এবার এলএনজির অভাবে বন্ধ হয়ে গেছে এক্সিলারেট এনার্জির এফএসআরইউ। ফলে গ্যাসের অভাবে আবারো দেশজুড়ে বেড়েছে লোডশেডিং। তিনদিনের ব্যবধানে আবারো লোডশেডিং ছাড়িয়েছে আড়াই হাজার মেগাওয়াট।
কক্সবাজারের মহেশখালীতে এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) গতকাল বুধবার বেলা ৩টা থেকে সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। নতুন করে এলএনজি মজুত না থাকায় টার্মিনালটি চালু রাখা সম্ভব হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন পেট্রোবাংলার একজন কর্মকর্তা।
এলএনজি সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদনে। বুধবার বিকেল থেকে দেশজুড়ে লোডশেডিং হঠাৎ বেড়ে যায়। বুধবার সকাল ১০টায় যেখানে সারা দেশে বিদ্যুতের ঘাটতি ছিল মাত্র ১১৭ মেগাওয়াট। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে লোডশেডিং বাড়তে থাকে। দুপুর ১২টায় ঘাটতি দাঁড়ায় ৫৬৩ মেগাওয়াটে, বেলা ১টায় তা ১ হাজার ১৯১ মেগাওয়াটে দাঁড়ায়। বিকেল ৩টায় সেই ঘাটতি বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৮৩৪ মেগাওয়াটে। সন্ধ্যা ৭টায় আবারো লোডশেডিং ছাড়িয়ে যায় আড়াই হাজার মেগাওয়াট। এ সময় ১৭ হাজার ৩৪৫ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয় ১৪ হাজার ৮১৫ মেগাওয়াট।
এর আগে, গত ২১ জুলাই এক্সিলারেটের টার্মিনালে আগুন লাগার পর থেকে দেশ টানা ২৫ দিন তীব্র গ্যাস–সংকটের মুখে পড়ে দেশ। মেরামত কাজ শেষে গত শনিবার সামিট পুরোদমে এবং এক্সিলারেট আংশিকভাবে চালু হলে সরবরাহ বেড়ে দাঁড়ায় ২৪২ কোটি ঘনফুটে।
নতুন এলএনজি কার্গো না আসায় রোববার দেশে গ্যাস সরবরাহ কমে দাঁড়ায় ২৪০ কোটি ঘনফুটে। সোমবার তা আরও কমে হয় ২২৮ কোটি ঘনফুট। বুধবার এক্সিলারেট এনার্জির এফএসআরইউ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর গ্যাস সরবরাহ আরও কমে নেমেছে ২১৮ কোটি ঘনফুটে।
জ্বালানি বিভাগের অনুমোদনে দেশে এলএনজি আমদানি তদারকি করে পেট্রোবাংলা, আর আমদানির দায়িত্ব পালন করে পেট্রোবাংলার অধীন রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (আরপিজিসিএল)।
পেট্রোবাংলা ও আরপিজিসিএল পক্ষ থেকে জানানো হয়, নিয়মিত প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে কম দামে এলএনজি কিনতে সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে বেশ কিছু কার্গোর ক্রয়াদেশ দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে চারটি কার্গো এ মাসেই আসার কথা থাকলেও এগুলোর একটিও আসেনি। ফলে টার্মিনাল প্রস্তুত থাকলেও গ্যাস সরবরাহ করা যাচ্ছে না।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা জানান, আজ বৃহস্পতিবার এক কার্গো এলএনজি আসার কথা রয়েছে, তবে সেটি যুক্ত হবে সামিটের টার্মিনালে। এক্সিলারেটের জন্য নির্দিষ্ট কার্গো আসতে অপেক্ষা করতে হবে ২৩ থেকে ২৪ আগস্ট পর্যন্ত। অর্থাৎ আগামী কয়েক দিন এক্সিলারেটের টার্মিনাল বন্ধ থাকবে। এই সময় গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটে জনভোগান্তি আরও বাড়ার আশঙ্কা থেকে যাচ্ছে।
দেশে দিনে গ্যাসের চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট। স্বাভাবিক সময়ে এর মধ্যে ২৭০ কোটি ঘনফুট সরবরাহ করা হয়। এই এলএনজি সরবরাহ হয় মহেশখালীর দুটি ভাসমান টার্মিনাল থেকে। মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালের দৈনিক সক্ষমতা ৬০ কোটি ঘনফুট, আর দেশি কোম্পানি সামিটের টার্মিনালের সক্ষমতা ৫০ কোটি ঘনফুট। এক্সিলারেট বন্ধ থাকায় সেই ভারসাম্য এখন পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে।
গ্যাসের অভাবে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পুরো সক্ষমতায় চলতে পারছে না। গত ১০ আগস্ট রাতে সারা দেশে চাহিদার তুলনায় বিদ্যুতের ঘাটতি ছিল ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াট। ৯ থেকে ১৩ আগস্ট পর্যন্ত প্রায় প্রতিদিনই ঘাটতি ছিল ২ হাজার থেকে ৩ হাজার মেগাওয়াটের ওপরে।
এরপর এলএনজি সরবরাহ স্বাভাবিক হতে থাকলে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়। ১৫ থেকে ১৮ আগস্টের মধ্যে লোডশেডিং কমে এসেছিল। গত সোমবার (১৮ আগস্ট) দুপুরে ঘাটতি ছিল মাত্র ১৭০ মেগাওয়াট। একটি এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ হতেই কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পরিস্থিতি ফের খারাপ হতে থাকে।
এক্সিলারেটের জন্য নতুন কার্গো আসার আগ পর্যন্ত অর্থাৎ আগামী ২৩-২৪ আগস্ট পর্যন্ত টার্মিনালটি বন্ধ থাকবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে। ততদিন গ্যাসের সংকট এবং তার জেরে লোডশেডিং আরও বাড়তে পারে। এই সময়ে দেশের মানুষকে গরমে বিদ্যুৎবিহীন দীর্ঘ সময় পার করতে হতে পারে বলে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।