চরচা ডেস্ক

এক মাসের বেশি যুদ্ধের পর গত ৮ এপ্রিল দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। এই যুদ্ধবিরতিতে মধ্যস্ততা করার জন্য দুই দেশের পক্ষ থেকেই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ এবং ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানো হয়। এরপর ২১ এপ্রিল যুদ্ধবিরতি শেষ হওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেন, পাকিস্তানের অনুরোধে ওই যুদ্ধবিরতি অনির্দিষ্টকালের জন্য বাড়ানো হয়েছে, যাতে আলোচনার সুযোগ অব্যাহত থাকে।
ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, আলোচনায় যে ফলই সামনে আসুক না কেন, পাকিস্তানিদের মধ্যে কিছুটা গর্ববোধের কারণ রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে দেশটি মূলত আইএমএফের ধারাবাহিক ঋণ সহায়তা এবং সন্ত্রাসী তৎপরতার জন্য পরিচিত ছিল। কিন্তু এখন দেশটি বৈশ্বিক ক্ষমতার রাজনীতিতে দক্ষ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হচ্ছে।
এই পুরো প্রক্রিয়ার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন সেনাপ্রধান আসিম মুনির, যাকে ট্রাম্প তার ‘প্রিয় ফিল্ড মার্শাল’ বলে অভিহিত করেছেন। পুরো সংকটজুড়ে পাকিস্তানের এই সেনাপ্রধান নিয়মিত ট্রাম্প এবং তার ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ রেখেছেন বলে জানা যায়।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, তিনি আলোচনার বিস্তারিত বিষয়ে গভীরভাবে যুক্ত ছিলেন। গত সপ্তাহে প্রথম দফা আলোচনার সময় তাকে প্রায়ই মনোযোগ দিয়ে নোট নিতে দেখা গেছে।

সাবেক গোয়েন্দা প্রধান হিসেবে পরিচিত আসিম মুনির গত সপ্তাহে তিন দিন তেহরানেও অবস্থান করেন। যুদ্ধবিরতির পর এটিই ছিল ইরানে প্রথম কোনো উচ্চপর্যায়ের সফর। সেখানে তিনি ইরানের শীর্ষ রাজনৈতিক ও সামরিক নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। এরপরই ইরান হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার ইঙ্গিত দেয় যদিও পরে ট্রাম্পের নৌ অবরোধের কারণে সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে।
দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, পর্যবেক্ষকদের অনেকেই এই সামরিক নেতার কূটনৈতিক তৎপরতায় বিস্মিত হয়েছেন। তবে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে যারা তার উত্থান পর্যবেক্ষণ করেছেন, তাদের ভাষ্য যে তিনি চতুর, কৌশলী, কঠোর এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষী।
২০২২ সালে সেনাপ্রধান হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর দ্রুত পাকিস্তানের সবচেয়ে প্রভাবশালী নেতায় পরিণত হন আসিম মুনির। প্রথমে তিনি সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণ সুসংহত করেন, পরে বিরোধী শক্তিকে দুর্বল করেন এবং সরকারের ওপর প্রভাব বিস্তার করেন। সাংবিধানিক কৌশলের মাধ্যমে তিনি দীর্ঘমেয়াদে, এমনকি এক দশক বা তারও বেশি সময়ের জন্য নিজের অবস্থান নিশ্চিত করেছেন বলে ধারণা করা হয়। পাকিস্তানে এখন আর কারও সন্দেহ নেই যে সিদ্ধান্ত গ্রহণের মূল ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের নয় বরং আসিম মুনিরের হাতে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ফিল্ড মার্শাল মুনিরের লক্ষ্য হলো পাকিস্তানকে বিশ্ব ব্যবস্থায় তার ‘প্রাপ্য অবস্থানে’ পৌঁছে দেওয়া। যদিও দেশের কোটি কোটি মানুষ এখনও দারিদ্র্য ও অর্থনৈতিক সংকটে ভুগছে।
এখন প্রশ্ন হলো—আসিম মুনির কি এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে দেশকে সামনে এগিয়ে নিতে পারবেন, নাকি আরেকজন সামরিক শাসকের আধিপত্য পাকিস্তানের দীর্ঘস্থায়ী সমস্যাগুলোকে আরও গভীর করবে?
