Advertisement Banner

মামলার জটে বন্দী ন্যায়বিচার

মামলার জটে বন্দী ন্যায়বিচার
প্রতীকী ছবি

গাজীপুরের সখীপুরে নিখোঁজের প্রায় ৪০ ঘণ্টা পর দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী সেঁজুতি রানীর মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। বাড়ির পাশের দোকানে চিপস কিনতে গিয়ে শিশুটি আর ফেরেনি। কিছুদিন যাবৎ দেশে ধর্ষণ আর বলাৎকারের হলি খেলা চলছে। দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী রামিসা আক্তারকে ধর্ষণ ও হত্যার বিচার ১৯ দিনের মাথায় সম্পন্ন হলেও সেঁজুতির মতো অসংখ্য শিশুর মৃত্যুর রহস্য উদঘাটনেই হয়তো প্রয়োজন হবে এক যুগের। প্রশ্ন হচ্ছে, ১৯ দিনে একটি মামলার রায় সম্ভব হলে অন্য সব মামলায় এত দীর্ঘ সময় লাগে কেন? নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলার কার্যক্রম শুরু হওয়ার ১৮০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তির বাধ্যবাধকতা আছে। হাইকোর্টের নির্দেশনায় ২০১৬ সনে এই আইনের অধীনে মামলাগুলোর অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের জন্য বিশেষ সেল গঠন হলেও তা এখন আর কার্যকর নয়।

মামলার সংখ্যা পাহাড়সম। গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৭ সালে বিচার বিভাগ পৃথক হওয়ার সময় বিচারাধীন মামলা ছিল ১৬ লাখের ঘরে। বিগত উনিশ বছরে তা বেড়ে প্রায় ৪৮ লাখে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে আপিল বিভাগে বিচারাধীন মামলা ৪০ হাজারের কাছাকাছি, হাইকোর্ট বিভাগে সাড়ে ৬ লাখের বেশি এবং অধস্তন আদালতে ৪০ লাখের বেশি মামলা ঝুলে আছে। এই বিপুল মামলার বড় অংশই দেওয়ানি ও সম্পত্তির অধিকার সংক্রান্ত। ২০২৫ সালে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন ২০০০ সালের আগের দায়ের হওয়া ১০ হাজারের বেশি মামলা দ্রুত শুনানি ও নিষ্পত্তির জন্য তালিকা প্রকাশ করে নির্দেশনা দিয়েছিল। ফৌজদারি মামলা হাইকোর্টে স্থগিত হয়ে গেলে বছরের পর বছর আর শুনানির উদ্যোগ নেওয়া হয় না। নিষ্পত্তির চেয়ে নতুন মামলা বেশি হওয়ায় জট প্রতিদিন বাড়ছে।

দ্রুত গতিতে উচ্চ ও অধস্তন আদালতে দেওয়ানি, ফৌজদারি মামলা রুজু হচ্ছে। রাজনৈতিক মামলার সমারোহ নিষ্পত্তির কোনো তাগিদ ছাড়াই চলছে। একটি মামলায় জামিন হলে জেলগেটে গ্রেপ্তার করে আরেকটি মামলা দিয়ে জেলে ঢোকানো হয়। বুদ্ধিজীবীরা বলেন, মামলা মোকাবিলা করে সাফসুতরো হয়ে আসুন। কিন্তু সাফসুতরো হতে গিয়ে বহু নিরীহ ব্যক্তি পথের ভিখারি হয়ে গেছে। মামলা দুই দিন, দুই বছর বা দুই যুগেও শেষ হয় না। আদালতের বারান্দায় ঘুরতে ঘুরতে জীবন শেষ।

হাইকোর্টের দেওয়া জামিন চেম্বার জজে স্থগিত হলে তার নিষ্পত্তি হতে ৭-৮ বছর লেগে যায়। অভিযুক্ত ব্যক্তি নিরপরাধী হলে তার প্রতি এই অন্যায়ের বিচার করবে কে?

