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগ নিয়ে ভোটার অসংখ্যবার ভাববে। জীবনের চেয়ে ভোটাধিকারের মায়া বেশি নয়। গানম্যান সাময়িক তৃপ্তি সৃষ্টি করবে। তবে সকলের জন্য নিরাপদ নির্বাচনী পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।”

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে দেশে আবারও ‘টার্গেট কিলিং’-এর আশঙ্কা বাড়ছে। সাম্প্রতিক কয়েকটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড, বিশেষ করে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও জুলাই আন্দোলনের সক্রিয় যোদ্ধা শরিফ ওসমান হাদি হত্যার পর উদ্বেগ বেড়েছে।
নির্বাচনকালীন সহিংসতা, নাশকতা ও টার্গেট কিলিং ঠেকাতে সরকার তরফে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বললেও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের অনেকেই বলছেন, বর্তমান প্রস্তুতি সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য যথেষ্ট নয়।
ওসমান হাদি হত্যার পর সরকার গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের গানম্যান দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। একই সঙ্গে নির্বাচনকালীন সহিংসতা রোধে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও ভোটের প্রার্থীদের আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স পাওয়ার এবং রিটেইনার (গানম্যান) নিয়োগের সুযোগ দিতে নীতিমালা করে সরকার।
নিরাপত্তা ঝুঁকিতে থাকা অর্ধশতাধিক নির্বাচনী প্রার্থী ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে গানম্যান দেওয়া হয়েছে। রাজনৈতিক দলের শীর্ষস্থানীয় নেতা, নির্বাচনপ্রার্থী ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিরাপত্তাও বাড়ানো হয়েছে। সরকারের বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার ঝুঁকি মূল্যায়নের তালিকার ভিত্তিতেই এসব নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
শঙ্কা কেন
২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জুলাই আন্দোলনের যোদ্ধাসহ বিভিন্ন দলের রাজনৈতিক নেতারা নানা ধরনের হুমকির মুখে পড়েন। দেশে আত্মগোপনে থাকা বা বিদেশে অবস্থানরত কয়েকজন ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ আছে, ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগ সভাপতি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার দলের নেতাকর্মীদের উসকানি দিচ্ছিলেন। ওসমান হাদির ক্ষেত্রেও কয়েক মাস ধরে বিদেশি নম্বর থেকে হত্যার হুমকি দেওয়া হচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত গত ১২ ডিসেম্বর তাকে গুলি করা হয়। দেশে ও বিদেশে উন্নত চিকিৎসা দেওয়া হলেও তাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।

অন্যদিকে এ বছরের শুরুতেই ঢাকাসহ দেশের তিনটি জেলায় বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের তিন নেতাকে পরিকল্পিতভাবে গুলি করে হত্যা করেছে দুর্বত্তরা। যদিও এসব ঘটনায় নির্বাচন-সংক্রান্ত কোনো বিষয় নেই বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। পুলিশ বলছে, রাজনৈতিক বিরোধ, চাঁদাবাজি এবং স্থানীয় দ্বন্দ্বের কারণে এসব হত্যাকাণ্ড হয়েছে।
শঙ্কার কথা তুলে ধরে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, “বছরের শুরুতেই ঢাকাসহ তিন জেলায় বিএনপির তিনজন নেতা পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়ার ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এসব হত্যাকাণ্ডের সবকটিই নির্বাচনকেন্দ্রিক না হলেও হাদি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে নির্বাচনের যোগসূত্র থাকার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে কোনো ঘটনা না বুঝে সেটিকে রাজনৈতিক সহিংসতা বা নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্র হিসেবে চিহ্নিত করা বিপজ্জনক। আগে এসব হত্যাকাণ্ডের প্রকৃতি, প্যাটার্ন ও সম্ভাব্য যোগসূত্র গভীরভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন।”
গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনায় কারা পেলেন গানম্যান
