তাসীন মল্লিক

স্থানীয় সরকার ভোটের আগে পুরো নির্বাচন ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কার আনতে চাচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এ লক্ষ্যে কাজও শুরু করেছে সাংবিধানিক সংস্থাটি। সরকারের আনুষ্ঠানিক সংকেত পেলে মেয়াদোত্তীর্ণ ইউনিয়ন পরিষদগুলোর (ইউপি) নির্বাচন দিয়েই স্থানীয় সরকারের ভোটযাত্রা শুরু হতে পারে বলে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
ইসির নির্বাচন পরিচালনা ও আইন শাখার সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন নির্বাচনের আইন ও বিধিমালায় পরিবর্তন আনতে এরই মধ্যে খসড়া প্রণয়নের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। গত ১৩ মে এক বৈঠকে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও), নির্বাচন পরিচালনা বিধিমালা এবং আচরণবিধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্থানীয় সরকার কাঠামোর জন্য অভিন্ন আচরণবিধি তৈরির বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। একই সঙ্গে প্রার্থীদের জামানতের পরিমাণ বাড়ানোর বিষয়টিও আলোচনায় উঠে আসে।
এদিকে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর হালনাগাদ তথ্য সংগ্রহে গত ৭ মে মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের কাছে চিঠি পাঠিয়েছে ইসি। এই তথ্যের ওপর ভিত্তি করে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ এবং ইউপি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ রোডম্যাপ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।
নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ চরচাকে বলেন, ‘‘সরকারের পক্ষ থেকে জানতে চাওয়া হয়েছিল, আমরা বলেছি ৪৫ দিনের মধ্যেই নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব। সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের জন্য আমরা আইন ও বিধি সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছি। সেটার খসড়া অনুমোদন ও ভেটিং হয়ে আসতে আসতে বছরের শেষ নাগাদ নির্বচানের সম্ভাব্য সময় হতে পারে।’’
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জামানতের পরিমাণ কিছুটা বাড়ানোর চিন্তা রয়েছে, যাতে শুধু যোগ্য প্রার্থীরাই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন।
সংশোধনের আওতায় আসছে যা
স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে আইন, বিধিমালা ও আচরণবিধিতে পরিবর্তন আনতে উদ্যোগ নিয়েছে ইসি। প্রস্তাবিত সংশোধনগুলোর মধ্যে প্রার্থীদের জামানতের অঙ্ক বাড়ানো, স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ক্ষেত্রে ভোটারদের স্বাক্ষর সংগ্রহের বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়া এবং আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিধান যুক্ত করার বিষয় রয়েছে।
ইসি সূত্র জানিয়েছে, বর্তমানে স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জন্য আলাদা আলাদা আচরণবিধি থাকলেও তা একীভূত করে একটি সমন্বিত আচরণবিধি তৈরির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি অনলাইনে মনোনয়ন জমা দেওয়ার সুযোগ বাতিল করা হতে পারে। স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে এক শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষর জমা দেওয়ার যে শর্ত রয়েছে, সেটিও তুলে দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। একই সঙ্গে প্রার্থীদের জামানত ও নির্বাচনী ব্যয়ের সীমা বাড়ানোর কথাও ভাবা হচ্ছে।
