ঢাকার সাভারের রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় নকশাবহির্ভূত ভবন নির্মাণে অবহেলার অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা মামলায় ভবনটির মালিক সোহেল রানাসহ আটজনের বিরুদ্ধে রায় ঘোষণার তালিকা থেকে আবারও মামলাটি যুক্তিতর্কের জন্য উত্তোলন করেছেন আদালত।
আজ মঙ্গলবার ঢাকার বিভাগীয় স্পেশাল জজ বি. এম. তারিকুল কবীরের আদালতে মামলাটির রায় ঘোষণার জন্য দিন নির্ধারিত ছিল। তবে বিচারক রায় ঘোষণা থেকে স্বতঃপ্রণোদিতভাবে মামলাটি উত্তোলন করে অধিকতর যুক্তিতর্কের জন্য আগামী ৬ অক্টোবর দিন নির্ধারণ করেছেন।
সংশ্লিষ্ট আদালতের বেঞ্চ সহকারী আরিফুল ইসলাম এ তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, মামলাটি রায় ঘোষণার তালিকা থেকে উত্তোলন করে অধিকতর যুক্তিতর্কের শুনানির জন্য বিচারক দিন নির্ধারণ করেছেন। এই আদেশ তিনি (বিচারক) স্বতঃপ্রণোদিতভাবে দিয়েছেন। কোনো পক্ষের আবেদন ছিল না বলে জানিয়েছেন বেঞ্চ সহকারী।
মামলার অপর আসামিরা হলেন সাভার পৌরসভার সাবেক মেয়র রেফাত উল্লাহ, সাভার পৌরসভার সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা উত্তম কুমার রায়, নির্বাহী প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম, সাবেক সহকারী প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমান, সাবেক উপসহকারী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান রাসেল, সাভার পৌরসভার সাবেক টাউন প্ল্যানার ফারজানা ইসলাম ও লাইসেন্স পরিদর্শক মো. আব্দুল মোত্তালিব।
আসামিদের মধ্যে সোহেল রানা এ মামলায় জামিনে থাকলেও হত্যা মামলায় কারাগারে রয়েছেন। এদিন তাকে কারাগার থেকে আদালতে হাজির করা হয়।
আসামি মাহবুবুর রহমান ও ফারজানা ইসলাম শুরু থেকেই পলাতক রয়েছেন। অপর আসামিরা জামিনে আছেন। এদিন তারা আদালতে হাজিরা দেন।
মামলার বিচার চলাকালে রানার বাবা আবদুল খালেক ও মা মর্জিনা খাতুন বেগম মারা যান। তাদের মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
মামলার অভিযোগে বলা হয়, ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সাভার বাসস্ট্যান্ড-সংলগ্ন রানা প্লাজা ধসে এক হাজার ১৩৬ জন নিহত এবং দেড় হাজারের বেশি মানুষ আহত হন। ঘটনার পরপরই ভবন নির্মাণে দুর্নীতির অনুসন্ধানে নামে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।২০১৪ সালের ১৫ জুন নকশাবহির্ভূত ভবন নির্মাণের অভিযোগে সাভার থানায় ১৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন দুদকের উপসহকারী পরিচালক এস এম মফিদুল ইসলাম। ভবনটি সোহেল রানার বাবার নামে হওয়ায় ওই সময় মূল অভিযুক্ত সোহেল রানাকে বাদ দিয়েই তার বাবা-মাসহ ১৭ জনের বিরুদ্ধে মামলাটি করা হয়। তদন্তে সোহেল রানাই ভবনের মূল দেখভালকারী ছিলেন বলে প্রমাণিত হলে তাকে অভিযোগপত্রে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
মামলার অভিযোগপত্রে বলা হয়, ‘রানা প্লাজা’ নামে সাততলা একটি শপিং কমপ্লেক্স নির্মাণের জন্য ২০০৬ সালের ১০ এপ্রিল নকশা অনুমোদন করে সাভার পৌরসভা। ২০০৮ সালের ২২ জানুয়ারি ওই ছয়তলা ভবনের ওপর আরও চারতলা নির্মাণের অনুমোদন চাওয়া হয়েছিল। তাছাড়া রানা প্লাজা নির্মাণের আগে শপিং কমপ্লেক্স করার কথা বলা হলেও পরে সেখানে পাঁচটি গার্মেন্ট কারখানা স্থাপনের অনুমতি দেয় সাভার পৌরসভা।
২০১৭ সালের ২১ মে ১০ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরু হয়। ওই সময় আটজনকে অব্যাহতির আদেশ দেন আদালত। মামলার বিচার চলাকালে আদালতে ২০ জন সাক্ষীর মধ্যে ১৯ জন সাক্ষ্য দেন।
উল্লেখ্য, ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল রানা প্লাজা নামের ভবন ধসে এক হাজার ১১৭ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও ১৯ জন মারা যান। ধ্বংসস্তূপ থেকে ২ হাজার ৪৩৮ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। উদ্ধার করা লাশের মধ্যে ৮৪৪টি নিহতদের স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ডিএনএ পরীক্ষার নমুনা রেখে ২৯১ জনের অশনাক্ত লাশ জুরাইন কবরস্থানে দাফন করা হয়।
উদ্ধার করা জীবিতদের মধ্যে ১ হাজার ৫২৪ জন আহত হন। তাদের মধ্যে গুরুতর আহত হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করেন ৭৮ জন। এ ঘটনার পরে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার সময় একই বছরের ২৯ এপ্রিল বেনাপোল থেকে সোহেল রানাকে গ্রেপ্তার করে র্যাব। এরপর থেকে তিনি কারাগারে আটক রয়েছেন।