ঈদের ঢাকা মানেই শুধু ফাঁকা রাস্তা আর কানফাটা হর্নের অনুপস্থিতি নয়। এই নীরবতার আড়ালেই বেঁচে থাকে আরেকটা ঢাকা–যেখানে উৎসবের কোনো ছায়া পড়ে না।
ফজলে রাব্বি

কিশোরগঞ্জ থেকে ছেড়ে আসা এগারোসিন্দু এক্সপ্রেস তেজগাঁওয়ের আউটার সিগন্যালে দাঁড়াতেই হুড়মুড় করে নেমে যাচ্ছে অনেকে। এদের মধ্যে মধ্যবয়স্ক জরিনা বেওয়া কারওয়ান বাজারের কাছে নামতে পেরে বেশ খুশি। বছর ৫/৬ আগে ঢাকার তেজতুরি বাজারে বেশ কয়েকটা বাসায় গৃহকর্মীর কাজ করতেন। পরে গ্রামের নানা ঝামেলা সামাল দিতে কিশোরগঞ্জে ফিরে যান। এরপর থেকে প্রতি বছর দুই ঈদের যাকাত আর কোরবানির মাংস সংগ্রহ করতে ঢাকা আসেন। একদিন আগে এসে যেসব বাসায় কাজ করতেন, তাদের জানান দেন যেন কোনোভাবেই মাংস দিতে ভুলে না যান।
জরিনার সাথে কথা বলতেই তিনি বলেন, “আমাগো গ্রামে তো আর ওমন বড়লোকেরা নাই, দুই-একটা কোরবানি হয় সারা গাঁয়ে। তাতে আমাগো কপালে এক টুকরা মাংসও জোটে না। কিন্তু ঢাকায় ঘরে ঘরে বড় বড় গরু জবাই হয়। দুইটা দিন যদি ঢাকার অলিগলিতে মানুষের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরি, আল্লায় দিলে কয়েক কেজি মাংস পামু।”
জরিনারা কিন্তু এই মাংস নিজে খান না। ঈদের দিন বিকেল থেকে শুরু করে পরদিন পর্যন্ত ঢাকার বিভিন্ন মোড়ে বা অস্থায়ী বাজারে কেজি দরে বিক্রি করে দেন। ৩-৪ হাজার নগদ টাকা হাতে নিয়ে ছেলের জন্য নতুন জামা আর বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার জন্য চাল-ডাল কিনে গ্রামে ফেরেন। এটাই জরিনাদের মতো হাজার হাজার মানুষের ঈদ।

এই দুই-তিন দিনের ‘ঢাকার জীবন’ অত্যন্ত কষ্টের। কোনো হোটেল নেই, থাকার জায়গা নেই। রেলওয়ে স্টেশনের শক্ত মেঝেতে, ফুটপাতে কিংবা কোনো মসজিদের বারান্দায় প্লাস্টিকের বস্তা বিছিয়ে রাত কাটে। উৎসবের উদ্বৃত্তটুকুই তাদের কাছে আগামী কয়েক মাসের টিকে থাকার পুঁজি।
জরিনার মতো শত শত মানুষ প্রতি বছর এই একই পথে আসেন। তাদের অনেকে উত্তরবঙ্গ বা চরাঞ্চলের নদীভাঙা পরিবারের। সারা বছর দিনমজুরের কাজ করেন, প্রতিদিনের খাবারের নিশ্চয়তাও থাকে না। কোরবানি ঈদের এই কয়দিন তাদের জন্য এক সুযোগ–শহরের সম্পদের একটুখানি অংশ নিজের জীবনে টেনে আনার।
কোরবানির ঈদের এই বিশেষ সময়ে এরা ঢাকায় আসেন একটাই কাজে–বাড়ি বাড়ি ঘুরে কোরবানির মাংস সংগ্রহ করতে। প্রতি বছর ঈদের এই ২-৩ দিন নিজেদের গ্রাম থেকে ঢাকায় আসেন এবং শহরের অলিগলি চষে বেড়ান মাংসের সন্ধানে।