দ্য ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এটি প্রথমবার নয় যে পাকিস্তান উচ্চপর্যায়ের বৈশ্বিক কূটনীতিতে জড়িত হয়েছে। দেশটির সামরিক নেতৃত্ব দীর্ঘদিন ধরেই বৈশ্বিক কূটনৈতিক মঞ্চে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে আগ্রহী ছিল বলে এক সাবেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান। ১৯৭২ সালে প্রেসিডেন্ট নিক্সনের চীন সফরের আগে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে গোপন যোগাযোগের সেতুবন্ধন হিসেবেও তিন বছর কাজ করেছিল পাকিস্তান।
এবার পরিস্থিতি ভিন্ন হওয়ার যুক্তি শুরু হয় ইরানকে কেন্দ্র করে। সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের মধ্যে কিছুটা সদিচ্ছা দেখা গেলেও দীর্ঘদিন ধরে পাকিস্তান ও ইরানের সম্পর্ক জটিল, বিশেষ করে সীমান্তের দুই পাশে বিদ্রোহী কার্যক্রমের কারণে তা আরও জটিল হয়েছে। পাকিস্তান আশঙ্কা করছে, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে শরণার্থীর ঢল বাড়তে পারে এবং দেশের বড় শিয়া জনগোষ্ঠীর মধ্যে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।
তবে কূটনৈতিক সাফল্য অর্জন করতে পারলে পাকিস্তান পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে কূটনীতিকদের আশা। এতে দেশটি তার বিপুল তরুণ জনশক্তির জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারবে। পাশাপাশি, ইরান-পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পিত গ্যাস পাইপলাইন প্রকল্পের ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের জন্যও এই কূটনৈতিক অবস্থান ব্যবহার করা যেতে পারে।
দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির পাকিস্তানের সামরিক শক্তিকেও কাজে লাগাতে চান।
সাবেক সিনেটর মুশাহিদ হুসেইনের মতে, যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে উপসাগরীয় দেশগুলো আরও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চয়তা নিয়ে তাদের আস্থা কমে যাবে। এই প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় এবং কার্যকর প্রতিষ্ঠান হলো তার সুশৃঙ্খল সেনাবাহিনী। চলতি বছরে তাদের প্রতিরক্ষা ব্যয় প্রায় এক-পঞ্চমাংশ বেড়েছে।
গত বছর সৌদি আরবের সঙ্গে সই করা পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তিকে একটি মডেল হিসেবে দেখা হচ্ছে। ইতোমধ্যে পাকিস্তানের প্রায় ১৩ হাজার সেনা ও ১৮টি যুদ্ধবিমান সৌদি আরবে মোতায়েন রয়েছে। যদিও চুক্তিটি প্রকাশ করা হয়নি, তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, নিরাপত্তা নিশ্চয়তার বিনিময়ে সৌদি আরব বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এছাড়া মিসর, পাকিস্তান, সৌদি আরব, তুরস্কসহ কয়েকটি দেশকে নিয়ে একটি সম্ভাব্য ‘ইসলামিক ন্যাটো’ গঠনের আলোচনাও চলছে, যা প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়াতে পারে।

ভারতের জন্যও সাম্প্রতিক কয়েক সপ্তাহ একটি বাস্তবতার পরীক্ষা ছিল বলে মন্তব্য করেছেন পাকিস্তানের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিনা রব্বানি খার। তার মতে, ভারত দীর্ঘদিন ধরে পাকিস্তানকে কূটনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করলেও পাকিস্তান মধ্যপ্রাচ্যে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করতে সক্ষম হয়েছে। অন্যদিকে, ভারত এখন অনেকটা পর্যবেক্ষকের ভূমিকায় রয়েছে।
তবে ভূরাজনৈতিক সাফল্য দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলো মোকাবিলায় তেমন সহায়ক নাও হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, আইএমএফ নির্ভরতা ও সন্ত্রাসী তৎপরতা—এই দুই চ্যালেঞ্জ এখনও বিদ্যমান। এক দশকে দেশটির জীবনমানও খুব একটা উন্নত হয়নি। অর্থনীতিকে কার্যকর করার জন্য সেনা নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর দিকেই মূলত মনোযোগ দিচ্ছেন ফিল্ড মার্শাল মুনির। তার নেতৃত্বাধীন বিনিয়োগ কাউন্সিল এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখাতে পারেনি।
