ছাত্রদলের নতুন কমিটি ঘোষণা ঘিরে দেশের বিভিন্ন জেলায় বিক্ষোভ ও উত্তেজনা ছড়ায়। পদবঞ্চিত নেতা-কর্মীরা কমিটিকে ‘পকেট কমিটি’ আখ্যা দিয়ে নানা স্থানে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেন। কোথাও সড়ক অবরোধ, কোথাও ঝাড়ু মিছিল, আবার কোথাও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবেগঘন প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। রাঙামাটিতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনকে ১৪৪ ধারা পর্যন্ত জারি করতে হয়েছে।
মেরিনা মিতু

‘চান্দা লাগলে চান্দা নে, নতুন করে কমিটি দে’, ‘অবৈধ কমিটি মানি না, মানব না’–ছাত্রদলের কমিটি ঘোষণার পর নানা জায়গায় হওয়া বিক্ষোভে এমনই সব স্লোগান শোনা গেছে। ক্ষমতাসীন দল বিএনপির সহযোগী সংগঠন হওয়ায় এর নেতৃত্ব পাওয়ার বিষয়ে অনেকেরই আগ্রহ। এদিকে বিদ্যমান কমিটির মেয়াদ শেষ। এ অবস্থায় দেশের বিভিন্ন জেলাসহ বিভিন্ন ইউনিটে বেশ কয়েকটি কমিটি ঘোষণা করা হলে শুরু হয় বিক্ষোভ, অভিযোগ।
২০২৪ সালের মার্চে গঠিত দুই বছর মেয়াদি কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ায় নতুন কমিটি নিয়ে আলাপ চললেও এখনো ছাত্রদল কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করতে পারেনি। তবে কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া চলছে। এরই অংশ হিসেবে গত শনিবার মধ্যরাতে একযোগে বেশ কয়েকটি ইউনিটে ছাত্রদলের কমিটি ঘোষণা করা হয়। এই কমিটিগুলোকে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা দেখছেন পরীক্ষামূলক হিসেবে।
কিন্তু ছাত্রদলের নতুন কমিটি ঘোষণা ঘিরে দেশের বিভিন্ন জেলায় বিক্ষোভ ও উত্তেজনা ছড়ায়। পদবঞ্চিত নেতা-কর্মীরা কমিটিকে ‘পকেট কমিটি’ আখ্যা দিয়ে নানা স্থানে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেন। কোথাও সড়ক অবরোধ, কোথাও ঝাড়ু মিছিল, আবার কোথাও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবেগঘন প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। রাঙামাটিতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনকে ১৪৪ ধারা পর্যন্ত জারি করতে হয়েছে।
সবচেয়ে বড় প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দিনকে ঘিরে। পদবঞ্চিত নেতা-কর্মীরা তার নিজ জেলা নোয়াখালীতে তাকে ‘অবাঞ্ছিত’ ঘোষণা করেন। নাছির উদ্দিনের ছবি সংবলিত প্ল্যাকার্ড পোড়ানোর ঘটনাও ঘটে। পরে নবগঠিত কমিটির ১০ নেতা পদত্যাগের ঘোষণা দেন।
গত শনিবার মধ্যরাতে একযোগে দেশের ৪৫টি ইউনিটে ছাত্রদলের কমিটি ঘোষণা করা হয়। বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ, জেলা ও মহানগর শাখায় এসব কমিটি গঠন করা হয়।
