নাইর ইকবাল

আর একটু!
আর একটু হলেই খুব সম্ভবত বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা গোলটি পেয়ে যেতেন ঋতুপর্না চাকমা। এশিয়ান কাপ ফুটবলে নিজেদের অভিষেকে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন চীনের বিপক্ষে মাত্র ১৩ মিনিটের মাথায় যে এমন একটা মুহূর্ত এসে পড়বে, সেটা আর কে ভেবেছিলেন! চীনের গোলকিপারও ভাবেননি হয়তো বাংলাদেশের বিপক্ষে এত শিগগিরই তাঁকে এত কঠিন পরীক্ষা দিতে হবে। নিজের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা দিয়েই তিনি রুখেছেন বাংলাদেশের সম্ভাবনা। চীনের মতো দলের বিপক্ষে এগিয়ে যেতে না পারার আক্ষেপটা বড় তীব্র হলেও মঙ্গলবার ঋতুপর্নার ওই শটটিই ছিল চীনের বিপক্ষে ম্যাচে বাংলাদেশের সেরা মুহূর্ত। র্যাঙ্কিংয়ে ৯৫ ধাপ এগিয়ে থাকা দলটির বিপক্ষে ২-০ গোলে হেরেও এশিয়ান কাপে অভিষেকের লগ্নটি দারুণভাবেই স্মরণীয় করে রেখেছেন বাংলাদেশের চির সাহসিকা নারী ফুটবলাররা।
দক্ষিণ এশীয় পর্যায়ে টানা দুইবার শ্রেষ্ঠত্ব নিজেদের করে নেওয়ার পর সুযোগ তৈরি করেই এশিয়ান কাপে জায়গা করে নিয়েছে বাংলাদেশ। গত জুলাইয়ে মিয়ানমারকে ২-১ গোলে হারিয়ে এশিয়ার শীর্ষ আসরে জায়গা পাকাপাকি করার পর থেকেই কথাটা উচ্চারিত হচ্ছে—মেয়েদের হাত ধরেই কী, এদেশের ফুটবলের সবচেয়ে গৌরবের উপলক্ষটি এল! যাঁরা ফুটবলের বিন্দু বিসর্গ খবর রাখেন, তাঁরা একবাক্যেই স্বীকার করবেন গত ৪৬ বছরে দেশের ফুটবলের সেরা অর্জনই হচ্ছে মেয়েদের এশিয়ান কাপের চূড়ান্ত পর্বে খেলা। ১৯৮০ সালে কুয়েতে ছেলেদের জাতীয় দল (তখন মেয়েদের ফুটবলে নাম লেখানো হয়নি বাংলাদেশের) এশিয়ান কাপের চূড়ান্ত পর্বে খেলেছিল। সে-ই শেষ! এরপর আর কখনোই এশীয় ফুটবলের শীর্ষ পর্যায়ে নাম লেখানো হয়নি বাংলাদেশের। তাই গত জুলাইতে মিয়ানমারকে হারিয়ে এশিয়ার শীর্ষ ১২ দলের একটি হয়ে ওঠার পর থেকেই গত মঙ্গলবারের ওই মুহূর্তটিরই অপেক্ষায় ছিলেন সবাই। শঙ্কা ছিল অনেক!