যুদ্ধ শুরুর পর জ্বালানি মূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে জনঅসন্তোষ দেখা দিলেও বিরোধী দলগুলোর ওপর কঠোর নজরদাড়ির কারণে বড় ধরনের প্রতিবাদ হয়নি। বড় শহরগুলোতে গ্যাস সংকট ও ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেখা দিচ্ছে, আর আগামী মাসগুলোতে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এসব সমস্যা সমাধানে ব্যর্থ হলে ফিল্ড মার্শাল মুনির আরও কঠোর দমননীতির দিকে ঝুঁকতে পারেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান বর্তমানে কারাবন্দি অবস্থায় রয়েছেন। জনপ্রিয়তার রাজনীতির মাধ্যমে ক্ষমতায় এলেও ২০২২ সালে রাজনৈতিক ও সামরিক মহলের বিরোধিতায় তিনি ক্ষমতাচ্যুত হন এবং পরে বিতর্কিত মামলায় কারাবন্দি হন। কারাগারে থাকাকালেও তার জনপ্রিয়তা বেড়েছে বলে দাবি তার পরিবারের।
বিরোধী দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) নেতারা অভিযোগ করছেন, দমন-পীড়নের মাধ্যমে তাদের কর্মীদের আটক করা হচ্ছে এবং আন্দোলন দমিয়ে রাখা হচ্ছে। একই সঙ্গে কয়েকশ মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলেও দাবি করা হচ্ছে।
অন্যদিকে অভিজ্ঞ ইসলামপন্থী রাজনীতিক ফজলুর রহমান ২০২৪ সালের নির্বাচনকে কারচুপির অভিযোগে প্রশ্নবিদ্ধ করলেও তিনি আবারও ফিল্ড মার্শালকে ‘ভালো মানুষ এবং সাহসী সৈনিক’ বলে উল্লেখ করেন।
দ্য ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাকিস্তানে এখনো নামমাত্র গণতান্ত্রিক সংবিধান বিদ্যমান থাকলেও বাস্তবে এটি একটি ‘হাইব্রিড’ শাসনব্যবস্থা, যা আরও বেশি সামরিক নিয়ন্ত্রণের দিকে ঝুঁকছে। একাধিক সূত্রের মতে, বর্তমানে বেসামরিক সরকারের ভূমিকা অনেকটাই আনুষ্ঠানিক হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং সেনাবাহিনীর প্রভাব প্রকাশ্যেই স্বীকৃত।
আগে পাকিস্তানের সামরিক প্রধানরা পর্দার আড়াল থেকে ক্ষমতা প্রয়োগ করতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন, যাতে রাজনৈতিক নেতারা জনরোষের মুখোমুখি হন। তবে ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির এখন সরাসরি ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছেন বলে বিশ্লেষকদের মত।

এক মাসের বেশি যুদ্ধের পর গত ৮ এপ্রিল দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। এই যুদ্ধবিরতিতে মধ্যস্ততা করার জন্য দুই দেশের পক্ষ থেকেই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ এবং ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানো হয়। এরপর ২১ এপ্রিল যুদ্ধবিরতি শেষ হওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেন, পাকিস্তানের অনুরোধে ওই যুদ্ধবিরতি অনির্দিষ্টকালের জন্য বাড়ানো হয়েছে, যাতে আলোচনার সুযোগ অব্যাহত থাকে।
ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, আলোচনায় যে ফলই সামনে আসুক না কেন, পাকিস্তানিদের মধ্যে কিছুটা গর্ববোধের কারণ রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে দেশটি মূলত আইএমএফের ধারাবাহিক ঋণ সহায়তা এবং সন্ত্রাসী তৎপরতার জন্য পরিচিত ছিল। কিন্তু এখন দেশটি বৈশ্বিক ক্ষমতার রাজনীতিতে দক্ষ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হচ্ছে।
এই পুরো প্রক্রিয়ার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন সেনাপ্রধান আসিম মুনির, যাকে ট্রাম্প তার ‘প্রিয় ফিল্ড মার্শাল’ বলে অভিহিত করেছেন। পুরো সংকটজুড়ে পাকিস্তানের এই সেনাপ্রধান নিয়মিত ট্রাম্প এবং তার ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ রেখেছেন বলে জানা যায়।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, তিনি আলোচনার বিস্তারিত বিষয়ে গভীরভাবে যুক্ত ছিলেন। গত সপ্তাহে প্রথম দফা আলোচনার সময় তাকে প্রায়ই মনোযোগ দিয়ে নোট নিতে দেখা গেছে।