পদবঞ্চিতদের অভিযোগ, নাছির উদ্দিন তার অনুসারীদের দিয়ে ‘পকেট কমিটি’ গঠন করেছেন। একই সঙ্গে কমিটিতে ১৮ জন বিবাহিত নেতাকে পদ দেওয়ার অভিযোগও তোলা হয়েছে।
শুরুতে বলা স্লোগানগুলো দেওয়া হয়েছে কক্সবাজারে। জেলাটিতে বিক্ষোভকারীরা ‘চান্দা লাগলে চান্দা নে, নতুন করে কমিটি দে’, ‘অবৈধ কমিটি মানি না, মানব না’ এবং ‘রাতের আঁধারের পকেট কমিটি বাতিল কর’–এমন নানা স্লোগান দেন।
গত শনিবার মধ্যরাতে একযোগে দেশের ৪৫টি ইউনিটে ছাত্রদলের কমিটি ঘোষণা করা হয়। বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ, জেলা ও মহানগর শাখায় এসব কমিটি গঠন করা হয়। ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দিন স্বাক্ষরিত পৃথক বিজ্ঞপ্তিতে কমিটিগুলোর অনুমোদন দেওয়া হয়।
কমিটি ঘোষণার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। তৃণমূলের অনেক নেতা-কর্মী অভিযোগ করেন, ত্যাগী ও আন্দোলনে সক্রিয়দের বাদ দিয়ে ‘মাইম্যান’ বা অনুসারীদের প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। কেউ কেউ লিখেছেন, ‘ত্যাগীরা বঞ্চিত, সুবিধাভোগীরা পদ পেয়েছে।’
আবার অনেকে দাবি করেছেন, কমিটিতে অছাত্র, বিবাহিত ব্যক্তি এবং নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের সাবেক নেতা-কর্মীদেরও স্থান দেওয়া হয়েছে।
কেউ কেউ আবার নতুন কমিটির বিজ্ঞপ্তির ছবি দিয়ে ক্যাপশনে জুড়ে দিয়েছেন–‘গুপ্ত’ ছাত্রদলকেও রেহাই দিল না। অর্থাৎ, ছাত্রদলের কমিটিতে ছাত্রশিবিরও প্রবেশ করেছে বলে এক ধরনের অভিযোগ তোলা হচ্ছে।
বিভিন্ন স্থানে হওয়া বিক্ষোভে পদবঞ্চিত নেতা-কর্মীরা এমন অভিযোগও করেছেন যে, বিএনপির এক নেতার অনুসারী হওয়ায় অন্য নেতার প্রভাবে তাদের মূল্যায়ন করা হয়নি।

এদিকে পদ না পাওয়ার ক্ষোভে ফেসবুক লাইভে এসে কান্নাজড়িত প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন লক্ষ্মীপুর জেলা ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম সম্পাদক মো. জাহিদ। প্রায় সাড়ে নয় মিনিটের সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওতে তিনি কমিটিতে জায়গা না পাওয়ার হতাশা প্রকাশ করেন।
কক্সবাজার, নোয়াখালী ও রাঙামাটি ছাড়াও কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ, দিনাজপুরসহ বিভিন্ন জেলায় বিক্ষোভ কর্মসূচি পালিত হয়েছে। নতুন ঘোষিত আংশিক কমিটি নিয়েই যখন এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তখন পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা হলে সংকট আরও গভীর হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কী বলছেন বঞ্চিতরা?