ঈদের সময় ঢাকা শহর নিজেই ছুটিতে চলে যায়। একটা অদ্ভুত নীরবতা নামে এই মহানগরীর বুকে। এবারও ব্যতিক্রম কিছু হয়নি। ঈদুল আজহার আগে থেকেই রাজধানীর রাজপথ ফাঁকা হতে শুরু করে। কমলাপুর, সদরঘাট, গাবতলী–সব টার্মিনালে একই দৃশ্য। বাড়ি ফেরার মানুষের ঢল। সংবাদমাধ্যম লেখে 'ফাঁকা ঢাকা'। কিন্তু এই ফাঁকা ঢাকার ভেতরেই জন্ম নেয় সম্পূর্ণ ভিন্ন মাত্রার ঈদকেন্দ্রিক জীবনের চিত্র।
যখন লাখো মানুষ নাড়ির টানে ঢাকা ছেড়ে যাচ্ছেন, তখন একটি সম্পূর্ণ বিপরীত স্রোত এই শহরে প্রবেশ করছে। এই মানুষগুলো আসছেন আনন্দ করতে নয়–বেঁচে থাকার লড়াইয়ে। কেউ বস্তা হাতে, কেউ ধারালো চাপাতি কাঁধে, কেউ আবার অসুস্থ সন্তানকে বুকে আঁকড়ে। উৎসবের আবহে যখন দেশের সচ্ছল মানুষেরা আনন্দের শীর্ষে, তখন এই প্রান্তিক মানুষগুলোর জীবনের গল্প অন্যরকম।
তিন দিনের কসাই, বাকি বছরের রিকশাচালক
গাবতলী বাস টার্মিনাল থেকে নামছেন একদল মানুষ–সবার পরনে লুঙ্গি, কাঁধে গামছা, হাতে কাপড়ে শক্ত করে বাঁধা ধারালো ছুরি আর চাপাতি। এরা পেশাদার কসাই নন, এরা সারাদেশ থেকে আসা ‘মৌসুমী কসাই’। সারা বছর তারা রিকশাচালক, খেতমজুর বা চায়ের দোকানদার। কিন্তু ঈদের এই ৩-৪ দিন তারা পরিণত হন শহরের সবচেয়ে চাহিদাসম্পন্ন মানুষে।
গত ঈদের দুদিনে ১২টি গরু কেটেছিলেন রংপুরের রংপুরের পীরগঞ্জ থেকে আসা ৩৫ বছরের মফিজুল ইসলাম। আর টুকটাক মাংস বিক্রি করে ১৫ হাজার টাকা বাড়ি নিয়ে যেতে পেরেছিলেন। তবে কাজটা অনেক পরিশ্রমের বলে জানালেন মফিজুল। তিনি বলেন, “এই তিনদিনেই সারা বছরের দেনা কিছুটা শোধ হয় ভাই। সকালের নাস্তা খাওয়ারও সময় নাই। এক বাসা থেকে আরেক বাসায় ছুটতে ছুটতে দিন শেষ। কিন্তু এই ঈদে যা কামাই হয়, সেটাই মেয়ের স্কুলের বেতন, স্ত্রীর শাড়ি আর বাজারের বাকি শোধের ভরসা।”
মফিজুল আরো বলেন সারা বছর রিকশা-ভ্যান চালিয়ে দিনে তিন-চারশ টাকার বেশি থাকে না। এনজিওর কিস্তি, ছেলের স্কুলের খরচ মেটাতে গিয়ে মাসের শেষে কিছুই থাকে না। কিন্তু কোরবানির এই ৩ দিনে ঢাকায় এসে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা আয় করা সম্ভব।
এই মানুষগুলোর কেউ আসেন নওগাঁ থেকে, কুড়িগ্রাম থেকে, ভোলা থেকে, জামালপুর থেকে। কেউ বাসে, কেউ ট্রাকে, কেউ লঞ্চে করে। ঢাকার বড় ফ্ল্যাট বাড়ির মালিকরা যখন দক্ষ লোকের অভাবে হিমশিম খান, তখন এই মফিজুল-শাহীনদের হাতের দক্ষতাই কোরবানির কাজ দ্রুত সম্পন্ন করে। কিন্তু এই বাড়তি আয়ের পেছনে থাকে যে অসহ্য শারীরিক কষ্ট, তার হিসাব কেউ রাখে না।

ঈদের তিন দিন শেষে যখন ঢাকা আবার স্বাভাবিক হতে শুরু করে, তখন পকেটে স্বস্তির টাকা নিয়ে এরা আবার ফিরে যান নিজের কষ্টের জীবনে–আবার রিকশা, আবার কিস্তি, আবার সেই একটানা লড়াই।
