Advertisement Banner

কবি সুকান্তকে যেভাবে বুঝেছিলেন সলিল ও হেমন্ত

কবি সুকান্তকে যেভাবে বুঝেছিলেন সলিল ও হেমন্ত
সলিল চৌধুরী, সুকান্ত ভট্টাচার্য ও হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। ছবি: সংগৃহীত

বাংলা শিল্পসাহিত্য-সংস্কৃতির তিন উজ্জ্বল ব্যক্তিত্বের মোহনা হয়ে উঠেছিল সুর। অথবা বলা যায়, সুর এসে মিলেছিল এই ত্রয়ীর কেন্দ্রে। বলছি, কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য, সংগীত পরিচালক সলিল চৌধুরী ও কণ্ঠশিল্পী হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কথা। সলিল ছিলেন কবি সুকান্তের বন্ধু। একসঙ্গে বামপন্থী রাজনীতি করতে করতে গান করা। পরে তাদের গানে কণ্ঠ মেলালেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। ততদিনে অবশ্য সুকান্ত বেঁচে নেই। ১৯৪৭ সালের ১৩ মে যক্ষ্মা-আক্রান্ত কবি মাত্র ২১ বছর বয়সে মারা যান।

চল্লিশের দশকের গোড়ার দিকে বাম রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন সুকান্ত। ওদিকে একই পথের পথিক বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী সলিল রাজনীতির পাশাপাশি দলের জন্য গণসংগীত রচনা ও সুর করেন। তখনও তিনি বাংলা ও হিন্দি সিনেমায় নাম করেননি। সলিল সুকান্তের চেয়ে প্রায় এক বছরের বড় হলেও দুজনের মধ্যে নিবিড় বন্ধুত্ব ছিল। সুকান্তই সলিল চৌধুরীকে বলেছিলেন, যদি সম্ভব হয়, সলিল যেন কোনোদিন তার কবিতাকে গানে রূপ দেয়। বন্ধুর কথা রেখেছিলেন বন্ধু।

পঞ্চাশের দশকের একেবারে শুরুতে গণসংগীত হিসেবেই সলিল সুকান্তর ‘অনুভব’ কবিতায় হাত দেন। ওই যে সেই বিখ্যাত কবিতা, ‘অবাক পৃথিবী! অবাক করলে তুমি/ জন্মেই দেখি ক্ষুব্ধ স্বদেশভূমি’। এই গানটিতেই প্রথম কণ্ঠ দেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়।

কবি বেঁচে থাকতে একটি কবিতায় সুর দিতে পেরেছিলেন সলিল। কবিতার শিরোনাম ‘রানার’। গান শুনে মুগ্ধ হয়েছিলেন সুকান্ত। তখনও এই গানের সঙ্গে যুক্ত হননি হেমন্ত। হেমন্ত এলেন সুকান্তর মৃত্যুর পর। প্রথমে সলিল সুকান্তের একটি কবিতায় সুর দিয়ে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কাছে যান। কিন্তু সেই গান পছন্দ হয়নি বলে হেমন্ত ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। সেই হেমন্তই পরে সলিল ও সুকান্তর গানগুলোকে নিজের অসামান্য গায়কী দিয়ে অমর করে দিলেন।

সুকান্তর কবিতাগুলো সলিল তুলে নিয়েছিলেন গণসংগীত করবেন বলে। সুকান্তর সমস্ত সাহিত্য গণমানুষের কথা বলে। যেন মানুষের ভাষার অনুবাদ হয়ে উঠেছিল তার কাব্য। এ প্রসঙ্গে গীতিকার গোবিন্দ হালদার বলছেন, “সুকান্ত অন্যান্যদের মতো সচেতন এবং সক্রিয়ভাবেই গণসংগীত রচনায় নিজেকে নিয়োজিত করেননি সত্য, কিন্তু তা সত্ত্বেও, সুকান্তর অনেক কবিতার মধ্যে বিক্ষুদ্ধ চল্লিশের দশক তার রূঢ় নগ্নতা এবং চারপাশের প্রচণ্ড ভাঙা গড়ার মধ্যে নতুন আশ্বাসের বার্তা নিয়ে যেভাবে নিজেকে উপস্থিত করেছিল, তাতে ছন্দগুণে দূরদর্শী এবং বলিষ্ঠ সুরকারের হাতে পড়ে সে-সব কবিতা গণনাট্য সঙ্ঘ পরিবেশিত গণসংগীতের ধারায় এক নতুন গতিবেগ এবং জীবন্ত প্রাণস্পন্দন জাগিয়েছিল। সংগ্রামী, মানুষের চেতনায় সেদিন তা বিদ্যুৎ-সঞ্চারের কাজ করেছিল। অবশ্য সুকান্তর কবিসত্তার বৈশিষ্ট্য ও তার প্রকাশভঙ্গীর ঋজুতাই ছিল অনেকখানি তার মূলে।”