কমিটি ঘোষণার পরদিনই পদবঞ্চিত বেশ কয়েকজন নেতা-কর্মী নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনেও বিক্ষোভ করেন। তাদের অভিযোগ, কমিটিতে অছাত্র, ব্যবসায়ী ও নব্যদের পদায়ন করা হয়েছে। টাকার বিনিময়ে পদ বিক্রি করা হয়েছে। সেখানে বিগত দিনের ত্যাগী, নির্যাতিত অনেককে বাদ দেওয়া হয়েছে।
নোয়াখালীতে নতুন কমিটিতে জ্যেষ্ঠ সহসভাপতির পদ পাওয়া আনোয়ার হোসেন ওরফে রকি চরচাকে বলেন, “দীর্ঘ ১৭ বছর আমরা কষ্টে ছিলাম। জেল খেটেছি, নানা অত্যাচার-নির্যাতনের শিকার হয়েছি। কিন্তু নতুন কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে আমাদের মূল্যায়ন করা হয়নি। কমিটি গঠনে কোনো ধরনের নিয়মনীতির তোয়াক্কা করা হয়নি। রাতের অন্ধকারে পকেট কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে।”

কিশোরগঞ্জ জেলা ছাত্রদলের সাবেক সহসভাপতি হুমায়ন কবির অমি চরচাকে বলেন, “ফ্যাসিস্টবিরোধী আন্দোলনে পরীক্ষিত, নির্যাতিত ও ত্যাগী নেতৃবৃন্দকে বাদ দিয়ে ঘোষিত কমিটি অবিলম্বে বাতিল করতে হবে। অন্যথায় কঠোর কর্মসূচির ঘোষণা দেওয়া হবে।”
এ ছাড়া ঘোষিত কমিটিকে ‘সিন্ডিকেট কমিটি’ আখ্যা দিয়ে পাট ও বস্ত্র প্রতিমন্ত্রী, কেন্দ্রীয় বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ও কিশোরগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতি শরীফুল আলমের বিরুদ্ধেও স্লোগান দেয় পদবঞ্চিত নেতারা।
জেলাটির পদবঞ্চিত নেতারা জানান, জেলা বিএনপির সভাপতি শরীফুল আলমের একাধিপত্য বিস্তারের উদ্দেশ্যে এই কমিটি দেওয়া হয়েছে। তারা এই কমিটি মানেন না। বিএনপির চেয়ারম্যানের কাছে তাদের আবেদন, যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হোক। অন্যথায় ভবিষ্যতে আরও কঠোর কর্মসূচি নিয়ে তারা রাজপথে নামবেন।
সংগঠনের ভাবমূর্তি নষ্টের আশঙ্কা
বিভিন্ন ইউনিটে আংশিক কমিটি ঘোষণার পর থেকে যে ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে এবং পদবঞ্চিতরা যে ধরনের অভিযোগ তুলছেন, তাতে ছাত্রদলের ভাবমূর্তি নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংগঠনটির সাবেক নেতারা।
ছাত্রদলের শীর্ষ পদে থাকা এক সাবেক নেতা চরচাকে বলেন, “কমিটিতে সবাইকে সমানভাবে মূলায়ন করার সুযোগ নাই। কেউ খুশি হবে, কেউ মন খারাপ করবে। কমিটি ঘোষণার পরপর এ ধরনের বিক্ষোভ নতুন কিছু না। আগে পরেও হয়েছে। কমিটি ঘিরে বঞ্চিতরা পল্টন অফিসের সামনে কফিন মিছিলও করেছে। তবে এবারের ব্যাপারটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখন বিএনপি সরকারে রয়েছে। এই কমিটি ঘিরে আকাঙ্ক্ষার জায়গাটা অনেক। তাছাড়া দীর্ঘ ১৭ বছরের জুলুম নির্যাতনের পর এই সময়ে এসে সবাই নিজের মূল্যায়ন চায়। তাই এই সময়ে এসে যদি কমিটিতে স্বচ্ছতার অভাব থাকে, তাহলে দল সামলানো কষ্ট হয়ে যাবে।”

আরেক ছাত্রনেতা বলেন, ”জেলা ইউনিটের কমিটি নিয়ে যে উত্তেজক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তাতে সামনের কেন্দ্রীয় কমিটি নিয়ে সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া দরকার। ইউনিট পর্যায়ের কমিটি নিয়ে বেশ কয়েকজন আহত হয়েছে। বলা যায়, কম সহিংসতা নিয়ে কোনোরকম ম্যানেজ হচ্ছে। তবে কেন্দ্রীয় কমিটি যদি প্রোপার ওয়েতে হ্যান্ডেল না করা যায়, তবে সেটা সহিংস পর্যায়ে যেতে পারে।”
ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদককে নিজ জেলায় অবাঞ্চিত ঘোষণার কথা জানিয়ে এই নেতা আরও বলেন, “চেইন অব কমান্ড যদি ভেঙে যায়, তাহলে দলের ভাবমূর্তি নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিষয়টাকে আরও গুরুত্ব সহকারে দেখতে হবে।”
কী বলছেন দায়িত্বশীল নেতারা?