এশিয়ান কাপের মতো আসরে খেলতে যাওয়ার আগে প্রস্তুতিটা একেবারেই আশানুরূপ হয়নি। প্রস্তুতি বলতে শুধু ঘরোয়া লিগ আর চট্টগ্রাম থেকে একটু দূরে কিছু দিনের প্রস্তুতি ক্যাম্প! অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার আগে বাফুফে ভবনে সংবাদ সম্মেলনেও পদে পদে হতাশার ব্যাপারটি সামনে চলে আসছিল। কোচ পিটার বাটলারও সাবধান করছিলেন সবাইকে অতি আশাবাদী হয়ে হতাশ হওয়ার চেয়ে প্রত্যাশাটা বাস্তবতার স্তরে রাখতে।

এশিয়ার সেরা দলগুলোর সঙ্গে খেলা যে সাফ অঞ্চলে ছরি ঘোরানোর মতো সহজ নয়, সেটি বারবারই মনে করিয়ে দিয়েছেন তিনি। এশিয়ান কাপের আগে থাইল্যান্ডের আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচ, আজারবাইজান ও মালয়েশিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে বোঝা গিয়েছিল সাফ অঞ্চলের বাইরের দলগুলোর সঙ্গে পার্থক্যটা। তবে বাটলার সন্তোর্পণে কিছু আশার কথাও শুনিয়েছিলেন। বলেছিলেন ভরসা রাখতে! তবে তাৎক্ষণিক ফল প্রত্যাশিরা যেন কিছুটা অধৈর্যই হয়ে পড়ছিলেন। বাটলারের কিছু কৌশল নিয়েও প্রশ্ন উঠছিল, প্রশ্ন উঠছিল এশিয়ান কাপের মতো আসরে দলে অভিজ্ঞ সাবিনা খাতুন, কৃষ্ণা রানি সরকার, সানজিদা আক্তার, মাসুরা পারভীনদের না থাকা নিয়েও। বাটলার বরাবরই বলে এসেছেন, শৃঙ্খলা তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় বিষয়! ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে বাটলারের বিরুদ্ধে জাতীয় ফুটবল দলের যে ১৮ নারী ফুটবলার বিদ্রোহ করেছিলেন, সেটির নেপথ্যের কারিগর হিসেবেই সাবিনা, সানজিদা, কৃষ্ণা, মাসুরাদের বাদ পড়া। ‘অভিজ্ঞ’দের বিরুদ্ধে বাটলারের দৃঢ় মনোভাবও কিছু মহলে সমালোচিত ছিল। কিন্তু বাটলারের ‘জেদ’ এক্ষেত্রে সব সমালোচনাকে উপেক্ষা করেই এগিয়ে গেছে সামনের দিকে। মঙ্গলবারের পর বাটলারের সেই জেদই যেন বিজয়ীর বেশে! যে চীনের বিপক্ষে পার্থক্য বিচারে রীতিমতো উড়ে যাওয়ার কথা, সেই প্রতিপক্ষের বিপক্ষেই লড়াকু ফুটবল খেলে বাংলাদেশ এখন প্রশংসায় ভাসছে। এশিয়ান কাপে চীনের বিপক্ষে ম্যাচটি যেন বাংলাদেশের নারী ফুটবলে বড় এক লাইট হাউজ হয়ে থাকল। যে ম্যাচটি অনাগত সময়ে ঋতুপর্না চাকমা, মনিকা চাকমা, মারিয়া মান্দা, আফঈদা খন্দকার, শিউলি আজিম, মিলি আক্তার, তহুরা খাতুন, নবীরন, মুনকিদের দেবে উত্তুঙ্গ আত্মবিশ্বাস।
এশিয়ান কাপ শুরুর আগে যেখানে হারগুলো কত ‘সম্মানজনক’ হবে, সেই ভাবনাই পেয়ে বসেছিল ফুটবলপ্রেমীদের, সেখানে মঙ্গলবারের পর থেকে তারা অনেক বেশি ভরসা রাখছেন দলের ওপর। মনে হচ্ছে ঋতু,মনিকা, মারিয়া, আফঈদারা আর যাই হোক, পরের ম্যাচগুলোতে হতাশ করবেন না বাংলাদেশকে। মনে হচ্ছে, নিজেদের সেরাটা খেললে বাংলাদেশ নারী দল ঘটিয়ে ফেলতে পারে ‘অপ্রত্যাশিত’ অনেক কিছুই।