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, যাদের গানম্যান দেওয়া হয়েছে, বা যাদের নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে, তাদের মধ্যে রয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন, দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সমন্বয়ক হাসনাত আবদুল্লাহ, উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সমন্বয়ক সারজিস আলম, মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, সাবেক সিনিয়র যুগ্ম সদস্যসচিব তাসনিম জারা, গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান। এ ছাড়া জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান, মেহেরপুরের বিএনপি নেতা মাসুদ অরুণ, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) প্রধান আন্দালিব রহমান পার্থ, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি, ডেমরা-যাত্রাবাড়ী থেকে বিএনপির প্রার্থী তানভির আহমেদ রবিন, পাবনা-৩ আসনে বিএনপির প্রার্থী জাফির তুহিন, জাতীয় পার্টির (জেপি) চেয়ারম্যান ও সাবেক মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, এলডিপি সভাপতি অলি আহমদ, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সিনিয়র নায়েবে আমির সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীম, খাগড়াছড়ি বিএনপির সভাপতি আব্দুল ওয়াদুদ ভূঁইয়া ও ইসলামী আন্দোলনের মহাসচিব ইউনুস আহম্মেদ শেখসহ আরও অনেকে রয়েছেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০টি আসনে প্রায় আড়াই হাজার প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। সূত্র জানায়, সিংহভাগ প্রার্থীই নিরাপত্তার জন্য গানম্যান চেয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছেন। সংশ্লিষ্টরা বলছে, সবাইকে গানম্যান দেওয়া সম্ভব নয়। ফলে সার্বিক নিরাপত্তা বিবেচনা করে কয়েকজনকে গানম্যান দেওয়া হয়েছে এবং প্রতিটি সংসদীয় আসনে প্রার্থীদের জন্য বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।

পুলিশ কী বলছে
পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজি) বাহারুল আলম চরচাকে বলেন, “যারা বেশি নিরাপত্তা ঝুঁকিতে রয়েছেন, তাদের একজন করে অস্ত্রধারী রক্ষী দেওয়া হয়েছে। যাদের ঝুঁকি তুলনামূলক কম, তাদের চলাফেরা ও যোগাযোগ-সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পুলিশের পক্ষ থেকে সারা দেশে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে এবং গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে অগ্রাধিকার অনুযায়ী নিরাপত্তা ছক প্রণয়ন করা হয়েছে।”
পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) খন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, “সাম্প্রতিক সহিংস ঘটনাগুলোকে সরাসরি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ঘটছে–এভাবে দেখার সুযোগ নেই। অনেক সময় ব্যক্তিগত শত্রুতা বা অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব থেকেও হত্যাকাণ্ড ঘটে। পরিস্থিতি এখনো এমন নয় যে, এতে নির্বাচন প্রক্রিয়া ব্যাহত হবে। ঝুঁকির গুরুত্ব অনুযায়ী নিরাপত্তা দেওয়া হচ্ছে এবং স্পেশাল ব্রাঞ্চ ইতোমধ্যে ১৭ জন প্রার্থীকে গানম্যান দিয়েছে। তবে সবার ঝুঁকি একরকম নয়। তাই সবাইকে আলাদা নিরাপত্তা দেওয়া সম্ভব নয়।”
যা বলছেন গানম্যান পাওয়া ব্যক্তিরা
যারা নিরাপত্তার জন্য গানম্যান পেয়েছেন তাদের মধ্যে বিজেপিপ্রধান আন্দালিব রহমান পার্থ চরচাকে বলেন, “টার্গেট কিলিং নিয়ে কতটা নিরাপত্তা ঝুঁকি রয়েছে, সেটা নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা ভালো বলতে পারবেন। আমি প্রয়োজন বোধ করেছি, তাই নিরাপত্তার জন্য গানম্যান নিয়েছি।”
ঢাকা-৮ আসনে এনসিপির প্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, “দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এখনো অস্ত্রবাজি, পেশী শক্তি ও টাকার প্রভাব বিদ্যমান থাকায় টার্গেট কিলিংয়ের আশঙ্কা থেকেই যায়।”