জানতে চাইলে ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দিন নাছির চরচাকে বলেন, “গত ১৭ বছর ধরে ফ্যাসিবাদ কায়েম ছিল। সে সময়ে অনেকে নির্যাতিত এবং পরীক্ষিত। আমাদের এই সংগঠনগুলোতে যেটা জটিলতা তৈরি হয়, সেটি হচ্ছে–আমাদের তো সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক যেকোনো দুজনকে দায়িত্ব দেওয়া যায়, চাইলেই পাঁচজনকে দেওয়ার সুযোগ নেই।”
নাছির উদ্দিন বলেন, “যারা কমিটিতে পদ পেয়েছেন তারা যেমন যোগ্য, যারা সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদক না হয়ে অন্য পদ পেয়েছেন, তারাও যোগ্য। তবে এটাই বাস্তবতা যে, যেকোনো দুজনকে শীর্ষ দুটি পদ দিতে হবে, সেটা যেকোনো ভাবেই হোক, বিচার বিশ্লেষণ করে, সবকিছু মিলিয়ে। তাই বাকিরা হয় অন্য সংগঠন করবে বা ছাত্রসংগঠনে অন্য পদে পদায়িত হবে। এ বাস্তবতার বাইরে কেউ না, এটা সবাইকে মেনে নিতে হবে।”

অছাত্র, বিবাহিত ব্যক্তি বা ছাত্রলীগকে পুনর্বাসনের অভিযোগ সম্পর্কে নাছির বলেন, “যেহেতু ফ্যাসিবাদ ১৭ বছর কায়েম ছিল। সেই সময়ে প্রত্যেকেরই ত্যাগ রয়েছে, সুতরাং প্রত্যেকেরই প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু সেটা পূরণ না হওয়ায় একরকম ক্ষুব্ধতা থেকে এ ধরনের কথাবার্তা চলে আসছে। আমরা আশা করছি খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে।”
পকেট কমিটি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ছাত্রদলের এই নেতা বলেন, “পকেট কমিটি বলে কিছু নাই। এই কথাটি যারা বলছেন তারা ক্ষুব্ধ হয়ে বলছেন।”
ছাত্রদলকে কী বিএনপির নেতারা নিয়ন্ত্রণ করছেন–এমন প্রশ্নের জবাবে নাছির বলেন, “আমাদের ছাত্রদলের কমিটি পলিসি একান্ত সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত। আমাদের সহকর্মীদের মতামতের ভিত্তিতে (কমিটি) করা হয়ে থাকে। এখানে বিএনপির কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ নেই। সেই অর্থে তাদের কোনো মতামত নেওয়া হয় না। কে কার অনুসারী সেগুলো ভেল্যু রাখে না।”
কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া সম্পর্কে নাছির বলেন, “অনেকগুলো প্রক্রিয়ায় কমিটি দেওয়া হয়। একটি হচ্ছে ধারাবাহিক রাজনীতি কারা আসলে করেছে। এখন পর্যন্ত আমরা যে কমিটিগুলো করেছি, তারা ফ্যাসিবাদী সময়ে রাজপথে কতটা সক্রিয় ছিল বা শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ে কী ভূমিকা ছিল, কিংবা ভবিষ্যতে তার এই সক্ষমতা রয়েছে কিনা– সবগুলো বিষয়কে যাচাই-বাছাই করে আমরা আসলে এই কমিটিটা করি।”
আর যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া সম্পর্কে ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক বলেন, “আমাদের সেন্ট্রাল কমিটি রয়েছে, আমাদের টিম রয়েছে। তারা গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদন তৈরি করেন। পরে সেগুলো বিচার বিশ্লেষণ করে কমিটি দেওয়া হয়।”