নির্বাচনী প্রচারণায়ও নতুন বিধিনিষেধ যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে পোস্টার নিষিদ্ধ করা, বিলবোর্ড ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ আরোপ এবং সামাজিক মাধ্যমে প্রচারণা সীমিত করার বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এসব পরিবর্তন গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও), নির্বাচন পরিচালনা বিধিমালা ও আচরণবিধির সঙ্গে সমন্বয় করেই আনা হবে।
নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদ চরচাকে বলেন, “স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জামানতের পরিমাণ কিছুটা বাড়ানোর চিন্তা রয়েছে, যাতে শুধু যোগ্য প্রার্থীরাই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন।”
জামানত বৃদ্ধির যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, “বর্তমানে যেকোনো নাগরিক দুই থেকে পাঁচ হাজার টাকা জামানত জমা দিয়ে প্রার্থী হতে পারেন। এতে ভোটে প্রার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। একদিকে আমাদের ব্যালট ব্যয় যেমন বৃদ্ধি পায়, অন্যদিকে মানুষের ভোট দিতে সময়ক্ষেপণ হয়। সেটি কমাতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।”
এই নির্বাচন কমিশনার আরও বলেন, “এ ছাড়া আরও কিছু পরিবর্তন আনা হবে। যেমন–পোস্টার থাকবে না, অনলাইনে মনোনয়ন জমা দেওয়ার বিষয়টি থাকবে না এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে ন্যূনতম ১ শতাংশ ভোটারের সমর্থনের নথি জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতাও থাকবে না।”
সমন্বিত আচরণবিধির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে তিনি বলেন, “আমি মনে করি, সব স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচনের জন্য একটি সমন্বিত আচরণবিধি থাকা উচিত। সেটিই আমি প্রস্তাব করব।”
বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ভোটারসংখ্যা পাঁচ লাখ পর্যন্ত হলে মেয়র প্রার্থীর জামানত ২০ হাজার টাকা। পাঁচ লাখ ১ থেকে ১০ লাখ হলে ৩০ হাজার, ১০ লাখ এক থেকে ২০ লাখ হলে ৫০ হাজার এবং ২০ লাখের বেশি হলে এক লাখ টাকা নির্ধারিত রয়েছে। সাধারণ ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদের ক্ষেত্রে ভোটারসংখ্যা অনুযায়ী ১০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত জামানত নির্ধারণ করা আছে।
সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর পদের জন্য জামানত ১০ হাজার টাকা। ২০২৪ সালে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদের জামানত ১০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে এক লাখ টাকা করা হয়েছিল।
পৌরসভা নির্বাচনে ২৫ হাজার ভোটার পর্যন্ত এলাকায় জামানত ১৫ হাজার টাকা, ২৫ হাজার ১ থেকে ৫০ হাজার ভোটারের ক্ষেত্রে ২০ হাজার টাকা, ৫০ হাজার ১ থেকে ১ লাখ ভোটারের ক্ষেত্রে ২৫ হাজার টাকা এবং এক লাখের বেশি ভোটারের ক্ষেত্রে ৩০ হাজার টাকা নির্ধারিত রয়েছে।
অন্যদিকে কাউন্সিলর পদে জামানত পাঁচ হাজার টাকা, ইউপি চেয়ারম্যান পদে পাঁচ হাজার টাকা এবং সদস্য পদের জন্য এক হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। জেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদের জন্য ২০ হাজার টাকা এবং সদস্য বা মহিলা সদস্য পদের জন্য পাঁচ হাজার টাকা জামানত দিতে হয়।
কোন স্তর থেকে শুরু হতে পারে নির্বাচন?