ঈদ উৎসবে নিয়তির নিষ্ঠুরতা
বরিশালের বাকেরগঞ্জ থেকে হালিমা বেগম ঢাকা এসেছেন তার ৮ বছরের ছেলে রায়হানকে নিয়ে। ওর শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। ভোরে অবস্থা খারাপ হওয়ায় বাচ্চাকে নিয়ে ঢাকায় এসেছেন।
হালিমা বেগম যাবেন জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে। বললেন, “ফাঁকা রাস্তায় দ্রুত পৌঁছাইতে পারছি, সেটা ভালো। কিন্তু আত্মীয়স্বজন কেউ ঢাকায় নাই। ওর বাবাও অসুস্থ।”
হালিমা বেগমের চোখে শূন্যতা। এত সব একলা কীভাবে সামলাবেন, তাই যেন তার মূল চিন্তা।
নেত্রকোনার প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে আসা ৬৮ বছরের খলিল মিয়া মহাখালী বাস টার্মিনালের এক কোণে বসে চোখ মুছছেন। তার কোলে মাথা দিয়ে শুয়ে আছে ১০ বছরের নাতি রুমান। রুমানের অ্যাপেন্ডিসাইটিসের তীব্র ব্যথা ওঠে গত রাতে। গ্রামের হাসপাতালে সার্জন নেই, ডাক্তার রেফার করেছেন ঢাকায়।
খলিল মিয়া বলেন, “ভালো ডাক্তাররা ডিউটিতে থাকব কি না, আল্লাহই জানে। পকেটে টাকাও বেশি নাই, গাড়িভাড়াই গ্যাছে গা সব। নিয়তি আমাগো এই সময় এই ফাঁকা শহরে টাইন্যা আনল। আগারগাঁও যামু। সবকিছুর ভাড়া বেশি চাইতাছে। কয় ঈদের বকশিস।”
এই ফাঁকা ঢাকায় চিকিৎসার সংকটটাও নতুন নয়। ঈদের দীর্ঘ ছুটিতে শহরের বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিকের বেশির ভাগ বন্ধ থাকে। সরকারি হাসপাতালে ডিউটি থাকলেও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের অনেকেই ছুটিতে। এই শূন্যতার মাঝেই হাজির হন খলিল-হালিমারা–নিজেদের ঈদ বিসর্জন দিয়ে।
ঈদের ঢাকা মানেই শুধু ফাঁকা রাস্তা আর কানফাটা হর্নের অনুপস্থিতি নয়। এই নীরবতার আড়ালেই বেঁচে থাকে আরেকটা ঢাকা–যেখানে উৎসবের কোনো ছায়া পড়ে না।
জরিনা বেগম এই শহরে আসেন বস্তা কাঁধে, ঘরে ঘরে কড়া নাড়েন মাংসের আশায়–যে মাংস তিনি নিজে খাবেন না, বিক্রি করবেন, সেই টাকায় কিনবেন ছেলের ঈদের জামা। মফিজুল ইসলাম আসেন চাপাতি হাতে, ঘুম-খাওয়া ভুলে তিন দিনে এনজিওর কিস্তি শোধের স্বপ্ন দেখেন। আর খলিল মিয়া আসেন কাঁদতে কাঁদতে–নাতির জীবন বাঁচানোর শেষ চেষ্টায় এই অচেনা শহরে।
এই মানুষগুলো কারও উৎসবের অংশ নন। তারা উৎসবের আড়ালে লুকিয়ে থাকা বাস্তবতা। তাদের গল্প আমাদের প্রতি বছর একটা কঠিন সত্য মনে করিয়ে দেয়–ঈদের আলো সবার ঘরে সমানভাবে পৌঁছায় না। কারো কারো জন্য উৎসব মানেই নতুন করে বেঁচে থাকার এক নির্মম যুদ্ধও!

