আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে ‘সরাসরি যুদ্ধের’ ঘোষণা পাকিস্তানের

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে ‘সরাসরি যুদ্ধের’ ঘোষণা পাকিস্তানের
আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণা করেছে পাকিস্তান। ছবি: রয়টার্স

পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সীমান্তে নতুন করে সংঘর্ষের পর ইসলামাবাদ আফগান তালেবান সরকারের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। গত শুক্রবার পাকিস্তান আফগানিস্তানের কাবুল এবং কান্দাহারে বোমা হামলা চালানোর পর এই উত্তেজনা চরম রূপ নেয়। এর মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে আফগান বাহিনী পাকিস্তানি সীমান্ত রক্ষীদের ওপর হামলা চালিয়েছিল, যাকে তালেবান সরকার চলতি সপ্তাহের শুরুতে পাকিস্তানের প্রাণঘাতী বিমান হামলার প্রতিশোধ হিসেবে বর্ণনা করেছে।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।

পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী খাজা আসিফ এক্স-এ এক পোস্টে বলেন, ‘‘আমাদের ধৈর্যের সীমা ছাড়িয়ে গেছে। এখন আমাদের এবং আপনাদের মধ্যে সরাসরি যুদ্ধ শুরু হলো।’’

সহিংসতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে উভয় দেশের সামরিক বাহিনী একে অপরের কয়েক ডজন সেনা হত্যার দাবি করেছে। যার ফলে কাতার-মধ্যস্থতাকারী যুদ্ধবিরতি চুক্তিটি এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।

এনডিটিভি জানায়, কাবুলে অন্তত তিনটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে, তবে আফগান রাজধানীতে হামলার সঠিক স্থান বা হতাহতের বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তালেবান সরকারের মুখপাত্র জবিহুল্লাহ মুজাহিদ জানিয়েছেন, পাকিস্তান দক্ষিণ কান্দাহার এবং দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় পাক্তিয়া প্রদেশেও বিমান হামলা চালিয়েছে।

এর কয়েক ঘণ্টা আগে, আফগানিস্তান জানিয়েছিল যে গত রোববার আফগান সীমান্ত এলাকায় পাকিস্তানের প্রাণঘাতী বিমান হামলার প্রতিশোধ নিতে বৃহস্পতিবার রাতে তারা সীমান্ত পেরিয়ে হামলা চালিয়েছে এবং পাকিস্তানের এক ডজনেরও বেশি সেনা চৌকি দখল করার দাবি করেছে। আফগান প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এই স্থল অভিযানে তাদের ৮ সেনা নিহত হয়েছে।

এএফপি নিউজ এজেন্সিকে এক আফগান কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তোরখাম সীমান্ত পারাপারের কাছে পাকিস্তান থেকে ফিরে আসা শরণার্থীদের একটি ক্যাম্পে হামলায় বেশ কয়েকজন বেসামরিক নাগরিক আহত হয়েছেন। নানগারহার প্রদেশের কর্মকর্তা কোরেশি বাদলুন বলেন, ‘‘একটি মর্টার শেল ক্যাম্পে আঘাত হেনেছে এবং দুর্ভাগ্যবশত আমাদের ৭ জন শরণার্থী আহত হয়েছে, যার মধ্যে একজন নারীর অবস্থা আশঙ্কাজনক।’’

বার্তা সংস্থা এপির প্রতিবেদনে বলা হয়, পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী কাবুল, কান্দাহার এবং পাক্তিয়া প্রদেশে আফগান সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালিয়েছে এবং অভিযোগ করেছে যে তারা দুটি ব্রিগেড বেস ধ্বংস করেছে, তবে হতাহতের কোনো উল্লেখ করেনি।

পাকিস্তান সরকার গত রোববারের বিমান হামলাকে ওই এলাকায় আশ্রয় নেওয়া জঙ্গিদের ওপর হামলা হিসেবে বর্ণনা করেছিল। তারা বৃহস্পতিবারের আফগান হামলায় সেনা চৌকি দখলের দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে।

আফগান তালেবানের বিরুদ্ধে অপারেশন গজব লিল-হক শুরু করার ঘোষণা দিয়ে পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার এক্স-এ লিখেছেন, ‘‘কাবুল, পাক্তিয়া এবং কান্দাহারে আফগান তালেবানের প্রতিরক্ষা লক্ষ্যবস্তুগুলোতে হামলা চালানো হয়েছে।’’

পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার মাধ্যম পিটিভি নিউজ জানিয়েছে, পাকিস্তানি বাহিনী কাবুল, কান্দাহার এবং পাক্তিয়ায় আফগান তালেবানের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্যবস্তু করেছে। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, কাবুলে দুটি ব্রিগেড সদর দপ্তর, কান্দাহারে একটি কোর সদর দপ্তর ও একটি ব্রিগেড সদর দপ্তর এবং পাক্তিয়ায় একটি কোর সদর দপ্তর ধ্বংস করা হয়েছে।

পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নকভি বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্যবস্তু করার জন্য আফগান তালেবানের নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘‘কাপুরুষ শত্রু রাতের অন্ধকারে আঘাত হেনেছে। আফগান তালেবান নির্দোষ বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্যবস্তু করার একটি ঘৃণ্য চেষ্টা চালিয়েছে। এই ভুলের জন্য তাদের গুরুতর পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে।’’

আফগানিস্তানের দাবি, তারা ৫৫ জন পাকিস্তানি সেনাকে হত্যা করেছে এবং কয়েকজনকে জীবিত বন্দি করা হয়েছে। তারা নিজেদের ৮ জন নিহত এবং ১১ জন আহত হওয়ার কথা জানিয়েছে। এছাড়া ১৯টি পাকিস্তানি সেনা চৌকি ও দুটি ঘাঁটি ধ্বংস করার দাবি করেছে। আফগানিস্তান আরও দাবি করেছে যে তারা পাকিস্তানের একটি এফ-১৬ যুদ্ধবিমান গুলি করে ভূপাতিত করেছে এবং এর প্রমাণ হিসেবে একটি জ্বলন্ত বিমানের ভিডিও পোস্ট করেছে।

এদিকে পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার জানিয়েছেন, মাত্র ২ জন পাকিস্তানি সেনা নিহত এবং ৩ জন আহত হয়েছেন। অন্যদিকে, ৩৬ জন আফগান যোদ্ধা নিহত হওয়ার কথা তিনি উল্লেখ করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর মুখপাত্র মোশাররফ আলী জাইদি কোনো সেনা বন্দি হওয়ার খবর অস্বীকার করেছেন। তিনি দাবি করেছেন যে ১৩৩ জন আফগান যোদ্ধা নিহত ও ২০০ জনের বেশি আহত হয়েছে।

আফগানিস্তান-পাকিস্তানের মধ্যে গত কয়েক মাস ধরেই উত্তেজনা বিরাজ করছে। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস উভয় পক্ষকে বেসামরিক নাগরিকদের রক্ষা করার এবং কূটনীতির মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের আহ্বান জানিয়েছেন।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাকিস্তানে জঙ্গি সহিংসতা বৃদ্ধি পেয়েছে, যার জন্য ইসলামাবাদ সরাসরি তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) এবং বেলুচ বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোকে দায়ী করে। পাকিস্তানের অভিযোগ, টিটিপি আফগানিস্তানের মাটি ব্যবহার করে এসব হামলা চালায়, যদিও কাবুল এবং টিটিপি উভয়ই এই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।

সম্পর্কিত