এশিয়ান কাপের চূড়ান্তপর্বে জায়গা করে নেওয়াটা বাংলাদেশে নারী ফুটবলারদের সংগ্রামের ফসল। এই সাফল্য একেবারেই তাদের নিজেদের। যে দেশে নারীদের ফুটবল লিগ নিয়মিত হয় না, যে দেশের শীর্ষ ক্লাবগুলোর নারী ফুটবল নিয়ে আগ্রহ নেই, তারা লিগ খেলে না, নারী ফুটবল দল গড়তে চায় না, যে দেশে নারী ফুটবলাররা বাফুফে ভবনের ওপর তলায় গাদাগাদি করে ক্যাম্পের আশ্রয়ে দিন অতিবাহিত করে, পেটে ভাতে ফুটবল খেলে, সে দেশের এশিয়ান কাপে এশিয়ার শীর্ষ ১২ দলের মধ্যে জায়গা করে নেওয়াটাই তো এক ধরনের মিরাক্যল। কোনো সত্যিকারে সিস্টেম ছাড়াই ঋতুপর্না, মনিকা, মারিয়া, আফঈদা, শামসুন্নাহার, হালিমা, নবীরন, মুনকিদের পেয়ে গেছে বাংলাদেশ। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে উঠে এসে এই ফুটবলাররাই সব প্রতিকূলতাকে জয় করে দেশকে সম্মানিত করছেন। তাই চীনের বিপক্ষে এশিয়ান কাপের অভিষেকে ২-০ গোলের হারটাও উদ্যাপনের বিষয়। সেই হারও বাহবা দেওয়ার বিষয়, কারণ আর কিছুই না, মেয়েদের দাঁতে দাঁত চেপে করা সংগ্রামটাকে সম্মান জানানো, স্যালুট করা। হতভাগ্য এ দেশ যেখানে তাদের কিছুই দিতে পারে না, সাফল্য এনে দেওয়ার বোনাস ঘোষিত হওয়ার পরেও যা পেতে তীর্থের কাক হয়ে অপেক্ষা করতে হয় সবাইকে, একবার ঘরোয়া লিগ হয়ে যাওয়ার পর যেখানে পরের লিগটা কবে হবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই; মাঠ নেই, সুযোগ-সুবিধা নেই; খালি ‘নেই’ আর ‘নেই’ এর মধ্যেও ঋতুপর্নার ওই শট যখন চীনের প্রাচীর কাঁপিয়ে দেয়, তখন অলক্ষ্যেই চোখের কোনে জল জমে যায়। সেই জৈ কারও কারও জন্য লজ্জার, তবে বেশিরভাগের জন্যই আক্ষেপ মিশ্রিত গৌরবের।
এশিয়ান কাপে অভিষিক্ত হয়ে যাওয়ার পরেও একটা সন্দেহ থেকে যায় অনেকেরই। নারীরা এদেশের ফুটবলই শুধু নয়, এদেশের ক্রীড়াঙ্গনকে কত বড় অর্জনের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন, সেটি অনুধাবনের ক্ষমতা আমাদের আছে কিনা! আমরা কী বুঝি এশিয়ান কাপে খেলাটা আমাদের জন্য কত বড় ব্যাপার? ৪৬ বছর ধরে যে ক্ষণটির অপেক্ষা করে এসেছে এদেশের ফুটবলপ্রেমীরা, সেই ক্ষণটি যখন সত্যিই সত্যিই মেয়েদের হাত ধরে চলে আসে, তখন সবকিছু স্বপ্নের মতোই লাগে। তবে সেই সঙ্গে বাস্তবতাটাও মনে পড়ে যায়। আর সেই বাস্তবতাই চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় বাংলাদেশের নারী ফুটবলারদের সংগ্রাম আর বীরত্বগাথা। যার জন্য কোনো প্রশংসাই তাদের জন্য যথেষ্ট নয়।
এশিয়ান কাপের নিজেদের গ্রুপে আরও দুটি ম্যাচ বাকি বাংলাদেশের। আগামীকাল শুক্রবার উত্তর কোরিয়া আর ৯ মার্চ উজবেকিস্তানের বিপক্ষে। চীন-ম্যাচের ঝলকগুলো উজ্জ্বল আলোর ঝলকানি নিয়ে আসুক পরের দুই ম্যাচে—আপাতত চাওয়া এটিই।

আর একটু!