কিশোরগঞ্জ থেকে ছেড়ে আসা এগারোসিন্দু এক্সপ্রেস তেজগাঁওয়ের আউটার সিগন্যালে দাঁড়াতেই হুড়মুড় করে নেমে যাচ্ছে অনেকে। এদের মধ্যে মধ্যবয়স্ক জরিনা বেওয়া কারওয়ান বাজারের কাছে নামতে পেরে বেশ খুশি। বছর ৫/৬ আগে ঢাকার তেজতুরি বাজারে বেশ কয়েকটা বাসায় গৃহকর্মীর কাজ করতেন। পরে গ্রামের নানা ঝামেলা সামাল দিতে কিশোরগঞ্জে ফিরে যান। এরপর থেকে প্রতি বছর দুই ঈদের যাকাত আর কোরবানির মাংস সংগ্রহ করতে ঢাকা আসেন। একদিন আগে এসে যেসব বাসায় কাজ করতেন, তাদের জানান দেন যেন কোনোভাবেই মাংস দিতে ভুলে না যান।
জরিনার সাথে কথা বলতেই তিনি বলেন, “আমাগো গ্রামে তো আর ওমন বড়লোকেরা নাই, দুই-একটা কোরবানি হয় সারা গাঁয়ে। তাতে আমাগো কপালে এক টুকরা মাংসও জোটে না। কিন্তু ঢাকায় ঘরে ঘরে বড় বড় গরু জবাই হয়। দুইটা দিন যদি ঢাকার অলিগলিতে মানুষের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরি, আল্লায় দিলে কয়েক কেজি মাংস পামু।”
জরিনারা কিন্তু এই মাংস নিজে খান না। ঈদের দিন বিকেল থেকে শুরু করে পরদিন পর্যন্ত ঢাকার বিভিন্ন মোড়ে বা অস্থায়ী বাজারে কেজি দরে বিক্রি করে দেন। ৩-৪ হাজার নগদ টাকা হাতে নিয়ে ছেলের জন্য নতুন জামা আর বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার জন্য চাল-ডাল কিনে গ্রামে ফেরেন। এটাই জরিনাদের মতো হাজার হাজার মানুষের ঈদ।

এই দুই-তিন দিনের ‘ঢাকার জীবন’ অত্যন্ত কষ্টের। কোনো হোটেল নেই, থাকার জায়গা নেই। রেলওয়ে স্টেশনের শক্ত মেঝেতে, ফুটপাতে কিংবা কোনো মসজিদের বারান্দায় প্লাস্টিকের বস্তা বিছিয়ে রাত কাটে। উৎসবের উদ্বৃত্তটুকুই তাদের কাছে আগামী কয়েক মাসের টিকে থাকার পুঁজি।
জরিনার মতো শত শত মানুষ প্রতি বছর এই একই পথে আসেন। তাদের অনেকে উত্তরবঙ্গ বা চরাঞ্চলের নদীভাঙা পরিবারের। সারা বছর দিনমজুরের কাজ করেন, প্রতিদিনের খাবারের নিশ্চয়তাও থাকে না। কোরবানি ঈদের এই কয়দিন তাদের জন্য এক সুযোগ–শহরের সম্পদের একটুখানি অংশ নিজের জীবনে টেনে আনার।
কোরবানির ঈদের এই বিশেষ সময়ে এরা ঢাকায় আসেন একটাই কাজে–বাড়ি বাড়ি ঘুরে কোরবানির মাংস সংগ্রহ করতে। প্রতি বছর ঈদের এই ২-৩ দিন নিজেদের গ্রাম থেকে ঢাকায় আসেন এবং শহরের অলিগলি চষে বেড়ান মাংসের সন্ধানে।
ঈদের সময় ঢাকা শহর নিজেই ছুটিতে চলে যায়। একটা অদ্ভুত নীরবতা নামে এই মহানগরীর বুকে। এবারও ব্যতিক্রম কিছু হয়নি। ঈদুল আজহার আগে থেকেই রাজধানীর রাজপথ ফাঁকা হতে শুরু করে। কমলাপুর, সদরঘাট, গাবতলী–সব টার্মিনালে একই দৃশ্য। বাড়ি ফেরার মানুষের ঢল। সংবাদমাধ্যম লেখে 'ফাঁকা ঢাকা'। কিন্তু এই ফাঁকা ঢাকার ভেতরেই জন্ম নেয় সম্পূর্ণ ভিন্ন মাত্রার ঈদকেন্দ্রিক জীবনের চিত্র।