পঞ্চাশের দশকের একেবারে শুরুতে গণসংগীত হিসেবেই সলিল সুকান্তর ‘অনুভব’ কবিতায় হাত দেন। ওই যে সেই বিখ্যাত কবিতা, ‘অবাক পৃথিবী! অবাক করলে তুমি/ জন্মেই দেখি ক্ষুব্ধ স্বদেশভূমি’। এই গানটিতেই প্রথম কণ্ঠ দেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। তার আগে গণনাট্যের আসরগুলোতে এই গান গাইতেন কণ্ঠশিল্পী দেবব্রত বিশ্বাস ও প্রীতি সরকার। দেবব্রতর বাড়িতে তো হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের আসা-যাওয়া ছিলই, তার বাড়িতেই হেমন্ত গানটি প্রথম শুনেছিলেন। এভাবেই গ্রামোফোন কোম্পানিতে স্নেহের হেমন্তকে দিয়ে গানটি রেকর্ড করান দেবব্রত।

১৯৭০ সালে সলিল হাজির করেন সুকান্তের ‘ঠিকানা আমার চেয়েছ বন্ধু/ ঠিকানার সন্ধান’ কবিতার গীতিরূপ। হেমন্ত কণ্ঠ দিলেন আর গানটি বাংলা গানের ইতিহাসে জায়গা করে নিল।

এরপর ১৯৫০ সালে সলিলের সুরে গান হয়ে ওঠা সুকান্তর আরও একটি কবিতায় কণ্ঠ দেন হেমন্ত, ‘বিদ্রোহ আজ বিদ্রোহ চারিদিকে’। কি ভীষণ প্রতিবাদী গান! গান নয়–যেন স্লোগান। তারপরই ১৯৫১ সালে এল সলিলের সুর দেওয়া সুকান্তর সেই বিখ্যাত কবিতা, ‘রানার ছুটেছে তাই ঝুম ঝুম্ ঘণ্টা বাজছে রাতে’। দরাজ কণ্ঠ দিয়ে গানটিকে চিরস্মরণীয় করে দিলেন হেমন্ত। অনেক পরে গানটি অন্য শিল্পীদের কণ্ঠেও সুখ্যাত হয়। আশির দশকের শেষের দিকে লতা মঙ্গেশকরকে দিয়েও সলিল গানটি গাইয়েছিলেন।

বিক্ষুব্ধ পঞ্চাশের দশকের পর একটি লম্বা সময় সলিল ও হেমন্তের যুগলবন্দীতে সুকান্ত উধাও। সম্ভবত তারা ব্যস্ত হয়ে পড়েন সিনেমার গানে। ১৯৭০ সালে সলিল হাজির করেন সুকান্তের ‘ঠিকানা আমার চেয়েছ বন্ধু/ ঠিকানার সন্ধান’ কবিতার গীতিরূপ। হেমন্ত কণ্ঠ দিলেন আর গানটি বাংলা গানের ইতিহাসে জায়গা করে নিল। চল্লিশের দশকে সুকান্ত লিখেছিলেন বিশ্বকবিকে নিবেদিত কবিতা ‘রবীন্দ্রনাথের প্রতি’। কবিতাটি ‘এখনো আমার মনে তোমার উজ্জ্বল উপস্থিতি’ দিয়ে শুরু হলেও, তাতে সমাজবাস্তবতার দুঃসহ ছবি ফুটে উঠেছে। ১৯৮১ সালে এই কবিতায়ও সুরারোপ করেন সলিল, কণ্ঠ দেন হেমন্ত। সম্ভবত এটিই সুকান্তের কথায় গাওয়া হেমন্তের শেষ গান।

সলিল ছাড়াও সুকান্তর কবিতাকে গানে রূপ দিয়েছেন আরও কয়েকজন সুরকার। কিন্তু সলিল হেমন্তের সহযোগিতায় সুকান্তর গানকে যে উচ্চতায় নিয়ে যেতে পেরেছেন, তা আর কেউ পারেননি। সলিল ও হেমন্ত পারলেন কেন? সম্ভবত আর কেউ গণমানুষের কবি সুকান্ত এবং তার সৃষ্টিকে তাদের মতো করে এত গভীরভাবে অনুধাবন করতে পারেননি বলে।

তথ্যসূত্র:

১. সুকান্ত স্মৃতি, সুজিত কুমার নাগ সম্পাদিত

২. দুরন্ত ঘূর্ণি, তাপস মল্লিক

৩. দেবব্রত বিশ্বাসের বাড়িতেই প্রথম ‘অবাক পৃথিবী’ শুনেছিলেন হেমন্ত, অংশুমান ভৌমিক, আনন্দবাজার পত্রিকা, ১৬ জুন ২০২০

৪. সুকান্ত-সঞ্চয়ন, ২০০২, সুকান্ত ভট্টাচার্য

৫. কাঁচরাপাড়ায় হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ও সলিল চৌধুরী, মধ্যিখানে সুকান্ত ভট্টাচার্য: তমাল সাহা

৬. ঝড়ের কাছে রেখে গেছেন ঠিকানা: সলিল চোধুরী, দৈনিক স্টেটসম্যান, ২৫ জানুয়ারি ২০২৫

সম্পর্কিত