তবে বিষয়টিকে সাময়িক অস্বস্তি হিসেবে দেখছেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী। চরচাকে তিনি বলেন, “দীর্ঘ দিনের লড়াই, আন্দোলন, ত্যাগের পর দলীয় নেতা-কর্মীরা এখন স্বস্তিতে আছে। দলকে তারা ভালোবাসে। তাই দলের প্রতি রাগ-অভিমানও হতে পারে। এটা সাময়িক। তারা আবার দলের সক্রিয় কর্মী হিসেবে দেশের জনগণের স্বার্থে কাজ করা শুরু করবে। এটাই জাতীয়তাবাদী আদর্শ।”

‘চান্দা লাগলে চান্দা নে, নতুন করে কমিটি দে’, ‘অবৈধ কমিটি মানি না, মানব না’–ছাত্রদলের কমিটি ঘোষণার পর নানা জায়গায় হওয়া বিক্ষোভে এমনই সব স্লোগান শোনা গেছে। ক্ষমতাসীন দল বিএনপির সহযোগী সংগঠন হওয়ায় এর নেতৃত্ব পাওয়ার বিষয়ে অনেকেরই আগ্রহ। এদিকে বিদ্যমান কমিটির মেয়াদ শেষ। এ অবস্থায় দেশের বিভিন্ন জেলাসহ বিভিন্ন ইউনিটে বেশ কয়েকটি কমিটি ঘোষণা করা হলে শুরু হয় বিক্ষোভ, অভিযোগ।
২০২৪ সালের মার্চে গঠিত দুই বছর মেয়াদি কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ায় নতুন কমিটি নিয়ে আলাপ চললেও এখনো ছাত্রদল কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করতে পারেনি। তবে কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া চলছে। এরই অংশ হিসেবে গত শনিবার মধ্যরাতে একযোগে বেশ কয়েকটি ইউনিটে ছাত্রদলের কমিটি ঘোষণা করা হয়। এই কমিটিগুলোকে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা দেখছেন পরীক্ষামূলক হিসেবে।
কিন্তু ছাত্রদলের নতুন কমিটি ঘোষণা ঘিরে দেশের বিভিন্ন জেলায় বিক্ষোভ ও উত্তেজনা ছড়ায়। পদবঞ্চিত নেতা-কর্মীরা কমিটিকে ‘পকেট কমিটি’ আখ্যা দিয়ে নানা স্থানে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেন। কোথাও সড়ক অবরোধ, কোথাও ঝাড়ু মিছিল, আবার কোথাও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবেগঘন প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। রাঙামাটিতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনকে ১৪৪ ধারা পর্যন্ত জারি করতে হয়েছে।
সবচেয়ে বড় প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দিনকে ঘিরে। পদবঞ্চিত নেতা-কর্মীরা তার নিজ জেলা নোয়াখালীতে তাকে ‘অবাঞ্ছিত’ ঘোষণা করেন। নাছির উদ্দিনের ছবি সংবলিত প্ল্যাকার্ড পোড়ানোর ঘটনাও ঘটে। পরে নবগঠিত কমিটির ১০ নেতা পদত্যাগের ঘোষণা দেন।
গত শনিবার মধ্যরাতে একযোগে দেশের ৪৫টি ইউনিটে ছাত্রদলের কমিটি ঘোষণা করা হয়। বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ, জেলা ও মহানগর শাখায় এসব কমিটি গঠন করা হয়।
পদবঞ্চিতদের অভিযোগ, নাছির উদ্দিন তার অনুসারীদের দিয়ে ‘পকেট কমিটি’ গঠন করেছেন। একই সঙ্গে কমিটিতে ১৮ জন বিবাহিত নেতাকে পদ দেওয়ার অভিযোগও তোলা হয়েছে।
শুরুতে বলা স্লোগানগুলো দেওয়া হয়েছে কক্সবাজারে। জেলাটিতে বিক্ষোভকারীরা ‘চান্দা লাগলে চান্দা নে, নতুন করে কমিটি দে’, ‘অবৈধ কমিটি মানি না, মানব না’ এবং ‘রাতের আঁধারের পকেট কমিটি বাতিল কর’–এমন নানা স্লোগান দেন।