যখন লাখো মানুষ নাড়ির টানে ঢাকা ছেড়ে যাচ্ছেন, তখন একটি সম্পূর্ণ বিপরীত স্রোত এই শহরে প্রবেশ করছে। এই মানুষগুলো আসছেন আনন্দ করতে নয়–বেঁচে থাকার লড়াইয়ে। কেউ বস্তা হাতে, কেউ ধারালো চাপাতি কাঁধে, কেউ আবার অসুস্থ সন্তানকে বুকে আঁকড়ে। উৎসবের আবহে যখন দেশের সচ্ছল মানুষেরা আনন্দের শীর্ষে, তখন এই প্রান্তিক মানুষগুলোর জীবনের গল্প অন্যরকম।
তিন দিনের কসাই, বাকি বছরের রিকশাচালক
গাবতলী বাস টার্মিনাল থেকে নামছেন একদল মানুষ–সবার পরনে লুঙ্গি, কাঁধে গামছা, হাতে কাপড়ে শক্ত করে বাঁধা ধারালো ছুরি আর চাপাতি। এরা পেশাদার কসাই নন, এরা সারাদেশ থেকে আসা ‘মৌসুমী কসাই’। সারা বছর তারা রিকশাচালক, খেতমজুর বা চায়ের দোকানদার। কিন্তু ঈদের এই ৩-৪ দিন তারা পরিণত হন শহরের সবচেয়ে চাহিদাসম্পন্ন মানুষে।
গত ঈদের দুদিনে ১২টি গরু কেটেছিলেন রংপুরের রংপুরের পীরগঞ্জ থেকে আসা ৩৫ বছরের মফিজুল ইসলাম। আর টুকটাক মাংস বিক্রি করে ১৫ হাজার টাকা বাড়ি নিয়ে যেতে পেরেছিলেন। তবে কাজটা অনেক পরিশ্রমের বলে জানালেন মফিজুল। তিনি বলেন, “এই তিনদিনেই সারা বছরের দেনা কিছুটা শোধ হয় ভাই। সকালের নাস্তা খাওয়ারও সময় নাই। এক বাসা থেকে আরেক বাসায় ছুটতে ছুটতে দিন শেষ। কিন্তু এই ঈদে যা কামাই হয়, সেটাই মেয়ের স্কুলের বেতন, স্ত্রীর শাড়ি আর বাজারের বাকি শোধের ভরসা।”
মফিজুল আরো বলেন সারা বছর রিকশা-ভ্যান চালিয়ে দিনে তিন-চারশ টাকার বেশি থাকে না। এনজিওর কিস্তি, ছেলের স্কুলের খরচ মেটাতে গিয়ে মাসের শেষে কিছুই থাকে না। কিন্তু কোরবানির এই ৩ দিনে ঢাকায় এসে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা আয় করা সম্ভব।
এই মানুষগুলোর কেউ আসেন নওগাঁ থেকে, কুড়িগ্রাম থেকে, ভোলা থেকে, জামালপুর থেকে। কেউ বাসে, কেউ ট্রাকে, কেউ লঞ্চে করে। ঢাকার বড় ফ্ল্যাট বাড়ির মালিকরা যখন দক্ষ লোকের অভাবে হিমশিম খান, তখন এই মফিজুল-শাহীনদের হাতের দক্ষতাই কোরবানির কাজ দ্রুত সম্পন্ন করে। কিন্তু এই বাড়তি আয়ের পেছনে থাকে যে অসহ্য শারীরিক কষ্ট, তার হিসাব কেউ রাখে না।

ঈদের তিন দিন শেষে যখন ঢাকা আবার স্বাভাবিক হতে শুরু করে, তখন পকেটে স্বস্তির টাকা নিয়ে এরা আবার ফিরে যান নিজের কষ্টের জীবনে–আবার রিকশা, আবার কিস্তি, আবার সেই একটানা লড়াই।
