ভাষাদিবস কী সার্বজনীন হতে পেরেছে?

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
ভাষাদিবস কী সার্বজনীন হতে পেরেছে?
কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার। ছবি: বাসস

“আমি চাই সাঁওতাল তার ভাষায় বলবে রাষ্ট্রপুঞ্জে”—কবীর সুমনের গানের এই পঙ্‌ক্তিটি যেমন রাজনৈতিকভাবে সচেতন, তেমনি বর্তমান সময়ের বাস্তবতায় কিছুটা ‘ইউটোপিয়ান’ বা অলীকও শোনায়। আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে এই আলাপটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। কেন প্রাসঙ্গিক, তা বুঝতে একটু পেছনের প্রেক্ষাপট দেখে নেওয়া দরকার।

পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই ভাষা নিয়ে যে বিতর্ক দানা বাঁধে, ১৯৫২ সালে তা গণআন্দোলনে রূপ নেয়। রাজপথে রক্ত ঝরিয়েও যখন আন্দোলন দমন করা গেল না, তখন শাসকগোষ্ঠী নতিস্বীকার করতে বাধ্য হয়। উর্দুর পাশাপাশি বাংলাও পায় রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা। পাকিস্তানের প্রায় ৫৬ শতাংশ মানুষের ভাষাকে উপেক্ষা করে সংখ্যালঘু উর্দুভাষীদের ভাষাকে চাপিয়ে দেওয়ার হঠকারী সিদ্ধান্তটি ছিল মূলত একটি বিশাল জনগোষ্ঠীকে পরিচয় সংকটে ফেলে দেওয়ার ষড়যন্ত্র।

ভাষা আন্দোলনের পেছনে কেবল আবেগ বা পরিচয় সংকট নয়, বরং একটি জোরালো অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ছিল। তৎকালীন শিক্ষিত মধ্যবিত্তের কাছে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুর আধিপত্য মানেই ছিল কর্মসংস্থানের অধিকার হারানো। কারণ, নতুন একটি ভাষা আয়ত্ত করা ছাড়া রাষ্ট্রীয় চাকরিতে প্রবেশের পথ তাদের জন্য বন্ধ হয়ে যেত। এই সার্বিক বঞ্চনার বিরুদ্ধেই ছিল সেই মহান আত্মত্যাগ, যা ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কোর মাধ্যমে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’-এর বৈশ্বিক স্বীকৃতি পায়।

বিশ্বব্যাপী এই দিনটি পালিত হওয়া নিঃসন্দেহে বাঙালিদের জন্য গৌরবের। কিন্তু যে ভূখণ্ড থেকে এই আন্দোলনের জন্ম, সেখানে বাংলার বাইরে থাকা অন্য ভাষাগুলো কতটা মর্যাদা পেয়েছে? অন্য ভাষাভাষীদের অস্তিত্বের লড়াই কি শেষ হয়েছে, নাকি তা আজও চলমান? আজ এই প্রশ্নগুলো এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

বাংলাদেশে সরকারি হিসেবে প্রায় ৪৮টি আদিবাসী গোষ্ঠী রয়েছে। অথচ জাতিসংঘের সংজ্ঞায়ন এড়িয়ে বাংলাদেশে তাদের অভিহিত করা হয় ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’ হিসেবে। পরিবেশ ও অধিকারকর্মীরা প্রতিনিয়ত এসব ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষণের দাবি জানাচ্ছেন। ভাষা আন্দোলনের ৭৪ বছর এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির ২৭ বছর পরেও যদি ‘সংরক্ষণের’ জন্য আকুতি জানাতে হয়, তবে স্পষ্ট যে তাদের লড়াই আজও শেষ হয়নি।

মাতৃভাষার অধিকারের জন্য যারা প্রাণ দিলেন, সেই ত্যাগের মহিমা কি তবে কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বার্থ রক্ষার পর থমকে গেল? আমরা কি তবে অন্যদের কথা ভুলে গেলাম? বিস্মৃতি বোধহয় আমাদের মজ্জাগত। এমনকি বৈষম্য দূর করার অঙ্গীকার নিয়ে যে ‘জুলাই অভ্যুত্থান’ সম্পন্ন হলো, যেখানে হাজারের বেশি প্রাণ ঝরল এবং দেয়ালে দেয়ালে ‘পাতা ছেঁড়া নিষেধ’-এর মতো সম্প্রীতির গ্রাফিতি আঁকা হলো। সেই বিপ্লব-পরবর্তী সময়েও আমরা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষকে নিগৃহীত হতে দেখলাম। কেবল নিজেদের ‘আদিবাসী’ দাবি করায় তাদের লাঞ্ছিত হতে হয়েছে।

কবীর সুমন ওই গানেই বলেছিলেন, এই চাওয়া অনেকের কাছে ‘স্বর্গরাজ্যের’ মতো অলীক মনে হতে পারে। কিন্তু তিনি আশা করেছিলেন, এমন একদিন আসবে যখন এই অধিকারগুলোর জন্য আলাদা করে দাবি জানাতে হবে না; এগুলো যাপনের অংশ হয়ে উঠবে। আমরাও সেই আশাই রাখি। এই আপাত ‘ইউটোপিয়ান’ পরিস্থিতি একদিন বাস্তব হয়ে উঠবে এবং প্রতিটি মানুষ তার আপন ভাষায় মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে সেই দিনটির অপেক্ষায়।

সম্পর্কিত