আর একটু হলেই খুব সম্ভবত বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা গোলটি পেয়ে যেতেন ঋতুপর্না চাকমা। এশিয়ান কাপ ফুটবলে নিজেদের অভিষেকে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন চীনের বিপক্ষে মাত্র ১৩ মিনিটের মাথায় যে এমন একটা মুহূর্ত এসে পড়বে, সেটা আর কে ভেবেছিলেন! চীনের গোলকিপারও ভাবেননি হয়তো বাংলাদেশের বিপক্ষে এত শিগগিরই তাঁকে এত কঠিন পরীক্ষা দিতে হবে। নিজের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা দিয়েই তিনি রুখেছেন বাংলাদেশের সম্ভাবনা। চীনের মতো দলের বিপক্ষে এগিয়ে যেতে না পারার আক্ষেপটা বড় তীব্র হলেও মঙ্গলবার ঋতুপর্নার ওই শটটিই ছিল চীনের বিপক্ষে ম্যাচে বাংলাদেশের সেরা মুহূর্ত। র্যাঙ্কিংয়ে ৯৫ ধাপ এগিয়ে থাকা দলটির বিপক্ষে ২-০ গোলে হেরেও এশিয়ান কাপে অভিষেকের লগ্নটি দারুণভাবেই স্মরণীয় করে রেখেছেন বাংলাদেশের চির সাহসিকা নারী ফুটবলাররা।
দক্ষিণ এশীয় পর্যায়ে টানা দুইবার শ্রেষ্ঠত্ব নিজেদের করে নেওয়ার পর সুযোগ তৈরি করেই এশিয়ান কাপে জায়গা করে নিয়েছে বাংলাদেশ। গত জুলাইয়ে মিয়ানমারকে ২-১ গোলে হারিয়ে এশিয়ার শীর্ষ আসরে জায়গা পাকাপাকি করার পর থেকেই কথাটা উচ্চারিত হচ্ছে—মেয়েদের হাত ধরেই কী, এদেশের ফুটবলের সবচেয়ে গৌরবের উপলক্ষটি এল! যাঁরা ফুটবলের বিন্দু বিসর্গ খবর রাখেন, তাঁরা একবাক্যেই স্বীকার করবেন গত ৪৬ বছরে দেশের ফুটবলের সেরা অর্জনই হচ্ছে মেয়েদের এশিয়ান কাপের চূড়ান্ত পর্বে খেলা। ১৯৮০ সালে কুয়েতে ছেলেদের জাতীয় দল (তখন মেয়েদের ফুটবলে নাম লেখানো হয়নি বাংলাদেশের) এশিয়ান কাপের চূড়ান্ত পর্বে খেলেছিল। সে-ই শেষ! এরপর আর কখনোই এশীয় ফুটবলের শীর্ষ পর্যায়ে নাম লেখানো হয়নি বাংলাদেশের। তাই গত জুলাইতে মিয়ানমারকে হারিয়ে এশিয়ার শীর্ষ ১২ দলের একটি হয়ে ওঠার পর থেকেই গত মঙ্গলবারের ওই মুহূর্তটিরই অপেক্ষায় ছিলেন সবাই। শঙ্কা ছিল অনেক!