গত শনিবার মধ্যরাতে একযোগে দেশের ৪৫টি ইউনিটে ছাত্রদলের কমিটি ঘোষণা করা হয়। বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ, জেলা ও মহানগর শাখায় এসব কমিটি গঠন করা হয়। ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দিন স্বাক্ষরিত পৃথক বিজ্ঞপ্তিতে কমিটিগুলোর অনুমোদন দেওয়া হয়।
কমিটি ঘোষণার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। তৃণমূলের অনেক নেতা-কর্মী অভিযোগ করেন, ত্যাগী ও আন্দোলনে সক্রিয়দের বাদ দিয়ে ‘মাইম্যান’ বা অনুসারীদের প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। কেউ কেউ লিখেছেন, ‘ত্যাগীরা বঞ্চিত, সুবিধাভোগীরা পদ পেয়েছে।’
আবার অনেকে দাবি করেছেন, কমিটিতে অছাত্র, বিবাহিত ব্যক্তি এবং নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের সাবেক নেতা-কর্মীদেরও স্থান দেওয়া হয়েছে।
কেউ কেউ আবার নতুন কমিটির বিজ্ঞপ্তির ছবি দিয়ে ক্যাপশনে জুড়ে দিয়েছেন–‘গুপ্ত’ ছাত্রদলকেও রেহাই দিল না। অর্থাৎ, ছাত্রদলের কমিটিতে ছাত্রশিবিরও প্রবেশ করেছে বলে এক ধরনের অভিযোগ তোলা হচ্ছে।
বিভিন্ন স্থানে হওয়া বিক্ষোভে পদবঞ্চিত নেতা-কর্মীরা এমন অভিযোগও করেছেন যে, বিএনপির এক নেতার অনুসারী হওয়ায় অন্য নেতার প্রভাবে তাদের মূল্যায়ন করা হয়নি।

এদিকে পদ না পাওয়ার ক্ষোভে ফেসবুক লাইভে এসে কান্নাজড়িত প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন লক্ষ্মীপুর জেলা ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম সম্পাদক মো. জাহিদ। প্রায় সাড়ে নয় মিনিটের সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওতে তিনি কমিটিতে জায়গা না পাওয়ার হতাশা প্রকাশ করেন।
কক্সবাজার, নোয়াখালী ও রাঙামাটি ছাড়াও কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ, দিনাজপুরসহ বিভিন্ন জেলায় বিক্ষোভ কর্মসূচি পালিত হয়েছে। নতুন ঘোষিত আংশিক কমিটি নিয়েই যখন এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তখন পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা হলে সংকট আরও গভীর হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কী বলছেন বঞ্চিতরা?
কমিটি ঘোষণার পরদিনই পদবঞ্চিত বেশ কয়েকজন নেতা-কর্মী নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনেও বিক্ষোভ করেন। তাদের অভিযোগ, কমিটিতে অছাত্র, ব্যবসায়ী ও নব্যদের পদায়ন করা হয়েছে। টাকার বিনিময়ে পদ বিক্রি করা হয়েছে। সেখানে বিগত দিনের ত্যাগী, নির্যাতিত অনেককে বাদ দেওয়া হয়েছে।
নোয়াখালীতে নতুন কমিটিতে জ্যেষ্ঠ সহসভাপতির পদ পাওয়া আনোয়ার হোসেন ওরফে রকি চরচাকে বলেন, “দীর্ঘ ১৭ বছর আমরা কষ্টে ছিলাম। জেল খেটেছি, নানা অত্যাচার-নির্যাতনের শিকার হয়েছি। কিন্তু নতুন কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে আমাদের মূল্যায়ন করা হয়নি। কমিটি গঠনে কোনো ধরনের নিয়মনীতির তোয়াক্কা করা হয়নি। রাতের অন্ধকারে পকেট কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে।”