এনসিপির এই নেতা বলেন, “যখন কোনো পক্ষ গণতান্ত্রিকভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে ব্যর্থ হয়, তখনই তারা ভীতি সৃষ্টির জন্য টার্গেট কিলিংয়ের পথ বেছে নেয়। বিশেষ করে যাদের জনগণের মধ্যে জনপ্রিয়তা নেই, তারা চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস ও দখলদারিত্বের মাধ্যমে আধিপত্য কায়েম করে। এই আধিপত্যকে কেউ চ্যালেঞ্জ করলে বা বিদেশি ও অভ্যন্তরীণ শক্তির স্বার্থের বিরুদ্ধে দাঁড়ালে তাকে টার্গেট কিলিংয়ের শিকার হতে হয়।”
গানম্যান প্রসঙ্গে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, “গানম্যান দিয়ে প্রকৃত নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। নিরাপত্তা আসে জনগণের মধ্যে থাকার মাধ্যমে। অস্ত্রধারী নিরাপত্তা থাকা সত্ত্বেও অনেকেই হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন।”
তার মতে, কোনো অস্ত্র বা গানম্যান নয়, বরং জনগণের শক্তি ও আল্লাহর ইচ্ছাই মানুষের প্রকৃত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে।
যা বলছেন বিশ্লেষকরা
পুলিশের সাবেক মহপিরিদর্শক (আইজিপি) নূরুল হুদা চরচাকে বলেন, “টার্গেট কিলিংয়ের আশঙ্কা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো আরও সক্রিয় হলে এবং আগাম তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হলে এসব ঘটনা কমানো সম্ভব।”
তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মতো বড় ঘটনার পর কোনো দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থা রাতারাতি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে পারে না। পুরো চিত্র বিবেচনায় নিয়ে বাস্তবসম্মত প্রত্যাশা রাখতে হবে।
নির্বাচন সামনে রেখে গোয়েন্দা তৎপরতা, নজরদারি ও প্রতিরোধমূলক উদ্যোগ আরও জোরদারের ওপর তিনি গুরুত্ব দেন।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) ড. নাঈম আশফাক চৌধুরী বলেন, “অন্তত তিন মাস আগে থেকেই সম্ভাব্য টার্গেট কিলিং ও নাশকতার আশঙ্কার কথা বলা হচ্ছিল। হাদির হত্যাকাণ্ড প্রমাণ করে, পর্যাপ্ত সতর্কতা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।”
নাঈম আশফাক বলেন, “সব হত্যাকাণ্ড নির্বাচনকেন্দ্রিক না হলেও (এতে) নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চাওয়া গোষ্ঠীর ভূমিকা থাকতে পারে। শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর নির্ভর করলে চলবে না। জুলাই বিপ্লবের পর পুলিশ অনেকটা ঘুরে দাঁড়ালেও এখনো পুরোপুরি সক্ষম হয়নি। তাই বহুমুখী উদ্যোগ, সমন্বিত হুমকি মূল্যায়ন এবং রাজনৈতিক দল, সামাজিক ও ধর্মীয় নেতাদের সম্পৃক্ত করা জরুরি।”
বিশেষজ্ঞদের অভিমত, নির্বাচন ঘিরে টার্গেট কিলিংয়ের আশঙ্কা বাস্তব। শুধু নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে নিরাপত্তা দিয়ে নয়; বরং সার্বিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমন্বিত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারলেই এই আতঙ্ক কাটানো সম্ভব হবে। অন্যথায় নির্বাচন যত এগিয়ে আসবে, ঝুঁকিও তত বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, “নির্বাচন ঘিরে যে টার্গেট কিলিংয়ের যে ঘটনাগুলো লক্ষ্য করছি সেটা শঙ্কা তৈরি করছে। যাদের নিরাপত্তা ঝুঁকি আছে, সরকারের পক্ষ থেকে গানম্যান দেওয়া হয়েছে। এটা একদিক থেকে স্বস্তি বা সতর্কতা তৈরি করবে। বাংলাদেশে আমরা সবার প্রতি গণতান্ত্রিক বিশ্বাস রাখতে চাই। কিন্তু অতীতে কিছু কিছু ঘটনায় যে দিকটিতে অধিক জোর দেওয়া প্রয়োজন। সেটা হচ্ছে, এমন একটি পরিবেশ নিশ্চিত করা দরকার, যেখানে কর্মী, প্রার্থী, ভোটার তথা জনগণ সবাই নিরাপদ থাকবে। সবাই তার মতামত চর্চা করবে। যেটা করতে গিয়ে কেউ আক্রান্ত হবেন না।”
গানম্যান দেওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “নির্বাচনে যে তিন স্তরের স্টেকহোল্ডার, অর্থাৎ-কর্মী, ভোটার ও প্রার্থী, তাদের প্রত্যেকের নিরাপত্তা বিবেচনা করে গানম্যান দেওয়া সম্ভব নয়। মনে রাখতে হবে, এই সময়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগ নিয়ে ভোটার অসংখ্যবার ভাববে। জীবনের চেয়ে ভোটাধিকারের মায়া বেশি নয়। গানম্যান সাময়িক তৃপ্তি সৃষ্টি করবে। তবে সকলের জন্য নিরাপদ নির্বাচনী পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।”