স্থানীয় সরকার নির্বাচন কোন পর্যায় থেকে শুরু হবে–সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি ইসি। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইউপি নির্বাচন দিয়েই প্রক্রিয়াটি শুরু হতে পারে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইসির এক কর্মকর্তা চরচাকে বলেন, ‘‘যেহেতু স্থানীয় সরকারের নির্বাচন নিয়ে নানা আলোচনা চলছে। চ্যালেঞ্জিং হলেও সরকার ইউপির প্রথম ধাপ আয়োজন করার নির্দেশ দিতে পারে, আবার পৌরসভাগুলোও আগে হতে পারে। আমরা ইতোমধ্যে সবগুলো প্রতিষ্ঠানের হালনাগাদ তথ্য চেয়ে চিঠি দিয়েছি, সে অনুযায়ী রোডম্যাপ প্রস্তুত করা হবে।’’
চলতি বছরের শেষ নাগাদ দেশের প্রায় সাড়ে চার হাজার ইউনিয়ন পরিষদের বেশির ভাগের মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে। এর মধ্যে প্রায় ৬০০টি নির্বাচন উপযোগী হয়ে উঠেছে। জুন ও জুলাই মাস নাগাদ আরও প্রায় ২৮০০ ইউপি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর্যায়ে পৌঁছাবে।
এখন আমাদের টপ প্রায়োরিটি (সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার) হলো স্থানীয় সরকার নির্বাচন। আমরা এ নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছি।
২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকার ইউপি ছাড়া অন্যান্য স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো স্থগিত ঘোষণা করে। পরে স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) সংশোধন অধ্যাদেশ, ২০২৪-এর আওতায় বিভিন্ন সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, জেলা পরিষদ ও উপজেলা পরিষদের নির্বাচিত মেয়র ও চেয়ারম্যানদের অপসারণ করা হয়। এর পর থেকেই জাতীয় নির্বাচনের আগেই স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের দাবি তোলে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি। যদিও পরে দল দুটি এই অবস্থান ধেকে সরে আসে।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন শেষ হওয়ার পর আবারও স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে আলোচনায় গতি আসে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকাও প্রকাশ করতে শুরু করেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা স্থানীয় সরকার নির্বাচন অধ্যাদেশ সংসদে পাস হওয়ার পর তৎপরতা আরও বেড়েছে।
সরকার তরফে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, চলতি বছরের শেষ দিকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে। গ্রাম থেকে শহর-সব পর্যায়ে সম্ভাব্য প্রার্থীরা প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছেন। গত ৫ মে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানিয়েছেন, আগামী এক বছরের মধ্যে স্থানীয় সরকারের সব ধাপের নির্বাচন সম্পন্ন করার চেষ্টা থাকবে।
নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বাসসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, “এখন আমাদের টপ প্রায়োরিটি (সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার) হলো স্থানীয় সরকার নির্বাচন। আমরা এ নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছি। এখনো প্রস্তুতি পুরোপুরি শেষ হয়নি। তবে আমাদের লক্ষ্য এক বছরের মধ্যে ধাপে ধাপে সব নির্বাচন সম্পন্ন করা।”
কী অবস্থায় প্রতিষ্ঠানগুলো
বর্তমানে দেশে ১২টি সিটি করপোরেশন নির্বাচন উপযোগী অবস্থায় রয়েছে। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০২৫ সালের জুনে, আর চট্টগ্রামের মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে। নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা ও রংপুর সিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা আগামী বছর। সিলেট, রাজশাহী, গাজীপুর, বরিশাল ও খুলনার মেয়াদ ২০২৮ সালে এবং ময়মনসিংহের ২০২৯ সালে শেষ হবে। তবে ২০২৪ সালের আগস্টেই এসব সিটির মেয়রদের পদ অপসারণের মাধ্যমে শূন্য হয়ে যায়। আইনে ১৮০ দিনের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা হয়নি। ফলে এখন নতুন করে সময়সূচি নির্ধারণ করতে হচ্ছে।