বিচারপ্রার্থীর ভোগান্তি শুধু সময়ের নয়, অর্থেরও। একটি দেওয়ানি মামলা নিষ্পত্তি হতে যে খরচ হয় তা অনেক সময় বিরোধপূর্ণ সম্পত্তির মূল্যকেও ছাড়িয়ে যায়। শ্রম আদালতে করা মামলার রায় আসে চাকরি থেকে অবসরের পর। তখন সেই রায় দিয়ে ক্ষতিপূরণ পেলেও হারানো সময় ফেরে না। সাধারণ মানুষ তাই আদালতে যেতে ভয় পায়। বিচার পাওয়ার চেয়ে বিচার এড়িয়ে আপস করাই তাদের কাছে সহজ মনে হয়। এতে সমাজে সালিশের নামে প্রভাবশালীদের দৌরাত্ম্য বাড়ে এবং রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা কমে।

তদন্ত সংস্থার দুর্বলতা মামলাজটের আরেকটি বড় কারণ। চার্জশিট দিতে বছরের পর বছর লেগে যায়। সাক্ষী হাজির হয় না, আলামত নষ্ট হয়, মামলার মেরিট দুর্বল হয়ে পড়ে। অথচ বিচারককে এই দুর্বল নথির ওপর ভিত্তি করেই রায় দিতে হয়। দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল গঠন করে দুই একটি মামলার রায় দ্রুত দেওয়া যায়, কিন্তু পুরো ব্যবস্থা না বদলালে লাখ লাখ মামলার জট খুলবে না। আলোচিত মামলায় তৎপরতা আর সাধারণ মামলায় নির্লিপ্ততা ন্যায়বিচারের ধারণাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।

সব সরকারের আমলেই রাজনৈতিক মামলার ঢল নামে। ব্যক্তি মামলা করছে এই যুক্তিতে সরকার দায় এড়াতে পারে না, কারণ বিচার ব্যবস্থার গতি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। মিথ্যা অভিযোগের শাস্তি হয় না বলেই মামলার সংখ্যা বাড়ে। প্রতিপক্ষকে হয়রানির জন্য তারিখের পর তারিখ নেওয়ার কৌশল চলে। তনু হত্যা, সাগর রুনি হত্যার মতো আলোচিত মামলা নিয়ে মিছিল হয়েছে, মানববন্ধন হয়েছে; অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে এই দুটি হত্যার মামলার অগ্রগতির কোনো সংবাদ পাওয়া যায়নি। মামলা নিয়ে রাজনীতি হয় বলেই জট খুলতে প্রশাসন আন্তরিক হয় না।

সমাধান তিনটি জায়গায় জরুরি। প্রথম, বিচারক সংকট দূর করা। গণমাধ্যমের হিসাব বলছে উচ্চ আদালতে বিচারকপ্রতি ছয় হাজারের বেশি মামলার চাপ। এই বোঝা নিয়ে গতি আসবে না। দ্বিতীয়, প্রযুক্তির পূর্ণ ব্যবহার। ই-ফাইলিং, ই-কজলিস্ট, ভার্চুয়াল শুনানি নিশ্চিত হলে তারিখের নামে কালক্ষেপণ কমবে। তৃতীয়, জবাবদিহি। অকারণে সময় প্রার্থনা করলে আইনজীবী এবং তদন্তে গাফিলতি করলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার আর্থিক জরিমানা ও বিভাগীয় শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তিকে বাধ্যতামূলক করতে হবে। পারিবারিক, দেওয়ানি ও ছোটখাটো ফৌজদারি বিরোধ আদালতের বাইরে মীমাংসার আইনি কাঠামো আছে, কিন্তু প্রয়োগ নেই। প্রতিটি জেলায় শক্তিশালী মধ্যস্থতা কেন্দ্র চালু করে মামলা রুজুর আগেই বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করলে আদালতের ওপর চাপ অর্ধেক কমে যাবে। একই সঙ্গে মিথ্যা মামলা প্রমাণিত হলে বাদীর জন্য দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান কার্যকর করা জরুরি। নইলে প্রতিহিংসার হাতিয়ার হিসেবে মামলার অপব্যবহার থামবে না।

দেশ জুড়ে আলোড়ন তোলা কিছু অপরাধের ঘটনা গণমাধ্যমে গুরুত্ব পেলে অনেক সময় সরকার উদ্যোগ নেয় দ্রুত বিচারের, যেমন নেওয়া হয়েছে রামিসার ক্ষেত্রে। দ্রুত বিচার শুধু রামিসার জন্য নয়, সেঁজুতির মতো প্রতিটি নাগরিকের জন্য রাষ্ট্রের সাংবিধানিক অঙ্গীকার রয়েছে। ১৮০ দিনের আইনি বাধ্যবাধকতা থাকার পরও বছরের পর বছর ঝুলে থাকা মানে, রাষ্ট্র নিজেই আইন ভাঙছে। এই পাহাড়সম জট ভাঙতে না পারলে ন্যায়বিচার শব্দটাই একদিন অর্থহীন হয়ে পড়বে।

লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক।

সম্পর্কিত