কিশোরগঞ্জ জেলা ছাত্রদলের সাবেক সহসভাপতি হুমায়ন কবির অমি চরচাকে বলেন, “ফ্যাসিস্টবিরোধী আন্দোলনে পরীক্ষিত, নির্যাতিত ও ত্যাগী নেতৃবৃন্দকে বাদ দিয়ে ঘোষিত কমিটি অবিলম্বে বাতিল করতে হবে। অন্যথায় কঠোর কর্মসূচির ঘোষণা দেওয়া হবে।”
এ ছাড়া ঘোষিত কমিটিকে ‘সিন্ডিকেট কমিটি’ আখ্যা দিয়ে পাট ও বস্ত্র প্রতিমন্ত্রী, কেন্দ্রীয় বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ও কিশোরগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতি শরীফুল আলমের বিরুদ্ধেও স্লোগান দেয় পদবঞ্চিত নেতারা।
জেলাটির পদবঞ্চিত নেতারা জানান, জেলা বিএনপির সভাপতি শরীফুল আলমের একাধিপত্য বিস্তারের উদ্দেশ্যে এই কমিটি দেওয়া হয়েছে। তারা এই কমিটি মানেন না। বিএনপির চেয়ারম্যানের কাছে তাদের আবেদন, যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হোক। অন্যথায় ভবিষ্যতে আরও কঠোর কর্মসূচি নিয়ে তারা রাজপথে নামবেন।
সংগঠনের ভাবমূর্তি নষ্টের আশঙ্কা
বিভিন্ন ইউনিটে আংশিক কমিটি ঘোষণার পর থেকে যে ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে এবং পদবঞ্চিতরা যে ধরনের অভিযোগ তুলছেন, তাতে ছাত্রদলের ভাবমূর্তি নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংগঠনটির সাবেক নেতারা।
ছাত্রদলের শীর্ষ পদে থাকা এক সাবেক নেতা চরচাকে বলেন, “কমিটিতে সবাইকে সমানভাবে মূলায়ন করার সুযোগ নাই। কেউ খুশি হবে, কেউ মন খারাপ করবে। কমিটি ঘোষণার পরপর এ ধরনের বিক্ষোভ নতুন কিছু না। আগে পরেও হয়েছে। কমিটি ঘিরে বঞ্চিতরা পল্টন অফিসের সামনে কফিন মিছিলও করেছে। তবে এবারের ব্যাপারটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখন বিএনপি সরকারে রয়েছে। এই কমিটি ঘিরে আকাঙ্ক্ষার জায়গাটা অনেক। তাছাড়া দীর্ঘ ১৭ বছরের জুলুম নির্যাতনের পর এই সময়ে এসে সবাই নিজের মূল্যায়ন চায়। তাই এই সময়ে এসে যদি কমিটিতে স্বচ্ছতার অভাব থাকে, তাহলে দল সামলানো কষ্ট হয়ে যাবে।”

আরেক ছাত্রনেতা বলেন, ”জেলা ইউনিটের কমিটি নিয়ে যে উত্তেজক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তাতে সামনের কেন্দ্রীয় কমিটি নিয়ে সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া দরকার। ইউনিট পর্যায়ের কমিটি নিয়ে বেশ কয়েকজন আহত হয়েছে। বলা যায়, কম সহিংসতা নিয়ে কোনোরকম ম্যানেজ হচ্ছে। তবে কেন্দ্রীয় কমিটি যদি প্রোপার ওয়েতে হ্যান্ডেল না করা যায়, তবে সেটা সহিংস পর্যায়ে যেতে পারে।”
ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদককে নিজ জেলায় অবাঞ্চিত ঘোষণার কথা জানিয়ে এই নেতা আরও বলেন, “চেইন অব কমান্ড যদি ভেঙে যায়, তাহলে দলের ভাবমূর্তি নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিষয়টাকে আরও গুরুত্ব সহকারে দেখতে হবে।”
কী বলছেন দায়িত্বশীল নেতারা?