দেশের ৬১টি জেলা পরিষদ ও প্রায় ৫০০টি উপজেলার অধিকাংশই বর্তমানে নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত। জনপ্রতিনিধি অপসারণের পর এসব প্রতিষ্ঠানে ভোট আয়োজনের আইনি বাধা না থাকলেও কিছু জটিলতা রয়েছে। যেমন–নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলায় দীর্ঘদিন নির্বাচন না হওয়া এবং আদালতে মামলা চলা। একইভাবে নতুন গঠিত মাদারীপুরের ডাসার উপজেলায় সীমানা নির্ধারণ ও ভোটার তালিকা প্রণয়ন শেষ হয়নি। ফলে সব উপজেলায় একযোগে ভোট আয়োজন সম্ভব না হলে ধাপে ধাপে নির্বাচন করতে হবে।
৩৩০টি পৌরসভার বেশির ভাগই নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত থাকলেও কয়েকটিতে সীমানা সংক্রান্ত মামলার কারণে তাৎক্ষণিক ভোট আয়োজন সম্ভব নয়। এসব সীমিত জটিলতা ছাড়া পৌরসভা নির্বাচন তুলনামূলকভাবে দ্রুত আয়োজনযোগ্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।

স্থানীয় সরকার ভোটের আগে পুরো নির্বাচন ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কার আনতে চাচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এ লক্ষ্যে কাজও শুরু করেছে সাংবিধানিক সংস্থাটি। সরকারের আনুষ্ঠানিক সংকেত পেলে মেয়াদোত্তীর্ণ ইউনিয়ন পরিষদগুলোর (ইউপি) নির্বাচন দিয়েই স্থানীয় সরকারের ভোটযাত্রা শুরু হতে পারে বলে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
ইসির নির্বাচন পরিচালনা ও আইন শাখার সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন নির্বাচনের আইন ও বিধিমালায় পরিবর্তন আনতে এরই মধ্যে খসড়া প্রণয়নের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। গত ১৩ মে এক বৈঠকে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও), নির্বাচন পরিচালনা বিধিমালা এবং আচরণবিধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্থানীয় সরকার কাঠামোর জন্য অভিন্ন আচরণবিধি তৈরির বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। একই সঙ্গে প্রার্থীদের জামানতের পরিমাণ বাড়ানোর বিষয়টিও আলোচনায় উঠে আসে।
এদিকে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর হালনাগাদ তথ্য সংগ্রহে গত ৭ মে মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের কাছে চিঠি পাঠিয়েছে ইসি। এই তথ্যের ওপর ভিত্তি করে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ এবং ইউপি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ রোডম্যাপ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।
নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ চরচাকে বলেন, ‘‘সরকারের পক্ষ থেকে জানতে চাওয়া হয়েছিল, আমরা বলেছি ৪৫ দিনের মধ্যেই নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব। সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের জন্য আমরা আইন ও বিধি সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছি। সেটার খসড়া অনুমোদন ও ভেটিং হয়ে আসতে আসতে বছরের শেষ নাগাদ নির্বচানের সম্ভাব্য সময় হতে পারে।’’
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জামানতের পরিমাণ কিছুটা বাড়ানোর চিন্তা রয়েছে, যাতে শুধু যোগ্য প্রার্থীরাই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন।
সংশোধনের আওতায় আসছে যা
স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে আইন, বিধিমালা ও আচরণবিধিতে পরিবর্তন আনতে উদ্যোগ নিয়েছে ইসি। প্রস্তাবিত সংশোধনগুলোর মধ্যে প্রার্থীদের জামানতের অঙ্ক বাড়ানো, স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ক্ষেত্রে ভোটারদের স্বাক্ষর সংগ্রহের বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়া এবং আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিধান যুক্ত করার বিষয় রয়েছে।
ইসি সূত্র জানিয়েছে, বর্তমানে স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জন্য আলাদা আলাদা আচরণবিধি থাকলেও তা একীভূত করে একটি সমন্বিত আচরণবিধি তৈরির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি অনলাইনে মনোনয়ন জমা দেওয়ার সুযোগ বাতিল করা হতে পারে। স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে এক শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষর জমা দেওয়ার যে শর্ত রয়েছে, সেটিও তুলে দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। একই সঙ্গে প্রার্থীদের জামানত ও নির্বাচনী ব্যয়ের সীমা বাড়ানোর কথাও ভাবা হচ্ছে।
