পুলিশ কি চাইলেই মারধর-তল্লাশি করতে পারে? আইন কী বলছে

পুলিশ কি চাইলেই মারধর-তল্লাশি করতে পারে? আইন কী বলছে

অপরাধ দমন, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা পুলিশের নিয়মিত দায়িত্ব। একটি নিরাপদ সমাজ গঠনে অপরাধীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাংবিধানিক ও আইনগত দায়িত্বের অংশ। তবে, অভিযানের নামে কি পুলিশ যেকোনো নাগরিককে তল্লাশি করতে পারে? কিংবা ইচ্ছে হলেই হলেই মারধর করতে পারে? আইনী সাংবিধানিক কি বলে!

সাম্প্রতিক রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মাদকবিরোধী অভিযানে সাংবাদিক ও শিক্ষার্থীদের মারধরের অভিযোগ উঠেছে পুলিশের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় একাধিক ভিডিও ফুটেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। শুধু তাই নয়, অবৈধভাবে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের অপসারণ চেয়ে শাহবাগ থানার সামনে বিক্ষোভ করেছে শিক্ষার্থীরা। পাশাপাশি সাংবাদিক মহল ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোও এ ঘটনায় নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ঘটনার অতিরিক্ত বলপ্রযোগের বিষয়টি সামনে আসার পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। পুলিশের পেশাদারিত্ব, আইনি এখতিয়ার ও নাগরিক অধিকার—সব মিলিয়ে জনমনে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন।

এ বিষয়ে আইন কী বলছে, আর নাগরিকের অধিকার কতটুকু!

তল্লাশির আইনি ভিত্তি

বাংলাদেশে তল্লাশি ও জব্দের বিষয়টি মূলত ফৌজদারি কার্যবিধি (Criminal Procedure Code বা CrPC) এবং ১৯৪৩ সালের Police Regulations Bengal (PRB) দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।

CrPC–এর ৯৪ ও ৯৬ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো নির্দিষ্ট দলিল, বস্তু বা আলামত উদ্ধারের প্রয়োজন হলে ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমতি বা সার্চ ওয়ারেন্ট নিয়ে তল্লাশি করতে হবে। এটি সাধারণ নিয়ম।

একই সঙ্গে ১০০ ও ১০৩ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো বদ্ধ স্থান—যেমন বাড়ি, অফিস বা ব্যাগ—তল্লাশির সময় এলাকার দুই বা ততোধিক সম্মানিত ব্যক্তিকে সাক্ষী হিসেবে উপস্থিত রাখতে হবে। তল্লাশির পর জব্দ তালিকা তৈরি করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে একটি কপি দিতে হবে। একই সঙ্গে পুলিশ রেগুলেশনস বেঙ্গল (পিআরবি) আইন অনুযায়ী পুলিশ তল্লাশি করতে পারলেও কিছু সুনির্দিষ্ট নিয়ম ও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তল্লাশির আইনি ক্ষমতা মূলত সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) বা তার ওপরের পদের কর্মকর্তাদের। এর নিচের পদমর্যাদার কোনো পুলিশ সদস্য তল্লাশি করতে পারবে না।

ওয়ারেন্ট ছাড়াই তল্লাশি

পিআরবি ১৬৫ ধারায় একটি ব্যতিক্রমী ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। যদি কোনো পুলিশ কর্মকর্তা যুক্তিসঙ্গতভাবে মনে করেন যে ওয়ারেন্ট আনতে দেরি হলে আলামত নষ্ট হতে পারে, তবে তিনি কারণ লিখিতভাবে লিপিবদ্ধ করে তাৎক্ষণিক তল্লাশি চালাতে পারেন। তবে পরে ম্যাজিস্ট্রেটকে বিষয়টি জানাতে হয়। অর্থাৎ এটি জরুরি পরিস্থিতির জন্য, নিয়মিত কোনো অভিযানের পদ্ধতি নয়।

কে তল্লাশি করতে পারেন?

তল্লাশির ক্ষমতা মূলত সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) বা তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার। কনস্টেবল একক সিদ্ধান্তে তল্লাশি চালাতে পারেন না; তিনি দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে সহায়তা করতে পারেন।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—তল্লাশি একটি আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া; তাৎক্ষণিক রাগ বা সন্দেহের ভিত্তিতে ‘হয়রানি’ করার সুযোগ আইন দেয় না।

একই সঙ্গে সিআরপিসি-এর ৫১ ধারা অনুযায়ী, কাউকে বৈধভাবে গ্রেপ্তার বা আটক করা হলে তার দেহ তল্লাশি করা যেতে পারে। তবে— পোশাক ছাড়া অন্য মালামাল জব্দ করলে তালিকা করতে হবে, জব্দ তালিকার কপি দিতে হবে এবং জব্দকৃত মালামাল থানায় সংরক্ষণ করতে হবে।

৫২ ধারায় স্পষ্ট বলা আছে, কোনো নারীকে তল্লাশি করতে হলে তা অবশ্যই নারী পুলিশ সদস্যের মাধ্যমে করতে হবে এবং শালীনতা রক্ষা বাধ্যতামূলক। কোনো পুরুষ সদস্য নারীর দেহ তল্লাশি করতে পারেন না।

জনসমক্ষে অপমানজনক আচরণ পুলিশের আচরণবিধির পরিপন্থী। যার কারণে সংশ্লিষ্ট সেই পুলিশ সদস্যদের বিভাগীয় শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে গোন্য হবে।

ফাইল ছবি
ফাইল ছবি

মারধর বা বলপ্রয়োগ—কতটুকু বৈধ?