এশিয়ান কাপের মতো আসরে খেলতে যাওয়ার আগে প্রস্তুতিটা একেবারেই আশানুরূপ হয়নি। প্রস্তুতি বলতে শুধু ঘরোয়া লিগ আর চট্টগ্রাম থেকে একটু দূরে কিছু দিনের প্রস্তুতি ক্যাম্প! অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার আগে বাফুফে ভবনে সংবাদ সম্মেলনেও পদে পদে হতাশার ব্যাপারটি সামনে চলে আসছিল। কোচ পিটার বাটলারও সাবধান করছিলেন সবাইকে অতি আশাবাদী হয়ে হতাশ হওয়ার চেয়ে প্রত্যাশাটা বাস্তবতার স্তরে রাখতে।

এশিয়ার সেরা দলগুলোর সঙ্গে খেলা যে সাফ অঞ্চলে ছরি ঘোরানোর মতো সহজ নয়, সেটি বারবারই মনে করিয়ে দিয়েছেন তিনি। এশিয়ান কাপের আগে থাইল্যান্ডের আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচ, আজারবাইজান ও মালয়েশিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে বোঝা গিয়েছিল সাফ অঞ্চলের বাইরের দলগুলোর সঙ্গে পার্থক্যটা। তবে বাটলার সন্তোর্পণে কিছু আশার কথাও শুনিয়েছিলেন। বলেছিলেন ভরসা রাখতে! তবে তাৎক্ষণিক ফল প্রত্যাশিরা যেন কিছুটা অধৈর্যই হয়ে পড়ছিলেন। বাটলারের কিছু কৌশল নিয়েও প্রশ্ন উঠছিল, প্রশ্ন উঠছিল এশিয়ান কাপের মতো আসরে দলে অভিজ্ঞ সাবিনা খাতুন, কৃষ্ণা রানি সরকার, সানজিদা আক্তার, মাসুরা পারভীনদের না থাকা নিয়েও। বাটলার বরাবরই বলে এসেছেন, শৃঙ্খলা তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় বিষয়! ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে বাটলারের বিরুদ্ধে জাতীয় ফুটবল দলের যে ১৮ নারী ফুটবলার বিদ্রোহ করেছিলেন, সেটির নেপথ্যের কারিগর হিসেবেই সাবিনা, সানজিদা, কৃষ্ণা, মাসুরাদের বাদ পড়া। ‘অভিজ্ঞ’দের বিরুদ্ধে বাটলারের দৃঢ় মনোভাবও কিছু মহলে সমালোচিত ছিল। কিন্তু বাটলারের ‘জেদ’ এক্ষেত্রে সব সমালোচনাকে উপেক্ষা করেই এগিয়ে গেছে সামনের দিকে। মঙ্গলবারের পর বাটলারের সেই জেদই যেন বিজয়ীর বেশে! যে চীনের বিপক্ষে পার্থক্য বিচারে রীতিমতো উড়ে যাওয়ার কথা, সেই প্রতিপক্ষের বিপক্ষেই লড়াকু ফুটবল খেলে বাংলাদেশ এখন প্রশংসায় ভাসছে। এশিয়ান কাপে চীনের বিপক্ষে ম্যাচটি যেন বাংলাদেশের নারী ফুটবলে বড় এক লাইট হাউজ হয়ে থাকল। যে ম্যাচটি অনাগত সময়ে ঋতুপর্না চাকমা, মনিকা চাকমা, মারিয়া মান্দা, আফঈদা খন্দকার, শিউলি আজিম, মিলি আক্তার, তহুরা খাতুন, নবীরন, মুনকিদের দেবে উত্তুঙ্গ আত্মবিশ্বাস।
এশিয়ান কাপ শুরুর আগে যেখানে হারগুলো কত ‘সম্মানজনক’ হবে, সেই ভাবনাই পেয়ে বসেছিল ফুটবলপ্রেমীদের, সেখানে মঙ্গলবারের পর থেকে তারা অনেক বেশি ভরসা রাখছেন দলের ওপর। মনে হচ্ছে ঋতু,মনিকা, মারিয়া, আফঈদারা আর যাই হোক, পরের ম্যাচগুলোতে হতাশ করবেন না বাংলাদেশকে। মনে হচ্ছে, নিজেদের সেরাটা খেললে বাংলাদেশ নারী দল ঘটিয়ে ফেলতে পারে ‘অপ্রত্যাশিত’ অনেক কিছুই।