নির্বাচনী প্রচারণায়ও নতুন বিধিনিষেধ যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে পোস্টার নিষিদ্ধ করা, বিলবোর্ড ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ আরোপ এবং সামাজিক মাধ্যমে প্রচারণা সীমিত করার বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এসব পরিবর্তন গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও), নির্বাচন পরিচালনা বিধিমালা ও আচরণবিধির সঙ্গে সমন্বয় করেই আনা হবে।
নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদ চরচাকে বলেন, “স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জামানতের পরিমাণ কিছুটা বাড়ানোর চিন্তা রয়েছে, যাতে শুধু যোগ্য প্রার্থীরাই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন।”
জামানত বৃদ্ধির যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, “বর্তমানে যেকোনো নাগরিক দুই থেকে পাঁচ হাজার টাকা জামানত জমা দিয়ে প্রার্থী হতে পারেন। এতে ভোটে প্রার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। একদিকে আমাদের ব্যালট ব্যয় যেমন বৃদ্ধি পায়, অন্যদিকে মানুষের ভোট দিতে সময়ক্ষেপণ হয়। সেটি কমাতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।”
এই নির্বাচন কমিশনার আরও বলেন, “এ ছাড়া আরও কিছু পরিবর্তন আনা হবে। যেমন–পোস্টার থাকবে না, অনলাইনে মনোনয়ন জমা দেওয়ার বিষয়টি থাকবে না এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে ন্যূনতম ১ শতাংশ ভোটারের সমর্থনের নথি জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতাও থাকবে না।”
সমন্বিত আচরণবিধির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে তিনি বলেন, “আমি মনে করি, সব স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচনের জন্য একটি সমন্বিত আচরণবিধি থাকা উচিত। সেটিই আমি প্রস্তাব করব।”
বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ভোটারসংখ্যা পাঁচ লাখ পর্যন্ত হলে মেয়র প্রার্থীর জামানত ২০ হাজার টাকা। পাঁচ লাখ ১ থেকে ১০ লাখ হলে ৩০ হাজার, ১০ লাখ এক থেকে ২০ লাখ হলে ৫০ হাজার এবং ২০ লাখের বেশি হলে এক লাখ টাকা নির্ধারিত রয়েছে। সাধারণ ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদের ক্ষেত্রে ভোটারসংখ্যা অনুযায়ী ১০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত জামানত নির্ধারণ করা আছে।
সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর পদের জন্য জামানত ১০ হাজার টাকা। ২০২৪ সালে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদের জামানত ১০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে এক লাখ টাকা করা হয়েছিল।
পৌরসভা নির্বাচনে ২৫ হাজার ভোটার পর্যন্ত এলাকায় জামানত ১৫ হাজার টাকা, ২৫ হাজার ১ থেকে ৫০ হাজার ভোটারের ক্ষেত্রে ২০ হাজার টাকা, ৫০ হাজার ১ থেকে ১ লাখ ভোটারের ক্ষেত্রে ২৫ হাজার টাকা এবং এক লাখের বেশি ভোটারের ক্ষেত্রে ৩০ হাজার টাকা নির্ধারিত রয়েছে।
অন্যদিকে কাউন্সিলর পদে জামানত পাঁচ হাজার টাকা, ইউপি চেয়ারম্যান পদে পাঁচ হাজার টাকা এবং সদস্য পদের জন্য এক হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। জেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদের জন্য ২০ হাজার টাকা এবং সদস্য বা মহিলা সদস্য পদের জন্য পাঁচ হাজার টাকা জামানত দিতে হয়।
কোন স্তর থেকে শুরু হতে পারে নির্বাচন?
স্থানীয় সরকার নির্বাচন কোন পর্যায় থেকে শুরু হবে–সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি ইসি। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইউপি নির্বাচন দিয়েই প্রক্রিয়াটি শুরু হতে পারে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইসির এক কর্মকর্তা চরচাকে বলেন, ‘‘যেহেতু স্থানীয় সরকারের নির্বাচন নিয়ে নানা আলোচনা চলছে। চ্যালেঞ্জিং হলেও সরকার ইউপির প্রথম ধাপ আয়োজন করার নির্দেশ দিতে পারে, আবার পৌরসভাগুলোও আগে হতে পারে। আমরা ইতোমধ্যে সবগুলো প্রতিষ্ঠানের হালনাগাদ তথ্য চেয়ে চিঠি দিয়েছি, সে অনুযায়ী রোডম্যাপ প্রস্তুত করা হবে।’’