আইন এখানে অত্যন্ত স্পষ্ট বলে আছে। সিআরপিসি–এর ৪৬ থেকে ৫৩ ধারায় গ্রেপ্তার ও বলপ্রয়োগের সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। গ্রেপ্তারের সময় যতটুকু বল প্রয়োগ প্রয়োজন (যেমন কেউ পালাতে চাইলে), তার বেশি শক্তি প্রয়োগ করা যাবে না। ব্যক্তি নিয়ন্ত্রণে এলে তাকে মারধর করা সম্পূর্ণ বেআইনি। তবে আত্মরক্ষার প্রয়োজনীয় বল প্রয়োগ করার কথাও রয়েছে।

নির্যাতনবিরোধী বিশেষ আইন

২০১৩ সালের নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন অনুযায়ী— শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন দণ্ডনীয় অপরাধ, নির্যাতনে মৃত্যু হলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড হবে পারে। এবং গুরুতর আহত করলে ন্যূনতম ৫ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে।

এই আইনটি বিশেষভাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে নির্যাতন ঠেকাতে প্রণীত করা হয়েছে।

ওয়ারেন্ট ছাড়াই গ্রেপ্তার?

সিআরপিসি–এর ৫৪ ধারা পুলিশকে ওয়ারেন্ট ছাড়া গ্রেপ্তারের ক্ষমতা দেয়, যদি যৌক্তিক সন্দেহ থাকে যে ব্যক্তি কোনো অপরাধ করেছে বা করতে যাচ্ছে। তবে “যৌক্তিক সন্দেহ” মানে যুক্তিযুক্ত তথ্য বা পরিস্থিতি—ব্যক্তিগত অনুমান নয়।

উচ্চ আদালত একাধিক রায়ে ৫৪ ধারার অপব্যবহার ঠেকাতে নির্দেশনা দিয়েছে—গ্রেপ্তারের কারণ জানানো, আত্মীয়কে অবহিত করা এবং নির্যাতন না করার বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে।

সংবিধান কী বলছে?

বাংলাদেশের বিদ্যমান সংবিধানের ৩৫(৫) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে— কোনো ব্যক্তিকে যন্ত্রণা দেওয়া যাবে না অথবা নিষ্ঠুর, অমানুষিক বা লাঞ্ছনাকর দণ্ড দেওয়া যাবে না। অর্থাৎ নির্যাতন সাংবিধানিকভাবেই নিষিদ্ধ।

নাগরিকের অধিকার

তল্লাশি বা আটক অবস্থায় নাগরিকেরও কিছু অধিকার রয়েছে। আইনে বলা আছে, নাগরিক পুলিশের পরিচয়পত্র দেখতে চাওয়া, সিভিল পোশাকে থাকলে নাগরিককের কাছে তার পরিচয় নিশ্চিত করা, তল্লাশির সময় নিরপেক্ষ সাক্ষীর উপস্থিতি দাবি করা, জব্দ তালিকার কপি নাগরিকের কাছে দিবে হবে এবং আইনজীবীর সহায়তা চাওয়ার অধিকার দিতে হবে।

কোনো নাগরিক পুলিশি নির্যাতনের শিকার হলে ২০১৩ সালের আইনের ৫ ধারা অনুযায়ী অভিযোগ দায়ের করা যায়। ভুক্তভোগীর জবানবন্দি গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে মিথ্যা অভিযোগ প্রমাণিত হলে অভিযোগকারীর বিরুদ্ধেও শাস্তির বিধান রয়েছে।

লাঠিচার্জ কি বৈধ?

পুলিশ কেবল তখনই লাঠিচার্জ বা বলপ্রয়োগ করতে পারে, যখন জননিরাপত্তা চরম হুমকির মুখে—যেমন দাঙ্গা, সহিংস ভাঙচুর বা প্রাণহানির ঝুঁকি দেখা দিলে। তব, শান্তিপূর্ণ পরিবেশে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ আইনসঙ্গত নয়।

আইন পুলিশকে ক্ষমতা দিয়েছে ঠিকই। কিন্তু সেই ক্ষমতার সীমাও নির্ধারণ করা হয়েছেছে। তল্লাশি, গ্রেপ্তার ও বলপ্রয়োগ—সবকিছুরই সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি আছে। সন্দেহভাজন ব্যক্তি দোষী নন; আর গ্রেপ্তার মানেই শাস্তি নয়।

আইনের শাসন তখনই কার্যকর হয়, যখন আইন প্রয়োগকারী সংস্থাও আইনের সীমার ভেতরে থাকে। নাগরিকের নিরাপত্তা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি নাগরিকের মর্যাদা ও অধিকার রক্ষাও সমানভাবে জরুরি।

সম্পর্কিত