সাবেক গোয়েন্দা প্রধান হিসেবে পরিচিত আসিম মুনির গত সপ্তাহে তিন দিন তেহরানেও অবস্থান করেন। যুদ্ধবিরতির পর এটিই ছিল ইরানে প্রথম কোনো উচ্চপর্যায়ের সফর। সেখানে তিনি ইরানের শীর্ষ রাজনৈতিক ও সামরিক নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। এরপরই ইরান হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার ইঙ্গিত দেয় যদিও পরে ট্রাম্পের নৌ অবরোধের কারণে সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে।
দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, পর্যবেক্ষকদের অনেকেই এই সামরিক নেতার কূটনৈতিক তৎপরতায় বিস্মিত হয়েছেন। তবে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে যারা তার উত্থান পর্যবেক্ষণ করেছেন, তাদের ভাষ্য যে তিনি চতুর, কৌশলী, কঠোর এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষী।
২০২২ সালে সেনাপ্রধান হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর দ্রুত পাকিস্তানের সবচেয়ে প্রভাবশালী নেতায় পরিণত হন আসিম মুনির। প্রথমে তিনি সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণ সুসংহত করেন, পরে বিরোধী শক্তিকে দুর্বল করেন এবং সরকারের ওপর প্রভাব বিস্তার করেন। সাংবিধানিক কৌশলের মাধ্যমে তিনি দীর্ঘমেয়াদে, এমনকি এক দশক বা তারও বেশি সময়ের জন্য নিজের অবস্থান নিশ্চিত করেছেন বলে ধারণা করা হয়। পাকিস্তানে এখন আর কারও সন্দেহ নেই যে সিদ্ধান্ত গ্রহণের মূল ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের নয় বরং আসিম মুনিরের হাতে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ফিল্ড মার্শাল মুনিরের লক্ষ্য হলো পাকিস্তানকে বিশ্ব ব্যবস্থায় তার ‘প্রাপ্য অবস্থানে’ পৌঁছে দেওয়া। যদিও দেশের কোটি কোটি মানুষ এখনও দারিদ্র্য ও অর্থনৈতিক সংকটে ভুগছে।
এখন প্রশ্ন হলো—আসিম মুনির কি এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে দেশকে সামনে এগিয়ে নিতে পারবেন, নাকি আরেকজন সামরিক শাসকের আধিপত্য পাকিস্তানের দীর্ঘস্থায়ী সমস্যাগুলোকে আরও গভীর করবে?
দ্য ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এটি প্রথমবার নয় যে পাকিস্তান উচ্চপর্যায়ের বৈশ্বিক কূটনীতিতে জড়িত হয়েছে। দেশটির সামরিক নেতৃত্ব দীর্ঘদিন ধরেই বৈশ্বিক কূটনৈতিক মঞ্চে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে আগ্রহী ছিল বলে এক সাবেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান। ১৯৭২ সালে প্রেসিডেন্ট নিক্সনের চীন সফরের আগে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে গোপন যোগাযোগের সেতুবন্ধন হিসেবেও তিন বছর কাজ করেছিল পাকিস্তান।
এবার পরিস্থিতি ভিন্ন হওয়ার যুক্তি শুরু হয় ইরানকে কেন্দ্র করে। সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের মধ্যে কিছুটা সদিচ্ছা দেখা গেলেও দীর্ঘদিন ধরে পাকিস্তান ও ইরানের সম্পর্ক জটিল, বিশেষ করে সীমান্তের দুই পাশে বিদ্রোহী কার্যক্রমের কারণে তা আরও জটিল হয়েছে। পাকিস্তান আশঙ্কা করছে, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে শরণার্থীর ঢল বাড়তে পারে এবং দেশের বড় শিয়া জনগোষ্ঠীর মধ্যে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।
তবে কূটনৈতিক সাফল্য অর্জন করতে পারলে পাকিস্তান পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে কূটনীতিকদের আশা। এতে দেশটি তার বিপুল তরুণ জনশক্তির জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারবে। পাশাপাশি, ইরান-পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পিত গ্যাস পাইপলাইন প্রকল্পের ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের জন্যও এই কূটনৈতিক অবস্থান ব্যবহার করা যেতে পারে।
দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির পাকিস্তানের সামরিক শক্তিকেও কাজে লাগাতে চান।
সাবেক সিনেটর মুশাহিদ হুসেইনের মতে, যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে উপসাগরীয় দেশগুলো আরও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চয়তা নিয়ে তাদের আস্থা কমে যাবে। এই প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় এবং কার্যকর প্রতিষ্ঠান হলো তার সুশৃঙ্খল সেনাবাহিনী। চলতি বছরে তাদের প্রতিরক্ষা ব্যয় প্রায় এক-পঞ্চমাংশ বেড়েছে।