চলতি বছরের শেষ নাগাদ দেশের প্রায় সাড়ে চার হাজার ইউনিয়ন পরিষদের বেশির ভাগের মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে। এর মধ্যে প্রায় ৬০০টি নির্বাচন উপযোগী হয়ে উঠেছে। জুন ও জুলাই মাস নাগাদ আরও প্রায় ২৮০০ ইউপি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর্যায়ে পৌঁছাবে।
এখন আমাদের টপ প্রায়োরিটি (সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার) হলো স্থানীয় সরকার নির্বাচন। আমরা এ নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছি।
২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকার ইউপি ছাড়া অন্যান্য স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো স্থগিত ঘোষণা করে। পরে স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) সংশোধন অধ্যাদেশ, ২০২৪-এর আওতায় বিভিন্ন সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, জেলা পরিষদ ও উপজেলা পরিষদের নির্বাচিত মেয়র ও চেয়ারম্যানদের অপসারণ করা হয়। এর পর থেকেই জাতীয় নির্বাচনের আগেই স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের দাবি তোলে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি। যদিও পরে দল দুটি এই অবস্থান ধেকে সরে আসে।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন শেষ হওয়ার পর আবারও স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে আলোচনায় গতি আসে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকাও প্রকাশ করতে শুরু করেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা স্থানীয় সরকার নির্বাচন অধ্যাদেশ সংসদে পাস হওয়ার পর তৎপরতা আরও বেড়েছে।
সরকার তরফে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, চলতি বছরের শেষ দিকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে। গ্রাম থেকে শহর-সব পর্যায়ে সম্ভাব্য প্রার্থীরা প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছেন। গত ৫ মে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানিয়েছেন, আগামী এক বছরের মধ্যে স্থানীয় সরকারের সব ধাপের নির্বাচন সম্পন্ন করার চেষ্টা থাকবে।
নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বাসসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, “এখন আমাদের টপ প্রায়োরিটি (সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার) হলো স্থানীয় সরকার নির্বাচন। আমরা এ নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছি। এখনো প্রস্তুতি পুরোপুরি শেষ হয়নি। তবে আমাদের লক্ষ্য এক বছরের মধ্যে ধাপে ধাপে সব নির্বাচন সম্পন্ন করা।”
কী অবস্থায় প্রতিষ্ঠানগুলো
বর্তমানে দেশে ১২টি সিটি করপোরেশন নির্বাচন উপযোগী অবস্থায় রয়েছে। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০২৫ সালের জুনে, আর চট্টগ্রামের মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে। নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা ও রংপুর সিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা আগামী বছর। সিলেট, রাজশাহী, গাজীপুর, বরিশাল ও খুলনার মেয়াদ ২০২৮ সালে এবং ময়মনসিংহের ২০২৯ সালে শেষ হবে। তবে ২০২৪ সালের আগস্টেই এসব সিটির মেয়রদের পদ অপসারণের মাধ্যমে শূন্য হয়ে যায়। আইনে ১৮০ দিনের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা হয়নি। ফলে এখন নতুন করে সময়সূচি নির্ধারণ করতে হচ্ছে।
দেশের ৬১টি জেলা পরিষদ ও প্রায় ৫০০টি উপজেলার অধিকাংশই বর্তমানে নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত। জনপ্রতিনিধি অপসারণের পর এসব প্রতিষ্ঠানে ভোট আয়োজনের আইনি বাধা না থাকলেও কিছু জটিলতা রয়েছে। যেমন–নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলায় দীর্ঘদিন নির্বাচন না হওয়া এবং আদালতে মামলা চলা। একইভাবে নতুন গঠিত মাদারীপুরের ডাসার উপজেলায় সীমানা নির্ধারণ ও ভোটার তালিকা প্রণয়ন শেষ হয়নি। ফলে সব উপজেলায় একযোগে ভোট আয়োজন সম্ভব না হলে ধাপে ধাপে নির্বাচন করতে হবে।
৩৩০টি পৌরসভার বেশির ভাগই নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত থাকলেও কয়েকটিতে সীমানা সংক্রান্ত মামলার কারণে তাৎক্ষণিক ভোট আয়োজন সম্ভব নয়। এসব সীমিত জটিলতা ছাড়া পৌরসভা নির্বাচন তুলনামূলকভাবে দ্রুত আয়োজনযোগ্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।