এশিয়ান কাপের চূড়ান্তপর্বে জায়গা করে নেওয়াটা বাংলাদেশে নারী ফুটবলারদের সংগ্রামের ফসল। এই সাফল্য একেবারেই তাদের নিজেদের। যে দেশে নারীদের ফুটবল লিগ নিয়মিত হয় না, যে দেশের শীর্ষ ক্লাবগুলোর নারী ফুটবল নিয়ে আগ্রহ নেই, তারা লিগ খেলে না, নারী ফুটবল দল গড়তে চায় না, যে দেশে নারী ফুটবলাররা বাফুফে ভবনের ওপর তলায় গাদাগাদি করে ক্যাম্পের আশ্রয়ে দিন অতিবাহিত করে, পেটে ভাতে ফুটবল খেলে, সে দেশের এশিয়ান কাপে এশিয়ার শীর্ষ ১২ দলের মধ্যে জায়গা করে নেওয়াটাই তো এক ধরনের মিরাক্যল। কোনো সত্যিকারে সিস্টেম ছাড়াই ঋতুপর্না, মনিকা, মারিয়া, আফঈদা, শামসুন্নাহার, হালিমা, নবীরন, মুনকিদের পেয়ে গেছে বাংলাদেশ। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে উঠে এসে এই ফুটবলাররাই সব প্রতিকূলতাকে জয় করে দেশকে সম্মানিত করছেন। তাই চীনের বিপক্ষে এশিয়ান কাপের অভিষেকে ২-০ গোলের হারটাও উদ্যাপনের বিষয়। সেই হারও বাহবা দেওয়ার বিষয়, কারণ আর কিছুই না, মেয়েদের দাঁতে দাঁত চেপে করা সংগ্রামটাকে সম্মান জানানো, স্যালুট করা। হতভাগ্য এ দেশ যেখানে তাদের কিছুই দিতে পারে না, সাফল্য এনে দেওয়ার বোনাস ঘোষিত হওয়ার পরেও যা পেতে তীর্থের কাক হয়ে অপেক্ষা করতে হয় সবাইকে, একবার ঘরোয়া লিগ হয়ে যাওয়ার পর যেখানে পরের লিগটা কবে হবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই; মাঠ নেই, সুযোগ-সুবিধা নেই; খালি ‘নেই’ আর ‘নেই’ এর মধ্যেও ঋতুপর্নার ওই শট যখন চীনের প্রাচীর কাঁপিয়ে দেয়, তখন অলক্ষ্যেই চোখের কোনে জল জমে যায়। সেই জৈ কারও কারও জন্য লজ্জার, তবে বেশিরভাগের জন্যই আক্ষেপ মিশ্রিত গৌরবের।
এশিয়ান কাপে অভিষিক্ত হয়ে যাওয়ার পরেও একটা সন্দেহ থেকে যায় অনেকেরই। নারীরা এদেশের ফুটবলই শুধু নয়, এদেশের ক্রীড়াঙ্গনকে কত বড় অর্জনের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন, সেটি অনুধাবনের ক্ষমতা আমাদের আছে কিনা! আমরা কী বুঝি এশিয়ান কাপে খেলাটা আমাদের জন্য কত বড় ব্যাপার? ৪৬ বছর ধরে যে ক্ষণটির অপেক্ষা করে এসেছে এদেশের ফুটবলপ্রেমীরা, সেই ক্ষণটি যখন সত্যিই সত্যিই মেয়েদের হাত ধরে চলে আসে, তখন সবকিছু স্বপ্নের মতোই লাগে। তবে সেই সঙ্গে বাস্তবতাটাও মনে পড়ে যায়। আর সেই বাস্তবতাই চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় বাংলাদেশের নারী ফুটবলারদের সংগ্রাম আর বীরত্বগাথা। যার জন্য কোনো প্রশংসাই তাদের জন্য যথেষ্ট নয়।
এশিয়ান কাপের নিজেদের গ্রুপে আরও দুটি ম্যাচ বাকি বাংলাদেশের। আগামীকাল শুক্রবার উত্তর কোরিয়া আর ৯ মার্চ উজবেকিস্তানের বিপক্ষে। চীন-ম্যাচের ঝলকগুলো উজ্জ্বল আলোর ঝলকানি নিয়ে আসুক পরের দুই ম্যাচে—আপাতত চাওয়া এটিই।