গত বছর সৌদি আরবের সঙ্গে সই করা পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তিকে একটি মডেল হিসেবে দেখা হচ্ছে। ইতোমধ্যে পাকিস্তানের প্রায় ১৩ হাজার সেনা ও ১৮টি যুদ্ধবিমান সৌদি আরবে মোতায়েন রয়েছে। যদিও চুক্তিটি প্রকাশ করা হয়নি, তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, নিরাপত্তা নিশ্চয়তার বিনিময়ে সৌদি আরব বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এছাড়া মিসর, পাকিস্তান, সৌদি আরব, তুরস্কসহ কয়েকটি দেশকে নিয়ে একটি সম্ভাব্য ‘ইসলামিক ন্যাটো’ গঠনের আলোচনাও চলছে, যা প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়াতে পারে।

ভারতের জন্যও সাম্প্রতিক কয়েক সপ্তাহ একটি বাস্তবতার পরীক্ষা ছিল বলে মন্তব্য করেছেন পাকিস্তানের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিনা রব্বানি খার। তার মতে, ভারত দীর্ঘদিন ধরে পাকিস্তানকে কূটনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করলেও পাকিস্তান মধ্যপ্রাচ্যে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করতে সক্ষম হয়েছে। অন্যদিকে, ভারত এখন অনেকটা পর্যবেক্ষকের ভূমিকায় রয়েছে।
তবে ভূরাজনৈতিক সাফল্য দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলো মোকাবিলায় তেমন সহায়ক নাও হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, আইএমএফ নির্ভরতা ও সন্ত্রাসী তৎপরতা—এই দুই চ্যালেঞ্জ এখনও বিদ্যমান। এক দশকে দেশটির জীবনমানও খুব একটা উন্নত হয়নি। অর্থনীতিকে কার্যকর করার জন্য সেনা নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর দিকেই মূলত মনোযোগ দিচ্ছেন ফিল্ড মার্শাল মুনির। তার নেতৃত্বাধীন বিনিয়োগ কাউন্সিল এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখাতে পারেনি।
যুদ্ধ শুরুর পর জ্বালানি মূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে জনঅসন্তোষ দেখা দিলেও বিরোধী দলগুলোর ওপর কঠোর নজরদাড়ির কারণে বড় ধরনের প্রতিবাদ হয়নি। বড় শহরগুলোতে গ্যাস সংকট ও ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেখা দিচ্ছে, আর আগামী মাসগুলোতে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এসব সমস্যা সমাধানে ব্যর্থ হলে ফিল্ড মার্শাল মুনির আরও কঠোর দমননীতির দিকে ঝুঁকতে পারেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান বর্তমানে কারাবন্দি অবস্থায় রয়েছেন। জনপ্রিয়তার রাজনীতির মাধ্যমে ক্ষমতায় এলেও ২০২২ সালে রাজনৈতিক ও সামরিক মহলের বিরোধিতায় তিনি ক্ষমতাচ্যুত হন এবং পরে বিতর্কিত মামলায় কারাবন্দি হন। কারাগারে থাকাকালেও তার জনপ্রিয়তা বেড়েছে বলে দাবি তার পরিবারের।
বিরোধী দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) নেতারা অভিযোগ করছেন, দমন-পীড়নের মাধ্যমে তাদের কর্মীদের আটক করা হচ্ছে এবং আন্দোলন দমিয়ে রাখা হচ্ছে। একই সঙ্গে কয়েকশ মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলেও দাবি করা হচ্ছে।
অন্যদিকে অভিজ্ঞ ইসলামপন্থী রাজনীতিক ফজলুর রহমান ২০২৪ সালের নির্বাচনকে কারচুপির অভিযোগে প্রশ্নবিদ্ধ করলেও তিনি আবারও ফিল্ড মার্শালকে ‘ভালো মানুষ এবং সাহসী সৈনিক’ বলে উল্লেখ করেন।
দ্য ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাকিস্তানে এখনো নামমাত্র গণতান্ত্রিক সংবিধান বিদ্যমান থাকলেও বাস্তবে এটি একটি ‘হাইব্রিড’ শাসনব্যবস্থা, যা আরও বেশি সামরিক নিয়ন্ত্রণের দিকে ঝুঁকছে। একাধিক সূত্রের মতে, বর্তমানে বেসামরিক সরকারের ভূমিকা অনেকটাই আনুষ্ঠানিক হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং সেনাবাহিনীর প্রভাব প্রকাশ্যেই স্বীকৃত।
আগে পাকিস্তানের সামরিক প্রধানরা পর্দার আড়াল থেকে ক্ষমতা প্রয়োগ করতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন, যাতে রাজনৈতিক নেতারা জনরোষের মুখোমুখি হন। তবে ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির এখন সরাসরি ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছেন বলে বিশ্লেষকদের মত।