মহামান্য, মাননীয় সমাচার

মহামান্য, মাননীয় সমাচার
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে শপথ পড়ান। ছবি: পিআইডি

সরকারি কর্মকর্তাকে ‘স্যার’ সম্বোধন না করায় মাঝেমাঝেই কিছু অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটে। যেগুলো সংবাদমাধ্যমে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বেশ সরব আলোচনার জন্ম দেয়। এবং অবধারিতভাবে দুটি পক্ষ কিছু দিন একে অপরের ওপর উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় করতে থাকেন। তারপর সব ঠান্ডা হয়ে যায়।

এমন এক প্রেক্ষাপটে গত বছরের ১৫ জুলাই বিবিসি বাংলা ‘স্যার’ সম্বোধনের সুলুক সন্ধান করেছিল। দীর্ঘ সেই আলোচনার এক জায়গায় বলা হয়, “জনপ্রশাসন বা সরকারি কর্মকর্তাদের ‘স্যার বা ম্যাডাম’ নামে সম্বোধনের রেওয়াজ বা রীতি যুগযুগ ধরে চলে এলেও ১৯৯০ সালে তা রদ করা হয়। ওই বছরের ১১ ডিসেম্বর সেই সময়ের সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ে এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করে। ওই মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব মো. ফজলুল হকের স্বাক্ষরে জারি করা প্রজ্ঞাপনে সরকারি অফিস বা প্রতিষ্ঠানে সম্বোধনের জন্য ‘স্যার’-এর পরিবর্তে ‘জনাব’ ব্যবহারের সুপারিশ করা হয়।”

বাংলাদেশে ‘স্যার’ বা ‘ম্যাডাম’ সম্বোধন সংক্রান্ত কোনো সরকারি আইন, বিধিমালা বা নীতিমালা নেই। এটি মূলত একটি প্রথাগত বা সামাজিক রীতি, যা শিক্ষা, প্রশাসন এবং করপোরেট জগতে বহুদিন ধরে চলে আসছে।

বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতিকে ‘মহামান্য’, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের দাপ্তরিকভাবে ‘মাননীয়’ সম্বোধন রীতি দীর্ঘদিনের। বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি অনুষ্ঠানে এই সম্বোধন বহুল প্রচলিত।

রাষ্ট্রাচার অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি যখন কোনো রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে, সংসদ অধিবেশনে ভাষণ দেন তার অনুষ্ঠানস্থলে ঢোকার সময় ঘোষণা দেওয়া হয়। তারপর বাজে বিউগল। এরপর অনুষ্ঠানের ঘোষক সবার উদ্দেশে রাষ্ট্রপতিকে ‘মহামান্য’ সম্বোধন করেন। এরপর রাষ্ট্রপতি নির্দিষ্ট স্থানে দাঁড়ানোর পর জাতীয় সংগীত বাজানো হয়।

তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের শপথের দিন গত মঙ্গলবার এসব নিয়ম মানা হয়। তবে শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনাকারী মন্ত্রিপরিষদ সচিব রাষ্ট্রপতিকে যখন ‘মাননীয়’ সম্বোধন করলেন তখন অভ্যস্ত কানে একটু খটকা লাগল। পুরো অনুষ্ঠান জুড়েই মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি রাষ্ট্রপতিকে ‘মাননীয়’ সম্বোধন করেছেন।

রাষ্ট্রাচারে কোনো পরিবর্তন এসেছে কি না সেটা খুঁজতে শুরু করলে কয়েকজন সরকারি কর্মকর্তা এবং আইনের অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান কার্জন জানালেন, সম্বোধন সংক্রান্ত কোনো আইনের কথা তাদের জানা নেই।

সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার (বর্তমানে জেলবন্দী) কাজী হাবিবুল আউয়াল ২০২১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর দৈনিক প্রথম আলোতে একটি নিবন্ধে লেখেন, “রাষ্ট্রপতি পদবির পূর্বে ‘মহামান্য’ এবং প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীগণের পদবির পূর্বে ‘মাননীয়’ সম্ভাষণ ব্যবহারের সাংবিধানিক বা সংবিধিবদ্ধ কোনো বাধ্যবাধকতা না থাকলেও বিষয়টি দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত রীতি।”

এই রীতি অনুযায়ী রাষ্ট্রপতিকে ‘মহামান্য’ সম্বোধন করা হয়। মন্ত্রিপরিষদ সচিব এই রীতি না মানলে আইনিভাবে কিছু বলার হয়ত নেই। কিন্তু সংবিধানের ১৫২ অনুচ্ছেদের একটি বিধান বলছে, “‘আইন’ অর্থ কোন আইন, অধ্যাদেশ, আদেশ, বিধি, প্রবিধান, উপ-আইন, বিজ্ঞপ্তি ও অন্যান্য আইনগত দলিল এবং বাংলাদেশে আইনের ক্ষমতাসম্পন্ন যে কোন প্রথা বা রীতি।”

২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর বর্তমান রাষ্ট্রপতি নিয়ে নানা কথা-আন্দোলন হয়েছিল। রাষ্ট্রপতিকে অপসারণেরও দাবি উঠেছিল। ওই সময় বিএনপি কোনো ধরনের ‘সাংবিধানিক সংকট’ যাতে না হয় সেজন্য রাষ্ট্রপতির অপসারণের বিপক্ষে ছিল। ব্যক্তির জায়গায় সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে গুরুত্ব দিয়ে ওই সময় বিএনপি প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে দেখাও করেছিলেন।

গত বছরের জুলাই মাসে অন্তর্বর্তী সরকার সরকারি কর্মকর্তাদের ‘স্যার’ বলে সম্বোধন করার নিয়ম বাতিল করে। উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

মন্ত্রিসভা থেকে নেওয়া অন্য অতিরঞ্জিত প্রটোকল নির্দেশিকা সংশোধনের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও সভায় আলোচনা হয়। জ্বালানি, সড়ক ও রেলপথ বিষয়ক উপদেষ্টা মোহাম্মদ ফাওজুল কবির খান এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানকে নিয়ে একটি কমিটিও গঠন করা হয়। ‘অতিরঞ্চিত প্রটোকল নির্দেশিকা’ সংশোধন নিয়ে কী সিদ্ধান্ত হয় তা নিয়ে পরে কোনো খবর আসেনি।

মন্ত্রিপরিষদ কোনো সিদ্ধান্ত নিয়েছিল কি না তাও জানা যায়নি। হয়ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়েছে, না হলে মন্ত্রিপরিষদ সচিব কেন আইনের ‘সমান’ রীতি বদলে রাষ্ট্রপতির সম্বোধন পরিবর্তন করলেন? কারণ, মন্ত্রিপরিষদ সচিব রাষ্ট্রীয় এসব আচার তিনি রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রাচার, রীতি এমন মেনে চলবেন এটা আলাদা করে বলার প্রয়োজন পড়ে না।

সম্পর্কিত