ঈদ উৎসবে নিয়তির নিষ্ঠুরতা
বরিশালের বাকেরগঞ্জ থেকে হালিমা বেগম ঢাকা এসেছেন তার ৮ বছরের ছেলে রায়হানকে নিয়ে। ওর শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। ভোরে অবস্থা খারাপ হওয়ায় বাচ্চাকে নিয়ে ঢাকায় এসেছেন।
হালিমা বেগম যাবেন জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে। বললেন, “ফাঁকা রাস্তায় দ্রুত পৌঁছাইতে পারছি, সেটা ভালো। কিন্তু আত্মীয়স্বজন কেউ ঢাকায় নাই। ওর বাবাও অসুস্থ।”
হালিমা বেগমের চোখে শূন্যতা। এত সব একলা কীভাবে সামলাবেন, তাই যেন তার মূল চিন্তা।
নেত্রকোনার প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে আসা ৬৮ বছরের খলিল মিয়া মহাখালী বাস টার্মিনালের এক কোণে বসে চোখ মুছছেন। তার কোলে মাথা দিয়ে শুয়ে আছে ১০ বছরের নাতি রুমান। রুমানের অ্যাপেন্ডিসাইটিসের তীব্র ব্যথা ওঠে গত রাতে। গ্রামের হাসপাতালে সার্জন নেই, ডাক্তার রেফার করেছেন ঢাকায়।
খলিল মিয়া বলেন, “ভালো ডাক্তাররা ডিউটিতে থাকব কি না, আল্লাহই জানে। পকেটে টাকাও বেশি নাই, গাড়িভাড়াই গ্যাছে গা সব। নিয়তি আমাগো এই সময় এই ফাঁকা শহরে টাইন্যা আনল। আগারগাঁও যামু। সবকিছুর ভাড়া বেশি চাইতাছে। কয় ঈদের বকশিস।”
এই ফাঁকা ঢাকায় চিকিৎসার সংকটটাও নতুন নয়। ঈদের দীর্ঘ ছুটিতে শহরের বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিকের বেশির ভাগ বন্ধ থাকে। সরকারি হাসপাতালে ডিউটি থাকলেও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের অনেকেই ছুটিতে। এই শূন্যতার মাঝেই হাজির হন খলিল-হালিমারা–নিজেদের ঈদ বিসর্জন দিয়ে।
ঈদের ঢাকা মানেই শুধু ফাঁকা রাস্তা আর কানফাটা হর্নের অনুপস্থিতি নয়। এই নীরবতার আড়ালেই বেঁচে থাকে আরেকটা ঢাকা–যেখানে উৎসবের কোনো ছায়া পড়ে না।
জরিনা বেগম এই শহরে আসেন বস্তা কাঁধে, ঘরে ঘরে কড়া নাড়েন মাংসের আশায়–যে মাংস তিনি নিজে খাবেন না, বিক্রি করবেন, সেই টাকায় কিনবেন ছেলের ঈদের জামা। মফিজুল ইসলাম আসেন চাপাতি হাতে, ঘুম-খাওয়া ভুলে তিন দিনে এনজিওর কিস্তি শোধের স্বপ্ন দেখেন। আর খলিল মিয়া আসেন কাঁদতে কাঁদতে–নাতির জীবন বাঁচানোর শেষ চেষ্টায় এই অচেনা শহরে।
এই মানুষগুলো কারও উৎসবের অংশ নন। তারা উৎসবের আড়ালে লুকিয়ে থাকা বাস্তবতা। তাদের গল্প আমাদের প্রতি বছর একটা কঠিন সত্য মনে করিয়ে দেয়–ঈদের আলো সবার ঘরে সমানভাবে পৌঁছায় না। কারো কারো জন্য উৎসব মানেই নতুন করে বেঁচে থাকার এক নির্মম যুদ্ধও!