লাটভিয়ায় সোহেল রানা নামে এক বাংলাদেশির মৃত্যু হয়েছে। মানব পাচারকারীদের মাধ্যমে ইতালি যাওয়ার পথে লাটভিয়ার একটি জঙ্গল থেকে তাকে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। সোহেল রানা মানব পাচারকারীদের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
মৃত সোহেল রানা ঝিনাইদহ সদর উপজেলার হালিধানী ইউনিয়নের আবুল হাসেমের ছেলে। পরিবারের সদস্যরা জানান, গত ৮ অক্টোবর লাটভিয়ার লাতগালে অঞ্চলের দাউগাভপিলস শহরের একটি হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়।
এ ঘটনায় তার স্ত্রী জেসমিন সুলতানা গত সোমবার ঝিনাইদহে মানবপাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমনসংক্রান্ত ট্রাইব্যুনালে নয়জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন।
বার্তা সংস্থা ইউএনবি এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
মামলার অভিযুক্তরা হলেন শামসুন্নাহার (৫৫), তার স্বামী শাহজাহান সরকার (৫৮), তাদের দুই ছেলে ইতালিপ্রবাসী সোহাগ (৩৫) ও কাতারপ্রবাসী নাসির সরকার (৩২), আবুল কালাম সরকারের ছেলে সোহেল রানা (৪১), শাহজাহানের জামাতা আবদুর রাজ্জাক (৫০), সোহাগ সরকারের স্ত্রী টনি সরকার (৩২), মিসরপ্রবাসী রিয়াদ দেওয়ান (৩৫) এবং জেলার সদর উপজেলার রামচন্দ্রপুর গ্রামের শরিফুল সরকার (৪৮)।
মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, বৈধভাবে ইতালি পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে অভিযুক্তরা প্রথমে সোহেলের কাছ থেকে ২৬ লাখ টাকা নেন। এরপর ২০২৫ সালের ৬ এপ্রিল তাকে কাতারে পাঠানো হয়।
সোহেলের স্ত্রী অভিযোগ করেন, ৯০ দিনের মধ্যে তার সোহেলকে ইতালি নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হলেও তাকে কোনো কাজের ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়নি।
পরে তার দেশে ফেরার জন্য ফিরতি টিকিট পাঠানো হলে অভিযুক্তরা তাকে দেশে ফিরতে বাধা দেন। এরপর মিসর হয়ে ইতালি পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে আরও পাঁচ লাখ টাকা দাবি করেন তারা।
অভিযোগ অনুযায়ী, টাকা পাওয়ার পর গত ১৪ আগস্ট তাকে মিসরে পাঠানো হয়।
গত ২৫ আগস্ট সোহেলের ফোনের মাধ্যমে পরিবারের কাছে আরও ২০ লাখ টাকা দাবি করা হয়। পরে ৯ অক্টোবর আরও সাড়ে চার লাখ টাকা চাওয়া হয়। সোহেলের জীবন বাঁচানোর চেষ্টা হিসেবে পরিবার পাঁচ কিস্তিতে টাকা পাঠায় বলে তার স্ত্রী অভিযোগ করেন।
গত ১২ অক্টোবর লাটভিয়ার পুলিশ বার্তার মাধ্যমে পরিবারকে জানায়, ৭ অক্টোবর সোহেলকে একটি জঙ্গল থেকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। পরদিন সেখানেই তার মৃত্যু হয়।
সোহেলের ভগ্নিপতি ইশতিয়াক আহমেদ মঙ্গলবার বলেন, তাদের পরিবারকে সোহেলকে বৈধভাবে ইতালি পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল।
কিন্তু গত দেড় বছরে তাকে বিভিন্ন দেশে ঘোরানো হয়। এক পর্যায়ে তাকে নির্যাতন করে লাটভিয়া-বেলারুশ সীমান্তের কাছে একটি জঙ্গলে ফেলে রেখে যাওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
ইশতিয়াক জানান, পরে পোল্যান্ডে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে তারা জানতে পারেন, লাটভিয়ার সীমান্তরক্ষীরা অসুস্থ অবস্থায় সোহেলকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, একই চক্র অন্তত ১২ জনকে বিভিন্ন দেশে নিয়ে গেছে। অবৈধ পথে ইতালি পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাদের কাছ থেকে কয়েক কোটি টাকা নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, গারামারা গ্রামের রিপন মিয়া, রামচন্দ্রপুর গ্রামের হামেদ আলী এবং মৃত তাইজেল মাস্টারের ছেলে জগৎ আলী নামের আরও তিন ব্যক্তি প্রায় ১২ বছর ধরে নিখোঁজ রয়েছেন।
তাদের পরিবারগুলোর সন্দেহ, তারাও ওই কথিত মানবপাচার চক্রের শিকার হয়ে থাকতে পারেন। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
হালিধানী ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য শহিদুল ইসলাম বলেন, রামচন্দ্রপুরসহ ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকার অন্তত ১৫ জনের কাছ থেকে ইতালি পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে ওই চক্র টাকা নিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, তাদের মধ্যে কয়েকজন গন্তব্যে পৌঁছাতে না পেরে বর্তমানে বিভিন্ন দেশে আটকে আছেন।
হালিধানী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট এনামুল হক নিলু বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি জানতে পেরেছেন, জঙ্গল থেকে উদ্ধারের পর লাটভিয়ার একটি হাসপাতালে সোহেলের মৃত্যু হয়েছে। ঘটনাটিকে তিনি অত্যন্ত মর্মান্তিক বলে বর্ণনা করেন।
এ বিষয়ে গতকাল মঙ্গলবার যোগাযোগ করা হলে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শেখ বিল্লাল হোসেন বলেন, এ ঘটনা সম্পর্কে পুলিশ সদর দপ্তর বা কোনো বিদেশি দূতাবাস থেকে তারা এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো তথ্য পাননি।
তিনি বলেন, তথ্য পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।