জানতে চাইলে ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দিন নাছির চরচাকে বলেন, “গত ১৭ বছর ধরে ফ্যাসিবাদ কায়েম ছিল। সে সময়ে অনেকে নির্যাতিত এবং পরীক্ষিত। আমাদের এই সংগঠনগুলোতে যেটা জটিলতা তৈরি হয়, সেটি হচ্ছে–আমাদের তো সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক যেকোনো দুজনকে দায়িত্ব দেওয়া যায়, চাইলেই পাঁচজনকে দেওয়ার সুযোগ নেই।”
নাছির উদ্দিন বলেন, “যারা কমিটিতে পদ পেয়েছেন তারা যেমন যোগ্য, যারা সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদক না হয়ে অন্য পদ পেয়েছেন, তারাও যোগ্য। তবে এটাই বাস্তবতা যে, যেকোনো দুজনকে শীর্ষ দুটি পদ দিতে হবে, সেটা যেকোনো ভাবেই হোক, বিচার বিশ্লেষণ করে, সবকিছু মিলিয়ে। তাই বাকিরা হয় অন্য সংগঠন করবে বা ছাত্রসংগঠনে অন্য পদে পদায়িত হবে। এ বাস্তবতার বাইরে কেউ না, এটা সবাইকে মেনে নিতে হবে।”

অছাত্র, বিবাহিত ব্যক্তি বা ছাত্রলীগকে পুনর্বাসনের অভিযোগ সম্পর্কে নাছির বলেন, “যেহেতু ফ্যাসিবাদ ১৭ বছর কায়েম ছিল। সেই সময়ে প্রত্যেকেরই ত্যাগ রয়েছে, সুতরাং প্রত্যেকেরই প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু সেটা পূরণ না হওয়ায় একরকম ক্ষুব্ধতা থেকে এ ধরনের কথাবার্তা চলে আসছে। আমরা আশা করছি খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে।”
পকেট কমিটি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ছাত্রদলের এই নেতা বলেন, “পকেট কমিটি বলে কিছু নাই। এই কথাটি যারা বলছেন তারা ক্ষুব্ধ হয়ে বলছেন।”
ছাত্রদলকে কী বিএনপির নেতারা নিয়ন্ত্রণ করছেন–এমন প্রশ্নের জবাবে নাছির বলেন, “আমাদের ছাত্রদলের কমিটি পলিসি একান্ত সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত। আমাদের সহকর্মীদের মতামতের ভিত্তিতে (কমিটি) করা হয়ে থাকে। এখানে বিএনপির কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ নেই। সেই অর্থে তাদের কোনো মতামত নেওয়া হয় না। কে কার অনুসারী সেগুলো ভেল্যু রাখে না।”
কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া সম্পর্কে নাছির বলেন, “অনেকগুলো প্রক্রিয়ায় কমিটি দেওয়া হয়। একটি হচ্ছে ধারাবাহিক রাজনীতি কারা আসলে করেছে। এখন পর্যন্ত আমরা যে কমিটিগুলো করেছি, তারা ফ্যাসিবাদী সময়ে রাজপথে কতটা সক্রিয় ছিল বা শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ে কী ভূমিকা ছিল, কিংবা ভবিষ্যতে তার এই সক্ষমতা রয়েছে কিনা– সবগুলো বিষয়কে যাচাই-বাছাই করে আমরা আসলে এই কমিটিটা করি।”
আর যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া সম্পর্কে ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক বলেন, “আমাদের সেন্ট্রাল কমিটি রয়েছে, আমাদের টিম রয়েছে। তারা গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদন তৈরি করেন। পরে সেগুলো বিচার বিশ্লেষণ করে কমিটি দেওয়া হয়।”
তবে বিষয়টিকে সাময়িক অস্বস্তি হিসেবে দেখছেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী। চরচাকে তিনি বলেন, “দীর্ঘ দিনের লড়াই, আন্দোলন, ত্যাগের পর দলীয় নেতা-কর্মীরা এখন স্বস্তিতে আছে। দলকে তারা ভালোবাসে। তাই দলের প্রতি রাগ-অভিমানও হতে পারে। এটা সাময়িক। তারা আবার দলের সক্রিয় কর্মী হিসেবে দেশের জনগণের স্বার্থে কাজ করা শুরু করবে। এটাই জাতীয়তাবাদী আদর্শ।”